ফিরে দেখা

পর্ব - ১৪

🟢

শেখ বাড়ির রান্নাঘরে তখন তুমুল কোলাহল। আজ শুক্রবার। বাড়িতে আজ ফুপি আসবেন, সঙ্গে তাঁর ছেলে-মেয়ে। সকাল থেকেই চলছে রান্নাবান্নার জোর তোড়জোড়। নিলুফার বেগমের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে তাঁর দুই মেয়ে—সোহা আর সাবা।

সাইফুল শেখ সকালেই বাজার সেরে পাশের মোড়ের টং দোকানে গিয়ে বসেছেন। সেখানকার চায়ের আড্ডা যেন এলাকার মুরব্বিদের এক অলিখিত পরিষদ। শুক্রবার বলে কথা, ছুটির দিনে চায়ের কাপে রাজনীতি, সন্তান মানুষ করা, চাকরির টানাপোড়েন, সব কিছু নিয়েই জমে উঠেছে আলোচনা।

এইদিকে রান্নাবান্না শেষ করে তিন মা-মেয়ে গোসল সেরে পরেছেন পরিপাটি জামা-কাপড়। যোহরের নামাজের ঠিক পরেই ফুপুরা এসে পৌঁছাবেন, এমনটাই ঠিক। এমন সময় সাইফুল শেখ বাইরে থেকে চিল্লাতে চিল্লাতে বাড়ির ভিতর ঢুকলেন। গমগমে গলায় কিছু একটা বলতে বলতে গিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। তাঁর গলার শব্দ শুনে তিন মা-মেয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। নিলুফার বেগম সামনের চুলগুলো সামলে স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে একটু বিরক্ত গলায় বললেন—

-"কি হয়েছে? এত চেঁচামেচি করছো কেন? আজ শুক্রবার, মেহমান আসবে বাড়িতে। একটু শান্ত হও সাইফুল। সবসময় এমন মাথা গরম করে ফেলো!"

সাইফুল শেখ স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। তবে গলার সুর খানিকটা নিচু করে বললেন—

-"চেঁচাবো না তো কী করব বলো! মকবুল সাহেবের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে জানো তো? যেই ছেলের কথা আমি তাঁকে সাবধান করে বলেছিলাম, সেই ছেলেই এখন তাঁর মেয়ের স্বামী! আমি তো আগেই দেখতাম, মেয়েটা রাস্তাঘাটে বিভিন্ন ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করছে। তখন ওনাকে বলেছিলাম এসব। কিন্তু উনি পাত্তাই দেননি। উল্টো বলেছিলেন, ‘আজকালকার মেয়েরা এমনই করে, বন্ধন দিলে বরং ক্ষতি হবে। সন্তানদের বন্ধু ভাবলে তবেই তারা আমাদের সঙ্গে খোলামেলা থাকবে, ভুল করলে নিজেরাই বলবে। কিন্তু ভয় দেখিয়ে, শাসন করে রাখলে তারা মিথ্যা বলবে, ভুল করবে, সংশোধনেরও সুযোগ থাকবে না।’ এই ছিলো তার যুক্তি।”

নিলুফার বেগম শান্ত, ধীর কণ্ঠে স্বামীর উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করতে বললেন—

-"হ্যাঁ তো, মকবুল ভাই কি ভুল বলেছেন? ধরো, তিনি যদি মেয়ের ওপর কড়াকড়ি করতেন, জোর করতেন, তাহলে যদি মেয়েটা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতো, তখন মান-ইজ্জত কোথায় যেত?"

সাইফুল শেখ খানিক থেমে বললেন—

-"আমি সেটা বলছি না।"

নিলুফার একটু ভুরু কুঁচকে বললেন—

-"তাহলে ঠিক কী বলতে চাইছ তুমি?"

সাইফুল শেখ মুখ শক্ত করে বললেন—

-"আজ সেই প্রসঙ্গ উঠতেই উনি আমার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আপনারও তো দুটো মেয়ে আছে। কে জানে ভবিষ্যতে তারা কী করবে? গ্যারান্টি দিতে পারেন?’ আমি বললাম—আমার মেয়েরা এমন সাহস দেখাবে না। তারা কারও সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করে না, ছেলেবন্ধুও নেই। তখন উনি হেসে বললেন, ‘মেয়েরা বড় হচ্ছে, ভার্সিটিতে পড়ছে। এখন সবই সম্ভব। কদিন আগে তো নাকি বাড়িতে ফুলের তোড়া আর আরও অনেক কিছু এসেছিল?’ এই নিয়েই শুরু তর্ক। আমি স্পষ্ট করে বলেছি, আমার মেয়েরা কখনো আমার মুখে কালিমা দেবে না। আমি তাদের এমনভাবেই মানুষ করেছি। আমি যাকে পছন্দ করব, আমার মেয়েরা তাকেই স্বামী হিসেবে মেনে নেবে, এই বিশ্বাস আমার আছে।”

নিলুফার এবার একটু নরম গলায় বললেন—

-"আচ্ছা, হয়েছে এবার। এত চেঁচামেচি করে কোনো লাভ আছে? মেয়েরা বড় হয়েছে, ঠিকঠাক বুঝে-শুনে চলতে শিখেছে। যখন সময় আসবে, তখন দেখা যাবে। অহংকার করো না কোনো বিষয় নিয়ে। সময় বড় শক্তিশালী।”

সাইফুল শেখ খানিকটা গম্ভীর হয়ে বললেন—

-"এই কথাটাই মকবুল সাহেবও বললেন।"

নিলুফার হালকা হাসলেন—

-"ঠিকই বলেছেন। এখন চুপ করো তো, তোমার বোনরা আর একটু পরেই এসে পৌঁছাবে। মুখটা শান্ত করো। অতিথিদের সামনে এমন মুখ নিয়ে বসলে সবাই অস্বস্তি বোধ করবে।"

সাইফুল শেখ অবশেষে একটু শান্ত হলেন। কিন্তু তাঁর বলা কথাগুলো সোহাকে অস্থির করে তুলল। বাবার মুখে ওরহানের প্রসঙ্গ না এলেও ইঙ্গিতটা বেশ পরিষ্কার ছিল। যদিও বাস্তবে ওরহানের সঙ্গে সোহার কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই, এটা সে নিজেও জানে, তবুও বাবার সন্দেহভাজন চোখে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তার গলা শুকিয়ে এলো। ওরহান তাকে স্পষ্ট বলেছে, ঘরকন্নার বা সম্পর্কের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে নিজেদের পারিবারিক ব্যবসায় স্থিত হতে চায়। তারপরই সে বাবা-মাকে নিয়ে সোহার বাড়িতে আসবে, সেই প্রতিশ্রুতি সে একাধিকবার দিয়েছে। তবুও, অজানা আশঙ্কায় সোহার বুক কেঁপে উঠল।

হঠাৎ সাইফুল শেখ মেয়েদের দিকে নজর দিলেন। চোখে একধরনের গম্ভীরতা, কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠল—

-"শুনেছি, ফুলের তোড়া নাকি এসেছিল বাড়িতে?"

এক মুহূর্তের নীরবতা। সোহা কেঁপে উঠল, কিন্তু কিছু বলার আগেই সাবা গলায় আত্মবিশ্বাস মিশিয়ে বলে উঠল—

-"ভুল ঠিকানায় এসেছিল, আমরা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।"

সাবা বরাবরই দুঃসাহসী ও চটপটে। দুই-চারটে মিথ্যে বলতে তার কোনো দ্বিধা নেই, বিশেষত যখন সেটা কারও সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হয়।

সাইফুল শেখ সন্তুষ্ট হলেন, বা অন্তত মুখে তেমনটাই প্রকাশ করলেন। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ালেন, ওজু করে নামাজের জন্য বেরিয়ে পড়লেন। নিলুফার বেগমও তখন মেয়েদের নিয়ে নামাজে মন দিলেন।

ঘণ্টাখানেক পর, দুপুর গড়িয়ে গেলে বাড়ির আঙিনায় হাস্যরোলে ভরে উঠল। সাইফুল শেখের বোন, বোনজামাই, আর তাঁদের ছেলে-মেয়েরা এসে পৌঁছালেন। সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর ড্রয়িং রুমে বসে গল্পগুজবে মেতে উঠলেন। পুরনো দিনের গল্প, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর আর ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনায় মুখর হয়ে উঠল শেখ বাড়ির পরিবেশ।

শুধু সোহা মাঝে মাঝে চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিল। ওর বুকের ভেতরে যেন এখনো জমে আছে বাবার বলা কথাগুলোর প্রতিধ্বনি।

.

.

.

সোহা আর স্নেহা পাশাপাশি হাঁটছিল ভার্সিটির সবুজপ্রান্ত ছোঁয়া পাথরবিছানো পথ ধরে। শরতের নরম রোদে ছায়া ফেলে এগোচ্ছিল দুজনেই। দুজনের কথার টুকরোগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল মূলত ওরহান আর তানভীরকে ঘিরে।

স্নেহা মাঝে মাঝেই সোহাকে ওরহান সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করছিল, আর সোহা একেকটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল বেশ সংযতভাবে। কিন্তু তানভীর প্রসঙ্গে সে ইচ্ছা করেই কিছু বলছিল না। সে জানে, তাকে কিছু জিজ্ঞেস না করলেও স্নেহা নিজেই বলবে, তাই আগ বাড়িয়ে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করল না।

হঠাৎ, কথা ঘোরাল স্নেহা। একটু কৌতূহলী চোখে সোহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

-"আচ্ছা, তোর ফ্রান্সে যাওয়ার ব্যাপারে কী হলো?"

প্রশ্নটা শুনেই সোহার মুখ মলিন হয়ে গেল। তার চোখে ভেসে উঠল অনেকবারের ব্যর্থ চেষ্টা আর বাবার কষ্ট পাওয়া মুখ। সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল—

-"অনেকবার চেষ্টা করেছি স্নেহা। বাবা আমার একাউন্টে সব টাকা দিয়ে রেখেছেন, যাতে দরকার হলে আমি নিজেই খরচ করতে পারি। কিন্তু বারবার ভিসা রিজেক্ট হওয়ার পর একসময় আর ইচ্ছে করতো না। কেবল মনে হতো, বাবার এত টাকা নষ্ট হচ্ছে, তার মনটাও খারাপ হয়ে যায় বারবার। তারপর একদিন সাবা বলল, ‘আবার চেষ্টা কর। ভাগ্যে থাকলে নিশ্চয়ই হবে।’ সেই সাহসেই আবার আবেদন করেছি। কিছু দিনের মধ্যেই রেজাল্ট চলে আসবে।"

সে একটু থেমে নিঃশ্বাস নিল, তারপর নিচু গলায় যোগ করল—

-"তবে এবার বাড়িতে কেউ জানে না। ভাবলাম যদি আবারও না হয়, তাহলে সবার মন খারাপ হবে। তাই সফল হলেই সবাইকে জানাবো।"

স্নেহা হালকা হেসে বলল—

-"ভালো সিদ্ধান্ত। আর যদি হয়, তাহলে তো দারুণ একটা সারপ্রাইজ হবে সবার জন্য!"

সোহা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।

-"হুম।"

হাওয়ায় ভেসে এল শুকনো পাতার খসখস শব্দ। সে মুহূর্তে ওদের মধ্যকার নীরবতাটাও যেন মৃদু প্রত্যাশায় মাখা। দুই বান্ধবী নিজেদের ছায়ায় ছায়া ফেলে ভার্সিটির পরিচিত পথ ধরে হাঁটছিল। কথা হচ্ছিল টুকটাক, কখনো হেসে, কখনো নীরব থেকে। চারপাশটা যেন আজ একটু বেশিই আপন, একটু বেশিই শান্ত।

ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল তানভীর, ওরহান, সিয়াম, রিয়া আর নিশাত। সবাই-ই এখন গ্র্যাজুয়েট, কিন্তু কেউই এখনো কর্মজীবনে পুরোপুরি পা রাখেনি। তাই পুরনো ক্যাম্পাসেই ফেরারী পাখির মতো ঘুরে বেড়ানো।

তানভীর আর ওরহানের হাতে দুটি ছোট্ট, সুন্দর বেলি ফুলের মালা। গন্ধে মিষ্টি এক nostalgia ছড়াচ্ছে।হঠাৎই তানভীর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল স্নেহার সামনে। পুরো ক্যাম্পাসের মাঝখানে ছোট্ট একটা মঞ্চ তৈরি হলো যেন সবার বিস্ময় আর হাসির মাঝে।সে নাটুকে গলায় বলল—

-"আপনি কি এই অধমের সহধর্মিণী হবেন, মিস স্নেহা?"

সবাই থমকে গেল এক মুহূর্ত। স্নেহা চোখ বড় করে তাকাল, তারপর হাসতে হাসতে বলল—

-"হ্যাঁ, হবো।"

চারপাশে যেন আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল। তানভীর ধীরে মালাটা পরিয়ে দিল স্নেহার হাতে। মুহূর্তটা নিঃসন্দেহে নাটকীয়, তবুও তাতে ছিল আন্তরিকতার এক সরল সৌন্দর্য।সবাই একসাথে করতালি দিয়ে উঠল। সিয়াম হাত উঁচিয়ে রসিকতার ছলে কাঁদো কাঁদো সুরে বলে উঠল—

-"ও স্নেহা! তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো না রে! কী নিষ্ঠুর, কী কঠোর হৃদয়ের তুই!"

হাসিতে ফেটে পড়ল পুরো দল। রিয়া কানে কানে নিশাতকে বলল—

-"আমাদের জন্য আর কবে এমন নাটক হবে, বল তো?"

নিশাত ভ্রু কুঁচকে বলল—

-"আমাদের জন্য কেউ নাটক করবে না, নাটক আমরাই করতে পারি কত!"

সবাই মিলে ফের এক দফা হেসে উঠল। এভাবেই একটুখানি বেলি ফুল, কিছু সংলাপ আর কিছু হাসির ফোয়ারা ক্যাম্পাসের শেষ দিনগুলোকে স্মরণীয় করে তুলল। সিয়াম আবারও নাটুকে ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

-"আহারে! আজ আমাদের কেউ নেই বলে বেলি ফুলের মালা দিয়ে কাউকে প্রপোজ করতে পারলাম না।"

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই রিয়া একটা ঠাস করে থাপ্পড়ের ভান করে বলল—

-"কেন ভাই! আমাদের নিশাত বেপিকে তোর চোখে পড়ে না?"

সিয়াম ভুরু কুঁচকে মুখে অস্থিরতা এনে বলল—

-"উফ্, সালি! কি বলিস এসব! নিশাতকে কে বিয়ে করবে?"

নিশাত তখনই দুই চোখ রক্তচক্ষু করে বলে উঠল—

-"কি শুনলাম? আচ্ছা, তাই নাকি?"

-"হ্যাঁ।" সিয়াম নির্লিপ্ত গলায় সায় দিল।

নিশাত এক পা সামনে বাড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

-"বাড়ি চল, এখনই তোর সাথে বিয়ে ক্যান্সেল করি। যদি আজই না করি, তাহলে আমার নাম নিশাত না বলে দিলাম!"

সিয়াম ভড়কে গিয়ে এক লাফে এসে নিশাতের হাত ধরে ফেলল—

-"না বইন! বিয়া ক্যান্সেল করিস না! ২৬ বছর ধরে বউ ছাড়া অনাথ আমি, এইবার আমারে আমার বউয়ের থেইক্কা আলাদা করিস না!"

তাদের এই কথার লড়াই দেখতে দেখতে বাকি সবাই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। রিয়া বলল—

-"ওরে বাবা! তোরা তো সত্যিই নাট্যদলের প্রাণ!"

এদিকে ওরহান চুপচাপ সোহার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সোহার নরম হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আস্তে করে বেলি ফুলের মালাটা পরিয়ে দিল। হাতে হালকা ঠান্ডা এক স্পর্শে সোহা চমকে উঠল। ঘুরে তাকাতেই দেখল, ওরহান ওর দিকেই তাকিয়ে ম্লান হাসছে। ঐ মুহূর্তটা যেন চারপাশের কোলাহল থেকে আলাদা, নিঃশব্দ এক কবিতা।

রিয়া হঠাৎ চারপাশে তাকিয়ে বলল—

-"তোরা ঝগড়া করে যা সারাদিন! আর এদিকে কেউ একজন ফাঁকে ফাঁকে রোমান্স চালায়, আহা রে!"

সবাই হেসে সেদিকে তাকাল। সোহা লজ্জায় গুটিয়ে গিয়ে তৎক্ষণাৎ একপাশে সরে দাঁড়াল। তার এই প্রতিক্রিয়ায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল।তানভীর ওরহানের কাঁধে হাত রেখে মজা করে বলল—

-"তো ভাইরা ভাই ওরফে বন্ধু, বিয়েটা কবে করছিস?"

ওরহান চোখ টিপে বলল—

-"যেদিন তুই করবি, সেদিনই।"

তানভীর অবাক হয়ে বলল—

-"বলিস কী! আমার তো সামনের সপ্তাহেই বিয়ে!"

ওরহান একরাশ চাহনি নিয়ে বলল—

-"আমারও ওইদিনই। তবে পাত্রীকে জিজ্ঞেস করবি না?"

তানভীর চমকে বলল—

-"কে?"

ওরহান মুচকি হেসে বলল—

-"তোর সালি!"

এই কথা শুনে সোহা এক লাফে পেছনে সরে গিয়ে মুখ ঢাকল। তার মুখে ফুটে উঠল এক টুকরো লজ্জা, আর আশেপাশে গড়িয়ে পড়ল হাসির ঢেউ। বন্ধুরা কেউ একে অপরের পিঠে হাত মারছে, কেউ ফোনে সেই মুহূর্ত ধরে রাখছে।এভাবেই কেটে গেল আরও একটি দিন। হাসি, খুনসুটি, মান-অভিমান, প্রেম আর বন্ধুত্বে মোড়ানো এক জীবনের মুহূর্ত।

জীবন সত্যিই এমনই, কখনো হাহাকার, কখনো উল্লাস। মাঝেমাঝে অল্প ফুলে, হালকা হাসিতে গাঁথা এমন কিছু মুহূর্ত, যা মনে পড়লে মন ভরে যায় একফালি নরম রোদে।

.

.

.

আজ স্নেহা ও তানভীরের বিবাহ। বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, শুধুমাত্র নিকটাত্মীয় ও প্রিয়জনদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হবে আকদ।

সোহা পরেছে একটি নিখাদ সাদা শাড়ি, শান্ত, পরিপাটি আর অপূর্ব। সাবা বেছে নিয়েছে গাঢ় নীল থ্রিপিস, যা তার প্রাণচঞ্চল স্বভাবের সঙ্গে দারুণ মানিয়েছে। সাবাকে সঙ্গে নিয়েই রওনা দিল সোহা, কারণ একা গেলে বাবা অনুমতি দিতেন না।

দুই বোন সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ে স্নেহার বাড়ির দিকে। ইতিমধ্যে পার্লার থেকে মেকআপ আর্টিস্ট এসে স্নেহাকে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। স্নেহা পরেছে এক কোমল প্যাস্টেল রঙের শাড়ি। তার চারপাশে এখন কেবল কিছু কাজিন ও ঘনিষ্ঠজনেরা বান্ধবী বলতে সোহা একাই।

সাবা ও স্নেহার কিছু কাজিন মিলে বরপক্ষকে আপ্যায়নের জন্য রসালো শরবত ও মিষ্টির ট্রে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সেই ভীড়েই ঘটল এক অনভিপ্রেত ঘটনা। সাবা একটি ট্রে হাতে উল্টোদিকে ঘুরতে গিয়ে হঠাৎই কারও শক্ত বুকের সঙ্গে ধাক্কা খেল। কপালে লেগে গেল বেশ ভালোমতোই।

রাগে চোখ মুখ লাল করে সাবা মুখ তুলে বলতে যাবে কিছু, তার আগেই ছেলেটি হা-হুতাশ করে বলল—

-"সরি সরি! আমি আসলে দৌঁড়ে আসছিলাম, বুঝতেই পারিনি এত জোরে ধাক্কা লাগবে।"

সাবা কটমট করে তাকিয়ে বলল—

-"কানা নাকি আপনি? চোখে দেখে হাঁটেন না? এত বড় মানুষকে দেখলেন না! নাকি চোখ কপালে তুলে হাঁটার অভ্যাস?"

গজগজ করতে করতে সে সরে গেল। ছেলেটি খানিকটা বোকা বনেই তার চলে যাওয়ার পথের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।

আকদ সম্পন্ন হলো। এখন বর-কনের মুখ দেখাদেখির পালা। স্নেহাকে নিয়ে সবাই ড্রয়িং রুমে আসে। তাকে তানভীরের পাশে বসানো হয়। হাসিমুখে দু’জন পরস্পরের মুখ দেখে। মুহূর্তটি সযত্নে ক্যামেরায় বন্দি করতে শুরু হয় ছবির পর ছবি।

ঠিক তখনই সোহার দিকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল এক অচেনা মেয়ে, অতি সুন্দরী, প্রাণচঞ্চল, সাবার বয়সী। আচমকা এই উচ্ছ্বসিত আলিঙ্গনে সোহা বিস্ময়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। সাবাও বিস্মিত, বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটি বলল—

-"তুমি তো দারুণ সুন্দর! আমি দাদাভাইকে কতবার বলেছি তোমার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে, কিন্তু সে শোনেইনি!"

সোহা স্তব্ধ। কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় ওরহান, সঙ্গে একটি অপরিচিত ছেলে।ওরহান হেসে বলল—

-"সরি, আসলে আমার ছোট বোন তোমাকে দেখার জন্য খুবই এক্সাইটেড ছিল। শিফা, এদিকে আয়।"

শিফা সোহার হাত ছেড়ে দাঁড়ায়। মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলে—

-"কেমন আছো তুমি? আমি শিফা। তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।"

তার চঞ্চলতা বলছে, সে সহজেই মনের কথা বলে ফেলে। সোহা মৃদু হেসে উত্তর দেয়—

-"ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?"

-"তোমাকে দেখে এখন আরো ভালো লাগছে।"

এই মুহূর্তে সাবা ওরহানকে দেখে চমকে ওঠে—

-"আরে আপনি এখানে!?"

-"তুমি?! এখানে কিভাবে?"

-"আমি আপুর সঙ্গে এসেছি। স্নেহা আপু আমার আপুর বান্ধবী।"

-"আচ্ছা! আমি তানভীরের বন্ধু, তাই বরপক্ষ।"

সোহা একপাশে দাঁড়িয়ে বিস্ময়চিহ্ন হয়ে রইলো। সাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো—

-"তুই চিনিস একে?"

সাবা হেসে ফেলে, খিলখিল করে বলল—

-"এই যে বাবার সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল না? ওই ছেলেটাই! এত সুন্দর দেখতে যে এখনো চোখে লেগে আছে তার মুখ!"

হাসির রোল পড়ে চারপাশে। ওরহান ও হাসে। তারপর একে একে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।যেই ছেলেটির সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল, সে হলো ওরহানের ভাই, ওসমান। সাবা তো তাকে চোখ দিয়েই যেন ছাই করে দিচ্ছে। ওসমানও কিছুটা কুণ্ঠিত হয়ে বারবার তাকাচ্ছে আর ইশারায় ‘সরি’ বলছে। কিন্তু সাবা নাছোড়বান্দা। প্রতিবারই তার চোখে যেন বিদ্যুৎ ঝরছে!

.

.

.

স্নেহার বিয়ের একমাস পেরিয়ে গেছে। হালকা হালকা শীতের পরশ পড়েছে শহরের বাতাসে। এমন সময়েই ঘোষিত হলো একটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন কম্পিটিশনের আয়োজন। সোহা বেশ কিছু দিন ধরেই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। নিজের হাতে তৈরি করেছে একাধিক পোশাক। তার মধ্যে কিছু ড্রেস প্রতিযোগিতার আয়োজকদের কাছেও পাঠিয়ে দিয়েছে আগেভাগেই। কালই চূড়ান্ত দিন, ফাইনাল কম্পিটিশন।

রাত তখন প্রায় তিনটা। সোহা বসে আছে তার সৃষ্টিশীলতা আর মেধার এক নিখুঁত ক্যানভাসে। মাস্টারপিস ড্রেসের শেষ সূতোটাও যেন নিখুঁতভাবে পরিপাটি করে গাঁথা চাই। পাশে বসে ছোট বোন সাবা তার বড় বোনের মগ্নতা আর নিষ্ঠার সাক্ষী হয়ে তাকিয়ে আছে। এ এক পরিপূর্ণতা তৈরির সন্ধিক্ষণ। আজানের কিছু আগে সোহা নিজের কাজ শেষ করে নামাজ আদায় করল। তারপর শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল।

কম্পিটিশন সন্ধ্যায়, কিন্তু সকাল সকালই হাজির হলো স্নেহা। সোহা, স্নেহা আর সাবা—আজ একসাথে যাবে সেই স্বপ্নের লক্ষ্যে। ওরহান আর তানভীর জানলেও আজ কেউ আসতে পারবে না, কে জানে কীসের এত ব্যস্ততা!

আজ সোহা পরেছে একটি সাধারণ অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ সুতি শাড়ি। ওরহানের অপছন্দের বিপরীতে, শাড়িতে সোহাকে দারুণ লাগে, সে কথা একাধিকবার ওরহান নিজেই বলেছে। সেই কথা মাথায় রেখেই সোহা এখন বিশেষ দিনে প্রায়ই শাড়ি পরে। এই প্রতিযোগিতা যদি জিতে, তাহলেই সোহার সামনে খুলে যাবে নতুন এক দিগন্ত, ফ্রান্সের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ।

কম্পিটিশনটির আয়োজক ভেলভেট ব্লুম কোম্পানি, যারা দেশ-বিদেশের উদীয়মান ডিজাইনারদের নিয়ে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিভার আসল মূল্য দেওয়া হবে। যাদের মেধা আছে কিন্তু সুযোগ নেই, এই উদ্যোগ তাদের জন্যই। সোহা তাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে চেয়েছে শাড়ির মধ্য দিয়ে। স্নেহা ও সাবাও একাত্মতা প্রকাশ করে আজ শাড়িই পরেছে। তিন বোন বেছে নিয়েছে বাংলার শিকড়কে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি।

সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ তারা পৌঁছায় প্রতিযোগিতার স্থানে। সেটি ছিল একটি ইনডোর হোল, যেখানে উপস্থিত কেবল প্রতিযোগী, বিচারক ও মিডিয়ার মানুষ। প্রতিটি অংশগ্রহণকারী ড্রেস নিয়ে ব্যস্ত। কেউ শেষবারের মতো ভাঁজ ঠিক করছে, কেউ রঙের মেলবন্ধন পরীক্ষা করছে। বিচারকদের সামনে একে একে ডাকা হচ্ছে অংশগ্রহণকারীদের।

চারজন বিচক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারক বসে আছেন। সবার পোশাক যাচাই করছেন, বিশ্লেষণ করছেন কাপড়, কাটিং, থিম ও উপস্থাপন। হঠাৎই শোনা গেল—

"মিস তেহজিব চৌধুরী, আপনার ড্রেস নিয়ে মঞ্চে আসুন।"

সবাই ঘুরে তাকালো। অসম্ভব রূপসী এক তরুণী মঞ্চে উঠলো। তার ড্রেস ঢেকে রাখা সাদা কাপড়ের নিচে লুকিয়ে আছে যেন এক রহস্যময় শিল্পকর্ম। তার উপস্থিতি মুহূর্তেই আলোড়ন তুললো। এরপর ডাক এলো—

"মিস নেসলিহান সোহা শেখ, আপনার ড্রেস নিয়ে মঞ্চে আসুন।"

সোহা ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠল। তার সঙ্গে থাকা মানিকুইনে পরানো শাড়িটি যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। প্রতিটি রঙ, প্রতিটি বুননে উঠে এসেছে বাঙালির চেতনাধারা। লাল সবুজের ছোঁয়া, জামদানির সূক্ষ্মতা, নকশিকাঁথার গল্প, সব মিলিয়ে এটি যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।

সোহা সাবলীল ভাষায় তার সৃষ্ট ড্রেসের প্রতিটি দিক তুলে ধরল—কোন অঞ্চল থেকে অনুপ্রেরণা, কাপড়ের গঠন, রঙের মনস্তত্ত্ব, এবং সর্বোপরি বাঙালি নারীর আত্মপরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস। বিচারকরা গভীর মনোযোগে শুনলেন, কেউ কেউ নোট নিচ্ছেন, কেউবা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন সোহার শিল্পবোধে।

অবশেষে এলো সেই মুহূর্ত, বিজয়ী ঘোষণার সময়। সব অংশগ্রহণকারীকে একসাথে মঞ্চে দাঁড় করানো হলো। বাতাসে চাপা উত্তেজনা। সবার চোখ বিচারকদের দিকে। "মিস আফসারা রুমি, আপনি ৩০ নম্বর পেয়েছেন। আমাদের এই প্রতিযোগিতায় আপনি তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন। আপনাকে অভিনন্দন।"

"মিস তেহজিব চৌধুরী, আপনি পেয়েছেন ৩৫ নম্বর। দ্বিতীয় স্থান আপনার। অনেক ধন্যবাদ আপনার চমৎকার উপস্থাপনার জন্য।" "এবং সর্বশেষ—মিস নেসলিহান সোহা শেখ। আপনি পূর্ণ ৪০ নম্বর পেয়ে এই বছরের 'ভেলভেট ব্লুম ফ্যাশন স্কলারশিপ' এর বিজয়ী হয়েছেন। অভিনন্দন!"

মঞ্চ জুড়ে মুহূর্তেই উল্লাস। স্নেহা আর সাবা চিৎকার করে কেঁদে ফেলল আনন্দে। বিচারকরা হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানালেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে সোহার চোখ ঝলসে গেলেও মুখে ফুটে উঠল এক চাপা প্রশান্তির হাসি।

রাত প্রায় বারোটা। সবাই ব্যস্ত নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেবার প্রস্তুতিতে। সোহা, স্নেহা ও সাবা বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। সোহা ভিতরে ভিতরে ভীষণ খুশি, কিন্তু তার স্বভাবই এমন, সব অনুভূতি চুপিচুপি হৃদয়ে জমিয়ে রাখে। রাস্তার ধারে হঠাৎই একদল মানুষ জমায়েত। কান পাতলে শোনা যায় উদ্বিগ্ন কণ্ঠ—

"ইশ, কি ফুটফুটে মেয়েটা ছিল! নিশ্চয় প্রেমঘটিত কিছু ছিল... তাই এই সিদ্ধান্ত?"

"বাঁচবে কিনা কে জানে! সময় মতো হাসপাতালে নিলে হয়তো..."

তারা তিনজন এগিয়ে গিয়েও আর এগোলো না। রাতে অচেনা কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া বিপজ্জনক হতে পারে, এই ভয়েই স্নেহা সোহাকে থামিয়ে দেয়। তারা ফিরে আসে। বিজয়ের আনন্দে ভরপুর, আবার কোথাও যেন এক অজানা শঙ্কাও দোলা দেয় মনে।শীতের হালকা বাতাসে সেই রাতটা দীর্ঘতর হয়ে যায়।

.

.

.

কম্পিটিশনের পর কেটে গেছে পনেরোটি দিন। মাঝারিভাবে শীতের আগমন ঘটেছে শহরে, তবে আজকের বিকেলটি একটু ব্যতিক্রম। চারপাশে একরকম ধূসরতা ছেয়ে আছে, যেন আকাশও আজ এক নতুন খবরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। মেঘলা আকাশ, হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় কুয়াশা না থাকলেও বাতাসে একটা স্নিগ্ধতা জেগে উঠেছে।

এই বিকেলেই সোহা পেল তার জীবনের অন্যতম বড় সুখবর। দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে, অবশেষে, সফলতা তার কণ্ঠে উচ্চারিত এক শব্দ হয়ে ধ্বনিত হলো। ফ্রান্সের ভিসা হাতে এসেছে আজ। সমস্ত স্কলারশিপের কাগজপত্র আগেই বুঝে পেয়েছিল সে, আজ তার স্বপ্ন সত্যিকার অর্থেই রূপ পেয়েছে। আল্লাহ আজ মুখ তুলে চেয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই খবরটা জানতে পারে সোহা। সে অভিভূত, বাকরুদ্ধ। চোখের কোণ ছুঁয়ে যায় এক পশলা আনন্দবিন্দু। আর স্নেহা? সে তো আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। একরকম সোহার দুই হাত ধরে ক্যাম্পাসের ভেতরেই ঘূর্ণি নৃত্যে মেতে ওঠে। পাতা ঝরা গাছের নিচে ঘূর্ণায়মান সেই দুই বোন যেন মুহূর্তের জন্য বাতাসে ভেসে ওঠে।

সুখের মুহূর্তে মিষ্টিমুখ না হলে চলে? সোহা আর স্নেহা হাতে হাত ধরে ছুটে যায় ক্যাফেটেরিয়ার দিকে। কেক আর মোজো, এই দুই মিষ্টি জিনিস আজ তাদের উদযাপনের সাক্ষী হবে। সোহা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, আর স্নেহা ভেতরে ঢুকে কিনে নিয়ে আসে খাবারগুলো।

কিন্তু আনন্দের মুহূর্ত চিরকাল স্থায়ী হয় না। সুখের দিগন্তে হঠাৎই জমে ওঠে এক বিপন্ন মেঘ।

ঠিক তখনই, কয়েকজন মেয়ে এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে। তাদের চোখে ছিল অদ্ভুত আগ্রহ, ঠোঁটে চাপা বিদ্বেষের রেখা। সেইসব মুখের ভিড় থেকে এক মেয়ে এগিয়ে আসে। না কোনো কথা, না কোনো ইঙ্গিত, হঠাৎই সোহার গালে সজোরে পড়ে এক চড়।

ঝাপটায় সোহার মুখটা বামদিকে ঘুরে যায়। ডান গালে তীব্র লাল দাগ পড়ে যায়, মুহূর্তেই শ্যামলা মুখশ্রী লালাভ বর্ণ ধারণ করে। নীরব বিকেল যেন এক মুহূর্তে থমকে যায়। বাতাস থেমে যায়, চারপাশের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

স্নেহা হতবাক! তার হাতে থাকা কেক আর মোজো মাটিতে পড়ে গিয়ে গুঁড়িয়ে যায়। সে মুহূর্তেই দৌড়ে এসে সোহাকে নিজের বুকে টেনে নেয়। স্নেহার চোখে তখন আগুন, ঠোঁটে কাঁপা কাঁপা শব্দ। সামনে দাঁড়ানো সেই মেয়েগুলোর দিকে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে। স্নেহা হতবাক! সে মুহূর্তেই সোহার সামনে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠল—

-"সাহস হলো কিভাবে ওর গায়ে হাত তোলার? কে দিয়েছে আপনাকে এই অধিকার?"

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মেয়েটি কাঁটা গলায় উত্তর দিল—

-"এই লিজা কারো অধিকার দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে না।"

তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।স্নেহা ধ্বস্ত হয়ে উঠল—

-"কেন মারলেন ওকে?"

লিজার চোখ জ্বলে উঠল। কণ্ঠে তীব্র বিষ ঢেলে সে বলে উঠল—

-"তোমার ওই সো-কোল্ড বান্ধবীটা আমার ওরহানকে নিয়ে ঘোরাফেরা করছে কেন এইটা জিজ্ঞেস করো! পুরো ভার্সিটি জানে ওরহান আমার বয়ফ্রেন্ড। তাহলে এই মেয়ে কোন সাহসে তার পেছনে ঘোরে? আনসার মি!"

লিজার গর্জনে মুহূর্তেই থমকে যায় চারপাশ। সোহা স্তব্ধ, মুখটা লাল হয়ে আছে আগের চড়ের দাগে, আর অন্তরে দাউদাউ করে জ্বলছে অপমানের আগুন। স্নেহা রীতিমতো হতভম্ব। অবিশ্বাসের সুরে সে বলে ওঠে—

-"কি! সোহা ঘোরে ওরহানের পিছে? আপনি আগে নিজের বয়ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞেস করুন। সত্যিটা জানুন তারপর অন্য কাউকে দোষারোপ করবেন।"

স্নেহার কথা শেষ হওয়ার আগেই সোহা তার কাঁধে হাত রেখে থামিয়ে দিল। ধীরে ধীরে নিজে এগিয়ে এল। চোখদুটো ছিল শান্ত, অথচ শীতলভাবে কঠিন।

-"ওরহান আপনার বয়ফ্রেন্ড?"

সোজা প্রশ্ন।

-"হ্যাঁ!"

লিজার উত্তর দ্রুত, রাগে কাঁপা।

সোহা ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল—

-"আপনার বয়ফ্রেন্ড হয়ে সে যদি অন্য মেয়ের পেছনে ঘুরে, তাহলে আপনি তাকে না বলে আমাকে কেন বলতে এলেন?"

লিজা এবার উত্তেজনায় থরথর করে উঠল—

-"তুই সুযোগ না দিলে তো আর তোর পেছনে ঘুরতো না!"

সোহা এবার কপাল উঁচু করে, একদম চোখে চোখ রেখে বলে উঠল—

-"আমি কখনো ওকে বলিনি আমার পেছনে ঘুরতে। সে নিজেই ঘুরেছে। আর আমি তাকে বার বার প্রত্যাখান করেছি। আর আপনি যাকে নিজের বলছেন, তার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের কোন প্রমাণ আছে?"

লিজা হেঁচিয়ে উঠল—

-"তুই কে তোর মতো থার্ড ক্লাস মেয়েকে প্রমাণ দেখাবো? আমার এত নিচে নামার দরকার নেই!"

সোহার গলায় এবার এক নির্মম ধৈর্যের ধার—

-"ভদ্রভাবে কথা বলুন।"

-"ভদ্রতা?" লিজা হেসে উঠল। কাঁটায় কাঁটায় তার কণ্ঠ—

-"এই মেয়েও এখন ভদ্রতা শেখায়! আয়নায় নিজেকে কখনো দেখেছিস? কালো, ক্ষেত মার্কা, ভূতের মতো একটা মেয়ে, তোর সাহস হয় কী করে ওরহানের পাশে দাঁড়াবার?"

সোহার গলা শান্ত, তবু ছুরির মত ধারালো—

-"আমার রূপ কেমন তা তো সবার সামনেই আছে। আমি অন্তত মেকআপের পুরু আস্তরণে নিজেকে ঢেকে মিথ্যা সৌন্দর্যের দাবি করি না। আর আপনার অভিযোগ থাকলে ওরহানকে গিয়ে বলুন। এখানে এসে আমাকে দোষারোপ করার মানে কী?"

ততক্ষণে চারপাশে অনেকেই দাঁড়িয়ে গেছে। ক্যাম্পাসে বিকেলটা ক্রমেই ঘন হয়ে আসছে। গুমোট মেঘ জমে উঠছে আকাশে, আর তার নিচে জমছে অপমান আর উত্তেজনার অদৃশ্য ঝড়।

লিজা আরেক পা এগিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল—

-"তোকেই তো প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতে এসেছি। ওরহান আমাকে ভালোবাসে, তোকে না! তোর হোয়াটসঅ্যাপে একটা ভিডিও পাঠিয়েছি, ওটাই প্রমাণ। ওরহান নিজের বদলা নিয়ে নিয়েছে। নেক্সট টাইম যদি ওর আশেপাশে তোকে দেখি, আমি কী করতে পারি, নিজেই দেখবি।"

এই বলে সে হাত নেড়ে নিজের দলবলকে ইঙ্গিত দিল। গম্ভীর মুখে তারা সবাই ফিরে যেতে লাগল। সোহা দাঁড়িয়ে রইলো নিশ্চল। চোখে বিস্ময়। ঠোঁটে কাঁপুনি। অন্তরের ভিতর কোথাও যেন একটা বেলুন ফেটে গেলো, ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে হতাশার ধোঁয়া।

"বদলা...? ওরহান...? আমি... কিছুই বুঝতে পারছি না..."

সে কাঁপা হাতে ফোন বের করল। হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করে ভিডিওটি প্লে করল। ভিডিও চলতে শুরু করল। ভিডিওর স্ক্রিনে ভেসে উঠল ভার্সিটির বটতলা। তাতে বসে আছে পরিচিত মুখ—ওরহান, তানভীর, সিয়াম, নিশাত, রিয়া। কেউ জানত না, সেই নির্জন কোণের কথোপকথন একদিন এইভাবে তলোয়ার হয়ে ফিরে আসবে। রিয়া তখন জিজ্ঞেস করছিল—

-"তুই মেয়েটার সাথে এতদিন ধরে প্রেমের নাটক করছিস কেন?"

ওরহান গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠল, স্বরটায় ছিল চাপা অভিমান—

-"সেদিন যে থাপ্পড়টা খেলাম, সেই লোকের মেয়ে সোহা। বিনা দোষে আমাকে মেরে অপমান করেছে। আমার চরিত্রে প্রশ্ন তুলেছে। আমি চুপ করে থাকবো? নাহ!"

তানভীর পাশে বসে ছিল, মুখে ক্লান্তি আর কপালে চিন্তার ভাঁজ। ধীরে গলা তুলে বলল—

-"সোহা অসম্ভব ভালো মেয়ে। দোস্ত, এই অন্যায়টা ওর সাথে করা উচিত না। যদি সত্যিই তুই ওকে ভালো না বাসিস, তাহলে এখানেই থাম। সোহা এই ধাক্কা সহ্য করতে পারবে না। ভেঙে পড়বে সে।"

ওরহান ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিল—

-"তার বাবাকে তো অপমান করিনি। আমাকে জনসম্মুখে অপমান করেছিল। আমি তো কিছুই করলাম না এখনো।"

তানভীর আবারও চেপে রাখা ক্ষোভে প্রশ্ন করল—

-"তাহলে? প্ল্যানটা কী ছিল ঠিক?"

ওরহানের ঠোঁট বাঁকা হেসে বলল—

-"সেদিন বিদায় অনুষ্ঠানে আমি ওকে দিয়ে কাবিননামায় সই করিয়ে নিয়েছি।"

ভিডিওটা হঠাৎই থেমে গেল। শব্দ থেমে গেল, আলো নিভে গেল, চারপাশ নিস্তব্ধ। সোহা নিজের হাতে ধরা ফোনটা শক্ত করে ধরল। আঙুলের জোরে যেন ফেটে যেতে চাইছে স্ক্রিন। মুখটা মৃতপ্রায় নিস্তব্ধ, চোখে বিস্ময় আর অভিশপ্ত কুয়াশা। কণ্ঠ নিঃশব্দ, বুকটা উঠানামা করছে অস্বাভাবিক গতিতে।

স্নেহা হতভম্ব, কিছু বলতে চেয়েও যেন মুখে শব্দ আসে না। তাদের দুজনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। এত বড় প্রতারণা? এত নির্মম ধোঁকা?

একটি মেয়ের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার সমস্ত বিশ্বাস, সম্মান, ভালোবাসাকে এক নিমিষে ছলনায় রূপান্তর করা হয়েছে! অন্যায় করেছিল বাবা, শাস্তি পেল মেয়ে!

না, না... না!

সোহা আর কিছুই ভাবতে পারল না। চোখের জলে নয়, বরং চুপচাপ নিঃশ্বাসে বিষ ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে। সে এক দৌঁড়ে বেরিয়ে পড়ল ক্যাফেটেরিয়ার ভেতর থেকে। ছুটে যাচ্ছে অন্ধকার গলির দিকে, যেন নিজেকে আড়াল করতে চায় সমস্ত পৃথিবী থেকে।

পেছন পেছন ছুটে এল স্নেহা—

-"সোহা! দাঁড়া! প্লিজ... শুন!"

কিন্তু সোহা আর কারো কথা শুনছে না। হৃদয়ের ভিতর এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। প্রতিশোধের নামে তার জীবনের পবিত্র সম্পর্কটি আজ কলঙ্কে ঢেকে গেছে।

সন্ধ্যার আকাশটা তখন কালো মেঘে ভরে আছে। একটা হালকা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেন মাটি ছুঁয়ে কাঁদছে আকাশও। আর সেই বাতাসে উড়ে যাচ্ছে সোহার শাড়ির আঁচল, তার ভাঙা বিশ্বাসের মতন।

.

.

.

মকবুল সাহেব আজ শেখ বাড়িতে এসেছেন। সঙ্গে ছিলেন পাড়ার কিছু গণ্যমান্য মুরুব্বি। সবাই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাইফুল শেখ দরজা খুলে তাঁদের ভেতরে আসতে বললেও, মকবুল সাহেব বললেন—

– "না শেখ সাহেব, আজ দরজার ভেতরে নয়, এখানেই কথা হবে!"

তার কণ্ঠে ছিল তীব্র কটাক্ষ আর চোখে অপমানের আগুন।

–"আপনার মেয়েকে নিয়ে তো অনেক গর্ব ছিল আপনার! আমাদের সন্তানদের সামান্য ভুলেও আপনি তাঁদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতেন না। অথচ শেষে আপনি নিজেই আপনার অসুন্দর, কালো মেয়েকে এক বড়লোক ছেলের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছেন?"

সাইফুল শেখ ক্ষোভে গর্জে উঠলেন—

–"মকবুল সাহেব! মুখ সামলে কথা বলুন। এটা আমার পরিবারের ব্যাপার।"

–"আর কত সামলে বলব? এতদিন তো আপনি এলাকায় মুরুব্বি সেজে ভাষণ দিয়েছেন। এবার নিজের মেয়ের কীর্তি দেখে নিন! আপনার মেয়ে যে ভার্সিটিতে কেমন রঙ্গ-রসিকতা করছে, সেটাই দেখাতে এসেছি।"

এই বলে মকবুল সাহেব কিছু ছবি বাড়িয়ে দিলেন তাঁর হাতে। ছবিগুলোতে দেখা যায়, বিদায় অনুষ্ঠানের পরের দিন গুলো, ওরহান একাধিকবার সোহাকে ফুল দিচ্ছে, প্রোপোজ করছে। আর সোহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্যগুলোর পেছনে যে কাহিনি আছে, সেটা না জেনেই পুরো ব্যাপারটিকে বদনামের রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ছবিগুলো মকবুল সাহেব পেয়েছেন তাঁর ছেলের মাধ্যমে, একদিন ভার্সিটিতে এই দৃশ্য দেখে সে বাবাকে জানায়। তারপর থেকেই গোপনে নজরদারি চলেছে।

এখন সেই ভুল ব্যাখ্যা করা ছবিগুলোকে অস্ত্র বানিয়ে মকবুল সাহেব ও তাঁর দলবল সাইফুল শেখকে সামাজিকভাবে ছোট করে গেলেন। সাইফুল শেখ স্তব্ধ হয়ে যান। চোখের সামনে যেন পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। ভেতর থেকে নিলুফার বেগম ও সাবা সব শুনছেন। একটা শীতল ভয় যেন ঘিরে ধরেছে তাদের বুক। যেন কোন এক অজানা ঝড় এগিয়ে আসছে, যা ভেঙে দিতে পারে পুরো সংসার।

অবশেষে অপমানের ঝড় তুলে মকবুল সাহেব ও মুরুব্বিরা ফিরে যান। সাইফুল শেখ ঘরে ফিরে চুপচাপ বসে থাকেন। চোখে অভিমান, হৃদয়ে ক্ষোভ। মুখে একটিও কথা নেই। বাড়ির বাতাসটা যেন এক নিমিষে ভারী হয়ে উঠল। মুকবুল সাহেবের অপমানজনক কথাগুলো কানে ধাক্কা মারছে বারবার। যেন প্রতিটা শব্দ আগুন হয়ে ঝলসে দিচ্ছে আত্মসম্মান।

"আপনার মেয়ে তো মনে হয় নিজের সীমা ভুলে গেছে। কালো বলে কি কেউ চরিত্রের দায় থেকে মুক্তি পায়?"

"যে মেয়ের গায়ে রং নাই, চেহারায় আকর্ষণ নাই, সেই আবার প্রেম করছে বড়লোক পোলা দিয়া? আহা রে, স্বপ্ন দেখলে দেখতে হয় নিজের অবস্থান বুঝে!"

এই মেয়েই তো, যার নাম মুখে আনলে আপনি গর্বে ফুলে উঠতেন, আজ তাকেই তো এলাকায় নিয়ে লোকজন হাসাহাসি করছে!"

Story Cover