ফিরে দেখা

পর্ব - ১৮

🟢

তুরস্কের ইস্তানবুলের হৃদয়ে, ভোরের ঠাণ্ডা আকাশের নীচে, সকাল আটটা বাজছে। বিশ্লেষণাত্মক শহরের এক সুসজ্জিত সাত তলা ভবনের শীর্ষ তলায়, নিজের জন্য বরাদ্দকৃত অফিস কক্ষে রাজকীয় এক মনুষ্য বসে আছে। তার নীরব তৎপরতা ও শান্ত ভাবমূর্তিতে যেন সময় থেমে গেছে। সামনে প্রজ্জ্বলিত কম্পিউটার স্ক্রিনে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে এক দৃশ্য, একটি রোমাঞ্চকর ও চমকপ্রদ মুহূর্ত, যেখানে এক সুদর্শন যুবক ও এক অপূর্ব শ্যামপরি মুখোমুখি, টপিক 'ট্রেডিং' নিয়ে আবেগঘন এক লড়াইয়ে মগ্ন।

তাদের মধ্যকার উত্তেজনা, হাসি-মুখর আবেগ, এবং দুর্দান্ত দৃশ্যপটে যেন গল্পের পাতা ফাঁটা হচ্ছে, যা মুহূর্তে ট্রেন্ডিংয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তের আনন্দ আর উত্তেজনা ওরহানের হৃদয়ে পুঞ্জীবদ্ধ ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তার গলার স্বর কঠোর, তার চোখে অশ্রুমাখা রাগের ঝিলিক। দ্রুত হাতে ফোন তুলে ইহাবকে ডেকে বলল—

-"সোহার নাম যেন ট্রেন্ডিং তালিকায় না থাকে! পাঁচ মিনিটের মধ্যে এটা সম্পন্ন কর!"

সঙ্গে সঙ্গে অফিসের পরিবেশে চাপের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ল। নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেল, সময় যেন আরও দ্রুত বয়ে চলল। প্রতিটি মুহূর্তে নাটকীয়তা ছড়িয়ে পড়ল, যেন কোনো তুমুল যুদ্ধের প্রাক্কালে থাকে মুহূর্তগুলো। এখানেই শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়, যেখানে শক্তি, রাগ, এবং অপ্রত্যাশিত মোড় অপেক্ষা করছে।

মিনিট পাঁচের মধ্যেই যেন সব ট্রেডিং উধাও হয়ে গেলো। ওরহানের কঠোর আদেশে PR টিম ঝাঁপিয়ে পড়ে, চটজলদি সব তথ্য তুলে ফেলে ট্রেন্ডিং থেকে। বিদেশের দূরবর্তী প্রান্ত থেকে, ইস্তানবুলের অফিসে বসে বসেই, ওরহান চোখ রাখছিল সমস্ত ঘটনার ওপর। রাগে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজের চুলগুলো টেনে ধরে বসে আছে, মনের তীব্র উত্তেজনা যেন শারীরিক আঘাতের মতো কাজ করছে।

এই মুহূর্তে সময় যেন ঘূর্ণায়মান, প্রতিটি সেকেন্ডের সাথে বাড়ছে সেই তীব্র আবেগের চাপ। যত দ্রুত সম্ভব তাকে দেশে ফিরতে হবে, আর তীব্রের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, এটাই একমাত্র পথ। ওরহান হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, অফিসের ঠান্ডা পরিবেশের মধ্যেও যেন অগ্নি জ্বলছে তার অন্তরজ্বালায়।

পকেট থেকে সিগারেট বের করে বারান্দায় চলে আসে সে। নিঃশ্বাসে ধোঁয়া টেনে আকাশের নিস্তব্ধতায় ছেড়ে দিলো দীর্ঘ লম্বা সাদা লাইন। তার চোখগুলো লাল, আগুনের মতো জ্বলছে, প্রতিটি কণায় বিরক্তি, প্রতিহিংসা আর ব্যথার সঞ্চয়। যেদিন থেকে তীব্র তার ব্যক্তিগত নারীকে স্পর্শ করেছে, সেদিন থেকেই ওরহান যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে নিজের।

হঠাৎ, এক মুহূর্তে সিগারেটটি নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে। আগুন ছড়িয়ে পড়লো, চামড়া ঝলসে গেল আগুনের তীব্রতায়। কিন্তু ওরহান একটুও ব্যথা অনুভব করলো না। নিরবতার মধ্যে সে শুধু তাকিয়ে আছে, উঁচু আকাশের দিকে। তার মনে একাকিত্বের ভিড় জমে উঠল। নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক করুণ আর্তনাদ, যা বাতাসের সাথে মিশে গেলো দূরে।

নিজেকে ধমক দিয়ে আওড়ালো সে, নিজের মনের গভীরে—

-"এই অবস্থা চলতে দিতে পারব না... এখনই শেষ করতে হবে।"

তার কণ্ঠে যেন গর্জন, আবারও যেন নীরব অগ্নিপরীক্ষা শুরু হলো।

-"ক’টা দিনের জন্য মাত্র দূরে গিয়েছিলাম, আর তাতেই অন্য পুরুষের সান্নিধ্যে গা ভাসাচ্ছো তুমি! এর শাস্তি তো তোমাকেই ভোগ করতে হবে, বিষরাণী। অতি দ্রুতই ফিরছি আমি, আমার অধিকার, আমার প্রাপ্য, আর আমার নিজের জিনিস আপন হাতে ফিরিয়ে নিতে।"

.

.

.

ভোরের নরম কুয়াশা ভেদ করে ট্রেনটি ধীরে ধীরে স্টেশনে এসে থামল। সোহা নেমে এল প্রথমে, সঙ্গে সাবা। অদ্ভুতভাবে, শিফা আর ওসমানও যেন ভাগ্যের টানে সেখানে উপস্থিত। কেন এসেছে—সেটা কেউ বুঝল না, আর আশ্চর্যের বিষয়, কেউ কোনো প্রশ্নও তুলল না।

ট্রেন থেকে নামার পর সবার জন্য আগেই ঠিক করে রাখা বাসটি অপেক্ষা করছিল, শুধু Velvet Bloom এর সদস্যদের জন্য ভাড়া করা একটি বিলাসবহুল কোচ। একে একে সবাই উঠে বসল, জানালার পাশে বসে কেউ তাকিয়ে রইল দূরের পাহাড়ে মিলিয়ে যাওয়া সকালের কুয়াশায়।

ঘণ্টাখানেক পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে বাসটি এসে থামল সাজেকের হৃদয়ে—রুংরাং হিল রিসোর্টে। সাজেকের সবচেয়ে নামি-দামি এই রিসোর্ট যেন স্বপ্নের কোনো দৃশ্য, যেখানে মেঘ এসে দোরগোড়ায় কড়া নাড়ে। কাঠের শৈল্পিক স্থাপত্য, প্রতিটি কটেজের সামনে ঝুলন্ত বারান্দা, নিচে সবুজ উপত্যকা, দূরে নীলচে পাহাড়ের সারি, সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় আবেশ। সূর্যের প্রথম সোনালি রশ্মি পড়তেই কাচের জানালাগুলো আলোর ঝলকানিতে ঝলমল করে উঠল, আর মনে হল, পৃথিবী যেন এক ক্ষণিকের জন্য থেমে গেছে।

জানালার বাইরে সাজেকের রঙিন রোদ-ভেজা পাহাড়, সবুজের ঢেউ, আর নীল আকাশ যেন আগন্তুকদের স্বাগত জানাচ্ছে। রিসোর্টের প্রবেশপথে সারি সারি রঙিন কাঠের কটেজ, প্রতিটি যেন একেকটা রূপকথার ঘর। প্রতিটি কটেজে দু’টি করে প্রশস্ত রুম, সামনে ছোট্ট বারান্দা, কাঠের রেলিংয়ে ঝুলছে টবভরা রঙিন ফুল, যার গন্ধে বাতাস ভরে আছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে জড়ানো কুয়াশার ফিতা যেন আকাশ আর মাটির মাঝে প্রেমের দূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এক এক করে সবাই বাস থেকে নেমে নিজেদের জন্য বরাদ্দ কটেজে গিয়ে উঠল। সাবা, মিরহা ও সোহা থাকছে এক কটেজে। তাদের ঠিক পাশের কটেজে আকাশ ও তীব্র। আর তার পাশেই শিফা ও ওসমান। সোহার কটেজের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে এক বিলাসবহুল কটেজ উঁচু ছাদ, গ্লাসের দেয়াল, আর বারান্দা থেকে সরাসরি পাহাড়ের দৃশ্য, যেটি আগে থেকেই বুক করা ছিল।

সবাই নিজ নিজ ল্যাগেজ কাঁধে বা হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করল। কাঠের মেঝে, হালকা হলুদ আলোর নরম ছোঁয়া, আর জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া শীতল পাহাড়ি হাওয়া, সব মিলিয়ে ঘরের ভেতরও যেন সাজেকের জাদু মিশে আছে। ফ্রেশ হয়ে নিল সবাই। রিসোর্টের পক্ষ থেকে সকালের নাস্তা পাঠানো হয়েছিল, গরম পরোটা, ডিম, মধু, পাহাড়ি চা। পেট ভরে খেয়ে সবাই ঘুমে ডুবে গেল।

দুপুর গড়িয়ে গেলে সবাই লাঞ্চের জন্য রিসোর্টের রেস্টুরেন্টে হাজির হলো। কাঠ ও বাঁশের তৈরি প্রশস্ত রেস্টুরেন্ট, চারপাশে কাঁচের দেয়াল, যেন খাওয়ার সময়ও পাহাড়ের সৌন্দর্য চোখে ধরা দেয়। তীব্র, সোহা, সাবা, মিরহা ও আকাশ একই টেবিলে বসল। একটু পর পেছন দিক থেকে শিফা ও ওসমান এসে একই টেবিলে জায়গা নিল। তীব্র, শিফাকে দেখেও না দেখার ভান করল।

শিফার মনে ঘন মেঘ জমল। লোকটা এত পাষাণ!

এই কয়েক মাসে সে বহুবার তীব্রর সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছে, প্রতিবারই তীব্র তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। কত কষ্টে নম্বর জোগাড় করেছিল, কত মেসেজ পাঠিয়েছিল, একটিরও উত্তর মেলেনি।

ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে শিফা দেখল, সোহার পাশে বসা সাবা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে মুচকি হেসে সাবাকে বলল—

-"তুমি কি আমার চেয়ারে বসবে? সোহা ভা... মানে, সোহা আপুর সাথে আমার একটু কথা ছিল।"

সাবা সোহার দিকে একবার তাকাল। সোহা মৃদু মাথা নাড়তেই সাবা উঠে দাঁড়াল এবং শিফার জায়গায় গিয়ে বসল। শিফা ধীরে ধীরে সোহার পাশে এসে বসে পড়ল। সোহার এক হাত নিজের হাতে আগলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি, জানো?"

সোহা সরাসরি কোনো উত্তর দিল না, শুধু হালকা এক স্মিত হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসিতে কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু কোনো উষ্ণতাও নেই, যেন দূরের কোনো স্মৃতিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। শিফার বুকের ভেতর খচখচ করে উঠল। সবকিছুই সে জানে, মেঝদাভাই নিজে সব বলে দিয়েছে।

শিফা মলিন মুখে বলল—

-"তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?"

-"না। তোমার কেন এমনটা মনে হলো?"

-"যেদিন প্রথম তোমায় দেখলাম, তুমি আমায় ছোট বোনের মতো আদর করেছিলে। এখন কি আমি তোমার ছোট বোন নেই?"

সোহা একটু নরম কণ্ঠে উত্তর দিল—

-"কি বলছ শিফা! এমন টা নয়... আচ্ছা, বাবু, কেমন আছো বলো?"

শিফা ভ্রু কুঁচকে বলল—

-"আমি বাচ্চা নই। বাবু কেন বলছ?"

শিফার শিশুসুলভ ভঙ্গি দেখে টেবিলে বসা সবাই হেসে উঠল। তীব্রও ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসি শিফার চোখ এড়াল না, আড়চোখে তাকিয়ে ভাবল, লোকটা হাসলে কত সুন্দর লাগে! অথচ এই গাম্ভাট মানুষটা হাসেই না। সারাক্ষণ মুখটা বানরের পশ্চাদশের মতো করে রাখে। বিরক্তি মেশানো ভেংচি কাটল শিফা।

সোহা তার মাথায় হাত রেখে স্নেহভরে বলল—

-"তুমি তো বাবুই, আমার ছোট বোন সাবা যেমন, ঠিক তেমন!"

শিফার চোখে একটু ঝিলিক ফুটে উঠল, ঠোঁটে লেগে রইল মুচকি হাসি। অন্যদিকে সাবা মুখে খাবার তুলে নিচ্ছিল, কিন্তু সোহার শেষ কথায় আচমকা কাশে উঠল। ওসমান তৎক্ষণাৎ তার দিকে পানি বাড়িয়ে দিল। গ্লাস ধরার সময় দুজনের চোখে চোখ আটকে গেল। পানি খেয়ে সাবা হালকা বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলল—

-"আপু, বেশি বেশি হচ্ছে কিন্তু। আমরা ভার্সিটিতে পড়ি, তুই আমাদের এইভাবে 'বাবু' বানিয়ে রাখতে পারিস না।"

সোহা মুচকি হেসে, যেন অদৃশ্য কোনো দুষ্টুমি ভেবে ফেলেছে, বলল—

-"আছে যা! তোদের দু’জনেরই তো বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। ঢাকা ফিরে তোদের দু’জনকেই একটা পেট-মোটা, টাকলা লোক দেখে বিয়ে দিয়ে দেবো। ঠিক আছে, এখন চুপচাপ খা।"

কথাটা শুনে সাবা আর শিফার মুখ একসাথে ম্লান হয়ে গেল। অনিচ্ছায় তারা খাওয়ায় মন দিল। দুজনের নাজেহাল অবস্থা দেখে টেবিলে বসা সবাই মিটিমিটি হাসছে। রাগে যেন কপালে আগুন জ্বলছে। সাবা কটমট করে ওসমানের দিকে তাকাল, তারপর চিবোতে চিবোতে বলল—

-"খুব মজা পাচ্ছেন, তাই না? ওরহান ভাই, আশুক আপনাকেও একটা মুটকি দেখে বিয়ে দিতে বলব!"

ওসমান ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি মাখানো হাসি এনে বলল—

-"তুমি না দাদাভাইয়ের ওপর রাগ করেছিলে? তাহলে আবার দাদাভাইয়ের সাথে কথা বলবে কিভাবে?"

-"তানভীর ভাই সব রাগ পানি করে দিয়েছে!"

-"মানে?"

-" আপনার মাথা চুপচাপ খান!"

ওসমান মিটিমিটি হেসে বলল—

-"কেন, আমাকে বেশি বেশি খাইয়ে কি পেট-মোটা টাকলা বানানোর জন্য? যাতে আমাকে বিয়ে করতে পারো?"

সাবা চোখ সরু করে তাকাল—

-"ইশ, সখ কত! আমার এত ঠেকা পড়ে নাই আপনাকে বিয়ে করার জন্য।"

সাবা ভেংচি কেটে আবার প্লেটের দিকে মন দিল। কিন্তু খাওয়ার ভান করলেও, ঠোঁটের কোণে চাপা রাগের রেখা স্পষ্ট। অন্যদিকে, ওসমান নিঃশব্দে মজা নিচ্ছে, মিটিমিটি হেসে আড়চোখে সাবার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে।

বাইরে পাহাড়ের মাথায় তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, টিনের ছাদে টুপটাপ শব্দ পড়ছে, আর ভেতরে টেবিলের চারপাশে হাসি-ঠাট্টার আড়ালে লুকিয়ে আছে ছোটখাটো রাগ-অভিমান।

.

.

.

দুপুরের খাওয়া শেষ করে সবাই একটু রিসোর্টের চারপাশ ঘুরে দেখল। কাঠের বারান্দা থেকে দূরের পাহাড়ের সারি, নিচে সবুজে মোড়া উপত্যকা আর হালকা বাতাসে ভেসে আসা পাইন পাতার গন্ধ, সবাইকে কেমন এক অলস মায়ায় ঢেকে ফেলল।

বিকেলের দিকে সবাই মিলে কাছের পাহাড়ি এলাকা ঘুরতে বের হলো। আজ তাদের গন্তব্য কংলাক পাড়া, রিসোর্ট থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা, দুই পাশে লম্বা লম্বা বেতগাছ আর পাহাড়ি ফুলের গন্ধে বাতাস যেন মাতাল। দূরের পাহাড়ে সূর্যের সোনালি আলো ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে, কোথাও কোথাও কুয়াশার পাতলা আস্তরণ ভেসে বেড়াচ্ছে।

সবাই ধীরে ধীরে হাঁটছিল, শিফা ও সাবা, সমবয়সী হওয়ায়, একে অপরের সাথে দুষ্টুমি আর গল্পে ব্যস্ত। মিরহা আকাশের সাথে গল্প করতে করতে চারপাশের দৃশ্য দেখছে। তীব্র ও সোহা পাশাপাশি হাঁটছে, মাঝে মাঝে নীচের উপত্যকার দিকে তাকিয়ে কিছু বলছে। আর ওসমান একাই হাঁটছে, দূর থেকে সবার চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করছে।

শিফা হঠাৎ ওসমানকে একা দেখে হাত ইশারায় নিজের কাছে ডেকে নিল। তারপর তাকে হেসে বলল—

-"মেঝদাভাই আজ থেকে আমাদের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার তুমি!"

ওসমান মজা পেয়ে ক্যামেরা হাতে নিল, আর তাদের ছবি তুলতে শুরু করল। অন্যদিকে তীব্র ও সোহা হাঁটতে হাঁটতে ব্যবসা নিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ তীব্র, যেন অন্য কোনো চিন্তায় ডুবে গিয়ে, প্রসঙ্গ বদলে নরম স্বরে বলল—

-"তো, আপনার এখানে এসে কেমন লাগছে?"

সোহা চারপাশের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—

-"বেশ ভালই লাগছে। জায়গাটা আসলেই অনেক সুন্দর, যেন হৃদয়ে প্রশান্তির ঢেউ বয়ে আনে।"

তীব্র মৃদু হেসে উত্তর দিল—

-"হুম... জায়গাটা আমার অনেক প্রিয়। পাহাড়ি এলাকা আমার ভীষণ ভালো লাগে।"

সোহা চোখ সরু করে তাকাল—

-"তাই নাকি? আপনাকে দেখে তো মোটেও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী মনে হয় না।"

তীব্র কণ্ঠে এক অদৃশ্য দৃঢ়তা—

-"থাকুন আমার সাথে, অনেক কিছুই ধীরে ধীরে জানতে পারবেন।"

সোহা হালকা হাসল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল অদৃশ্য এক প্রাচীর। সে বুঝতে পারছে, তীব্র তার দিকে কোন অনুভূতির বার্তা ছুঁড়ে দিচ্ছে। কিন্তু সে বুঝেও না বোঝার ভান ধরে, একই ভুল সে আর করতে চায় না।

হঠাৎ তীব্র থেমে গিয়ে, কণ্ঠে গভীর কোমলতা মিশিয়ে বলল—

-"আমি জানি... আপনি আমার অনুভূতি বোঝেন। চোখের ভাষা, নীরবতার ভাষা, সবটাই আপনি পড়তে পারেন। কিন্তু কেন আপনি আমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছেন না... সেটা আমি বুঝি না।"

তীব্রের দৃষ্টি তখন পাহাড় পেরিয়ে সোহার হৃদয়ে পৌঁছাতে চাইছে।

-"তবে এতটুকু বুঝতে পারি... আপনার অতীত আপনাকে ভালোবাসার এক ভয়ঙ্কর, বীভৎস রূপ দেখিয়েছে। সেই জন্য হয়তো আপনি ভয় পান, আবার ভেঙে যাওয়ার, আবার হারিয়ে যাওয়ার।"

বাতাসে তখন পাহাড়ি পাইন গাছের পাতার সাঁই সাঁই শব্দ, আর সেই শব্দে যেন তীব্রের কণ্ঠে মিশে গেছে অকথিত এক প্রতিজ্ঞা, এইবার আমি ভাঙতে দেব না।

সোহা অবাক হলো না। তীব্র খুব বিচক্ষণ একজন মানুষ, তার পক্ষে না বোঝাটাই বরং বোকামি হতো। দূরের পাহাড়ের মাথায় তখন সূর্যের শেষ আলো গড়িয়ে পড়ছে, আকাশে কমলা-সোনালি রঙের মিশেল। সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে সোহা ধীরে বলল—

-"জীবনে সব সুখ পেতে নেই। সব সুখ পেলে মানুষ লোভী হয়ে যায়... আমি লোভী হতে চাই না।"

তীব্র এক মুহূর্তও চোখ সরাল না তার মুখ থেকে। কণ্ঠে যেন নীরব প্রতিজ্ঞার শপথ—

-"কথা দিচ্ছি... আপনাকে একদিন লোভী বানাবো।"

কথাটা সোহার কানে পৌঁছাল, কিন্তু মনে গিয়ে যেন হালকা ধাক্কা দিল। ধীরে ঘুরে তাকাল তীব্রের দিকে, দৃষ্টি আটকে গেল তার চোখে। তীব্রর চোখে অদ্ভুত কিছু অনুভব করল, কিন্তু কিছু বলল না।

আজ তার মুখে সেই চিরচেনা, সবকিছু ঢেকে রাখা মিথ্যে হাসিটাও নেই। শুধু নিঃশব্দে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল পাহাড়ের ওপাশের দিকে, যেন নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, একই ভুল আর নয়...

বাতাসে পাইন পাতার মৃদু সোঁ সোঁ শব্দ, আর পাহাড়ি বিকেলের শীতল হাওয়ায় তাদের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

.

.

.

সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। পাহাড়ি বাতাসে এই সময়টায় হালকা ঠাণ্ডার ছোঁয়া মিশে যায়। মেয়েদের কারো সাথেই অতিরিক্ত শাল নেই। শীতে সোহা কাঁপতে শুরু করেছে। তীব্র সেটা খেয়াল করে নিজের টি-শার্টের উপর পড়া শার্ট খুলে এগিয়ে দিলো তার দিকে।

সোহা নিতে ইতস্তত করল। তীব্র হালকা হাসি দিয়ে বলল—

-"নিন, কিছু হবে না।"

অবশেষে সোহা শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নিলো।

ওদিকে শিফা, সাবা আর ওসমানকে রেখে একটু দূরে গিয়ে মায়ের ফোন ধরেছে। সাবার কাঁপুনি চোখ এড়ালো না ওসমানের। নিজের জ্যাকেট খুলে বাড়িয়ে দিলো সে।

-"ঠাণ্ডা লাগছে, নাও পরে নাও।"

-"প্রয়োজন নেই।"

-"আছে। তুমি ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছ না, কাঁপছ দেখছি।"

সাবা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। জেদে না নেওয়ায় ওসমানের বিরক্তি বাড়ল। মেয়েটা এখনো সেই আগের মতোই একগুঁয়ে, ঝগড়াটে।

হঠাৎই সে জ্যাকেটটা ঝটকা দিয়ে নাড়ল, শব্দে সাবা কেঁপে উঠল। ওসমান এগিয়ে এসে তাকে সোজা করে দাঁড় করাল, প্রায় জোর করেই জ্যাকেটটা গায়ে পরিয়ে দিল। সাবা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ওসমানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়তেই শব্দ গলায় আটকে গেল।

তীব্র ও সোহা কথা বলতে বলতে সাবাদের কাছে এসে দাঁড়াল। ওসমানকে দেখে তীব্র হালকা হাসি দিয়ে বলল—

-"আসার পর থেকে তোমার সঙ্গে ঠিকমতো কথাই হলো না।"

ওসমান মৃদু স্বরে জবাব দিল—

-"সমস্যা নেই। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে সবাই ক্লান্ত ছিল, এটাই স্বাভাবিক।"

-"হুম... তো, মিহিরিমার কোনো খবর?"

-"জেলে আছে। সানা-ও। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই বের হয়ে যাবে।"

তীব্র ভ্রু কুঁচকে বলল—

-"এরপর যদি আবার এমন কিছু করে?"

ওসমান ঠোঁটে দৃঢ় হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল—

-"দাদাভাই থাকতে কেউ কিছু করার সাহস পাবে না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।"

তীব্র মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই শিফা এসে দাঁড়াল। পাতলা কুর্তি পড়া মেয়েটির গায়ে শীত যেন কামড় বসিয়েছে। ঠোঁট নীলচে, দাঁত কাঁপছে ঠকঠক করে। সবার তুলনায় অনেক হালকা কাপড় তার গায়ে।

সোহা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের গায়ের উষ্ণ শার্ট খুলে শিফার গায়ে জড়িয়ে দিল। চোখে-মুখে তীব্র স্নেহ আর কণ্ঠে মৃদু ধমকের সুর—

-"এমন হালকা পোশাক পরে কেউ আসে? জানো না, সন্ধ্যার পর এদিকের হাওয়ায় কেমন হিমের শিহরণ নেমে আসে?"

-"খেয়াল ছিল না... না হলে সাথে একটা জ্যাকেট নিতাম।"

-"হয়ে গেছে, কথা বাড়িও না। তোমার ঠাণ্ডা লাগার ধাত, অল্পেই ধরা দেয়।"

শিফা নীরবে মাথা নিচু করল। মুহূর্তেই সাবা এসে অন্য দিক থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল। সোহার আর সাবার গায়ের উষ্ণতায় কিছুটা কাঁপুনি থামল তার।

তীব্রের চোখে কিঞ্চিৎ প্রশ্নচিহ্ন ফুটে উঠল। দৃষ্টির তীক্ষ্ণতায় সে বুঝে নিল, সোহা এই মেয়েটিকে আগেই চেনে। খান পরিবারের সঙ্গে সোহার কোনো এক অজানা অতীত আছে, সেটা তার মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল।

সোহা ধীরে ওসমানের দিকে ফিরল—

-"সবাইকে ডাকুন ভাইয়া, আমরা রিসোর্টে ফিরব।"

ওসমান মাথা নেড়ে সবাইকে ডাকার জন্য এগিয়ে গেলো। এক এক করে সবাই রিসোর্টে ফিরে এলো। রাতের খাবার খেয়ে, আর পরিশ্রমের ক্লান্তি মুছে, নিজেদের নিজের রুমের দিক নিল।

শিফার হঠাৎই জ্বরের আক্রমণ এলো। মিরহা, সাবা, সোহা আর ওসমান সবাই তার ঘরেই। তীব্র যদিও শুনছিলো, কিন্তু পরিস্থিতি দেখে অপ্রয়োজনীয় ভাবল। যত্ন নিয়ে শিফাকে ওষুধ খাইয়ে সে যেন গভীর ঘুমে ডুবে যায়, তারপর সবাই আলতো স্বরে ঘর ছেড়ে নিজেদের রুমের উদ্দেশ্যে চলল।

সোহা নিজের রুমে ফিরে এসে অদ্ভুত এক অনুভূতি পেল, এক ধরনের অস্তিত্ববোধ, যেন ঘরে কেউ আছে।

রুমের লাইট জ্বালাতে গেলে দেখতে পেলো, বিদ্যুৎ নেই। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে চুপচাপ চারদিকে খুঁজতে লাগল, কিন্তু কাউকেই পেল না। মনের কোনো ভুল ভেবে নিজেকে শান্ত করল, এবং ফ্রেশ হতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলো।

ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, অন্ধকারের গভীর থেকে যেনো একটি ছায়াময় পুরুষ অবয়ব উথলে পড়ল, সজোরে টেনে নিয়ে সে সোহাকে দেয়ালের দিকে ঠেলে দেয়।

সোহার শরীর হঠাৎ জমে যায়, হৃদস্পন্দন যেন থেমে যাওয়ার পথে। তার ঠোঁট কেঁপে উঠে, গলার এক কোণে ভয়ে গলাধঃকৃত একটি চিৎকারের আগুন জ্বলে উঠতে চাইল, কিন্তু তার আগেই পুরুষালি শক্তিমত্তার আঁচল তার মুখ বন্ধ করে দেয়। "উম...উম..." শব্দগুলো সোহার ঠোঁট থেকে যেন মৃদু বাঁচার আবেদন হয়ে বেরিয়ে আসছে।

পুরুষের নিশ্বাস, ভারী ও গন্ধমাখা, সোহার কোমল মুখের ওপর পড়তে থাকে, তার শ্বাসের তীব্রতা সোহার ত্বকে সোনালী আঁচ লাগিয়ে দেয়। সোহার চোখ দুটো বিস্ময়ের ঝলক আর ভয়ের ছায়ায় বড় হয়ে ওঠে, যেনো কোনো শিকারী সেজে এসেছে তার সামনে।

সোহার সমস্ত শক্তি দিয়েও যেনো ব্যর্থ হচ্ছে, তার হাতে-প্রান্তে লড়াইয়ের জোর নেই। তার শরীর ধীরে ধীরে পুরুষের অবয়বের শক্ত হাতে আটকে পড়ছে।তখন সোহার মন যেন কাঁপতে থাকে, ভয় আর অবাকত্বের এক অজানা ঝড় উড়ে যায় তার চারপাশে।

হঠাৎ পুরুষের ঠোঁট সোহার কানের কাছে এসে ঘনঘন ফিসফিস করতে থাকে, তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, রহস্যময়, যেনো বিষের মতো মধুর বিষাদ মেশানো....

Story Cover