ফিরে দেখা

পর্ব - ২

🟢

-"Nice to meet both of you, Mr. Khan!"

-"Nice to meet you guys as well, Miss soha!"

ওরহান নিজেকে সংযত রেখে বলল কথাটা।

-"তো মিস্টার খান," সোহা পেশাদার ভঙ্গিতে শুরু করল, "আমাদের কোম্পানি সম্পর্কে নিশ্চয়ই আপনি অবগত। আমরা মূলত ফ্যাশন ও ওমেন প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করি। হেড অফিস প্যারিসে, তবে বিশ্বের নানা প্রান্তে আমাদের শাখা রয়েছে। আপনাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নতুন নয়। আমাদের বিল্ডিংয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজ আপনাদের প্রতিষ্ঠানই করেছে। হেড অফিস সেই কাজের প্রশংসা করেছে, এবং সেই সন্তুষ্টি থেকেই এবার পুরো আর্কিটেকচার ও ইন্টেরিয়রের দায়িত্ব আপনাদের উপরই দিতে চায়।"

ওসমান চুপচাপ ভাইয়ের মুখের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছে। সোহাকে সামনে পেয়ে ওরহান যেন আর স্থির থাকতে পারছে না, চোখে তার দূরের কোনো জগৎ, মনের গভীরে অন্য এক সময়ের প্রতিচ্ছবি। সে যে কত কথা বলতে চায়, অথচ সব কিছুই যেন আটকে যাচ্ছে। ওসমান টের পাচ্ছে, ওরহান যদি এখন মুখ খোলে, না জানি কোন ভুল শব্দ উচ্চারিত হয়। এই ভেবে সে নিজেই এগিয়ে এসে বলল—

-"জ্বি, মিস সোহা। আমরা আপনাদের সঙ্গে পুনরায় কাজ করতে আগ্রহী। এটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গর্বের বিষয়।"

ওসমানের কথা শুনে সোহা হালকা এক সূক্ষ্ম হাসি হাসলো। তারপর মাথা হেলিয়ে সংযত কণ্ঠে বলল—

-"ধন্যবাদ, মিস্টার খান। তবে হ্যাঁ, এবার আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি ধাপ তদারকি করব। কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমাকে জানানো এবং আমার সম্মতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। কনস্ট্রাকশনের কাজটি আমরা সরাসরি দেখিনি, হেড কোয়াটার থেকেই আদেশ এসেছিল। তবে এইবার থেকে সমস্ত কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আশা করি, আমি আমার বক্তব্য যথেষ্ট স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পেরেছি?"

তার কণ্ঠে ছিল নিখুঁত পেশাদারিত্ব, যেন এই ঘরে উপস্থিত কেউই তার পূর্বপরিচিত নয়। সোহা যখন কথা বলছিল, ওরহান একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। যেন বহু বছরের তৃষ্ণা মেটাতে ব্যাকুল চোখদুটো। চার বছর! চারটি দীর্ঘ, নির্জন,অনুতাপমাখা বছর। এই কয়টি বছরে কোথায় যায়নি সে? কত শহর, কত সন্ধ্যা, কত অনন্ত রাত্রি কেটেছে সোহাকে খুঁজতে খুঁজতে। অথচ কেউ জানাতে পারেনি তার খবর। সোহা নিজেই হারিয়ে গিয়েছিল, নিজেকে লুকিয়ে নিয়েছিল সবকিছুর থেকে। এমনকি নিজের পরিবারের থেকেও।

আজ এই সভাকক্ষে হঠাৎ তাকে সামনে দেখে, ওরহানের ভেতর উথলে ওঠে শত প্রশ্ন। এই বছরগুলোতে কোথায় ছিল সে? কেমন ছিল? কার সঙ্গে ছিল? ও যেন আর এই ঘরে নেই, চুপিসারে ডুবে গেছে এক বিস্মৃত, অথচ বেদনাময় ভাবনার জগতে।

নিজেকে সামলে নেয় ওরহান। এখন নয়, এই মুহূর্তে সে আবেগের কাছে হার মানতে পারে না। প্রথমে এই ডিল সাইন করাতে হবে। তাহলে সে সোহার কাছাকাছি থাকতে পারবে, দীর্ঘ সময় ধরে। তখন, একে একে, সে খুঁজে নেবে সব প্রশ্নের উত্তর। এই ভাবনার মাঝেই ওরহান নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলা শুরু করল—

-"জি, মিস সোহা, আমরা বুঝতে পেরেছি। আপনি যদি বিস্তারিতভাবে জানান ঠিক কেমন ধরনের আর্কিটেকচার ও ইন্টিরিয়র ডিজাইন চান, তাহলে আমরা সে অনুযায়ী আমাদের পরিকল্পনাগুলো আপনাকে ব্যাখ্যা করতে পারব," বিনয়ের সঙ্গে বলল ওরহান। সোহা মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠ ছিল নিখুঁত আত্মবিশ্বাসে ভরা, একেবারে কর্পোরেট নেতার মতো দৃঢ়।

-"অবশ্যই বলছি। আপনারাতো জানেনই আমাদের একটি দশতলা বিশিষ্ট ভবন, ফ্যাশন ও ওমেন প্রোডাক্ট বিষয়ক কাজের জন্য এটা হতে হবে আধুনিক, কার্যকর ও রুচিসম্মত। আন্ডারগ্রাউন্ডসহ হবে। নিচতলায় থাকবে পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস। প্রথম তলা থাকবে রিসেপশন ও রেস্টিং এরিয়া। দ্বিতীয় তলায় থাকবে আমাদের ক্যাফেটেরিয়া। তৃতীয় তলায় ডিজাইনারদের ওয়ার্কশপ। চতুর্থ তলায় থাকবে তাদের কেবিন ও মিটিং রুম। পঞ্চম তলায় বিউটি প্রোডাক্ট ল্যাবরেটরি। ষষ্ঠ তলায় রিসার্চ টিম। সপ্তম তলায় লিগ্যাল ডিপার্টমেন্ট, আমাদের অ্যাডভোকেটরা। অষ্টম তলায় একটি চিলিং স্পেস, যেখানে থাকবে পুল টেবিল, টেবিল টেনিস, কেরাম ইত্যাদি। নবম তলা আমার ব্যক্তিগত কেবিন, পুরো ফ্লোরজুড়ে থাকবে। সঙ্গে থাকবে একটি বড় মিটিং রুম। দশম তলায় থাকবে রিল্যাক্সেশন এরিয়া এবং ওভারনাইট স্টে এর সুবিধা।" একটু থেমে নিঃশ্বাস নিয়ে সে আবার বলল,

-"আপনারা আগে একটি প্রাথমিক প্ল্যান তৈরি করুন। আমরা পরবর্তী ধাপে আলোচনা করব।"

-"জি, নিশ্চয়ই। আমরা সবকিছু পরিকল্পনা করে আপনাদের জানাবো," বিনয়ের সঙ্গে বলল ওরহান। সোহা হালকা মাথা নাড়ল, গলার স্বর একটুও না নরমিয়ে বলল—

-"Fine then, আজ আমরা উঠি। আপনারা প্ল্যান রেডি করে আমাদের জানাবেন। আল্লাহ হাফেজ।"

সোহা বেরিয়ে গেলে ওরহান নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। পর মুহূর্তেই তারা উঠল তার কেবিনে। ওরহানের কেবিনে, ওসমান যেন কথাগুলো আর আটকে রাখতে পারল না—

-"দাদাভাই, ওটা সেহরা ছিল! তুমি এত নিশ্চুপ ছিলে কীভাবে? কেনো কথা বললে না? কিছু জিজ্ঞাসা করলে না ওকে?"

ওরহান নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকল দেয়ালের দিকে। এরপর ক্লান্ত সুরে বলল—

-"কি জিজ্ঞেস করব বল? কালকের পার্টিতেও ও ছিল। আমি ওকে দেখেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। আর আজ...চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও এমন ব্যবহার করল যেন আমাদের কেউকেই সে চেনে না।"

ওসমানের কণ্ঠে অভিমান মেশানো অনুরোধ—

-"কিন্তু দাদাভাই, ওকে পেয়েও তুমি কি আবার হারিয়ে ফেলবে?"

এই কথাটা যেন কোথাও গিয়ে আঘাত করল ওরহানকে। হঠাৎ যেন বিস্ফোরণ ঘটল তার ভেতরে। টেবিলে সজোরে দুই হাতে আঘাত করে সে গর্জে উঠল—

-"কখনোই না! একবার হারিয়েছি, এবার নয়। আমি ওরহান খান,এইভাবে কখনও হারি না। এবার ওকে হারাতে দেব না। যা করার, খুব ভেবেচিন্তেই করতে হবে। আপাতত সবচেয়ে জরুরি হলো, এই ডিলটা কনফার্ম করা। এই ডিলটাই আমার টিকিট, ওর পাশে থাকার, ওর সঙ্গে আবার কথা বলার। না হলে কিছুই করতে পারব না।"

ওরহানের এমন উত্তেজিত অবস্থা দেখে ওসমান এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বলল—

-"শান্ত হও দাদাভাই, আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। এই ডিলটা আমরাই পাবো, তুমি নিশ্চিত থাকো।"

কিন্তু বলার পর ওসমানের গলা কেঁপে ওঠে। সে ফিসফিস করে বলল—

-"কিন্তু দাদাভাই....তুমি কি শুধুই ওর ক্ষমা চাওয়ার আশায় এগোচ্ছো? নাকি..."

সেই ‘নাকি’টা আর শেষ করতে পারল না ওসমান। তার গলা আটকে যায়। সাহস হয় না বাকিটা বলার। যদি তার দাদাভাই কেবল ক্ষমার আশা ছাড়াও অন্য কিছুর জন্য সোহাকে কাছে টানতে চায়, তাহলে, মিহিরিমা কী করবে? তাদের পরিবার কী করবে? আর সোহা, সে কি কখনও ক্ষমা করতে পারবে?

সিনারি

আজকের দিনটা ছিল ভীষণ চাপের। সোহা আজ একাধিক অফিসে মিটিং সেরেছে। হেড কোয়ার্টার থেকে শিডিউল নির্ধারিত ছিল, তাই মিটিং এড়ানো সম্ভব ছিল না। একদিনেই অনেকটা মানসিক ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে তাকে। আপাতত কাজ সামলানোর জন্য একটি ছোট অফিস নেওয়া হয়েছে, সেখানেই পিএ, ম্যানেজার ও অ্যাডভোকেটদের সঙ্গে জরুরি আলাপ সেরে সোহা বাড়ির পথে রওনা দেয়।

বছরখানেক আগে, শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, এক নির্জন শান্ত পরিবেশে নিজের জন্য একটি ছোট্ট আশ্রয় তৈরি করেছে সোহা। চওড়া দেয়াল ঘেরা সেই বাড়ির চারপাশে বিছানো কাঁটাতারের নিরাপত্তা, আর তার মধ্যেই একতলা একটি বাড়ি, যেটা তার নিজের হাতেই গড়া। চারপাশের খোলা জায়গায় সোহা নিজের হাতে ফলের গাছ লাগিয়েছে, সাজিয়েছে নানা রকম ফুলে। বাড়ির ভেতরে আছে একটি মাস্টার বেডরুম, রান্নাঘর, একটি গেস্টরুম, আর প্রশস্ত একটি বসার ঘর। ছাদে সে লাগিয়েছে শাকসবজির ছোট্ট বাগান, আর একপাশে বসিয়েছে একটি দোলনা, যেখানে বসেই সে মাঝেমধ্যে কাজ করে কিংবা আকাশ দেখে।

রাতের খাবার সেরে ফ্রেশ হয়ে, ল্যাপটপ হাতে সোহা ছাদে যায়। চারদিকে সাজানো বাহারি আলোয় ছাদটি যেন নীরব আলোকোজ্জ্বল এক জগৎ। দোলনায় বসে কাজ করছিল সে। ঠিক তখনই ওরহান খান শাহিরের মুখ ভেসে ওঠে তার মনে। সেই মানুষ, যে আজও বদলায়নি। সেই আগের মতই সুদর্শন, দাম্ভিক, আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর চোখের ভাষা। সোহা ভাবেনি, এত বছর পর আবার এভাবে মুখোমুখি হতে হবে তার সঙ্গে। আজকের মিটিং-এ নিজেকে অনেক কষ্টে সংযত রেখেছিল সে। তবে মনে মনে জানে, এই প্রজেক্ট যদি খানরা পেয়ে যায় সোহার জন্য এক বিভীষিকাময় অতীত আবার ফিরে আসবে। না, সে আর ফিরতে চায় না। চার বছর আগের সেই অপমান, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, সব যেন এখনো কাঁটার মতো গেঁথে আছে মনে। আজকের সোহা নিজের মতো করে জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। সে আর কারো জন্য ভাবতে চায় না। এই পৃথিবীতে তার আপন কেউ নেই, সবাই মৃত সোহার কাছে।

বৃষ্টির ফোঁটা সোহার শরীরে পড়ায় সোহার হুশ ফিরে। আকাশ পনে তাকিয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। ক্ষণে ক্ষণে বিদুৎ চমকাচ্ছে। দোলনা থেকে উঠে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের পানে মুখ করে। বৃষ্টিতে ভিজছে নিঃশব্দে।

তার ঠোঁটে নেই কোনো শব্দ, তবুও সৃষ্টিকর্তার কাছে হয়তো আজও সে অনেক কিছু বলছে।হয়তো শুধু এইটুকু—

"আর ফিরে যেতে চাই না..."

.

সিনারি

.

খান ভিলা,

ওরহান সোজা নিজের রুমে চলে গেছে। চুপচাপ। মুখ গম্ভীর। ওদিকে ওসমান বসে তার মা সুরাইয়া বেগমকে আজকের ঘটনার সবকিছু খুলে বলছে। কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছেন তিনি। কথার শক্তি হারিয়ে গেছে যেন, শুধু চোখজোড়া ছলছল করছে, আর চুপচাপ তাকিয়ে আছেন ওরহানের কক্ষের দরজার দিকে।

-"আল্লাহ....এইবার আমার ছেলেটাকে একটু শান্তি দাও। এত অনুশোচনা, এত অস্থিরতা থেকে মুক্তি দাও তাকে। ও যেন ক্ষমা পায়....আল্লাহ, আমার ছেলের সহায় হও!" কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করলেন তিনি।

ওসমান ধীরে ধীরে বলল—

-"কিন্তু মা....আমার মনে হচ্ছে দাদাভাই অন্য কিছু ভেবে রেখেছে। যা হয়তো আমাদের কারো জন্যই ভালো হবে না। মা....যদি সত্যি সে সোহাকে....

কথাটা গলার কাছে আটকে গেল। আর যদি সেই কারণেই এত অনুশোচনা করে....তাহলে মিহিরিমা? মা, সে তো এমনিতেও দাদাভাইকে শান্তি দেয় না। এরপর যদি জানতে পারে...."

সুরাইয়া বেগম শান্ত স্বরে বললেন—

-"চিন্তা করিস না, ওসমান। ওরহান যা করবে ভেবেচিন্তেই করবে। ও এখন আর আগের মতো ছেলেমানুষ নেই। এই চার বছরে অনেক কিছু শিখেছে, অনেক বদলেছে....আর এই বদলের পেছনে যদি কারও অবদান থাকে, সেটা সোহাই। মেয়েটা আমার ছেলেকে মানুষ করেছিল, কিন্তু আমরা সবাই মিলে তার জীবনটাকে....নষ্ট করে দিয়েছিলাম। ও কি আমাদের ক্ষমা করবে রে?"

ওসমানের চোখ জ্বালা করে উঠল।

-"জানি না মা....আজ তাকে যেভাবে দেখলাম, মনে হলো সে আমাদের কাউকেই চিনে না। এখন শুধু দেখার পালা, দাদাভাই কী করে, আর ভাগ্য কী লিখে রেখেছে আমাদের জন্য।"

রাত ১০টা ডাইনিং টেবিলজুড়ে একসাথে বসেছে খান পরিবারের সদস্যরা। দুই কর্তা, ওমর খান ও ওয়াহিদ খান। ওমরের তিন সন্তান—ওরহান খান শাহির, ওসমান খান শান্ত, ওয়াজীহা খান শিফা।

ওয়াহিদের যমজ দুই ছেলে—আয়ান খান মুফতি ও আয়যান খান মারুফ। ওরহান ও ওসমান এখন ব্যবসার হাল ধরেছে। ওয়াজীহা অনার্সের প্রথম বর্ষে, যমজরা অনার্স শেষ বর্ষে। বড়রা কথা বলছে ব্যবসা নিয়ে, ছোটরা হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে। দুই কর্তা নিজের হাতে খাবার পরিবেশন করছেন। সবার মাঝে যেন এক টুকরো নিখাদ পারিবারিক দৃশ্য।

ডাইনিং টেবিল টইটম্বুর, ভাত-মাংস-তরকারির চেয়ে বেশি গরম মেজাজে আছে ভাইবোনদের ঠাট্টা-মশকরা। পুরো পরিবেশটা যেন “আজই বিয়ে হবে কারো!” এই নিয়ে নাটক চলছে। মুফতি একাধারে প্লেটে পোলাও এর মাংস নিয়েই চলেছে। শিফা সেইসব দেখে নাক মুখ কুচকে বলল—

-"জীবনে খাবার খাও নি? নাকি সারাজীবনের খাবার এখনই খেয়ে শেষ করবে?"

মুফতি কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—

-"খবরদার শিফুর বাচ্চা আমার খাবারে নজর দিবি না। তোর এই নজর দেওয়ার জন্য আমার শরিলের দিন দিন অবনতি হচ্ছে।"

মারুফ সবেই পানি মুখে দিয়েছিল মুফতির কথা শুনে পানি ছিটকে পড়ে যায়। কাশতে কাশতে বলল—

-" ৮৭ কেজি ওজনের শরীর তোর। কোন দিক দিয়ে অবনতি হচ্ছে আমাকে একটু দেখা।"

-"তুই কথা কম বল। আমার শরীরে নজর দিলে জীবনেও তোর বিয়ে হবে না।"

-"এহ এমন ভাবে বলছিস যেনো আমি বিয়ে করার জন্য মরে যাচ্ছি।"

এদের কথা শুনে ওসমানের বুকটা ধক করে উঠল। সে একটু চেঁচিয়ে বলল—

-"চুপ করো তো! বড় ভাইয়ের বিয়ের খবর নেই আর এরা নিজেদের বিয়ের কথা বলছে লজ্জা করে না তোদের। আগে আমি বিয়ে টা করে নেই তারপর তোরা এইসব নিয়ে কথা বলবি।"

সবাই একসাথে অবাকের চরম পর্যায় পৌঁছে গেলো। এই প্লেবয় মাসে কয়টা বিয়ে করতে চায় তার ঠিক নেই। এখন আবার কোনটার পিছে লাগছে কে জানে। সবাই একসাথে টিটকারী মেরে বলল—

-"আবার? কোনটা? পঞ্চম নাকি ষষ্ঠ? তুমি তো আবার মাসে মাসে বিয়ে করতে চাও। আর প্রতি মাসেই তোমার মেয়ে চেঞ্জ হয়ে যায়।"

-"এইবার সিরিয়াস...মেয়েটা গাজরের হালুয়া বানাতে পারে।

ওয়াজীহা ওসমানের প্লেট থেকে মুরগীর লেগ পিছটা থাবা মেরে নিয়ে বলল—

-"তোমার প্রেম নয়, এটা ডায়াবেটিকসের প্রণয়!"

ওরহান চুপচাপ খেতে ব্যস্ত, যেন চারপাশের হাসি-ঠাট্টা, কোলাহল তার কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না। কিন্তু সেই নীরবতা ভেঙে, হঠাৎ মুফতি যেন হেঁকে উঠল—

—"দাদাভাই, তুমি বিয়ে করবে না? সেই কবে থেকে ওই চৌধুরী কন্যার সাথে এনগেজ হয়ে বসে আছো! নাকি চৌধুরী সাহেব তোমাকে বাংলা সিনেমার মত একটা ব্রিফকেস হাতে দিয়ে বলেছে, ‘আমার মেয়েকে ভুলে যা ছোটলোক, এই নে এক কোটি টাকা’!"

চারপাশে হাসির রোল পড়ে যায়, কিন্তু ওরহান মাথা তোলে না, চামচে শেষ ভাতটুকু তুলে ঠোঁটে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে—

—"কার এত বড় সাহস আমাকে এক কোটি টাকা অফার করবে? যেখানে আমি নিজেই চৌধুরী গ্রুপ কেনার ক্ষমতা রাখি।"

তার জবাবে চারপাশ এক মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়ে—

—“ওওওওওহ!” (টিজার গর্জন)

ওসমান এবার হালকা টিটকিরি মাখা কণ্ঠে বলে—

—"দাদাভাই প্রেমের কবিতা লেখে, আর আমরা শুধু কাবাবের কবিতা বুঝি! তাই এই দাদাভাইয়ের আর চৌধুরী কন্যার বিয়ে হবেই, নিশ্চিত থাক তোরা। কিরে, আমার লেগ পিস্ কে নিয়েছিস রে?"

ওয়াজীহা একটা হাঁড়ি ঢাকনা খুলে বলল—

-"এই যে ভাইসব, মাংস নাই কেন?"

সুরাইয়া বেগম বাটি ভর্তি তরাকরি আনতে আনতে বললো—

-"তোর পেছনের দুজন বাঘের থাবা দিয়ে তুলে নিয়েছে।"

মুফতি অসহায় কন্ঠে বলল—

-"আমি তো শুধু হাড্ডি তুলেছি, মাংস গায়েব ছিল!"

মারুফ বলল—

-"ভাই, প্লেটের হাড্ডিগুলো হাওয়াই মিঠাই ছিল নাকি?”

সবার হাসির ফোয়ারা ছুটে যায়। খাওয়া শেষ হওয়ার পর সবাই থালাবাসন নিয়ে হাঁটছে, তখন ওয়াজীহা হঠাৎ পিছন থেকে ওসমানকে পানি ছুঁড়ে দিল। ওসমান হায় হায় করতে করতে বলল—

-"আল্লাহ! বাথরুমটা তুমি ডাইনিং রুমেই বানিয়ে দিলে নাকি?"

ওয়াজিব দার কেলিয়ে বলল—

-"এটা ছিল আমার শেষ প্রতিশোধ! তুমি আমার ফোনের ক্যামেরায় আজ চুলকানি ফিল্টার লাগিয়ে দিয়েছিলে!"

ওরহান হেসে বলল—

-"তোদের ফিল্টার ছাড়া জীবনে কোনো রং নাই!"

.

সিনারি

.

রাত ১২টা ওরহান বেলকনিতে, রাত পেরিয়ে গেছে, তবু ঘুম আসেনি। ওরহান বেলকনিতে বসে আছে, সিগারেটের ধোঁয়া একের পর এক আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই ভার্সিটির দিন গুলো। কত অন্যায় কত হাসি কত কিছু ছিল। সব চেয়ে বেশি মনে পড়ে নিজের করা সেই অন্যায় কথা।

ওরহান মাস্টার্সের শেষ বর্ষে। ক্যাম্পাসে এসেছে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। বয়স ২৬ হলেই কোম্পানি সামলাতে হবে, তাই এখন নিজেকে একটু মুক্তভাবে উপভোগ করার সময়। বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি চলছে, তখনই একটি মেয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে, মাথায় ওড়না টেনে ওদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। মেয়েটি অনন্য সুন্দরী না হলেও, তার মুখে ছিল অদ্ভুত এক মায়া।

ঠিক সেই মুহূর্তে, হঠাৎ করেই ওদের বন্ধু তানভীর দৌড়ে এসে মেয়েটির সঙ্গে ধাক্কা খায়। মেয়েটি ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। সিয়াম চেঁচিয়ে উঠে বলে—

-"কানা নাকি! মেয়ে দেখলেই গায়ে পড়তে ইচ্ছা করে তোর?"

তানভীর তড়িত্‍ ঘুরে উঠে দাঁড়ায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাফসানের দুই বান্ধবী রিয়া ও নিশাত তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে ধরে তোলে। মেয়েটির হাতে সামান্য কাটাছেঁড়ায় রক্ত বের হচ্ছে।

তানভীর অপরাধবোধে গদগদ হয়ে মেয়েটির সামনে এসে বলতে থাকে—

-"সরি আপু, আমি আপনাকে দেখতে পাইনি। এক্সট্রিমলি সরি। আসলে একটা বিপদ হয়েছে তো, তাই দৌড়াতে গিয়েই খেয়াল করতে পারিনি। সরি।"

মেয়েটি মাথা তুলে তাকায়। মুখে ফুটে ওঠে মিষ্টি এক হাসি। সে শান্ত স্বরে বলে—

-"ইট’স ওকে ভাইয়া। আমিও তো মাথা নিচু করে হাঁটছিলাম, আপনাকে দেখিনি। দোষ আমারও ছিল। সরি ভাইয়া।" ওড়নাটা ঠিক করে ব্যাগটা হাতে নিয়ে মেয়েটি ধীরপায়ে প্রস্থান করে।

ওরহান ও তার বন্ধুবান্ধব সবাই যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে মেয়েটির চলনপথ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। পরস্পরের মুখে বিস্ময়ের ছায়া। অবশেষে তানভীর মুখ খুললো—

-"দোস্ত, ঝামেলা হয়ে গেছে, এটা জানানোর জন্যই আসতে গিয়ে মেয়েটার সঙ্গে ধাক্কা লাগল।"

সিয়াম তৎপর হয়ে বলে—

-"কি হয়েছে, বল তো?"

-"রুদ্র আমাকে থ্রেট দিয়েছিল। বলেছিল, ওরহানকে গিয়ে বলি যেন লিজার পিছু ছেড়ে দেয়। আমি বলেছিলাম, সেটা ওরহানকে সামনে গিয়ে বলতে। বুকের পাটা নেই নাকি! এই কথার জন্য সালা আমাকে ঘুষি মেরেছে।"

ওরহানের চোখ দুটো রক্তিম আগুনে জ্বলতে থাকে। মুখের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে তানভীরের কলার চেপে ধরে বলে—

-"কথায় ওই জানোয়ারের বাচ্চা? চল, আজকে ওর একদিন না, আমার যত দিন লাগে!"

বলেই উত্তপ্ত পায়ে সবাই রওনা দেয়, ঝড়ের মতো।

পরদিন ওরহান ভার্সিটিতে এসেছে। মেইন গেটের সামনে বাইক হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের ভ্রুর পাশে ছোট্ট একটা কাটা দাগে ওষুধ মেখে রাখা, হাতে সাদা ব্যান্ডেজ। বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া ভেসে বেড়ায়।

ঠিক তখনই তার দৃষ্টিতে পড়ে সেই মেয়েটি, কালকের পরিচিত মুখ।

একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোকের সঙ্গে মেয়েটি রিকশা থেকে নামল। ভদ্রলোক স্নেহভরে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে পুনরায় রিকশায় উঠলেন এবং ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেন ভিড়ের মাঝে।

ওরহানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটটি মাটিতে ফেলে পিষে দেয় সে। তারপর তার বন্ধুদের ফেলে রেখে এক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যায়। মেয়েটির সামনে গিয়ে রূঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—

-"লোকটা কি হয় তোমার?"

হঠাৎ করে ওরহানকে সামনে দেখে মেয়েটি থমকে যায়। দু'পা পিছিয়ে গিয়ে, ভয়জড়ানো কাপা গলায় জবাব দেয়—

-"বা…বাবা!"

ওরহানের চোয়াল আরো শক্ত হয়ে উঠল। চোখে একরাশ অভিমান আর ক্ষোভ। শব্দহীনভাবে সে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল, ভার্সিটির গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল জনারণ্যে।

হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে বাস্তবে ফিরে আসে ওরহান। বৃষ্টি নেমেছে, নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে সে। কিছুক্ষণ পর পকেট থেকে ফোন বের করে একটাই কথা বলে—

-"ইহাব, মিস সোহা’র বাড়ির ঠিকানা বের করো।"

তারপরই ফোন কেটে দেয়, ইহাবের কোনো কথা শোনার আগেই।

Story Cover