ফিরে দেখা

পর্ব - ১৫

🟢

দূরে, বিশাল এক প্রাচীন বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে হালকা আড্ডায় মগ্ন ছিল ছয়জন—ওরহান, সিয়াম, তানভীর, রিয়া, আর নিশাত। শীতের আগমন, তবুও আজ আকাশ ছিল অদ্ভুতভাবে মেঘলা। বাতাসে ঝিরঝিরে বিকেলের কোমল ছোঁয়া বয়ে যাচ্ছে, আর পাতা পড়ছে টুপটাপ শব্দ করে।

তারা সবাই মিলে কিছু একটা নিয়ে ওরহানকে খোঁচাচ্ছিল। হয়তো কোনো পুরনো ঘটনা, কিংবা কারও প্রতি জাগ্রত হওয়া তার দুর্বলতা। ওরহান হেসে যাচ্ছিল, তবে সেই হাসিতে একরকম লজ্জা লুকিয়ে ছিল, চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল, কপালে হাত দিচ্ছিল বারবার। সবাই সেটা লক্ষ্য করে আরও হেসে উঠছিল হালকা, উচ্ছল, নির্ভার এক দৃশ্য যেন।

ঠিক তখনই, আচমকা এক শীতল ঝড় বয়ে গেল বটগাছের ছায়ার উপর দিয়ে।

হঠাৎই সেখানে হাজির হলো সোহা ও স্নেহা। দুজনেই নিশ্চুপ, চোখে কৌতূহল আর স্থিরতা। পায়ের আওয়াজও যেন বাতাসকে ভেদ করে আসছে। তাদের আগমন ছিল এতটাই অপ্রত্যাশিত, যেন কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করেনি এভাবে এই সময়ে তাদের দেখা পাওয়া যাবে।

ওদের দেখে এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। হাসির রোল থেমে গেল, শব্দ থেমে গেল, শুধু এক নিঃশ্বাসে জমে রইল সবাই। ওরহান, তানভীর, রিয়া, নিশাত, সিয়াম, একসাথে হকচকিয়ে তাকিয়ে রইলো।

ওরহান সামনের পা বাড়িয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শব্দ এসে ঠোঁটেই থেমে গেল। তার গলা শুকিয়ে গেছে, চোখ স্থির। যেন শব্দগুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে গলায় আটকে গেছে একটি দৃশ্য দেখে। সোহার ডান গালে পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ স্পষ্ট। মুহূর্তেই ওরহান ছুটে গেল তার দিকে। ভয়ের ছাপ চোখে-মুখে, কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল—

-"কি হয়েছে? কে মেরেছে তোমায়?"

সোহা কোনো উত্তর দিল না। বরং পরক্ষণেই ওরহানকে এক ঝটকায় সরিয়ে ঠাস করে বসিয়ে দিল এক চড়, সোজা তার গালে।

ঘটনাটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে চারপাশ থমকে গেল মুহূর্তে। ওরহান গালে হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এর মধ্যেই সোহা ফেটে পড়ল—

-"প্রতারক! এত বড় প্রতারণা করলে আমার সঙ্গে? কী অপরাধ ছিল আমার? বারবার আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছি, তবু পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়ালেন কেন? প্রতিশোধ নিতে? এতটা নিচে নামলেন আপনি? আপনাকেই ভালোবেসে, আপনাকেই বিশ্বাস করে শেষমেশ আমাকে শেষ হতে হলো! এত অভিনয়! এত নিখুঁত ভালোবাসার ভান! এত মিথ্যার জালে জড়িয়ে রেখেছিলেন আমাকে! এত বড় প্রতারণা! এত নির্মম ধোঁকা! যেন আমি কেবলই এক পুতুল, আর আপনি এক দক্ষ অভিনেতা। না, না... এত নিখুঁত অভিনয় তো সত্যিকারের কোনো অভিনেতাও করতে পারে না! মানুষ কীভাবে পারে, বলুন? কীভাবে পারে এতটা নির্মম, এতটা নিষ্ঠুর হতে?"

সোহার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। তার কণ্ঠে ক্ষোভ, তীব্র হতাশা আর অপমানের আগুন।আশেপাশে কেউ একটি শব্দ করতেও সাহস পেল না। চারদিকে যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো। শুধু ওরহান, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, সোহার কিছুটা জানা হয়েছে, কিন্তু পুরোটা নয়। তার ভালোবাসার গভীরতা, তার আত্মত্যাগের সত্য আজও অজানা রয়ে গেছে সোহার কাছে।

ওরহান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল, কিছু বলতে চাইল। কিন্তু সোহা এক হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। কণ্ঠে ঝরল বিদ্রুপ আর বিষাদে মেশানো এক গভীর আক্ষেপ—

-"আমাকে ঠকিয়ে বিয়ে করেছেন! আমি জানতামই না, আমি বিবাহিত! আমি তো বারবার বলেছি, আমি প্রেমের সম্পর্কে জড়াবো না। আপনার পরিবার নিয়ে আসুন, সামাজিকভাবে সামনে আসুন। আর আপনি? আপনি শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, 'ব্যবসায় বসলেই নিয়ে আসবেন পরিবার'! তাহলে এই প্রতারণা কেন? কেনো ধোঁকা দিয়ে কাবিননামায় সই করালেন? আমার বাবাকে অপমান করতে? কাবিননামা হাতে নিয়ে সামনে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন? নিন, আজ আপনার সেই খায়েশ পূর্ণ হোক। যে বিয়ে আমার অজান্তে হয়েছে, তাকে আজ আমি স্বীকৃতি দিলাম, এই অপমানেই।"

একটু থেমে, চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ নিশ্বাস টেন সোহা। চোখ দিয়ে বাঁধ ভেঙে পড়ার মতো অশ্রু গড়িয়ে আসছিল। এরপর চোখ খুলে সে ওরহানের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল। সোহার লালচে চোখে ছিল অদম্য ক্ষোভ, আর ওরহানের চোখে ফুটছিল অসহায়তার এক অদ্ভুত ছায়া।

সোহার কণ্ঠ ছিল বরফের মতো ঠাণ্ডা, অটল, কঠোর, যেমন কেউ জীবনকে এক কঠিন সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিদায় নেয়। বলল—

-"আমি নেসলিহান সোহা শেখ, আজ এই মুহূর্তে, সেই মিথ্যে প্রতারক উন্মাদ প্রেমিক ওরহান খান শাহির-কে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করলাম। আর সেই স্বামীকেই আজ হৃদয় থেকে দাফন করলাম।"

চোখ মুছে সোহা ঘুরে দাঁড়ালো। তার পদক্ষেপে ছিল শুদ্ধ ক্রোধ আর গা ছমছম করা অভিমান। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। কেউ কখনো সোহার এমন রূপ দেখেনি। তারা সেই শান্ত, ভীতু মেয়েটিকে চিনতেই পারছিল না।

রিয়া ছুটে গিয়ে ঝাঁকিয়ে ধরল স্তব্ধ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওরহানকে—

-"যা, দৌড়া! বোঝা ওকে। নিজের মনের কথা বল। আর কিছু গোপন করিস না, সত্যটা খুলে বল!"

ওরহানের হুঁশ ফিরল। সে দৌড়ে গেল সোহার পেছনে, ভালোবাসা, অনুতাপ আর অপ্রকাশিত সত্য স্বচ্ছ অনুভূতি নিয়ে।

.

.

.

চারদিকে হালকা কুয়াশার আস্তরণ। বাতাসে শীতের আগমনী সুর, পাতা কাঁপে, শরীর সেঁটে আসে ঠান্ডার কোমল ছোঁয়ায়। অথচ আকাশ আজ যেন শীত ভুলে হাহাকার করছে। মেঘে মেঘে ঘন হয়ে থাকা দিগন্ত এক মুহূর্তে বিদীর্ণ হয়ে গেল। হঠাৎ করেই আকাশ ফেটে নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি, যেন প্রকৃতি নিজেই কান্নায় ভেঙে পড়েছে। এ শুধু বাইরের ঝড় নয়, এই দুর্যোগ যেন সোহার ভেতরেও সমানভাবে চলছে।

স্নেহা নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইল তানভীরের দিকে। তার চাহনিতে ছিল বিস্ময়, ক্রোধ আর দহন। তানভীর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো, মুখে ছিল অনুতাপের ছায়া, কিন্তু স্নেহা তাকে একটি শব্দও বলার সুযোগ দিল না। এক ঝড়ের মতোই হাত উঠে এলো, আর পড়ল এক জোরালো চড়—তানভীরের গালে।

চারপাশ স্তব্ধ। নীরবতার দেয়াল যেন এক মুহূর্তে আরও পুরু হয়ে উঠলো। সবাই বাকরুদ্ধ। হঠাৎ, সেই নিরবতা ছিঁড়ে স্নেহার কণ্ঠে আগুন ঝরে পড়ল—

-"বেইমানের দল! তোরা কি আদৌ মানুষের কাতারে পড়িস? সামান্য প্রতিশোধ নিতে একটি নিষ্পাপ ফুলের মন ভেঙে তোরা আনন্দ পেলি? সোহার কি অপরাধ ছিল? ও শুধু একজন মেয়ে, একটা স্বপ্নভরা হৃদয়! ওর বাবার সাথে দ্বন্দ্ব ছিল তোমাদের, কিন্তু তার বদলা এত নিচুভাবে? এটা কি পুরুষত্ব? আর তোদের কেউ বাধা দিলি না? উল্টো তোরা ওরহানের পাশেই দাঁড়ালি। আর তোমরা, তোমরা তো মেয়ে, তোমাদের অন্তত বিবেকে লাগল না?"

শেষের কথাগুলো ছুঁড়ে দিল রিয়া ও নিশাতের দিকে, যেন এক একটি তীক্ষ্ণ ছুরির মতো। তারা কেউ মুখ তুলতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

স্নেহা আর কিছু বলল না। ঝড়বৃষ্টির মতোই নিঃশব্দে চলে গেলো সে, কারও কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, যেন এই সন্ধ্যার মতো প্রকৃতি ও প্রতিবাদের সমাপ্তি টানল তার পদচিহ্নে।

.

.

.

বৃষ্টি থামেনি। বরং ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে প্রকৃতির আহাজারি। মেঘের গর্জন যেন কারও দুঃখে সঙ্গ দিচ্ছে, ছায়া হয়ে ঢেকে ফেলছে আকাশ। হিমেল বাতাস শিরশির করে বয়ে যাচ্ছে, অথচ হৃদয়ের মধ্যে যেন এক জ্বলন্ত আগুন।

সোহার পিছু ছুটে এসেছে ওরহান। ছায়ার মতো, অপরাধবোধে পোড়া এক ছায়া।

সোহা হাঁটছে, জলের ফোঁটাগুলো চোখ-মুখ ঢেকে দিলেও ও থামছে না। ওরহান দুই হাতে পেছন থেকে টেনে, ঘুরিয়ে, তার দুহাতের বাঁধনে সোহাকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে বলল—

-"ভুল বুঝছ তুমি আমায়, প্লিজ, আমার কথাটা তো একবার শোনো!"

সোহা তার চোখে ঘৃণার আগুন ছুঁড়ে দিলো—

-"কি শুনবো আপনার? অপমান করেছেন, এখন কী চাচ্ছেন? আর কিছু বাকি আছে?"

-"না! না, এমন কিছু না। হ্যাঁ, আমার মনে প্রতিশোধের আগুন ছিল। কিন্তু আমি শপথ করে বলছি, আমি কিছু করিনি।"

সোহার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ টলমল করে উঠল, তবুও কণ্ঠে বজ্রপাতের মতো শব্দ—

-"ও তাই? ও তাই নাকি? তাহলে ছলনা করে কাবিননামায় সই করালেন কেনো? যান গ্রহণ করেছি আপনাকে স্বামী হিসেবে। এখন এই কাবিননামা নিয়ে যান আমার বাবার কাছে, করুন অপমান, করুন হাসি-ঠাট্টা। আর আমার পেছনে আসছেন কেনো আপনি?

আপনার তো প্রেমিকা আছে, লিজা! যান তার কাছে।"

ওরহান কেঁপে উঠল—

-"কি বলছ তুমি? লিজা! ও আমার কিছু না! আমি..."

-"আপনার কি আছে না আছে আমি জানতে চাই না। ছাড়ুন আমাকে!"

সোহা ছুটে যেতে চাইল, কিন্তু ওরহান চেপে ধরল তাকে আরও শক্ত করে। বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে যাওয়া দু'টি শরীর একে অপরের খুব কাছাকাছি, তাপ আর ঠান্ডা একসাথে খেলছে ওদের মধ্যে। জামাকাপড় লেপ্টে গিয়ে যেন ছুঁয়ে ফেলছে আত্মা।

সোহার ভেতর গর্জে উঠল প্রবল ঘৃণা ও ঘৃণার বিপরীতে যে আশ্চর্য দুর্বলতা, তাকে থামাতে, ছিঁড়ে ফেলতে, নিজেকে মুক্ত করতে হঠাৎই সোহা ওরহানের ঘাড়ে এক কামড় বসিয়ে দিলো।

ব্যথায় চিৎকার করে সরে গেলো ওরহান। সোহা আর পিছু ফিরে তাকাল না, এক দৌঁড়ে গিয়ে উঠে পড়ল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি রিকশায়। রিকশা নেমে পড়ল রাতের আঁধারে, বৃষ্টির শব্দে চাপা পড়ে গেলো ওর চোখের কান্না।

ওরহান ব্যথা উপেক্ষা করে ছুটে গেলো রিকশার পিছু। কিন্তু রাস্তায় দৌড়াতে গিয়ে এক ইটের সঙ্গে পা ঠেকে মুখথুবড়ে পড়ে গেলো রাস্তায়। তানভীর আর সিয়াম ছুটে এসে ধরলো ওকে, ভেজা মাটির মধ্যে লুটিয়ে পড়ে আছে সে, কাঁপছে, চিৎকার করছে—

-"ছাড়ো! আমি যেতে চাই! আমাকে যেতে দাও! সোহা..."

কিন্তু ওরা ছাড়লো না। টেনে হিঁচড়ে ওকে বাড়িতে নিয়ে এলো। চিকিৎসক ডেকে এনে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হলো তাকে। তবেই শান্ত হলো কিছুটা।

রাত গভীর হল। সব ধুয়ে মুছে যেন এক নিস্তব্ধতা নামলো ঘরে। তানভীর, সিয়াম, রিয়া, নিশাত, সবাই মিলে খান পরিবারের সামনে খুলে বলল সত্যিটা।

তবুও, এই রাতে বৃষ্টি থামলো না। ঠিক যেমন কোনো কোনো দুঃখের গল্পেও থামে না কাহিনি।

.

.

.

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে। তবু এখনো ঘরে ফেরেনি সোহা। রিকশা থেকে নেমে কোথায় কোথায় হেঁটেছে, নিজেই জানে না সে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। এই শহরের আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে অনেকটা সময় ধরে নিজের জীবনের হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেছে, একটি জীবন, যে জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আজ যেন ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট।

বাড়িতে ফিরে দেখে—তার মা ও ছোট বোন এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে, চোখেমুখে অজানা আশঙ্কার ছায়া। আর বাবা, সাইফুল শেখ, নীরব রাগে ফেটে পড়ার মতো শান্ত মুখে সোফায় বসে আছেন, দৃষ্টি স্থির, ঠোঁট সোজা দাগে চাপা।

বাইরে তখনো নেমে আসছে একটানা নিঃশব্দ বৃষ্টি।

সোহা ভেজা শরীরে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকে পড়ে। বোন সাবা দৌঁড়ে ছুটে আসতে চায়, কিন্তু নিলুফার বেগম এক চাপে তার হাত টেনে নিজের শরীরের সাথে আটকে রাখেন, যেন মাতৃত্বের ছায়াটি আজ কোনো অদৃশ্য নিয়মে শীতল হয়ে গেছে।

বাড়ির পরিবেশ ভর করে আছে এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা। ঘরের বাতাসে আতঙ্কের গন্ধ। সোহা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এক পা, এক পা করে এগোতেই ভেতর থেকে গর্জে ওঠে বাবার কণ্ঠ—

-"এখানেই দাঁড়াও। ভেতরে যাবে না।"

শব্দগুলো তীক্ষ্ণ শাণে কাটা। সেই কণ্ঠে কোনও আবেগ নেই, শুধু হুকুম। বলেই সাইফুল শেখ উঠে পড়লেন এবং সোজা বেরিয়ে গেলেন ঘরের বাইরে। সোহা থমকে যায়, ভিজে শরীরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে দোরগোড়ায়। তার বুক ধুকপুক করছে, কিছু একটা ঘটবে, এ নিশ্চিত জানে সে। কিন্তু ঠিক কী ঘটবে, বুঝে উঠতে পারছে না।

কয়েক মুহূর্ত পরে, সাইফুল শেখ ফিরে এলেন।

হাতে মোটা, ভারী একটি বাঁশ। কারও কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই বাঁশ আছড়ে পড়ে সোহার গায়ে, একটা বীভৎস শব্দে কেঁপে ওঠে ঘর। আর সঙ্গে সঙ্গে সোহা এক চিৎকার ছেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

তার কষ্টের চিৎকার ছুটে যায় দেয়াল বেয়ে,

বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে ওঠে, বুকফাটা কান্নায় বিদীর্ণ করে তোলে সমস্ত বাড়ি।

সাবা ছুটে যেতে চাইলে, মা নিলুফার বেগম শক্ত হাতে তাকে আগলে রাখেন। কোনো প্রতিবাদ নেই, কেবল মৌন দর্শকের মতো চোখে তাকিয়ে থাকেন নিজের সন্তানের এই নির্মম পরিণতির দিকে।

সাইফুল শেখ থামেন না। তিনি একের পর এক এলোপাথাড়ি আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে তুলছেন নিজেরই মেয়ের শরীর। বাঁশের আঘাতে ঘরে প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে।

সোহা ছটফট করছে। তার কান্না, তার আর্তনাদ যেন আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মেঘ গর্জে উঠছে, মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন প্রতিবাদ জানাচ্ছে এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে।

কিন্তু তবুও কাঁপল না পাষাণ পিতা। কান পেতেও শুনল না পাষাণ মা।

এ সময়, সাইফুল শেখ হঠাৎ বিকৃত গলায় গালিগালাজ করতে থাকেন, গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, চোখে আগুন।

-"নষ্ট মেয়ে! কোথায় ছিলি এত রাতে? কার সঙ্গে করেছিস এইসব নোংরামি? এই শিক্ষা দিয়েছি তোদের আমি? আমার শত বছরের মান-ইজ্জত ধুলায় মিশিয়ে দিলি! তোর জন্মের সময় যদি জানতাম একদিন এমন কলঙ্ক নিয়ে ফিরবি—মুখে লবণ ছিটিয়ে তখনই শেষ করে দিতাম তোকে। তোর মতো মেয়ের কোনো প্রয়োজন নেই আমার জীবনে! বড়লোক ছেলেদের পেছনে ঘুরে বেড়ানোই এখন তোর কাজ? আল্লাহ মানুষকে সব কিছুই দেন, কিন্তু চিনে দেন, বুঝে দেন! তোকে যদি আল্লাহ একটু রূপ, একটু ফর্সা ত্বক দিতেন, কে জানে, তুই আর কতটা নিচে নেমে যেতি! নষ্ট মেয়ে! ধিক তোকে!"

সাইফুল শেখ চিৎকার করে যাচ্ছেন, গলা ভারী, চোখে আগুন। প্রতিটি শব্দ যেন ছুরি হয়ে বিদ্ধ করছে ঘরের বাতাস।

নিলুফার বেগম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, চোখে জল নেই, স্নেহ নেই, শুধু জমে থাকা এক অচেনা ঘৃণা।

সোহার কপালে আঘাত লেগেছে, রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। বৃষ্টির জলে ভেজা আর কপালের ক্ষত সেই রক্ত মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য তৈরি করেছে।

সাইফুল শেখ থেমে যান মুহূর্তের জন্য, সেই রক্ত দেখে।

কিন্তু তাতেও করুণা জাগে না তাঁর চোখে।

পকেট থেকে মকবুল সাহেবের দেওয়া ছবিগুলো বের করে সটান ছুঁড়ে মারেন সোহার মুখে।

-"এই তো প্রমাণ! এই তো তোর চরিত্র!"

তারপর কোনও মানবিকতা না রেখেই সোহাকে শক্ত করে টেনে তুলে নিয়ে যান সদর দরজার দিকে। আর এক ধাক্কায় ঠেলে ফেলে দেন বাইরে, বৃষ্টির জলে ভেজা, রক্তাক্ত, অপমানিত সেই কন্যাকে।

সোহা ছিটকে পড়ে গিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলার চেষ্টা করে—

-"বিশ্বাস করো বাবা, সব মিথ্যে। আমি কিছু করিনি।

তোমার সম্মান আমি নষ্ট করিনি, একবার... একবার শুধু বিশ্বাস করো বাবা..."

কিন্তু সাইফুল শেখ অচল পাথরের মতো। তাঁর চোখে আর কানে পৌঁছায় না সেই আকুতি। উল্টো এক চিৎকারে, এক সজোর চড়ে থেঁতলে দেন মেয়ের মুখ।

সোহার ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়ায়, আর সেই রক্ত যেন চিৎকার করে বলে—এই পৃথিবীতে মেয়েদের পবিত্রতা প্রমাণ দিতে রক্ত দিতে হয়, তবুও বিশ্বাস মেলে না।

তিনি আরও এক ধাক্কা দিয়ে বলেন—

-"বেরিয়ে যা! তোর মতো নষ্ট মেয়ের কোনো দরকার নেই আমার! আজ থেকে তুই আমাদের কাছে মৃত!"

সোহা বাকরুদ্ধ। জীবনের এই অসম্মানজনক মুহূর্তে, শেষবারের মতো তাকালো মায়ের দিকে। নিলুফার বেগমের চোখে যেন কুয়াশার মতো ঘোলাটে ঘৃণা, স্নেহের এক বিন্দু আলোও নেই সেখানে।

সোহা অনুভব করলো, এই ঘর তার নয়, এই মানুষগুলো তার নয়, এই রক্তের সম্পর্ক আজ মৃত।

ছুটে আসতে চায় ছোট বোন সাবা। ধস্তাধস্তি করতে করতে বুকভাঙা আর্তনাদে চিৎকার করে ওঠে—

-"ছেড়ে দাও! ছেড়ে দাও আমার আপুকে!

আমার আপু নির্দোষ! তোমরা ভুল করছো... মেরো না আমার আপুকে!"

সাবার সেই কান্না, সেই চিৎকার বিদীর্ণ করে তোলে ঘরের দেয়াল। আকাশের বজ্রও যেন থেমে শোনে ছোট্ট এক বোনের নিষ্পাপ আর্তি। কিন্তু শোনে না পাষাণ বাবা মা। কেউই শোনে না ছোট্ট সাবার বুক ফাটা কান্না।

বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি, ঝড়ে গাছ কাঁপছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর এক নিষ্ঠুর পিতা, সাইফুল শেখ, শেষ ধাক্কায় সোহাকে ঠেলে ফেলে দেয় দরজার বাইরে।

সেই রাত, সেই ঝড়, সেই নির্দয় বৃষ্টি সাক্ষী হয়ে রইলো, একটি কন্যার চিরন্তন নির্বাসনের।

Story Cover