রাতের তৃতীয় প্রহর। চারদিক যেন মৃত্যুর নীরবতায় ডুবে আছে, শুধু জানালার ওপারে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ আর মাঝে মাঝে আকাশ চিরে ওঠা মেঘের গর্জন। স্নেহাদের বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে আছে তানভীর, নিঃশব্দ, অনড়। ওরহানকে বাড়িতে রেখে সে সোজা চলে এসেছে স্নেহার কাছে।
স্নেহা সেই বিকেলেই ভার্সিটি থেকে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, আর এখনো পর্যন্ত একবারও বের হয়নি। স্নেহার বাবা-মা অফিসের কাজে শহরের বাইরে, যাওয়ার আগে তানভীরকে স্নেহার কাছে থাকতে বলে গিয়েছেন, সাথে দিয়ে গেছেন চাবি। সেই চাবির জোরেই তানভীর ঢুকেছে ঘরে।
পুরো ড্রয়িং রুমে পিনপতন নীরবতা। দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দও যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গেছে। তানভীর সোফায় বসে, হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে দুই হাত ঝুলিয়ে রেখেছে, চোখ স্থির স্নেহার ঘরের দরজায়। বহুবার ডেকে কথা বলতে চেয়েছে, কিন্তু স্নেহা একবারও সাড়া দেয়নি।
হঠাৎ—ট্রিং... ট্রিং...
কলিং বেলের শব্দে যেন তানভীরের তন্ময়তা ভেঙে গেল। এত রাতে কে আসতে পারে? অবাক মনেই দরজা খুলল সে, এবং মুহূর্তেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। দুনিয়া যেন কেঁপে উঠল তানভীরের। বুকের ভেতর ঢেউয়ের মতো ধাক্কা খেল তার হৃদস্পন্দন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সোহা, মাথা নিচু, পুরো শরীর ভিজে একাকার। কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁটের কোণ থেকেও লাল বিন্দু ঝরে পড়ছে ধীরে ধীরে।
তানভীর কথা বলতে চাইলো, কিন্তু মনে হলো অদৃশ্য কেউ যেন তার স্বরযন্ত্র চেপে ধরেছে। সোহা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। সেই চোখ, সাদা অংশটুকু রক্তিম, যেন অগ্নিশিখার ভিতর ডুবে আছে। তানভীরের মাথা শূন্য হয়ে গেল, হাত-পা অবশ হয়ে এল। সোহা কাঁপা, ভাঙা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
-"স্নেহা..."
তানভীরের হুশ ফিরল। এক বীভৎস, হাহাকারমিশ্রিত চিৎকারে সে স্নেহাকে ডাকল। তড়িঘড়ি এগিয়ে গিয়ে স্নেহাকে সাবধানে ধরে সোফায় বসিয়ে দিলো, হাতে তুলে দিল এক গ্লাস পানি। তানভীরের সেই তীক্ষ্ণ চিৎকার স্নেহার বুক কাঁপিয়ে দিলো, ঘরে বসেই যেন মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে এলো তার ভেতর।
পাগলের মতো ছুটে এলো দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে, স্নেহা সোহার অবস্থা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলো। নিঃশব্দে, স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সোহার ভগ্নদেহ, ক্ষত-বিক্ষত মুখাবয়বের দিকে। সেই বিধ্বস্ত মুখে শুধু নীরব অশ্রুধারা বয়ে চলেছে। এক দৌড়ে স্নেহা সোহার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো, আঁকড়ে ধরলো শক্ত করে। ব্যথার আর্তনাদে কেঁপে উঠলো সোহা, স্নেহা তড়িঘড়ি সরে এসে পাশে বসলো, কাঁপা কণ্ঠে আস্তে জিজ্ঞেস করলো, কীভাবে হয়েছে এইসব?
সোহার কণ্ঠে শক্তি নেই। তবুও ভাঙা গলায় ধীরে ধীরে সব খুলে বলল। স্নেহা অবাক হলো না, সে জানে সোহার বাবা কেমন মানুষ। তবে এমন নির্মমতা! এমন অমানবিক প্রহার! একদম আধমরা করে দেবে, তা কল্পনাতেও আনেনি স্নেহা।
তানভীর নীরবে চোখ ভাসিয়ে দিলো অশ্রুতে। ভাবতে লাগলো, একটি বাবা কতটা নিষ্ঠুর হলে, না শুনে, না জেনে, নিজের মেয়ের প্রতি এমন নৃশংস হতে পারে? তার হৃদয় যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিলো এই অমানবিক দৃশ্যে। অবশেষে কান্নামিশ্রিত গলায় ফিসফিস করে বলল—
-"আমরা কোনো ছবি তোমার বাবাকে পাঠাইনি, বিশ্বাস করো। আমরা এইভাবে বদলা নিতে চাইনি।"
তানভীরের কণ্ঠে ছিল ভাঙা অনুনয়, চোখে অপরাধবোধের ছায়া।
সোহা ধীরে মাথা তুলল, তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক মলিন, ক্লান্ত হাসি, যেন ভেতরের সব ঝড় সামলে কেবল বাহিরে শান্তির মুখোশ এঁকেছে। সোহা বুঝতে পারল তানভীরের চোখে অনুতাপের ইঙ্গিত। সোহা বুঝেছে, তানভীরের কোনো দোষ নেই। বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো দোষ নয়, যদিও সেই সমর্থন কখনও কখনও ভুল পথে নিয়ে যায়। হয়তো তানভীর ভালোই বোঝাতে চেয়েছিল, কিন্তু ওরহান তা বুঝতে পারেনি। তানভীর নির্দোষ, এ সত্য সোহা স্বীকার করে। তবু তার চোখে ঝুলে আছে অদৃশ্য ক্লান্তি। সোহা মলিন হাসি ধরে রেখেই, প্রায় ফিসফিসে কণ্ঠে বলল—
-"আমাদের পাড়ার মকবুল কাকার ছেলে আমাদের ভার্সিটিতে পড়ে। সেই ছবিগুলো... সে-ই মকবুল কাকেকে দিয়েছিল।"
তানভীর স্থির, বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল সোহার দিকে। এত ঘটনার পরও সোহা তাদের দিকে অভিযোগের তীর ছুঁড়ল না, বরং সূক্ষ্মভাবে তানভীরের হৃদয়ের অপরাধবোধটুকু মুছে দেওয়ার চেষ্টা করল। যেন সে বলতে চাইছে, "আপনি দোষী নন।"
কিন্তু স্নেহা চুপ থাকতে পারল না। তার মুখের রেখা শক্ত হয়ে উঠল, চোখে বিদ্যুতের ঝলক, কণ্ঠে আগ্নেয়গিরির গর্জন—
-"সাধু সাজতে এসেছো? এত নাটক তোমরা পারো! অন্যায় করার আগে নিজের বন্ধুকে বাধা দিতে পারোনি? এখন আবার সিনেমা করতে চলে এসেছো?"
তানভীর ঠোঁট নাড়ল, তার স্বর কেঁপে উঠল—
-"বিশ্বাস করো স্নেহা, আমরা এভাবে কিছু করতে চাইনি। এটা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। তুমি তো আমাকে বলতেই দিচ্ছ না..."
-"হয়েছে... থামো। তোমাদের কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। একদম চুপ।"
স্নেহার কণ্ঠ যেন ছুরি কেটে দিল নীরবতার শরীরটুকু। তানভীর মুহূর্তেই থেমে গেল। সোহা ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে, বুক উঠানামা করছে দ্রুত, যেন প্রতিটি শ্বাসের সাথে শরীর আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে বুঝে স্নেহা আর তানভীর দ্রুত তাকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। ডাক্তারের মুখ গম্ভীর, সোহাকে দুই দিনের জন্য ভর্তি থাকতে হবে। সেই দুই দিন তানভীর আর স্নেহা হাসপাতালের দোরগোড়া ছেড়ে এক চুল নড়েনি।
আজ রিলিজ দেওয়া হবে। হাসপাতালের বিছানায় আধশোয়া সোহা, পাশে তানভীর আর স্নেহা। চোখে একরাশ স্থিরতা, ঠোঁটে শীতল সংযম। কিছু বলার ছিল তার, যা গলার কাছে জমে ছিল দীর্ঘদিন ধরে। ঠান্ডা, শীতল কণ্ঠে সোহা বলল—
-"আমার ফ্রান্সে যাওয়ার কথা ছিল। ভিসা, স্কলারশিপ, সব পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু বাবা... সাইফুল শেখ আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমার কাছে কোনো ডকুমেন্টস নেই। ভাইয়া, আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন?"
তানভীর বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল—
-"অবশ্যই। কী করতে হবে বলো?"
সোহা ধীরে চোখ নামাল—
-"ভার্সিটি থেকে আমার ট্রান্সফারের সব ব্যবস্থা আমি আগেই করে রেখেছিলাম। আপনি শুধু সব ডকুমেন্টস কালেক্ট করে থানায় অফিসিয়াল কমপ্লেইন করবেন, আমার পাসপোর্টের কপি তুলবেন, তারপর ভিসা আর স্কলারশিপের সব কাগজ নিয়ে একটা টিকিট কেটে দেবেন। তিন দিনের মধ্যে করলে ভালো হয়।"
তানভীর খানিক দ্বিধায় বলল—
-"কিন্তু আইনি ব্যাপারে তো সময় লাগে, বোন।"
সোহা তার চোখে সরাসরি তাকাল, কণ্ঠে অনমনীয় দৃঢ়তা—
-"আপনার কাছে সেটা কোনো ব্যাপার না, ভাইয়া। আপনার বাবা নিজেই একজন পুলিশ অফিসার।"
-"বেশ, ঠিক আছে... অন্যায় যেহেতু করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত করব। তোমার সব কথা মেনে চলব।"
তানভীরের কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক শান্তি, যেন দীর্ঘদিনের বোঝা নামিয়ে রাখছে। সোহা মলিন হাসল। তানভীর উঠে দাঁড়াল, অগণিত কাজ তার অপেক্ষায়, হাতে সময় নেই। দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল সে।
স্নেহা তখনও স্থির হয়ে বসে আছে, মুখে নীরব ক্লান্তি। সোহা তার চেহারা লক্ষ্য করে ধীরে এক হাত বাড়িয়ে স্নেহার হাত নিজের হাতে নিল। কণ্ঠে মৃদু কোমলতা—
-"তানভীর ভাইয়ের কোনো দোষ নেই, স্নেহা। যা করার, ওনার বন্ধু করেছে। তুই আমার জন্য নিজের বিবাহিত জীবন নষ্ট করিস না। তোর মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমার জন্য তোর এত বড় ক্ষতি... আমি মানতে পারব না। আমি লক্ষ্য করছি তুই তানভীর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলিস না। আমি যদি ভুল না হই, তুই কি ওকে ডিভোর্স দিতে চাইছিস?"
স্নেহা বিস্ময়ে তাকাল, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সে জানল কিভাবে? সোহা হালকা হাসল, যেন উত্তরটা আগেই জানে। স্নেহা মাথা নিচু করে ধীরে বলল—
-"আমি কিছুতেই ওকে ক্ষমা করতে পারছি না। তোর সঙ্গে এত বড় অন্যায়... আমি মেনে নিতে পারছি না।"
সোহা শান্ত কণ্ঠে বলল—
-"তুই ভাইয়াকে সময় দে। কথা বল... সব ঠিক হয়ে যাবে।"
স্নেহা মনোযোগ দিয়ে শুনল, কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর করল না। ঘরে যেন নীরবতার ছায়া ঘনিয়ে এল, দুজনেই চুপচাপ বসে রইল, শুধু দূরের জানালায় বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ ভেসে আসছিল।
.
.
.
আজ সোহার ফ্লাইট। গত তিনদিন সে প্রায় একটিও অপ্রয়োজনীয় কথা বলেনি, নীরবতা যেন তার চারপাশে এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাওয়ার পর স্নেহার বাড়িতেই থেকেছে সে। স্নেহা তাকে সন্তানের মতো আগলে রেখেছে, তবু সোহার চোখে ছিল এক স্থির শূন্যতা।
এখন, ঢাকার ব্যস্ত এয়ারপোর্টের ভিড়ের মাঝেও তিনজন একসাথে বসে আছে। কয়েক মিনিট পরই সোহা বিদেশগামী বিমানে উঠবে। সোহা ধীরে মুখ তুলে তানভীরের দিকে তাকাল, চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা—
-"আমাকে বোন বলে ডেকেছেন... বোনের শেষ আবদার রাখবেন?"
তানভীর হালকা অবাক হলেও গম্ভীর সুরে বলল—
-"আবদার কেন বলছ? তুমি হুকুম করো।"
সোহার ঠোঁটে এক ক্ষীণ, ক্লান্ত হাসি ফুটল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত ভঙ্গিমায় বলল—
-"আমার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী... একটি বানোয়াট মিথ্যেকে সত্যি বলে মেনে নিয়েছেন। আমাকে একবারও কিছু বলার সুযোগ দেননি। আমি আজ নিজের চরিত্রে এক কলঙ্কের বোঝা বয়ে দেশ ছাড়ছি। আপনি যদি পারেন, আমার এই কলঙ্কটা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। আমি দ্বিতীয়বার আর কোনোদিন তাদের সামনে যাব না, নিজের সপক্ষে কিছু বলতেও নয়। সেই রাতের পর থেকে... তারা আমার কাছে মৃত, আমিও তাদের কাছে মৃত।তারা যদি কোনোদিন আমার খোঁজখবর জানতে চায়, দয়া করে বলবেন না। শুধু বলবেন... আপনারা কিছুই জানেন না।"
তানভীরের চোখে একরাশ অঙ্গীকারের ছাপ ফুটে উঠল।
-"ঠিক আছে... তুমি যেভাবে বলবে, সেভাবেই সব হবে।"
-"আর একটা কথা..."
সোহার কণ্ঠে ছিল এক অচেনা দৃঢ়তা।
-"বলো!"
-"আমার সাথে যা যা হয়েছে, তার একটি শব্দও যেন আপনার বন্ধুর কানে না যায়। সে যেন কোনোদিন আমাকে খুঁজে না পায়... সেটা আপনাকেই দেখতে হবে।"
তানভীর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল—
-"সোহা, ওরহানের ব্যাপারে তুমি এতদিন কিছুই শুনতে চাওনি। তোমার অবস্থা দেখে আমিও কিছু বলিনি। কিন্তু আজ... আজ আমাকে বলতে হবে, তুমি ওরহানকে ভুল বুঝছো।"
সোহা মুখ ফিরিয়ে নিল—
-"আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে, ভাইয়া। আমি যাচ্ছি।"
-"সোহা... আমার কথাটা শোনো..."
কথা শেষ করার আগেই সোহা উঠে দাঁড়াল। পায়ের ধ্বনি যেন এয়ারপোর্টের কোলাহল ছাপিয়ে যাচ্ছিল। কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ থামল, উল্টে স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল—
-"তানভীর ভাইয়া ভালো মানুষ। নিজের জীবন নষ্ট করিস না, স্নেহা। কথা বল, তোরা নিজেদের ঝামেলা মিটিয়ে নে। যা হয়েছে, আমার সাথে হয়েছে। দোষী তানভীর ভাই না... তাই তাকে শাস্তি দিস না।"
বলে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ঘুরে চলে গেল, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে অতীতের সমস্ত বন্ধন ছিঁড়ে ফেলছে। একবারও পেছনে তাকাল না। পেছন থেকে তানভীর সমানে ডাকতে লাগল—
-"সোহা... একটিবার দাঁড়াও! শোনো, জীবনে আক্ষেপ থেকে যাবে যদি এই কথাটা না শোনো... ওরহান তোমাকে..."
ব্যস। বাকিটা আর সোহার কানে পৌঁছাল না। কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেল, মানুষের ভিড়ের গুঞ্জনে হারিয়ে গেল। সোহা অদূরে মিলিয়ে গেল যেন এই দেশ, এই মানুষ, এই অতীত থেকে নিজেকে চিরতরে ছিন্ন করে ফেলল।
বর্তমান—
বায়ুমণ্ডল ভারী, আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে ঘন কালো মেঘের অন্ধকার আস্তরণ। বাতাসে মৃদু ঠাণ্ডা, যেন কষ্টের মৃদু ফোঁটা বয়ে নিয়ে আসছে। মাঝে মাঝে আকাশ গর্জন করছে, একটি অদ্ভুত শূন্যতা ও বিষণ্ণতার প্রতিধ্বনি। থেমে থেমে পড়ছে হালকা বৃষ্টি, সারা পরিবেশকে ঢাকা দিয়েছে এক বিষাদের নীলে।
সেখানে, সেই বিষণ্নতার মাঝেই, সোহা নীরব কান্নায় ভেঙে পড়েছে, চোখের জলে তার অন্তরেকের যন্ত্রণা মলিন হয়ে গেছে। তার পাশে ছোট্ট সাবা, ছোট্ট বুকের মধ্যে নিজের কোল জড়িয়ে, মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কাঁদছে, একটি নিষ্পাপ বেদনার নিঃস্ব ছোঁয়া। আর মিরহা, শ্বাসকষ্টের মতো হেঁচকি তুলছে, চোখ ভিজিয়ে কাঁদছে, কোনো শব্দ ছাড়াই। তার মনে একরাশ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কীভাবে একজন বাবা এত নিষ্ঠুর হতে পারে? কীভাবে পাক্ষিক একপক্ষের কথা শুনে এতো কঠোর বিচার করা যায়?
মিরহার মনে অন্ধকার, জানতে পারছে না, বুঝতে পারছে না। তার চোখে বর্তমান অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক যেমন আকাশ ঘন হয়ে আঘাত হানছে পৃথিবীর বুকে। চারপাশে যেন গণ্ডার বেদনার নীরবতা মণ্ডিত। কেউ কথা বলছে না, কেউ হাসছে না। শুধু একটা গভীর, বিষাদময় থমথমে শান্তি। সাবা উঠে বসে, ধীরে ধীরে সোহার হাতে হাত রেখে বলে—
-"তুই চলে যাওয়ার পর মকবুল কাকা সব শিকার করে ফেলেছে।" সাবার কণ্ঠে মিশে আছে বিষণ্ণতা।
-"কিন্তু কিভাবে, কীভাবে হয়েছে... আমরা জানি না। হয়তো তানভীর ভাই করেছে। আর স্নেহা আপুও আজও আসে আমায় দেখতে, খোঁজ নিতে। জানিস, স্নেহা আপুর একটা সুন্দর মেয়ে হয়েছে, তার নাম দিয়েছে—সোহা।"
সোহা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল সাবার দিকে। কতবার খুঁজেছে স্নেহাকে, কিন্তু পায় নি। এখন জানতে পারল যে, স্নেহা তার মেয়ের নাম দিয়েছে সোহা, নিজেকে যেন কিছুটা ভিন্ন অনুভব করল, মনের এক অজানা কোণে নরম এক স্পর্শ লেগে গেল।
মিরহা স্বরে প্রশ্ন করল—
"আর ওরহান স্যার?"
সাবা বিষণ্ন হয়ে বলল—
"সে বহুবার এসেছে। কিন্তু বাবা প্রতিবারই তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে। তানভীর ভাই আর স্নেহা নিজেদের কথা রেখেছিল, একত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। একটি কাক পক্ষিকেও আপুর খোঁজ দেয় নি।"
সোহা চুপচাপ শুনে রইল, চোখে থেমে থাকা বাধ ভেঙে পড়ল অশ্রুর নদী। মিরহা ও সাবার চোখ থেকেও জল ঝরে পড়ছিল। রাত গভীর, নিঃশব্দ। নিজের চোখের জল মুছতে মুছতে সোহা বলল—
-"অনেক কথা হয়েছে... যাও, ঘুমিয়ে পড়ো তোমরা।"
সাবা ও মিরহা বুঝতে পারল, সোহা একাকী থাকতে চায়। তাই আর কোনো কথাবার্তা না বাড়িয়ে দুজনেই নিঃশব্দে রুমের ভেতরে চলে গেল।
মনের গর্জন শান্ত করতে পারল না সোহা। তারা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে বারান্দায় চলে এল। আকাশ এখনো সেদিনের মতন ভারী, ধূসর মেঘে ঢাকা, আর ছুটছুটে বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু আজ সে ভিজলো না।অকস্মাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে সোহা মুখ খুলল, কণ্ঠে বিষাদের সুর—
-"ওরহান ঠিক বলেছিল... তার জন্য আমাকে একদিন অনেক কাঁদতেই হবে। চোখের পানি শুকিয়ে যাবে, তবুও আমার কান্না থামবে না।
শুনছেন ওরহান? আপনি কি দেখতে পারছেন? আপনার কথা সত্য হয়েছে। আমিও আজও আপনার জন্য কাঁদি... চোখের পানি শুকিয়ে যায়, আমার কান্না শেষ হয় না, ওরহান।"
কিছু পল নীরবতা তারপর হঠাৎই যেন ভিতরটা ফেটে চিৎকার করে উঠলো সে—
-"ভালোবাসি! ওরহান খান শাহির... এই নেসলিহান সোহা আজও আপনাকে ভালোবাসে! শুনছেন আপনি? এই সোহার হৃদয়ে আজও আপনি বিচরণ করেন। কেন? কেন আমি আজও আপনাকে ঘৃণা করতে পারি না?"
চিৎকারের সাথে সাথে চোখের কোন বেয়ে নেমে এলো অশ্রু। অজান্তেই... অপ্রতিরোধ্যভাবে। আকাশের দিকে তাকিয়ে, সেই বিস্তৃত নীল ফাঁকা চোখে, সোহা আবার বলল—
-"ভালোবাসি। তবে আপনাকে আমি চাই না।
এই ইহজীবনে আপনার সান্নিধ্য আমার আর প্রয়োজন নেই। আপনাকে আমার চারপাশে চাই না। না, কখনোই না। ভালোবাসলেই সবকিছু পেতে হয় না। সব ভালোবাসা শান্তির পরিণতি নয়। কিছু ভালোবাসা কেবল লাঞ্ছনা, অপমান আর অনিঃশেষ বেদনার রক্তচিহ্ন বয়ে আনে। আপনি সেই ভালোবাসা।
তাই আপনাকে গ্রহণ করা আমার কাছে নিষিদ্ধ।
শুনছেন আপনি? আপনাকে গ্রহণ করা বারণ, চিরতরে বারণ..."
বাতাসে ভেসে বেড়ায় সোহার মনের গহীনে লুকানো অনুভূতিগুলো—
-"ভুল-ভাঙা স্বপ্নের আলো তুমি,
অচেনা চেনা মুখে লুকানো ভালো তুমি।
আশ্রয়ের খোঁজে পাওয়া প্রতারণার স্পর্শ তুমি,
অভিমানের নীরব চিৎকার তুমি,
এই নীরব ভালোবাসার নীরব যন্ত্রণা তুমি।"