ফিরে দেখা

পর্ব - ১৩

🟢

আকাশে এখনো সূর্যের দেখা মেলেনি। চারদিক ঘিরে অদ্ভুত এক আঁধার নেমে আছে, যেন দিগন্তজোড়া নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে শহরের বুক জুড়ে। আযানের সময় প্রায় সমাগত। হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে মসজিদের মাইক ভেদ করে ভেসে এলো আযানের মিষ্টি মধুর সুর, আলোর আহ্বানে ঘুমন্ত শহরকে ডেকে তুলছে।

সোহা সেই ধ্বনির স্পর্শে ধীর গতিতে উঠে বসল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে থেকে চোখ বন্ধ করে ধরা দিল নিঃশ্বাসের ছন্দে। তারপর পাশ ফিরে সাবাকে ডেকে তুললো। ফ্রেশ হয়ে দুই বোন একসাথে দাঁড়িয়ে গেল ফজরের নামাজে। নামাজ শেষে সাবা আবারও ফিরে গেল ঘুমের রাজ্যে, যেন ভোরের আলো তার চোখ ছুঁতে না পারে।

কিন্তু সোহা আর শুতে গেল না। মনটাও যেন ঠিক ঘুমঘোরে নেই। আস্তে ধীরে দরজা ঠেলে বের হয়ে গেল রান্নাঘরে। চুপচাপ চা বসালো। নিজের জন্য এক কাপ চা বানিয়ে বাকিটা ঢেলে নিলো ফ্ল্যাক্সে। এরপর নিঃশব্দে সিঁড়ি ভেঙে উঠে এলো ছাদে, তার প্রতিদিনকার সকাল শুরু হয় এখানেই।

ছাদের চারপাশে শোভা পাচ্ছে নানা জাতের ফুল আর সবজির টব। যেন ছোটো এক বাগান রাজ্য—সোহার গড়া। ফুলের গন্ধে ভোর আরও মধুর লাগে তার কাছে। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, পায়ে চপ্পল নেই, নরম ভেজা বাতাসে খালি পায়ে হাঁটছে ছাদের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

আজ, এই ঘুমচোখা সকালে হঠাৎ করে ওরহানের কথা মনে পড়ছে বারবার। যেদিন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল, তার পর থেকে বহুবার চেষ্টা করেছে সে যোগাযোগ করতে। কিন্তু সোহা প্রতিবারই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। স্পষ্ট প্রত্যাখান।

একদিন তো ওরহান সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। সেদিন লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে বেরোতেই, হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এলো এক ঝাঁক লাল গোলাপের পাপড়ি, নীরব বিস্ময়ে মাথা জুড়ে নেমে এলো সেই আবেগের ঝড়। সোহা হতভম্ব। ভয় আর লজ্জায় হাতের বইগুলো নিচে পড়ে গেল।

দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ওরহান ও তার বন্ধুরা, নির্বাক দর্শক, এই নাটকের গোপন নির্দেশকরা। সোহার চোখে ভয় বুঝে ছুটে এসেছিল ওরহান। মাটি থেকে বইগুলো তুলে হাতে দিয়ে বলেছিল—

-"সরি... সরি... আমি আপনাকে ভয় দেখাতে চাইনি। সত্যি বলছি, ইচ্ছে করে কিছু করিনি।"

ওরহানের কণ্ঠে ছিল অপরাধবোধে মিশে থাকা একরাশ ভয়।

সোহা শান্ত গলায় বলল—

-"আমি বুঝেছি... আপনি ইচ্ছা করে করেননি। তবে আচমকা হওয়াতে ভয় পেয়েছিলাম।"

-"সরি!"

-"আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম, আমার সাথে এমন কিছু করবেন না। মানুষ খারাপ বলবে... সমাজ আঙুল তুলবে... আপনি দয়া করে দূরে থাকুন আমার থেকে। আর যদি সত্যিই ভালোবাসেন, যদি এই অনুভবটা মনের গভীর থেকে আসে... তাহলে আমার বাবার কাছে যান। তাঁকেই বলুন।"

এই ক’টি কথা যেন এক টানেই বলে ফেলল সোহা। চোখে মুখে দৃঢ়তা, কিন্তু কণ্ঠে চাপা কাঁপুনি। কথা শেষ করে কোনো উত্তর না শুনেই হাঁটতে শুরু করল। পেছনে রেখে গেল এক নির্বাক ওরহানকে। সে দাঁড়িয়ে ছিল নিস্তব্ধতার মূর্ত প্রতীক হয়ে। যেন বাতাসও হঠাৎ থমকে গেছে।

সোহা জানে, সে হয়তো কিছুটা বেশি বলেছে। হয়তো এভাবে না বললেও চলতো। কিন্তু উপায় ছিল না। তার বাবা যদি এসব জানতে পারেন, তাহলে সে আর এই শহরে টিকতে পারবে না।

তবুও, ওরহানের ছোট ছোট চেষ্টাগুলো যেন অজান্তেই মনের মাটিতে ভালোবাসার বীজ বুনে দিয়েছে। এই এক মাসে ওরহানের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি চাওয়া, প্রতিটি উপস্থিতি সোহার হৃদয়ে একেকটি স্থায়ী দাগ কেটেছে। কেউ কখনও তার জন্য এমন পাগলামি করেনি—কেউ না।

এই প্রথম কোনো পুরুষ এমন উন্মাদ ভালোবাসা নিয়ে তার জীবনে এসেছে। আর সোহাও অজান্তেই সেই উন্মাদনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ওরহানের গায়ের সুগন্ধ... তার আচমকা এসে পাশে দাঁড়ানো... নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকা, সবকিছু যেন এক অদ্ভুত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সোহার কাছে।

চিন্তাগুলো তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সে ছাদের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে হাঁটছিল চুপচাপ। হঠাৎ কী এক অজানা অনুভূতিতে থমকে দাঁড়াল। সামনের দিকে চোখ পড়তেই তার মুখ পলকে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চায়ের কাপটা যেন হাত ফসকে মাটি ছুঁয়ে শব্দ করে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সোহার কণ্ঠে চাপা কাঁপুনি, নিঃশ্বাস ভারী—

-"আপনি... আপনি এখানে কী করছেন?"

সোহার গলায় কাঁপন। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেছে তার। হাত থেকে পড়ে যাওয়া কাপের টুকরোয় চা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে, কিন্তু সে দৃষ্টি রাখছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখে—ওরহান।

ওরহান দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। পরনে কালো শার্ট আর ডেনিম জিন্স। তার ফর্সা গায়ে কালোর ছায়া যেন দুর্বার আকর্ষণ তৈরি করেছে। কিন্তু আজ তার চোখ দুটো লাল, ঘুমহীন, ক্লান্ত, অথচ তীব্র। চুলগুলো এলোমেলো, গায়ে অগোছালো ভাব। তবু একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা আর প্রেম মিশে যেন তাকে আরও বেশি করে অনিন্দ্য করে তুলেছে। ওরহানের দৃষ্টি... তীক্ষ্ণ, লোভনীয়। যেন সোহাকে এক মুহূর্তেই গিলে ফেলবে।

ধীরে ধীরে ওরহান এগিয়ে আসে। ছাদের রেলিংয়ের সামনে এসে দুই পাশে দুই হাত রেখে সোহাকে রুদ্ধ করে ফেলে। আর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস টেনে চাপা কণ্ঠে হিশহিশে বলে ওঠে—

-"সারাটা রাত ফোন করেছি, তুমি ধরোনি।

সারাটা রাত বারবার মেসেজ করেছি কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। সারাটা রাত আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম তোমার বাড়ির সামনে একবার শুধু একবার যদি দেখা দিতে। একবার যদি এসে বলতে—‘ওরহান, ফিরে যান’, তবু বুঝতাম তুমি এখনও রাগ করো।

কিন্তু তুমি... তুমি কিছুই করোনি। কেন?"

সোহার শ্বাস রুদ্ধ হতে থাকে। এত কাছে ওরহানকে পেয়ে, এত গভীর অনুভবের মুখোমুখি হয়ে সে কিছুটা অপ্রস্তুত। চোখ নামিয়ে মিনমিন করে বলে ওঠে—

-"কি বলছেন এসব আপনি?"

-"তোমার ফোন কোথায়?" কণ্ঠে বিরক্তি না, বরং হতাশার ছায়া।

-"ঘরেই আছে কোথাও... আমি গত রাত থেকে ফোন হাতে নেইনি তো!"

ওরহান এবার কিছুই বলে না। কেবল কিছু মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সব গুছিয়ে নিতে চাইছে নিজের ভেতরে। তারপর ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরে যায়। হাঁটতে শুরু করে সিঁড়ির দিকে।

সোহা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, কেবল তাকিয়ে থাকে তার পিছন দিকে হেঁটে যাওয়া ছায়ার দিকে।

অথচ, ঠিক সিঁড়ির মুখে পৌঁছে ওরহান হঠাৎ থেমে যায়।চোখ ফেরায় না, কেবল পেছন ফিরে না তাকিয়েই বলে—

-"আমি কি তোমাকে খুব বিরক্ত করি, সোহা? তাহলে থাক... আজকের পর থেকে আমি আর তোমার সামনে আসব না। তুমি মুক্ত।"

শব্দগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এবং সোহা অনুভব করে, ঠিক সেই মুহূর্তে, যেন বুকের ভেতরে কিছু একটা ধসে পড়ছে ধীরে ধীরে। সোহা একপলক দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে এসেছে। বুকের ভেতর অজানা কষ্টের ঢেউ দোলা দিচ্ছে। কিছু বলার আগেই, কিছু বোঝার আগেই, ওরহান চলে গেল। চলে গেল, এমন এক সুরে, যেন শেষ কথা বলে গেল চিরতরে।

সোহা তাজ্জব বনে গেছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এই সকাল সকাল ছাদে উপস্থিত হওয়া, সেই লাল চোখ, ক্লান্ত মুখ, এতোটা গভীর অভিমান! কেন?

তখনই মাথায় এসে আঘাত করল এক ঝটকা—

"সে তো বলছিল সারারাত ফোন করেছে... মেসেজ করেছে... আমি তো ফোন হাতে নেইনি!"

সে আর দেরি না করে দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। দম ফেলার সময় নেই। এক লাফে খাটের ওপর পড়ে থাকা নিজের ফোনটা হাতে তুলল। ফোনটি হাতে নিয়েই চোখ স্থির হয়ে গেল।

৪১২টি মিসড কল। ২৫৬টি মেসেজ।

প্রতিটা মেসেজ যেন আর্তনাদের মতো। পরপর স্ক্রিনে ভেসে উঠছে। আঙুল কাঁপছে। চোখ স্থির, স্ক্রিনের ওপর জমে থাকা সেই অসংখ্য মেসেজে। প্রথমে একটি, তারপর আরেকটি, তারপর গড়িয়ে এক এক করে শত শত। সবচেয়ে প্রথম যে মেসেজটি চোখে পড়ে, তাতে লেখা—

"নীলশ্যামা, আপনাকে কি একবার দেখতে পারি?"

এর উত্তরে কোনো সাড়া না পেয়ে, আরেকটি মেসেজ আসে—

"আছে বেশ, দেখা দিতে হবে না। একটিবার... শুধু একটিবার কি আপনার কণ্ঠ শুনতে পারি?"

তারপর নীরবতা।আর সেই নীরবতার দেয়ালে বারবার ধাক্কা দিতে থাকে ওরহানের ব্যাকুলতা। ৪১২ বার কল, ২৫৬ টি বার্তা। আর প্রতিটিই যেন একেকটি ব্যর্থ প্রেমপত্র, রক্তমাখা, নিঃশব্দ আর্তি।

"আমার সাথে আপনার কথা বলতে হবে না। একটু... শুধু একটু ফোনটা তুলুন। আপনি শুধু 'হ্যালো' বললেই হবে।"

"আপনার কণ্ঠ শোনার জন্য আমি তৃষ্ণার্ত প্রেয়সী।"

"প্লিজ... একটিবার কলটা তুলুন। আমি আর কিছু চাই না।"

সোহা তখনও কোনো উত্তর দেয়নি। ওরহান তবুও থামেনি। তার ভালোবাসা যেন অভিমানেও পিছু হটেনি, বরং আরও মরিয়া হয়েছে। শেষের দিকের মেসেজগুলো যেন আর প্রেমের ভাষায় নয়, এক আত্মার চিৎকারে রূপ নিয়েছে—

"আপনি যদি বারান্দায় না আসেন, আমি সারা রাত এখানেই থাকবো।"

"এতটা ঘৃণা করেন আমাকে? আমি কি এতটাই অপছন্দের?"

"আমি কি ভালোবাসার অযোগ্য?"

"আমাকে কি একটিবার ভালোবাসা যায় না?"

তারপর যেন প্রণয়ের শেষ প্রস্তাব—

"কথা দিচ্ছি, কোনোদিন আপনার চোখে অশ্রু আসতে দেব না। এই অধমকে একটিবার দেখা দিন!"

"আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি আপনার বিরহে।"

"একটিবার শুধু একটিবার আসুন, আপনাকে দেখেই আমি চলে যাব।"

"তুমি কোথায়, সোহা?"

"ঘুমিয়ে পড়েছো, তাই না? আমি অপেক্ষা করছি… এখনও!"

"দেখো, আমি নিচে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার বাড়ির আলো নিভে গেছে। তবুও দাঁড়িয়ে আছি।"

"আমি কখনো এত অপেক্ষা করিনি কারও জন্য!"

"তুমি কি জানো না আমি কতোটা পাগল হয়ে পড়েছি তোমার জন্য?"

"একবার শুধু বলো 'ওরহান, ফিরে যান' আমি চলে যাব।"

"তোমার নীরবতাই এখন আমার সবচেয়ে বড় শাস্তি।"

এরপর, যেন চরম আত্মবিসর্জনের প্রতিজ্ঞা—

"আপনার চোখে অশ্রু আসবে, কেবল আমার জন্য।

আর কোনো পুরুষের অধিকার থাকবে না সেই অশ্রুর ওপর।"

"একটু ভালোবাসুন না আমায়। আমি আপনার ভালোবাসার কাঙাল। একটু শুধু একটু ভালোবাসুন আমাকে।"

সবশেষে, যেন এক মৃত প্রেমিকের মতন অন্তিম স্বীকারোক্তি—

"কথা দিলাম সোহা, একদিন এই ওরহানের জন্য কাঁদবেন। আপনার চোখের জল ফুরিয়ে যাবে, তবুও কান্না থামবে না, এই ওরহানের জন্য।"

"চলে যাচ্ছি আমি, আর কখনও আপনাকে বিরক্ত করব না।"

স্ক্রিনের আলো নিভে যাচ্ছে, সোহার চোখে ঠিক সেই মুহূর্তে অশ্রু ঝরে পড়ে।

ভোরের আলোয় খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, সোহা নিজেকে জিজ্ঞেস করল—

-"এই ওরহানকে কি আমি সত্যিই হারাতে চাই?"

সর্বশেষ মেসেজটি এল ঠিক তখনই—

"পারি নি আমি চলে যেতে। এত মায়ায় কিভাবে পড়েছি আপনার? আমি মরে যাচ্ছি, সোহা। তোমাকে ভোলা সম্ভব না। আমি পারিনি চলে যেতে।"

সোহার বুকের ভেতর যেন একসাথে শত শব্দ বিস্ফোরিত হলো। সেই মেসেজের অক্ষরগুলো তার বুক চিরে নেমে গেল হৃদয়ের গভীরে।

তার চোখ ভরে উঠল জলে, তার ঠোঁট কাঁপল, তার সমস্ত জড়তা যেন গলে গেল এক মুহূর্তে। অঝোরে কাঁদতে লাগল সে। হাউমাউ করে নয়, নিঃশব্দে, যেভাবে একমাত্র সত্যিকারের ভালোবাসা কাঁদায়। এই মানুষটাকে আমি আর কতবার ফিরিয়ে দেব? কতবার বোঝাবো, কতটা বললে সে থামবে? কিন্তু এই মুহূর্তে সোহা জানে, সে আর পারছে না।

সে জানে, সে ভালোবাসে। অসম্ভব ভালোবাসে এই ছেলেটাকে, যে তার জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছে প্রতিটি নিঃশ্বাসে। হঠাৎই সে উঠে দাঁড়ালো। আর এক মুহূর্ত নয়।

দ্রুত পায়ে ছুটে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। নিচে ওরহান দাঁড়িয়ে আছে। ভেজা চোখ, ফ্যাকাশে মুখ, তবু যখন সোহাকে বারান্দায় দেখে, ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক নির্মল হাসি। একটা এমন হাসি, যা বহুদিন পর সোহা দেখে,

যা কান্নার ফাঁকেও মুগ্ধ করে।

সোহা তাকিয়ে থাকে অপলক, সেই চোখের দিকে, সেই হাসির দিকে, সেই মুখের দিকে, যেখানে এখন কেবল একটাই আকুতি, একটাই নাম, সোহা। এই মুখকে আর আঘাত করা তার পক্ষে সম্ভব না। আর না।

তার কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই, চোখে কেবল অশ্রু।

এই ভালোবাসার নীরব স্বীকৃতিই যেন পৌঁছে যায় ওরহানের হৃদয়ে। ততক্ষণ সোহা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ ওরহান নিচে।

স্নেহাকে সোহা আগেই মেসেজ করেছে। তানভীর এসে যেনো ওরহানকে নিয়ে যায়। একটু পর তানভীর এসে পড়ে। সোহা জানে, তানভীর ছাড়া ওরহান যাবে না।

ওরহানকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলছে তানভীর। ওরহান প্রতিরোধ করে না। তবে চোখ ফেরায় না। সোহাও তাকিয়ে থাকে, নির্বাক, নিঃশব্দ, নিঃস্ব। গাড়ি চলে যায়।

সোহা ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে আসে। কোনো শব্দ নেই চারপাশে। জন্মায় এক ধ্বনি, নিজেকে ভেঙে ফেলার ধ্বনি। সে ঢুকে যায় বাথরুমে। কল ছেড়ে দেয়। জলের শব্দে নিজের কান্নার ধ্বনি লুকিয়ে ফেলে।

অঝোরে কাঁদছে সে। যেন এই কান্না দিয়ে সমস্ত অপরাধবোধ ধুয়ে ফেলতে চায়। নিজেকে আয়নায় দেখে বলে—

-"আমি আর পারব না ওরহানকে আঘাত করতে, না, আর না। এইবার আমি বলব, স্পষ্ট করে বলব, আমি আপনাকে ভালোবাসি।"

কিন্তু এই ভালোবাসার শর্ত থাকবে। এই ভালোবাসা হবে আত্মমর্যাদার ভিত গড়ে। সে ওরহানকে বলবে পরিবার নিয়ে আসতে। ভালোবাসলেও সে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে পারবে না। সোহা জানে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসাকে প্রমাণ করতে হয়।

.

.

.

কেটে গেছে আরও কিছু দিন। আজ ওরহানদের বিদায় অনুষ্ঠান। পুরো ভার্সিটি সেজে উঠেছে এক উৎসবের আনন্দে। প্রতিটি ক্লাসের ছেলেমেয়েদের জন্য নির্ধারিত ছিল আলাদা ড্রেস কোড। সোহাদের জন্য ছিল নীল রঙের শাড়ি আর সাদা পাঞ্জাবি; ওরহানদের জন্য বরাদ্দ ছিল সাদা শাড়ি আর হলুদ পাঞ্জাবি।

কে এই রঙের ছক কষেছে, সোহা জানে না। তবে ওরহানের ছোঁয়া এতে যে রয়েছে, সেটা সে আর স্নেহা ঠিকই বুঝেছে। কারণ তাদের দুজনকে দেখে ঠিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের 'হিমু' আর 'রূপা' মনে হচ্ছিল।

সোহা এক কোণে স্নেহার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওরহান। আজ ওরহানের চোখে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা। সেখানে ছিল না কোনো তৃষ্ণা, ছিল না কোনো কামনা, ছিল নিখাদ ভালোবাসার অগ্নিপরীক্ষিত দীপ্তি। এমন মুগ্ধ চোখে কখনও তাকায়নি সে সোহার দিকে।

সোহা সেই দৃষ্টি এড়াতে পারছে না। অস্থির হয়ে উঠছে সে। অপ্রস্তুত অনুভব করছে নিজেকে। ঠিক তখনই রিয়া, ওরহানের এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, সাথে নিশাত, হাতে এক বেলি ফুলের গজরা নিয়ে এগিয়ে এল।

সোহার মুখে ছিল বিস্ময়ের রেখা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিয়া হালকা হাসিতে বলল—

-"তোমার চুল গুলো আজ যেন একটু খালি খালি লাগছে। তাই ওরহান এই গজরা পাঠিয়েছে।"

সোহা লজ্জায় পুরো মুখশ্রী লাল হয়ে গেলো। তার গায়ে ছিল নীল রঙের শাড়ি, হাতে ঝলমলে নীল রেশমির চুড়ি, চোখে ঘন কালো কাজল আর কপালে ছোট্ট এক কালো টিপ। চুলগুলো পরিপাটি খোপা করে বাঁধা। সে লজ্জায় মাথা ঝুকিয়ে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

দূরে, স্টেজের কোণায় কাজ করতে থাকা ওরহানের দিকে একবার ঘুরে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে, কথার মধ্যে হঠাৎ করেই এক ছেলে হাতে কিছু কাগজ নিয়ে ছুটে এসে উপস্থিত হলো।

সোহা, রিয়া, নিশাত আর স্নেহা—কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটি তড়িঘড়ি করে তাদের চারজনের সই নিয়ে নিল। চারপাশে স্তব্ধতা নেমে এলো, কেউ কিছু বলতে পারলো না। ছেলেটি ঝুঁকে কাঁপতে কাঁপতে উল্টো ঘুরে যেতে লাগল। তখন রিয়া কণ্ঠটা ঝাঁঝালো করে উঠল—

-"এই আবালের বাচ্চা, আবাল কিসে সই করিয়ে নিল?"

রিয়ার কণ্ঠে তীব্র রাগ। ছেলেটি ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে কঁপে কঁপে বলল—

-"আসলে আপু, আজকের অনুষ্ঠান উপলক্ষে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের সবার একটা সই দরকার ছিল। হেডমাস্টার চেয়েছেন। কি কারণে চেয়েছেন আমি জানি না।"

-"হতচ্ছাড়া! কিসে সই নিলি, দেখতেও তো পারলাম না! যদি জায়গা জমি লিখে নিস আমার তখন?"

-"আপনি চাইলে এখনই চেক করতে পারেন, আপু!"

-"যা দূর হ এখন থেকে! এখন চেক করে কি করবো? সই তো নিয়ে নিয়েছিস!"

রিয়া রাগে গজগজ করতে করতে লাগলো, আর সেই সুযোগেই ছেলেটি ছুটে পালালো। সোহা খানিকটা ভয় পেলো। রিয়া সাধারণত তার সাথে হেসে-খেলে কথা বলে, এমন রাগী রূপ সে আগে দেখেনি।

রিয়া তড়িঘড়ি করে সোহার মাথায় গজরাটা গুঁজে দিয়ে নিশাতকে নিয়ে চলে গেলো। স্নেহা আর সোহা একে অপরের দিকে তাকিয়ে একটু বিব্রত হেসে ফেলল।

রাত প্রায় গড়িয়ে গেছে। প্রোগ্রামের পর্বতুল্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো ওরহান। কিন্তু সোহার সঙ্গে একটিবার দেখা করার সুযোগও পায়নি সে।

সব কাজ শেষে যখন সে সোহার খোঁজে এগোলো, তখন সোহা ও স্নেহা গেটের দিকে এগিয়ে চলেছে, হাতে ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি। হঠাৎই সামনে এসে দাঁড়ালো ওরহান। এমন আচমকা উপস্থিতিতে দুজনেই একধাক্কায় পেছিয়ে গেল।

স্নেহা হকচকিয়ে বলে উঠলো—

-"ওরহান ভাই, আপনাদের এই আচমকা এসে দাঁড়ানোর স্টাইলটা বদলান! ভয় পাই না ভাবেন?"

ওরহান দুষ্টু হাসি দিয়ে উত্তর দেয়—

-"সরি ভাবী!"

স্নেহা চোখ কুঁচকে বলে—

-"ভাবী আবার কার? আমি আপনার কোন জন্মের ভাবী হলাম?"

ওরহান একটুও না হকচকিয়ে শান্ত স্বরে বলে—

-"এই জন্মেরই। আপনি তো আমাদের তানভীর ভাইয়ের হবু বউ।"

স্নেহা ঠোঁট চেপে রাগে দাঁত খিঁচে বলল—

-"আমার মাথায় ছাই পড়ুক আপনার ওমন বন্ধুকে বিয়ে করতে হলে!"

ঠিক তখনই এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর পিছন থেকে ভেসে এলো—

-"আচ্ছা, তাই নাকি?"

স্নেহা কাঁপা হাতে পেছনে ফিরলো। তানভীরকে দেখে এক ঢোক গিলে নিয়ে গলা কাঁপিয়ে বলে—

-"আসসালামুয়ালাইকুম ভাইয়া। ভালো আছেন?"

তানভীর চোখে শীতল হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিলো—

-"ওয়ালাইকুম আসসালাম আপু। হ্যাঁ, ভালোই আছি, আপনাকে দেখে আরও ভালো লাগছে।"

তারপর আর কিছু না বলে, স্নেহার হাত টেনে নিয়ে চলে যেতে লাগলো। স্নেহা অসহায় চোখে একবার সোহার দিকে তাকালো। সোহা নিশ্চুপ। দৃষ্টি নামিয়ে ফেলেছে নিচের দিকে। কিছু বলার নেই তার। তানভীরের সঙ্গে বিয়ের কথা অনেক আগেই চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সেই গাঢ় সিদ্ধান্তে তার কোনও অধিকার ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু তবু কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল সোহার।

ওরহান চুপচাপ সব দেখছিল। কপালে ভাঁজ, মুচকি হাসি, ঠোঁটের কোণে শ্লেষ—

-"লাব নেই ম্যাডাম। যার বউ, সে নিয়ে গেছে। এখন আপনি নির্ভার।"

সোহার মাথা আরও নিচু হলো। ওরহান হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলো—

-"আচ্ছা, আমাকে কেমন লাগছে বলুন তো আজ?"

সোহা চোখ তুলে তাকালো এক ঝলক, তারপর লাজুক স্বরে বলল—

-"সুন্দর লাগছে।"

ওরহান চোখ চাওয়াচাওয়িতে চোখ আটকে বলল—

-"আপনাকেও হিমুর লাগছে।"

সোহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। চারপাশে হালকা বাতাস। ক্যাম্পাসের আলো ফিকে হয়ে আসছে। আর তার মাঝে ওরহান তার চোখে চোখ। সোহার চোখে কৌতূহল। কিছু না বুঝেই তাকিয়ে থাকে ওরহানের দিকে। ওরহান গভীরভাবে বলে চলে—

-"সবাই আজ বলল, আমাকে নাকি হিমুর মতো দেখাচ্ছে। ভাবলাম, আপনি তাহলে রূপা। তারপর নিজেই হাসলাম। হিমুর জীবনে রূপা তো ওর পেছনে ঘুরে মরতো, কিন্তু হিমু পাত্তা দিত না। আর আমি তো উল্টো পথে হাঁটছি... আমি ঘুরি, আপনি পাত্তা দেন না। আপনি বুঝলেন তো? হিমু-রূপার গল্প আমাদের মাঝে উল্টোভাবে লিখা হচ্ছে।"

সোহার ঠোঁটে একটু নীরব হাসি খেলে গেল। সে নিজের ঠাণ্ডা গলায় বলল—

-"আপনি গল্প পড়ে অনেক বেশি ভাবেন, ভাইয়া।"

ওরহান চুপ করে রইলো। চোখে লেগে রইলো একটা ক্ষীণ আঘাত, যা সে হালকাভাবে মুছে ফেলল মুখের হাসিতে। মাথা নিচু করে বলল—

-"হয়তো ঠিকই বলেছেন। কিন্তু আমার ভাবনার গল্পটা তো আপনাকে ঘিরেই লেখা।"

সোহা আর কোনো কথা বলল না। একটু পেছনে ফিরলো, ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল—

-"আব্বু এসে গেছেন। আমি যাই। ভালো থাকবেন।"

ওরহান তাকিয়ে রইলো। যেন সব কথা শেষ হয়ে গেছে, অথচ হৃদয়ের ভেতর শুরু হলো এক নতুন অনুচ্ছেদ।

Story Cover