ফিরে দেখা

পর্ব - ১৯

🟢

নিশীথের গাঢ় আঁধারে মোড়া সাজেকের পাহাড়ি বুকে, ঘন কুয়াশার সুরেলা আবরণ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। কালো মেঘের সমুদ্র আকাশ, যেন অশ্রুবিন্দু ঝরিয়ে স্বপ্নভঙ্গের আগাম সংকেত দিচ্ছে। বাতাসের শায়-শায় শব্দে প্রকৃতির হৃদস্পন্দন যেন শোনা যায়, মৃদু, রহস্যময়, অশ্রুতিমধুর।

রুংরং রিসোর্টের নিস্তব্ধ কক্ষে বিদ্যুতের কোনও আভাস নেই। অন্ধকারের অমাবস্যা ঘিরে রেখেছে চারপাশকে। জানালার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে কুয়াশার আলতো আলোকচ্ছটা, যা যেন ধীরে ধীরে ঘরটিকে আলোকিত করার আকুতি করছে, অথচ নিরাশায় ডুবে আছে স্থির বাতাস।

ঘর জুড়ে শুধু এক পুরুষের গাঢ় নিশ্বাসের শব্দ আর এক রমণীর গুঙানোর। বাথরুমের বাহিরের দেয়ালের কোণে চেপে ধরে রাখা হয়েছে সোহাকে, এক অপরিচিত, অচেনা স্পর্শের বন্দী সে। সোহার মন খুঁজছে মুক্তির সুর, কিন্তু তার মস্তিষ্ক যেন বন্ধ পড়েছে। বুকে নিস্তব্ধতার মাঝে শুষ্কতা জড়িয়ে ধরেছে, গলা শুকিয়ে আসছে ভয়ের অগ্নিতে।

সেই অপরিচিত পুরুষ মৃদুস্বরে কিছু বলেছে, কিন্তু সোহার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ভয়ের করাল ছোবলে হারিয়ে গেছে সমস্ত সংবেদন। হঠাৎ করেই ঘরের দরজার কর্কশ শব্দ ভেঙে দেয় নিস্তব্ধতার রাজত্ব। দুজনেই তৎপর চোখে তাকিয়ে পড়ল প্রবেশপথের দিকে। অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসছে এক মানবের ছায়া, মুক্তির আলো, নাকি আরও এক অনিশ্চিত ছায়া?

সোহাকে ধরে রাখা সেই অজানা স্পর্শ হঠাৎ ছেড়ে পালিয়ে যায়, বারান্দার ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো লাফিয়ে পড়ে বাইরে অন্ধকারে। সোহা কাঁপছে, তার ভীতু হৃদয় আর শরীর অবশ হয়ে আসছে। সে বসে পড়ল মাটিতে, যেন পৃথিবীর সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে তার মাঝে। এই নিস্তব্ধতা, এই একাকিত্ব যেন এক বেদনার সুর, যা পাহাড়ের বাতাসেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

ওরহান দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো। বারান্দা দিয়ে কাউকে পালাতে দেখে ঝড়ের বেগে ছুটে গেল সেই দিকে। কিন্তু, আশ্চর্য! সেখানে কেউ নেই, মনে হলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে অপরিচিত ছায়াটি।

ফিরে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল, সোহা গুটিসুটি মেরে বসে আছে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে কান্নায় কাঁপছে সমগ্র দেহ।

বিদ্যুতের মত ছুটে এলো ওরহান। এক নিঃশ্বাসে আগলে নিল সোহাকে, কণ্ঠে আতঙ্কের সুর—

-"কি হয়েছে, জান? কে ছিল? কিছু করেছে তোমার সাথে?"

সোহা ভয়ার্ত চোখে তাকালো তার দিকে। সেই চোখে স্পষ্ট, এই স্পর্শ, এই কণ্ঠস্বর, এই উষ্ণ নিশ্বাস, চেনা। অন্ধকার যতই গভীর হোক, এ ওরহান, তাতে ভুল হবার নয়।

সে এক ঝটকায় খামচে ধরল ওরহানের কোর্ট, যেন ভরসার শেষ আশ্রয়। নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইল ওরহানের বুকে, এমনভাবে মুখ গুঁজে দিল, যেন ওরহানের বুকের ভেতরে আশ্রয় নিতে পারলেই মিলবে শান্তি। যেন কোনো অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা রয়েছে সেখানে, যতক্ষণ এই বুকে লুকিয়ে থাকবে, ততক্ষণ কোনো বিপদ তার গায়ে ছুঁতে পারবে না।

দরজার বাইরে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, বারান্দায় চাঁদের আলো যেন কেঁপে উঠছে অস্থিরতায়। ঘরের ভেতর নীরবতা, শুধু সোহার হেঁচকি তোলা কান্না আর ওরহানের অস্থির শ্বাসের শব্দে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে পৃথিবী সংকুচিত হয়ে তাদের দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

ওরহান বুঝল, সোহা প্রচণ্ড ভয়ে আচ্ছন্ন। এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের বাহুতে জড়িয়ে নিলো তাকে। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল, কণ্ঠে শান্তনার সুর মিশিয়ে বলল—

-"কিছু হয়নি, জান... আমি চলে এসেছি তো। আমি থাকতে কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, বেবি। ডোন্ট ক্রাই সোনা... এইতো আমি এসে গেছি, দেখো।"

কিন্তু সোহা শান্ত হলো না। হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠল। থরথর কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলল—

-"মেরে ফেলবে... আমাকে মেরে ফেলবে। আমার... আমার গলা টিপে ধরতে চেয়েছিল। বাঁচাও... আমাকে বাঁচাও।"

ওরহান দৃঢ় অথচ স্নেহভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—

-"শশশ... বেবি... এইতো আমি। কেউ মারবে না তোমাকে। কলিজা ছিঁড়ে ফেলব যে আমার বিষরাণীকে আঘাত করবে। ভয় পেয়ো না, জান।"

সে সোহার মাথায় আলতো করে চুমু খেল। সোহা যেন এক শেষ ভরসায় আঁকড়ে ধরল তাকে, আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিলো, বুকের গভীরে মুখ গুঁজে দিলো। কণ্ঠ কেঁপে উঠল, অভিযোগ ও অভিমানের স্রোতে ভেসে—

-"ছিলেন না... ছিলেন না আপনি। বাঁচাননি আমাকে। সেইদিন... সেই রাতে আমি কত ডেকেছি আপনাকে, আপনি আসেননি। বাবা আমাকে খুব মেরেছে... আপনি আসেননি।"

ঘর তখন ভারী হয়ে উঠেছে অদৃশ্য স্মৃতির বোঝায়। ওরহানের বুকের ভেতর কেমন এক অস্থির আগুন জ্বলে উঠল, হয়তো অপরাধবোধের, হয়তো প্রতিজ্ঞার, কিংবা দুটোই। বাইরে রাত আরও গভীর, বাতাসে যেন অজানা শঙ্কার গন্ধ।

ভয়ের অভিঘাতে সোহা হুঁশ হারিয়েছে। ওরহান এক মুহূর্তে বুঝে ফেলল, সেইদিনের অভিশপ্ত ঘটনা সোহাকে এমন গভীর ট্রমায় ফেলে দিয়েছে, যা আজকের এই আতঙ্কে আবার জেগে উঠেছে, দগদগে ক্ষতের মতো। সে নরম, ভরসাদায়ক সুরে বলল—

-"ক্ষমা কর আমায়... আমি বাঁচাতে পারিনি তোমায়, থাকতে পারিনি তোমার পাশে। কিন্তু এখন আছি, জান... দেখো, এই তো আমি তোমার সামনে।"

ওরহান আলতো করে সোহার মুখ তুলতে গেল, কিন্তু হঠাৎ থমকে গেল, সোহা অজ্ঞান হয়ে গেছে। ওরহানের বুকের ভেতর ভারী দীর্ঘশ্বাস জমল। সোহার মুখের নাজেহাল অবস্থা, কান্নায় ভিজে, ক্লান্তিতে নিস্তেজ, তার চোখে অসহায় ক্রোধ আর ব্যথার ঝড় তোলে।

সাবধানে, যেন কাঁচের পুতুলকে আগলে রাখছে, তেমনি করে কোলে তুলে নিলো সোহাকে। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বাথরুমে গিয়ে ভেজা টাওয়াল নিয়ে এল। নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে মুছিয়ে দিলো সোহার মুখ, যেন প্রতিটি অশ্রুবিন্দু মুছে দিয়ে মুছে ফেলতে চায় তার সব কষ্টও।

সোহার মাথার কাছে বসে, এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে, ফোন বের করল ওরহান। নম্বর ঘুরিয়ে কল দিল ইহাবকে। ফোন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ হলো, অপর প্রান্ত থেকে তাড়াহুড়োর সুর—

-"স্যার, হয়েছে নাকি? কতক্ষণ বাহিরে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খাবো?"

ইহাবের বিরক্ত কণ্ঠ দরজার বাইরে শোনা গেল।

ওরহান ধমকে বলল—

-"ডাক্তার নিয়ে আসো, ইহাব!"

ইহাব নিচু গলায় বিড়বিড় করল—

-"সালা... এক রাতেই বউকে আধমরা বানিয়ে দিলো। এত হটনেস দেখানোর কি দরকার ছিল, হে সালা? মাত্র কুড়ি মিনিটে বউয়ের এই অবস্থা... ভাবা যায়!"

ওরহান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—

-"কি বিড়বিড় করছ, ইহাব?"

থতমত খেয়ে ইহাব তড়িঘড়ি করে বলল—

-"এত রাতে ডাক্তার কোথায় পাবো, স্যার?"

ওরহানের চোখে তখন আগুনের ঝিলিক। রাগান্বিত কণ্ঠে ঝাঁঝ মিশে উঠল—

-"জানি না। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার সামনে ডাক্তার নিয়ে উপস্থিত হবে। নইলে তোমার এমন হাল করব, নিজেকে নিজেই চিনতে পারবে না।"

বলেই ফোন কেটে দিলো ওরহান। অন্যদিকে ইহাব ওরহানের চোদ্দগুষ্টি ধুতে ধুতে অন্ধকার রাস্তায় হাঁটা ধরল। মাঝরাতের নীরব শহর, রাস্তার বাতির নিচে ধোঁয়াটে আলো, আর ফার্মেসির একাকী সাইনবোর্ড তাকে পথ দেখাতে লাগল।

ঠিক আধা ঘণ্টার মাথায়, হাঁপাতে হাঁপাতে, এক ফার্মেসির ভেতর বসে থাকা বয়স্ক ডাক্তারকে নিয়ে এসে হাজির হলো ইহাব। ডাক্তার সোহার শ্বাস, পালস ও প্রেসার মেপে শান্ত গলায় বললেন—

-"উনি অতিরিক্ত ভয় পেয়েছেন। সাথে, পুরোনো কোনো আঘাত ওনার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। সব মিলিয়ে ওনার মধ্যে এক ধরনের ট্রমা কাজ করেছে... যার কারণে প্রেসার ড্রপ করে গেছেন, আর তাতেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন।"

ওরহান শুরু থেকেই সব বুঝেছিল। তাই ডাক্তারের কথায় তার চোখে কোনো বিস্ময় ফুটলো না।

ইহাব অতীতের সব জানে, কিন্তু আজকের এই ঘটনার বিশদ সে জানে না। কৌতূহলী চোখে কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা প্রশ্ন নিয়ে ওরহানের দিকে তাকিয়ে রইল।

ডাক্তার আবার বললেন—

-"চিন্তার কিছু নেই। সময় মতো ওনার জ্ঞান ফিরে আসবে।"

ইহাব ডাক্তারকে তার বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল। ডাক্তার একবার ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই ফার্মেসির শাটার টেনে দিয়ে তিনি ইহাবের সাথে বেরিয়ে এসেছিলেন।

ঘরে ফিরে এল নিস্তব্ধতা। ইহাব চলে যাওয়ার পর ওরহান কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল, যেন নিজের ভেতরের সব ঝড় থামিয়ে নিচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে সোহার মাথার কাছে এসে দাঁড়াল। হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে পড়ল সে।

সোহার মুখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল, তার নিস্তেজ চোখের পাতা, ক্লান্ত ঠোঁট, আর কপালের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা চুল যেন অদ্ভুত শান্ত অথচ ব্যথার ছবি এঁকে রেখেছে।

ওরহান আলতো করে হাত রাখল সোহার মাথায়, ধীরে ধীরে চুলে হাত বুলিয়ে দিল, যেন প্রতিটি স্পর্শে তাকে সান্ত্বনা দিতে চাইছে। তারপর মুখটা একটু এগিয়ে এনে সোহার কপালে এঁকে দিল এক স্নিগ্ধ, কোমল চুমু, যেন সেই চুমুর ভেতরে আছে ক্ষমা, প্রতিজ্ঞা, আর অনন্ত ভরসা।

হঠাৎ সে সোহার হাত নিজের হাতে তুলে নিল, মুখের কাছে এনে ধরে রাখল তার গালে, অনেকক্ষণ। নরম, স্থির কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল—

-"মাফ করো, জান আমার..." ওরহানের কণ্ঠে ভারী ক্লান্তি আর অনুতাপ।

-"আমি সত্যি অপরাধী। যখন তোমার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল আমাকে... আমি তখন তোমার পাশে ছিলাম না। কত অপমান, কত আঘাত তুমি একাই নিজের ভেতর নিয়ে সহ্য করেছ। নিজের অজান্তেই করা এই অপরাধবোধ আমাকে শান্তি দেয় না, সোনা। বিশ্বাস করো, গত চারটি বছর ধরে আমার চোখে ঘুম নেই। কী করলে তুমি আমায় ক্ষমা করবে, আমার নীলশ্যামা?"

শব্দগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেলেও ঘরে জমে রইল ভারী আক্ষেপের গন্ধ। আক্ষেপ আর অপরাধবোধে ওরহান যেন ভিতর থেকে ভেঙে পড়েছে। নিজের অতীতের সেই ভুলের জন্য আজও সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি।

নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে সোহারের দিকে। তার চোখে চিকচিক করছে অদ্ভুত এক আলো, যেন জল আর আগুন মিলেমিশে আছে সেখানে। গাল ভিজে গেছে অশ্রুতে... সে কি কাঁদছে? না হয়তো কেবল ভিতরের তোলপাড় তার চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে, কে জানে!

আস্তে করে ছেড়ে দিলো সোহার হাত। নিঃশব্দে উঠে এসে শুয়ে পড়ল তার পাশে। নিস্তেজ সোহাকে তার একটুও ভালো লাগছে না, না হাসছে, না ঝগড়া করছে, না রাগে কিছু বলছে। "কেনো আমার দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছো, নীলশ্যামা?" মনে মনে প্রশ্ন করল সে।

এই অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ওরহানকে বিরক্ত করল, অথচ সেই বিরক্তির ভিতরে জমে আছে গভীর ভয়,।হয়তো সে সোহাকে হারিয়ে ফেলবে।

সারারাত ওরহান শুয়ে রইল সোহার পাশে, তার দিকে তাকিয়ে... ঘুম তার কাছে আসে নি। শুধু নিঃশব্দ রাত আর মশার ভনভনানি সাক্ষী থাকল সেই নির্ঘুম প্রহরের।

.

.

.

ভোরের আলো ধীরে ধীরে কুয়াশা ভেদ করে জানালার কাচে এসে পড়ল, সেখান থেকে সরাসরি ছুঁয়ে গেল সোহার মুখ। কপালে হালকা বিরক্তির ভাঁজ পড়ল, চোখের পাতা মিটিমিটি করে নড়ল। ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই ঝাপসা আলো আর মাথার ভারী ঝিমুনি তাকে ঘিরে ধরল। আস্তে আস্তে উঠে বসল সোহা, চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে সব বোঝার চেষ্টা করল। মাথাটা যেন কারো ভারি হাতের নিচে চাপা পড়ে আছে, সে মাথা চেপে ধরে আবার বসে পড়ল।

হঠাৎই কাল রাতের সবকিছু এক ঝটকায় মনে পড়ে গেল, আতঙ্ক যেন আবার নতুন করে নখ বসিয়ে দিল তার বুকে। সোহা শিউরে উঠল, ভয় যেন আবার তার দম বন্ধ করে দিল। মনে পড়ল, ভয়ে সে হুঁশ হারিয়েছিল... আর আবছা স্মৃতিতে ভেসে উঠল আরেকজনের মুখ, ওরহান।

"হ্যাঁ, ওরহান এসেছিল," মনে মনে বলল সে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, যেন কোথাও হারিয়ে যাওয়া কিছু খুঁজছে। পুরো ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ওরহানকে পেল না। স্পষ্ট মনে আছে, সেই অজানা আগন্তুক পালিয়ে যাওয়ার পর ওরহান তাকে জড়িয়ে নিয়েছিল... কিন্তু ওরহান কি বলেছিল, সে শুনতে পায়নি। ভয়ের আগুনে ডুবে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। মাথার ব্যথা আরও চেপে বসতে লাগল। সব ভাবনা আপাতত সরিয়ে রেখে সে বাথরুমের দিকে এগোল, ফ্রেশ হওয়ার জন্য।

.

.

.

সকালের নাস্তার জন্য আজ সবার পরিকল্পনা, বাহিরের একটি রেস্টুরেন্টে যাওয়া। শিফার জ্বর কিছুটা কমেছে, তবে শরীরে এখনো তাপমাত্রা আছে। সবাই বাসে করে রেস্টুরেন্টে এসে পৌঁছাল। নিজ নিজ টেবিল নিয়ে বসে খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো।

টেবিলে খাবার আসতে না আসতেই সবাই খাওয়া-দাওয়ায় মগ্ন হয়ে গেল। সোহা আর শিফা পাশাপাশি বসেছে। শিফা জ্বরের মুখে তেমন কিছু খেতে পারছিল না, তাই সোহা তাকে আদর করে কখনো এটা, কখনো ওটা মুখে তুলে দিচ্ছিল।

টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে, তীব্র আড়চোখে পুরো দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎই সেই গম্ভীর কণ্ঠ বাতাস চিরে উঠে এল—

-"এত নেকামোর কি আছে? জ্বর কি আর কারো আসে না? এইভাবে বাচ্চাদের মতো আচরণ করার মানে কি?"

তীব্রর গম্ভীর কণ্ঠ যেন পুরো টেবিলের উপর এক অদৃশ্য বরফের চাদর বিছিয়ে দিল। সবাই থমকে গেল। উপস্থিত সবার দৃষ্টি একসঙ্গে ঘুরে গেল তীব্রর দিকে। শিফাকে দেখলেই বোঝা যায়, তার ভেতরের শিশুসুলভ সরলতা এখনো হারিয়ে যায়নি। পরিবারের অতি আদরের মেয়ে, একমাত্র কন্যা, তাকে সবাই সবসময় বেশি ভালোবাসে, স্নেহ করে, আগলে রাখে, এটা উপস্থিত সবাই জানে।

সোহা তখনও শিফাকে আদর করে খাওয়াচ্ছিল। কিন্তু তীব্রর কথায় শিফার মুখ মলিন হয়ে গেল। তা দেখে সাবা আর চুপ থাকতে পারল না—

-"সবার জ্বর এক নয় ভাইয়া। সবার সহ্য ক্ষমতাও এক নয়। শিফার একটি সমস্যা আছে, ঠান্ডা লাগলেই জ্বর মুহূর্তে কাবু করে ফেলে তাকে। সেটা কাল রাতে নিশ্চয়ই দেখেছেন। ওহ... সরি, দেখবেন কিভাবে? একজন মানুষ অসুস্থ, সেটা তো দেখার প্রয়োজনবোধও করেননি!"

-"আহ, সাবা! কি বলছিস? চুপচাপ খা।" ধমকে উঠল সোহা।

সাবা মুখ মলিন করে তাকিয়ে রইল বোনের দিকে। গতকালই শিফা তাকে বলেছে, সে তীব্রকে পছন্দ করে। তাই তীব্রর এই আচরণ তার সহ্য হলো না, আর উত্তর করে দিল।

পরিস্থিতি বুঝে তীব্র ঠান্ডা সুরে বলল—

-"থাক, মিস সোহা. ওকে বলতে দিন। হ্যাঁ, সাবা, মানুষের জ্বর আসা স্বাভাবিক। কিন্তু কাল থেকে মিস ওয়াজিহা যা শুরু করেছেন, তুমি দেখছো না? এত বাড়াবাড়ি মানুষ করে? সামান্য জ্বরই তো। এখন কি নাটক করছে খাওয়া নিয়ে। তার জন্য মিস সোহা ঠিকমতো খেতেও পারছে না!"

তীব্রর এই শেষ কথাগুলো শিফার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধল। সে কি বাড়াবাড়ি করছে? নাটক করছে? তার জন্য সোহা ভাবী ঠিকমতো খেতে পারছে না? শিফার দৃষ্টি সোহার দিকে গেল, দেখল, সত্যিই ভাবীর প্লেটে খাবার পড়ে আছে, একটুও ছোঁয়া হয়নি।

কিছু না বলে, শিফা চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল—

-"আমার খাওয়া হয়ে গেছে। আমি যাচ্ছি।" বলেই দ্রুত পায়ে সরে গেল। অথচ মেয়েটি কিছুই খায়নি।

সোহা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল, তীব্রর দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল—

-"কাজটা মোটেও ঠিক করেননি, মিস্টার তীব্র।"

এ কথা বলে শিফার পিছু নিল সে। সঙ্গে গেল ওসমান ও সাবা। কিন্তু শিফা যেন চোখের পলকেই উধাও হয়ে গেছে। চারপাশের করিডর, রেস্টুরেন্টের বাইরে, গাড়ির কাছে, সব জায়গায় খুঁজেও তাকে পাওয়া গেল না।

শেষমেশ ওসমান ফোন করল। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর শিফা কল ধরল—

-"রিসোর্টে যাচ্ছি আমি, চিন্তা করো না মেঝদাভাই।"

শিফার কণ্ঠের ভঙ্গিমা ছিল ঠান্ডা, কিন্তু ক্লান্ত। কল কেটে সবাই কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো। ভেতরে ফিরে নিজেদের জায়গায় বসতেই ওসমান মুখ তুলল। কণ্ঠে ছিল গর্জন চাপা—

-"আমার একমাত্র বোন... আমাদের বংশের একমাত্র কন্যা। বাবার রাজকন্যা সে। চার ভাইয়ের চোখের মণি। জন্মের পর থেকে যতবার অসুস্থ হয়েছে, প্রতিবারই গুরুতর হয়েছে অবস্থা। প্রিম্যাচিউর বেবি হওয়ায় ওর প্রতি সবসময় বাড়তি যত্ন নিতে হয়। আপনি যে কথাগুলো বললেন, প্রতিটা কথা আমার বোনকে আঘাত করেছে। সকালের নাশতাটা পর্যন্ত করতে পারল না আমার বোন, মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী!"

শেষ লাইনটি উচ্চস্বরে বলে উঠল ওসমান। চোখে যেন আগুন ছুটে গেল তীব্রর দিকে। চারপাশ নিস্তব্ধ। সবার মুখে একরাশ বিস্ময়। তীব্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে ঠান্ডা গলায় বলল—

-"এত গুরুতর অসুস্থ আপনার বোন, তাহলে বাইরে এসেছে কেনো খেতে?"

এই পর্যায়ে সোহার ধৈর্য ভাঙল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল—

-"আপনার কি বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে, মিস্টার চৌধুরী? আজকে বাইরে খাওয়ার প্ল্যান ছিল, তাই রিসোর্ট থেকে নাস্তা দেওয়া হয়নি। তাহলে বেচারি রিসোর্টে বসে না খেয়ে থাকত?"

তীব্র গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর করল—

-"কিন্তু মিস সোহা, আপনি তো ওনার জন্য কিছুই খেতে পারেননি।"

সোহা ঠোঁট কামড়ে বলল—

-"অন্ধ নাকি আপনি? আমি ওর প্লেট থেকে খেয়েছি।"

তীব্র চুপ করে গেল। সে প্লেট ভর্তি দেখে ভেবেছিল সোহা কিছুই খায়নি। ভুলটা বুঝতে পেরে মুখ শক্ত করল। ঠিক তখনই ওসমানের কণ্ঠ ফের শোনা গেল—

-"অসুস্থ হলে আমার বোন আরও ছেলেমানুষ হয়ে যায়। তখন শুধু আম্মুর হাতে বা দাদাভাইয়ের হাতে খায়। এখানে দুজনেই নেই... তাই সোহা ভা... মিস সোহাকে বলেছিলাম ওকে খাইয়ে দিতে। এত বছর পর সোহাকে দেখে সে কথা শুনবে ভেবেছিলাম।"

তীব্রের চোখে ক্ষণিকের জন্য কিছু নড়েচড়ে উঠল, পশ্চাৎাপ নাকি বিরক্তি, কেউ বুঝতে পারল না। সবার খাওয়া থেমে গেল। চামচের শব্দও যেন গিলে নিলো নীরবতা। তীব্র বুঝতে পারল, সে সীমা ছাড়িয়েছে। কিন্তু কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবে, সেই ভাষা খুঁজে পেল না। ঠোঁট শক্ত করে নীরব রইল।

সোহা আর মুখে খাবার তুলতে পারল না। চেয়ার সরিয়ে উঠে বেরিয়ে গেল। তার পিছু নিল সাবা, তীব্র, ওসমান, মিরহা আর আকাশ। শিফা তখনও এক চামচ খাবার মুখে দেয়নি। তাকে খাওয়াতে হবে, এই চিন্তায় সোহা খাবার প্যাক করে নিলো।

তীব্র কাছে গিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল—

-"শুনুন, আমি..."

কিন্তু সোহা একদম শুনল না। মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

দূরে দাঁড়িয়ে সাবা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে তীব্রর দিকে। দৃষ্টিটা এত ধারালো যে, মিরহা ফিসফিস করে বলল—

-"এইভাবে তাকিয়ে আছো কেনো? মনে হচ্ছে তীব্র স্যারকে এখনই গিলে ফেলবে।"

সাবার কণ্ঠে বিষ মেশানো বিরক্তি—

-"এই বজ্জাত লোককে শিফা কেন পছন্দ করে, বুঝি না।"

মিরহা কপাল কুঁচকালো—

-"মানে?"

সাবা নিঃশ্বাস ফেলে বলল—

-"মানে, শিফা এই লোকটাকে ভালোবাসে। আর এই লোক সেটা জানে।"

মিরহার চোখে বিস্ময়—

-"তাহলে আজকে তীব্র স্যার যে ব্যবহার করল, সেটা ইচ্ছে করেই?"

সাবা তীক্ষ্ণ স্বরে—

-"হ্যাঁ। শিফা ওকে বহুবার ভালোবাসার কথা বলেছে, আর প্রতি বার এই লোকটা ওকে অপমান করেছে। আজও তাই করল।"

মিরহা চুপ করে গেল। সাবার দিকে একবার তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরাল সেই দিকে, যেখানে তীব্র সোহাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে।

ফিসফিস করে বলল—

-"আমার মনে হয় তীব্র স্যার সোহা ম্যামকে পছন্দ করে।"

সাবার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি—

-"সেটা আমিও বুঝেছি। কিন্তু লাভ নেই। ওরহান ছাড়া আপুর মনে কোনোদিন কোনো পুরুষ ছিল না। একাকিত্ব এমনি এমনি বেছে নেয়নি সে। মুখে যতই বলুক ওরহানকে ঘৃণা করে, আমি ওকে খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারি, এখনো সে ওরহানকেই ভালোবাসে।"

মিরহা চুপ রইল। সে নিজেও জানে, সাবার কথাই সত্য।

.

.

.

সবাই রিসোর্টে একত্রিত হলো। ওসমান, তীব্র, সোহা, সাবা, মিরহা, আকাশ, সবার উপস্থিতি শিফার রুমের সামনে অনুভূত হলো। রুমের বাইরে ইহাবকে দেখে সবাই অবাক। ইহাব এখানে মানে, ওরহানও, এখানেই। সবাই ধীরে ধীরে ইহাবের কাছে এগোলো।

ইহাবকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই ভেতর থেকে শিফার বাচ্চামুখর কণ্ঠ ভেসে এলো। সে কারও কাছে তীব্রর নামে নালিশ করছিল, কীভাবে সে তাকে অপমান করেছে। সোহার হাতে খেতে না পাওয়ায় সে কতটা কষ্ট পেয়েছে, তা তার কণ্ঠে ফুটে উঠছিল।

সোহা যখন শুনতে পেলো, শিফা কান্না করতে করতে বলছিল—

-"জানো দাদাভাই, সোহা আপু আমাকে কত আদর করে খাইয়ে দিচ্ছিল, ঠিক যেমন তুমি আর আম্মু আমাকে খাইয়ে দাও, ঠিক তেমন। জানো, আমার না তোমার আর আম্মুর কথা খুব মনে পড়ছিল। আমি অসুস্থ হলে তোমরা খাইয়ে দাও। তাহলে আজ কে খাইয়ে দিবে? তখন সোহা আপু এসে আমাকে আদর করে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার পাশে বসিয়ে যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছিল। আমি তো খেতে পারছিলাম না, জানো, আমার এঁটো খাবার তুমি আর আম্মু যেমন করে খাও, ঠিক সেইভাবে খাচ্ছিল। ওই বজ্জাত লোক আমার আদর কেড়ে নিলো। আমাকে সোহা আপুর আদর পেতে দিলো না।"

বলেই শিফা কান্না ছেড়ে দিলো। সোহার চোখেও অস্রু চিকচিক করে উঠলো। মেয়েটি এত আদুরে, বিলক্ষণ বিড়াল ছানার মতো। ভাই ও পরিবারের আদরে এখনো সে এক নীরব শিশুর মতো রয়ে গেছে। সাবা অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো। ওসমান ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলো, বোনের পিছে বসে তাকে আড়ম্বরপূর্ণ স্নেহে আগলে নিলো। ওরহান এতক্ষণ চুপচাপ বোনের সব অভিযোগ শুনল। প্লেটে খাবার নিয়ে বসে আছে সে।

ওরহান ভোরের আলো ফোটার আগেই সোহার রুম থেকে বেরিয়ে নিজের কক্ষে ফিরে এসেছিল। সারাটা রাত তার কেটেছে নির্ঘুম, ক্লান্ত দৃষ্টি যেন রাতের অন্ধকারেই বন্দি ছিল। ঘরে ফিরে অবশেষে কয়েক ঘণ্টার জন্য চোখ লেগে আসে। সে জানত, সোহা ঘুম থেকে উঠেই তাকে দেখলে হঠাৎ অস্থির হয়ে পড়বে, মনে এক অযাচিত চাপ জন্ম নেবে, এটুকু ওরহান কোনোভাবেই চায়নি। তাই প্রভাতের নীরবতা ভেঙে সকাল আসার আগেই নিঃশব্দে নিজের কক্ষে আশ্রয় নেয়।

ওরহান ও ইহাব একসাথে নাস্তা করতে গিয়েছিল, একই রেস্টুরেন্টে। সোহাকে দেখাও ছিল একটি কারণ। দূর থেকে দাঁড়িয়ে তীব্রর প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। শিফা যখন কাল রাতে অসুস্থ ছিল, তা শুনে ওরহানের অন্তর আত্ন কেঁপে উঠেছিল। হঠাৎই সে দ্রুত সেখানে থেকে প্রস্থান করল।

শিফা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওরহান পিছু পিছু চলে আসে, পথে খাবার কিন নেয়। এতক্ষণ বোনকে অনেক বোঝিয়েছে, তার সব অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেছে। ওরহান খাবারের একটি লোকমা শিফার মুখে দেওয়ার সঙ্গে আদুরে কন্ঠে বলল—

-"কাঁদো না, বাবু। খাবারের সময় কাঁদতে নেই। আমি তীব্রকে অবশ্যই শাসন করে দেব। আমার আদুরে বিড়ালকে আঘাত করা? ওকে আমি শিক্ষা দেবো, তুমি চিন্তা করো না, জানবাচ্চা। আমি সোহাকে এনে দেবো। সে তোমাকে অনেক আদর করবে। ঠিক আছে, এখন খেয়ে নাও।"

ওরহান বহু চেষ্টা করছিল শিফাকে শান্ত করার, কিন্তু শিফার কান্না থামছিল না। তীব্র, এদের ভাইবোনের অকুণ্ঠ ভালোবাসা দেখে যেন ধাক্কা খেয়ে গেল। কিছু মনে পড়লো তার। এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারল না। চোখ জ্বলে উঠছে তার। সে উল্টো ঘুরে, গটগট পায়ে, নিজের রুমের দিকে চলে গেল। পিছন পিছন আকাশও ছুটলো। সবাই একবার তার প্রস্থান লক্ষ্য করলো, তারপর নিঃশব্দে শিফার কাছে চলে এল।

সোহা ওরহানের পাশে দাঁড়ালো। ওরহান চোখ তুলে তাকাল। সোহা ধীরে বলল—

-"শরুন।"

ওরহান নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো, খাবারের প্লেট হাতে ধরে। সোহা নিজের আনা খাবার বের করে শিফার মুখের সামনে ধরলো। শিফা চোখ তুলে তাকালো। সোহা বলল—

-"আমি কিন্তু খাইনি। তুমি না খেলে, আমিও কিন্তু খাবো না।"

এই কথায় শিফা চটজলদি হা করল। সোহা মুচকি হেসে শিফাকে খাইয়ে দিতে লাগলো, সাথে নিজেও খাচ্ছে। সবাই অপলক তাকিয়ে দেখছে সেই দৃশ্য। ধীরে ধীরে সবার মুখে হাসি ফুটলো, মৃদু আনন্দের আলো ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে।

সাবা গুটিগুটি পায়ে ওরহানের সামনে এসে দাঁড়ালো। ওরহান ভ্রু কুচকে তাকাল সাবার দিকে। সাবা কোমল কণ্ঠে বলল—

-"আমিও কিছু খাইনি। কেউ তো আমার দিকে লক্ষ্যই করলো না।"

ওরহান হঠাৎ শব্দ করে হেসে ফেলল। সবাই সেই হাসি মুগ্ধ নয়নে দেখল। ওরহান বুঝল, সোহা শিফাকে খাইয়ে দিচ্ছে দেখে সাবার হিংসা হচ্ছে। তাই সে ওরহানের সামনে এসে এভাবে বলল যেন ওরহান নিজেই তাকে খাইয়ে দেয়।

ওরহান নিঃশব্দে, মুখে হালকা হাসি ঝুলিয়ে সাবাকে খাইয়ে দিল। ওসমান সেটা দেখে নিজেও এগিয়ে এলো। ওরহান তাকেও খাইয়ে দিল। সাবা ওরহানের প্লেট থেকে খাবার নিয়ে ওরহানকেও খাইয়ে দিল। সেই দৃশ্য দেখে শিফাও সোহাকে খাইয়ে দিল।

এইভাবে, ছোট ছোট আদর ও খাওয়ানোর খুশিতে, আনন্দে ভরে উঠল তাদের দুপুর। দূরে দাঁড়িয়ে মিরহা ও ইহাব মুগ্ধ চোখে সব দেখছিল।

.

.

.

মিরহা হঠাৎ খেয়াল করল, তাদের কটেজ থেকে শব্দ আসছে, কিছু পরে গেছে। পেছন ঘুরে তাকাতেই দেখল, কেউ কালো পোশাকে দ্রুত পায়ে চলে যাচ্ছে। ইহাবও লক্ষ্য করলো। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যেই তারা সেই কটেজের দিকে ছুটে গেল।

সোহার রুমের দরজা খোলা। রুমের ভিতরে সূক্ষ্ম আলো পড়ছে। টেবিলের উপর রাখা একটি ফুলদানি যেন শান্তির বাতাসে দুলছে। কিন্তু টেবিলের পাশে চোখে পড়ল একটি চিরকুট—

-"যত খুশি আনন্দ করে নাও। এটাই তোমার জীবনের শেষ আনন্দ।"

Story Cover