পড়ন্ত বিকেল। বিকেলের মিঠে রোদে আকাশ যেন এক অপূর্ব রঙের চাদরে মোড়ানো। চারপাশে ছোট ছোট শিশুরা খেলায় মেতে উঠেছে, তাদের হাসি আর কোলাহলে বাতাসও যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আকাশে ছুটে চলেছে পাখিদের দল। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির পরে আজ সূর্যের দেখা মিলেছে, কেমন এক স্বস্তির শ্বাস যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কাদামাখা পথ পেরিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বেরিয়ে পড়েছে খেলার জন্য। তাদের প্রাণবন্ত হাসির শব্দে চারপাশ এক আনন্দঘন আবেশে মোড়ানো।
জানালার ধারে বসে আছে সোহা। হাতে মেহেদি দিচ্ছে, একান্ত নিজস্ব মনোযোগে। মেহেদি তার ভীষণ প্রিয়, যেন প্রতিদিনই এই রঙে রাঙাতে চায় নিজেকে। তার হাতদুটো সবসময়ই মেহেদির গাঢ় লাল ছোঁয়ায় মোড়ানো থাকে। খোলা জানালা দিয়ে ঢুকছে মৃদু বাতাস। বাতাসের আলতো ছোঁয়ায় মুখের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো হেলে দুলে উঠছে। সোহা তবু একাগ্র, মেহেদির নকশায় ডুবে আছে সম্পূর্ণ মনটা।
হঠাৎই সাবা ঘরে দৌড়ে এসে দাঁড়ালো তার পাশে। গলা হাঁপানিতে ভার, কিন্তু চোখে উচ্ছ্বাসের ঝলক। বলল—
-"আপু! তোর জন্য পার্সেল এসেছে!"
সাবার মুখে ক্লান্তির রেখা, কিন্তু কণ্ঠে তীব্র উত্তেজনা। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে কথাটা বলল। সোহা কপাল কুঁচকে তাকালো সাবার দিকে। কৌতূহল মিশ্রিত গলায় জিজ্ঞাসা করল—
-"আমি তো কিছু অর্ডার করি নি?"
-"জানি না আমি। তুই ড্রয়িংরুমে আয়, দেখ—পুরো ঘরজুড়ে শুধু লাল গোলাপের তোড়া!"
সোহা চমকে উঠল। চোখে এক ধরণের বিস্ময় খেলে গেল। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—
-"মানে? কি বলছিস তুই?"
-"হুম। যা বলছি, আয় দেখ। নিজে দেখলেই বুঝবি।"
সাবা ও সোহা দুজনেই ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়িয়ে গেছে।
বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, দুজনেই বাকরুদ্ধ। কে এমন পাগলামি করতে পারে? পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুধুই লাল গোলাপের তোড়া! রেশমী চুরির ডালা! একটুকু ফাঁকও নেই, যেন ফুলের স্রোতে ডুবে গেছে গোটা ঘর। ঘরটা এখন কেবল একটি ঘর নয়, এ যেন রক্তরঙা ভালোবাসার এক অলিখিত কবিতা।
দু’চোখে অপার বিস্ময় নিয়ে সাবা ছুটে বেড়াচ্ছে এক তোড়া থেকে আরেক তোড়ায়। প্রতিটি ফুলে যেন কোনো এক রহস্যময় হাতের স্পর্শ লেগে আছে। সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে, মনে হচ্ছে প্রতিটি তোড়া যেন কিছু বলতে চাইছে।
আর সোহা? সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে, স্তব্ধ, শান্ত, অথচ চোখের ভিতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে, বুঝে উঠতে পারছে না। চোখেমুখে বিস্ময়, মনে অজানা এক চাপা কাঁপুনি। এত ভালোবাসা, এতটা প্রকাশ, এতটা সাহস, এটা কি তার জন্যই?
হঠাৎ সাবার দৃষ্টি থেমে গেল। চোখ আটকে গেল এক কোণে রাখা একটি বাক্সে।
সব তোড়ার ও রেশমি চুরির মাঝখানে একটু উঁচু করে রাখা কালচে লাল রঙের চকচকে সেই বাক্সটা যেন ডাকছে তাকে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, হাতে তুলে নিল বাক্সটি। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল—
-"আপু! এখানে একটা বক্স আছে!"
তার গলায় কৌতূহল, উত্তেজনা আর চাপা উত্তাপ।
আর সোহা? সে আরও গভীর নীরবতায় ডুবে যায়,
কারণ সে বুঝতে শুরু করেছে, এই ভালোবাসার গল্পের পাতাগুলো এবার খুলে যাচ্ছে।
-"আপু, দেখ ! চল, খুলে দেখি আয়!"
সাবার কণ্ঠে শিহরণ জড়ানো কৌতূহল।
সোহার ধ্যান ছিন্ন হলো। সে ধীরে তাকালো সাবার দিকে, তার হাতে ধরা সেই রহস্যময় বাক্স। চোখ মুহূর্তেই বিস্ময়ে ছলকে উঠলো। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বলল—
-"খুলিস না! এগুলো... এগুলো বোধহয় ভুল করে আমাদের ঠিকানায় চলে এসেছে।"
সাবা অবাক হয়ে চোখ বড় করে বলল—
-"নারে আপু, ডেলিভারির কাগজে তোর নাম ছিল!"
সোহার চোখে এক রকম ঘোলাটে দ্বিধা। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
-"কি বলছিস এসব?"
-"হুম আপু। দেখ, এই বক্সের গায়েও তোর নামই লেখা।"
সোহার চোখ ধীরে ধীরে বাক্সের গায়ে পড়লো।
সত্যিই... তার নাম! তারই পুরো নাম সুন্দর করে ছাপানো বাক্সটির গায়ে। তাকে উদ্দেশ্য করেই পাঠানো, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এরমধ্যেই সাবা তড়িঘড়ি করে বাক্সটি খুলে ফেলল।
আর বাক্স খুলতেই, দুজনে একসাথে চমকে উঠল।
নির্বাক! বিস্ময়ে ঠায় দাঁড়িয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল তারা। সাবা ও সোহা, দুজনেই বাকরুদ্ধ।
বাক্সভর্তি অসংখ্য মেহেদীর কোণ! এক নয়, দুই নয়, সম্ভবত শত শত। এত মেহেদী, যেন সারাজীবন জুড়ে দিলেও ফুরাবে না। সুগন্ধ মিশে আছে প্রতিটা কোণে,
আর তার মাঝেই হঠাৎ নজরে পড়ল এক ছোট্ট চিরকুট।
সোহা নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল সেই চিরকুট। আঙুল কাঁপছে তার। কণ্ঠ শুকিয়ে আসছে। চোখের কোণে অজানা জলের ছায়া। এইবার, সে পড়বে, আর খুলে যাবে আরেকটি গোপন অধ্যায়...
"প্রিয় নীলশ্যামা,
তোমাকে নীলশ্যামা বলে ডাকলেও, আমার হৃদয়ের প্রিয় রং বরাবরই লাল। নীলের গভীরতায় তুমি অনন্য,
তবুও লালের উষ্ণতায় আমি আমার ভালোবাসাকে খুঁজি।
এই যে তোমার জন্য লাল গোলাপের তোড়া পাঠালাম
তা কেবল একটি ফুল নয়, বরং আমার না বলা হাজার কথা, আমার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের অনুবাদ।
তোমার সেই মেহেদি রাঙা হাত... দেখলেই আমার নিশুতি রাত ছুটে যায় নির্ঘুমতায়। প্রতিটি আঙুল যেন কবিতার পঙ্ক্তি, যেখানে আমার নামটা যদি আঁকা হতো, তবে পৃথিবীর সব অভিমান মুছে দিতাম।
ভালোবাসা তো মুখে বলা কিছু শব্দ নয়, তা এক ধরনের নীরব আরাধনা, যেখানে চোখে চোখ পড়লে,
আলাদা করে কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। যেভাবে মেহেদির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে, তেমন করেই তুমি মিশে গেছো আমার সত্তায়।
তোমার হাতে কি একটুখানি স্থান হবে না আমার নামের জন্য? একবার, শুধু একবার যদি তোমার মেহেদির রেখায় আমার নামটি আঁকা হয়, তবে আমি সেই হাতের ছায়াতলে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চাই।
তুমি বুঝবে না নীলশ্যামা, এই ভালোবাসা কোনো খেয়ালি আবেগ নয়, এ এক গভীর, নিশ্চুপ প্রতিজ্ঞা।
তোমার হাসির মাঝে, তোমার চুপ থাকা দৃষ্টিতে, তোমার অজস্র না-বলা কথার ভিতরেই আমি প্রতিদিন নিজেকে খুঁজে পাই।
ভালোবাসি তোমার রঙে, তোমার ঢঙে, তোমার সেই মেহেদি রাঙা অস্তিত্বে— যেখানে একদিন আমার নাম লেখা থাকবে, এই আশায় প্রতিদিন নিঃশব্দে বেঁচে থাকি।
—ওরহান খান শাহির"
সোহার শরীর নিস্তেজ। স্তব্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সামনের দিকে। হাত-পা যেন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই, অবিরত কাঁপছে। সাবা সেই কাঁপুনি টের পেয়ে ছুটে এল, দুই হাতে বোনকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।
ভয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"কি হয়েছে আপু? এভাবে কাঁপছিস কেনো?"
সোহার ঠোঁট কাপছে, গলা শুকিয়ে গেছে। কিছু বলতে পারছে না সে, চোখে ধরা পড়ছে আতঙ্কের ছায়া। সাবা তাকে ধীরে ধীরে বসিয়ে দিল, তারপর ছুটে গেল রান্নাঘরে। এক গ্লাস পানি নিয়ে ফিরে এসে সোহাকে জোর করে খাওয়াল। সোহা ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিল, কিছুটা স্বাভাবিক হলো। সাবা তার কাঁধে হাত রেখে বলল—
-"এত ভয় পেয়ে গেলি কেনো আপু? কী হয়েছে বল?"
সোহার কণ্ঠ কাঁপছে। তার কণ্ঠ যেন হাওয়ার মতো হালকা, তবু বোঝা যায় প্রতিটি শব্দে লুকানো আতঙ্ক।
-"এ... এ আমার ভার্সিটির সিনিয়র। খুবই ভয়ংকর। রাগী মানুষ। প্রায়ই মারামারি করে। সবাই তাকে ভয় পায়। সমীহ করে চলে। এই ছেলে কেনো আমার পেছনে পড়েছে বুঝি না! কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে,
সব ছেড়ে আমার মতো একটা কালো মেয়ের পেছনে কেনো পড়েছে?"
সাবার মুখ শক্ত হলো। তার চোখে জ্বলে উঠল এক দৃঢ় দৃপ্তি। বলল—
-"চুপ, একদম চুপ কর! কালো হলে কি হয়েছে? ভালো লাগা কি গায়ের রঙ দেখে হয়? তুই কি এখন ঠিক করে দিবি, কার চোখে কাকে ভালো লাগবে?"
সে সোহার হাত ধরল শক্ত করে।
-"তোকে যদি ভালো না লাগে, তুই না করে দিবি।
ব্যাস! ব্যাপারটা সেখানেই শেষ। কাউকে তো জোর করে ভালবাসা যায় না।"
সোহার চোখ ভিজে উঠল। ঠাণ্ডা হতে লাগল সে।
সাবা ঠিকই বলেছে—ভালো লাগা দোষ নয়, প্রত্যাখ্যান করাটাও অধিকার। সে মাথা নাড়ল ধীরে, নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করল, সব ঠিক আছে, সে শক্ত, সে পারবে। হঠাৎই সোহা শিউরে উঠল। চোখ বড় বড় করে বলল—
-"সাবা! এইসব সরাতে হবে... যদি বাবা-মা এসে দেখে,
আমাকে তো মেরে কুটি কুটি করে ফেলবে!"
সাবা হেসে ফেলল হালকা করে।
-"আর রিল্যাক্স কর আপু। মা-বাবা তো নানুবাড়ি গেছে। ১০–১২ দিন থাকবে বলেছে।"
সোহার বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল। সে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল, বাবা যদি আজকে এইসব দেখতো... সত্যিই হয়তো আজ আমাকে মাটি চাপা দিত।
.
.
.
স্নেহা একা একা হাঁটছে। চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা, আকাশটা আজ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন, যেকোনো মুহূর্তে ঝরে পড়বে বৃষ্টি। এই রকম দিন স্নেহার ভীষণ প্রিয়। আর সোহা? সেও ভালোবাসে এমন আবহাওয়া।
বর্ষার দিনে দুজন মিলে বৃষ্টির ভেজায় বিলীন হয়ে যাওয়াই যেন তাদের প্রিয় বিলাস। আজও তারা ঠিক করেছিল একসাথে দেখা করবে। কিন্তু সোহা এখনো এসে পৌঁছায়নি।
স্নেহা আপন মনে হাঁটছে। সোহার জন্য অপেক্ষা,
তবু এক অদ্ভুত শূন্যতা যেন বুকের ভেতর জমে উঠছে ধীরে ধীরে। তার বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী। ঘর ফাঁকা থাকে প্রায় সারাদিন। তার জগৎটাও ছোট, একদম ক্ষুদ্র পরিসরে বাঁধা। এই ছোট জগতে সোহাই একমাত্র আপন, একমাত্র বন্ধু। সোহা না থাকলে, সব কিছু বড় বেশি নিঃশব্দ, বড় বেশি শূন্য শূন্য লাগে।
হঠাৎ স্নেহার পা থেমে গেল। সে নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল, হঠাৎ সামনে চোখে পড়ল দু’জোড়া পা। এক ঝটকায় মাথা তোলে, চমকে ওঠে।
সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তানভীর। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে স্নেহার দিকে, চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি, যেন প্রশ্নবিদ্ধ... না বলা কিছু ক্ষোভে ভরা।
স্নেহাও অবাক। মুখে একধরনের ভ্রুকুটি নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
-"সমস্যা কী? রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো?"
স্নেহার গলায় বিরক্তির সুর।
তানভীর চোখ সরু করে বলল—
-"কানে শুনতে পাও না তুমি? কতক্ষণ ধরে ডেকে চলেছি, কোনো সাড়া-শব্দই পাও না!"
স্নেহা সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিল—
-"শুনতে পাইনি। কানে হেডফোন ছিল।"
তানভীর একটু ঠান্ডা গলায় বলল—
-"ওহ, আচ্ছা... তাই বলো।"
স্নেহা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
-"কিছু বলবেন আমাকে?"
-"হ্যাঁ। তোমার বান্ধবী কোথায়?"
-"চলে আসবে একটু পরেই।"
তানভীর মৃদু হাসল—
-"ওহ।"
স্নেহা এবার সরাসরি প্রসঙ্গে এল—
-"আচ্ছা, ওরহান ভাই এইসব শুরু কি করেছে?"
তানভীর কাঁধ ঝাঁকালো, যেন ব্যাপারটা একেবারেই স্বাভাবিক—
-"কেনো? আমি তোমার পেছনে ঘুরে যা করেছি, ওরহানও তাই করছে!"
স্নেহা অবাক, চোখ বড় বড় করে বলল—
-"আশ্চর্য! আপনি তো আমাকে ভালোবাসতেন বলে আমার পেছনে পড়ে ছিলেন।"
-"ওরহানও সোহাকে ভালোবাসে।"
স্নেহা এবার গম্ভীর গলায় বলল—
-"তাহলে সরাসরি প্রস্তাব দিন। সোহা এইসব প্রেম-ট্রেমে জড়াবে না।"
তানভীর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
-"কেনো?"
স্নেহার কণ্ঠ শক্ত হয়ে উঠল—
-"ওর বাবা এসব একদমই সহ্য করেন না। জানলে ওকে মেরে ফেলবেন।"
তানভীর হঠাৎ চুপ করে গেল। চোখে গভীর ভাবনার ছায়া। সে বুঝল, এখানে খেলা নয়, এখানে সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। তারই মধ্যে সোহা এসে উপস্থিত হলো। পায়ে পায়ে হেঁটে এসে নম্র গলায় সালাম দিল—
-"আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।"
তানভীর সালামের উত্তর দিলো হালকা হাসি নিয়ে—
-"ওয়ালাইকুম আসসালাম, আপু। কেমন আছো?"
-"ভালো আছি ভাইয়া। আপনিও ভালো তো?"
-"হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ।"
সোহা কিছুটা দ্বিধাভরা গলায় বলল—
-"ভাইয়া, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।"
তানভীর মাথা নাড়ল—
-"হ্যাঁ, নিশ্চিন্তে বলো।"
-"আপনার বন্ধুর সঙ্গে কি একটু দেখা করা যাবে?"
তানভীর এক মুহূর্ত থেমে বলল—
-"হুম, অবশ্যই। তোমরা এক কাজ করো, পুকুরপাড়ের ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করো। আমি এখনই ওরহানকে নিয়ে আসছি।"
স্নেহা ও সোহা একসাথে মাথা নেড়ে সম্মতির ইঙ্গিত দিল। তানভীর একবার তাদের দিকে তাকিয়ে উল্টোদিকে ঘুরল, পকেট থেকে ফোন বের করে পায়ে পায়ে হেঁটে গেল দূরে, হয়তো এখনই ওরহানকে খবর দেবে।
সোহা স্নেহার হাত ধরে ধীরে ধীরে পুকুর পাড়ের দিকে এগিয়ে এলো। চারপাশে এক নিঃসঙ্গ শীতলতা। বাতাসটা যেন ভিজে ভিজে মৃদু, প্রতিটি দমকা হাওয়ায় শরীর কেঁপে উঠছে হালকা স্নিগ্ধতায়।
পুকুরের জলে কচুরিপানাগুলো দুলছে অলস ঘূর্ণিতে,
নির্বাক প্রকৃতি যেন অপেক্ষা করছে কোনো অজানা ঘটনার জন্য। গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো, শীতল বাতাসে হালকা ঝাঁকুনিতে পড়ে পড়ে টুপটাপ শব্দ করছে। সেই শব্দে যেন জমে আছে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা।
মাঝেমাঝে আকাশ গর্জে ওঠে, একটা ধমকানো হুংকারে জানান দেয় তার অভিমান, তারপর আবার সব নিঃশব্দ। যেকোনো মুহূর্তে আকাশ ভেঙে নেমে আসবে বৃষ্টি, ঠিক যেমন করে কোন না কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়ে একটি জমে থাকা সম্পর্কের অতল গোপন অনুভব।
স্নেহা ও সোহা, দুজনেই নিশ্চুপ। কেউ কিছু বলছে না,
তবে একে অপরের উপস্থিতিতে এক ধরণের সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে। প্রকৃতি যেন আজ তাদের গল্প শোনার জন্য প্রস্তুত।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অবশেষে তানভীর ওরহানকে সঙ্গে নিয়ে এসে উপস্থিত হলো পুকুর পাড়ে।
স্নেহা তখন পায়চারি করছিল, সে কখনোই চুপচাপ বসে থাকতে পারে না, অপেক্ষা তার ভেতরের অস্থিরতাকে আরও উস্কে দেয়। অন্যদিকে, সোহা একদম নীরবে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটার চেইন ধরে ধরে বারবার নাড়ছে, কোনো কথা নেই, কোনো ভঙ্গিমা নেই—শুধু থেমে থাকা এক প্রতীক্ষা।
তানভীরকে দেখেই স্নেহা বলল—
-"এত দেরি লাগল আসতে? সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি!"
তানভীর হালকা হেসে উত্তর দিল—
-"আরে, ওরহান ভার্সিটিতে ছিল না। বেরোতে একটু সময় লেগে গেল তাই।"
স্নেহা মুখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকালো—
-"হ্যাঁ, আর এখন তোমাদের জন্য বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে আমাদের।"
তানভীর চোখ টিপে মৃদু হাসল—
-"তাতে কী! তোমার তো বৃষ্টি পছন্দ, না?"
স্নেহা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল—
-"পছন্দ তো বটেই, তবে আজ ভিজতে ইচ্ছে করছে না।"
তানভীর এবার ওরহানের দিকে তাকাল, সপ্রতিভ কণ্ঠে বলল—
-"মামা, তোরা কথা বল। আমি স্নেহাকে নিয়ে একটু যাচ্ছি।"
ওরহান নীরবে মাথা নাড়ল। সোহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও, ভিতরে ভিতরে সবকিছু বুঝে নিচ্ছে। তার চোখ এড়ায়নি, স্নেহা আজ খুব অল্প কথা বলেছে। সেই নীরবতার কারণ হয়তো কিছু গভীর অভিমান, কিংবা অন্য কোনো অব্যক্ত ক্লান্তি। তাই সে বাধা দিল না। স্নেহা ও তানভীর পায়ে পায়ে সরে গেল দূরে।
এদিকে ওরহান এসে দাঁড়াল সোহার ঠিক পাশে।
তার চোখে এক রকম কোমল আবেগ, যা সরাসরি সোহার চোখে পড়ে না, কিন্তু বাতাসে যেন তার ভার অনুভব করা যায়।
একটু সামান্য ঝুঁকে হালকা গোলা খাঁকরি দিল ওরহান। সোহা কেঁপে উঠল, না সেটা শুধু শব্দে নয়,
এই ভেজা বাতাসে মিশে থাকা ওরহানের শরীরের গন্ধ
তার নাসারন্ধ্রে আঘাত হানল এক অজানা টান নিয়ে।
একটি গন্ধ, যা পরিচিত...অথচ ব্যাখ্যাতীত।
সে চোখ তুলে তাকাল, মুখে কাঁপুনি, গলায় অস্পষ্ট কণ্ঠ, তবু প্রশ্নটা বেরিয়ে এলো—
-"আপনি... আপনি কি আমার বাড়িতে ফুল পাঠিয়েছিলেন?"
ওরহান শান্ত। মোহনীয় কণ্ঠে বলল—
-"হ্যাঁ, ম্যাডাম। পছন্দ হয়নি আপনার?"
-"ফুল তো সব মেয়েরই পছন্দ। কিন্তু আমার বাড়িতে আর কখনও এইসব কিছু পাঠাবেন না। আমি এইসব একেবারেই পছন্দ করি না।"
ওরহান কপাল কুঁচকে তাকালো। অদ্ভুত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"কেনো? আপনার পছন্দের অন্য কোনো ফুল আছে? তাহলে আমাকে বলুন, আমি সেগুলিই পাঠাবো!"
-"আপনি বুঝতে পারছেন না। আমার পরিবার এসব পছন্দ করে না। বাবা যদি জানতে পারেন, আমাকে মেরে ফেলবেন!"
ওরহান শরীর দুলিয়ে হেসে উঠল। তার পেটানো শরীর, আকর্ষণীয় গঠন—হাসলে আরও সুদর্শন লাগে। সোহা তাকানোর সাহস পেল না। তখন ওরহান কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি কণ্ঠে বলল—
-"এসব কোনো বাবা-মাই পছন্দ করে না। তবে লুকোচুরি তো করছি না। আচ্ছা, আমরা কি প্রেম করছি? আপনি কি সেটা বাসায় লুকিয়েছেন?"
সোহা কেঁপে উঠল। এত কাছে কোনোদিন কোনো পুরুষ আসেনি তার। তার উপর এমন এক নেশাময় কণ্ঠ, এত কাছ থেকে! ওরহানের গা থেকে ভেসে আসা ঘ্রাণ নাকে এসে লাগছে। নিশ্বাস এসে পড়ছে সোহার গায়ে। সে দু’কদম পিছিয়ে গেল। ওরহান মিটমিট করে হাসছে।
সোহা কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"কি বলছেন আপনি? প্রেম করতে যাবো কেনো?"
ঠিক তখনই ঝুম করে বৃষ্টি এসে পড়ল। সোহা উল্টো ঘুরে দৌড় দিতে যাবে, তার আগেই ওরহান তার হাত ধরে টেনে এনে নিজের সামনে দাঁড় করাল। দুজনেই ভিজে গেছে একেবারে। ওরহান ঘর লাগানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সোহার দিকে। মোহনীয় কণ্ঠে বলল—
-"তাহলে লুকাচ্ছেন কেনো?"
সোহা কোনো উত্তর করল না। নিজেকে ছাড়াতে ব্যস্ত। ওরহান বিরক্ত হয়ে উঠল। বলল—
-"ভালোবাসি আপনাকে।"
সোহা স্তব্ধ। নড়াচড়া বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ তুলে তাকাল ওরহানের মুখের দিকে। ওরহান মোহনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাথার চুল বেয়ে বৃষ্টির ধারা তার গাল ছুঁয়ে থুতনি হয়ে নেমে আসছে। ওরহানকে সেই মুহূর্তে অতিরিক্ত সুদর্শন লাগছে, অস্বাভাবিকভাবে আকর্ষণীয়।
সোহা চোখ নামিয়ে নিল। কাঁপা কণ্ঠে, কিন্তু দৃঢ়স্বরে বলল—
-"দূরে থাকুন। মানুষজন দেখলে খারাপ ভাববে। আমাকে পছন্দ করার কিছু নেই। আমি কালো। আপনার জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুনেছি, আপনার অনেক মেয়ের সাথেই উঠা-বসা। তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিন। আমার পিছু ছাড়ুন।"
ওরহান সোহাকে ছেড়ে দিল। সোহা দু’কদম পিছিয়ে গেল। ওরহান তখন দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"আমার পেছনে শত মেয়ে ঘুরে বেড়ালেও," (ওরহানের কণ্ঠে বজ্র নেমে এলো) "আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ শুধু এক বৃষ্টিস্নাত শ্যামকন্যার উপর। হাজার মেয়ের দৃষ্টি আমাকে ছুঁয়েও যায় না, কারণ এই ওরহানের সমস্ত সত্তা, সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে ঘুরে ফিরে শুধু আপনি—শুধু সোহা। আমাকে দূরে ঠেলে কিছুই লাভ হবে না আপনার। আমি তো আর ফিরে যাবার পথ রাখিনি, নীলশ্যামা। আপনি এই ওরহানের, এ কথা কেউ খণ্ডাতে পারবে না। কেউ না।"
সোহা কেঁপে উঠল। ওরহানের কণ্ঠে যেন বিস্ফোরণ। কেবল শব্দে নয়, সেই কণ্ঠে ছিল দাবানলের মত দুরন্ত আবেগ, চোখে ছিল উন্মত্ত এক চাওয়া, ঠোঁটে ঝরছিল অকপট ঘোষণা। সোহার বুক ধকধক করে উঠলো। সে বুঝে গেলো—এই মানুষটিকে আর বোঝানো যাবে না। তার কোনো যুক্তি, কোনো অস্বীকার আর পৌঁছাবে না ওরহানের কাছে।
ভয় তার সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়লো, অথচ সেই ভয়ের ভেতরেও এক অচেনা ঘোর লেগে রইল। ওরহান যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, সোহার নিঃশ্বাস আটকে গেল। তার চোখের দিকে ঝুঁকে ওরহান গভীর, হুস্ক কণ্ঠে বলল—
-"ভালোবাসি নীলশ্যামা।"
সোহা চমকে তাকালো। এই প্রথমবার ওরহান তাকে এই নামে ডাকল। সেই উচ্চারণে ছিল শ্রদ্ধা, প্রেমিকের মতো এক অধিকার, আর এক পাগলামির ছায়া। ওরহানের চোখে তাকিয়ে সোহা বুঝলো, এই চাহনিতে নেই কোনো ছলনা, নেই কোনো দৃষ্টিকটুভাব, ছিল শুধু এক মগ্ন ভালোবাসা।
সোহা আর তাকিয়ে থাকতে পারলো না। তার হৃদয় ছুটে যেতে চাইলো সেই চাওয়ার দিকে, অথচ শরীর পিছিয়ে গেল। ভয়ে নয়, নিজেকে রক্ষা করতে, এই দুর্বোধ্য ভালোবাসা থেকে।
উল্টো ঘুরে সোহা দৌড়ে পালালো বৃষ্টিভেজা পথ ধরে। তার চুল, জামা, সারা শরীর জুড়ে কেবলই ভেজা আর কাঁপুনি।
আর পেছনে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে, ওরহান কেবল মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলল—
-"ভয় পাচ্ছেন তো? তবুও জানেন না, আপনি আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন, নীলশ্যামা। এই হৃদয় আপনার কাছে বন্দী। আর সেই বন্দী আমি, যাকে মুক্তি দিলে নিজেই মরে যাবো।"