ফিরে দেখা

পর্ব - ১১

🟢

নীল আকাশের বুক চিরে অবশেষে দেখা দিল রোদ্দুর। সূর্যের কোমল কিরণে ধীরে ধীরে সোনালি আলোর আবরণে রাঙতে লাগল দিগন্ত। চারপাশে পাখিদের কিচিরমিচির সুর যেন এক স্বর্গীয় রাগিণী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। জানালার সাদা পর্দা ভেদ করে রোদ্দুরের এক স্নিগ্ধ রেখা এসে পড়ল সাবা ও সোহার মুখশ্রীর ওপর।

সাবা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে সোহাকে। আর সোহার কপালে ভাঁজ পড়েছে আলোচুম্বিত চোখে। ধীরে ধীরে চোখ খুলে সে অনুভব করল, বুকের ওপর যেন এক কোমল ভার। মাথা খানিকটা উঁচু করতেই দেখতে পেল, সাবা তার বুকের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে মগ্ন। সেই দৃশ্য দেখে সোহার ঠোঁটে এক শান্ত, স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। সে স্নেহভরা হাতে বোনের চুলে আলতোভাবে বিলি কেটে দিল। তারপর ধীরে ধীরে তার কানে ফিসফিস করে ডাক দিল—

-"সাবা... ওগো বাবু, ওঠো।"

সাবার মুখের রেখায় বিরক্তির ছায়া ফুটে উঠল। আধো ঘুমে সে ফুঁসফুঁসিয়ে বলল—

-"আহ আপু... আর একটু ঘুমোতে দে না। এত সকালে কেউ ওঠে নাকি?"

সোহার কণ্ঠে হাস্যরসের রেশ মিশিয়ে উত্তর এল—

-"হ্যাঁরে বাচ্চা! আজ কিন্তু আমাদের ঘোরাঘুরির দিন। যাবি না বুঝি ঘুরতে?"

ঘোরার কথা শুনতেই যেন এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে গেল সাবার শরীরে। বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে সে চঞ্চল ভঙ্গিতে বলে উঠল—

-"উফ আপু! আরও আগে ডাকলি না কেন!"

বলেই সে ছুটে গেল বাথরুমের দিকে।

সোহা হেসে উঠল উচ্চ কণ্ঠে। তার সেই হাসি যেন পূর্ণ সকালের হৃদয় জয় করে নিল, ঠিক যেন কোনো ভালবাসায় মোড়ানো উপন্যাসের এক উষ্ণ অধ্যায়।

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর থেকে কাজের চাপ যেন পাহাড়ের মতো নেমে এসেছে সোহার কাঁধে। প্রতিটি মুহূর্তই দৌড়ে বেড়ানো, ক্লান্তিতে ভেজা। এই কর্মব্যস্ততার মাঝে ওরহান আশ্চর্যভাবে একদিনের জন্যও তাকে বিরক্ত করেনি। যেন সময়, দূরত্ব আর নীরব সম্মতি, তিন মিলে অদৃশ্য এক প্রাচীর তুলে দিয়েছে তাদের মাঝে।

তবে এই ব্যস্ত জীবনের মাঝেই এক আশ্চর্য বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে সোহার সাথে তীব্রর। অফিসের করিডোর পেরিয়ে সেই বন্ধন ছড়িয়ে পড়েছে অবসরের আলো-আঁধারিত মুহূর্তে। সম্পর্কটি সহজ, স্বাভাবিক, ঠিক যেন দীর্ঘদিনের চেনা কেউ হঠাৎ একদিন খুব আপন হয়ে উঠেছে।

আজকের দিনটি একটু আলাদা। অফিসে ছুটি। ব্যস্ততা ঝেড়ে ফেলে আজ সবাই মিলে বের হবে ঘুরতে, তীব্র, সাবা, সোহা, মিরহা আর তীব্রর পিএ আকাশ। যেন একদিনের মুক্তি, ব্যস্ত জীবনের অবসরে প্রশান্তির খোঁজ।

তবে, এই নিঃশ্বাসে প্রশান্তির আগে এক বিষণ্ন ছায়া পড়ে আছে খান কোম্পানির ওপর। ওরহান গতকাল থেকেই অফিসে অনুপস্থিত। কেউ কিছু বলছে না, কিন্তু বাতাসে অজানা কিছু অনিশ্চয়তা ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছু একটা ঘটেছে, এটা স্পষ্ট। কিন্তু ঠিক কী? এই প্রশ্নটাই আজও উত্তরহীন।

সকালটা ছিল একদম অন্যরকম। সাবা ও সোহা দুজনেই প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়েছে। সোহা তার চিরচেনা নিজস্ব ভঙ্গিতে আজও সুতি শাড়ি পরেছে, অতীতের কারো একান্ত পছন্দের স্মৃতিকে সে যেন এখনো নিজের অন্তরে বহন করে চলেছে। সেই ভালোবাসার রেশ মুছে যায়নি আজও। সাবাও আজ পরেছে শাড়ি, বোনের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিতে তার এ এক ছোট্ট চেষ্টামাত্র।

সোহা সাবাকে নিয়ে পৌঁছেছে শহরের এক শান্ত রেস্টুরেন্টে, যেখানে তীব্র আগেই অপেক্ষায় ছিল।

তাদের দেখে তীব্র উঠে দাঁড়াল। সোহা হাসিমুখে সাবাকে পরিচয় করিয়ে দিল। তীব্র সাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো। তারপর তাকে চেয়ার টেনে বললো—

-"বস সাবা।"

সাবা বিনীতভাবে বলল—

-"ধন্যবাদ ভাইয়া।"

তীব্র হালকা হাসলো—

-"আপনিও বসুন, মিস সোহা।"

তিনজন বসতে না বসতেই মিরহা এসে উপস্থিত হল। মিরহাকে দেখে হঠাৎই চমকে উঠে সাবা দাঁড়িয়ে পড়ল।

-"তুমি?"

-"তুমি?"

একই সময়ে একই বিস্ময়ে দুই কণ্ঠস্বর গুঞ্জন তুলল রেস্টুরেন্টে। তীব্র ও সোহা হতবাক চোখে তাকিয়ে রইল। তাদের অভিব্যক্তিতেই বোঝা যায়, মিরহা ও সাবা পূর্বপরিচিত। সোহা ধীরে সাবাকে জিজ্ঞেস করল—

-"তুই মিরহাকে চিনিস সাবা?"

-"হ্যাঁ আপু, মিরহা আপু তো আমাদের বাসায় থাকেন।"

মিরহাও জবাব দিল—

-"হ্যাঁ সোহা। আমি সাবাদের বাসায় ভাড়া থাকি। কিন্তু তুমি সাবাকে চিনো কিভাবে?"

সোহা একটু থেমে বলল—

-"ও আমার ছোট বোন।"

মিরহার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

-"তুমিই তাহলে সাইফুল আংকেলের বড় মেয়ে?"

সোহা হালকা হেসে বলল—

-"না।"

-"তাহলে সাবা তোমার বোন হয় কি করে?"

সোহা এক নিঃশ্বাসে সব থামিয়ে বলল—

-"এসব কথা এখন থাক। বসো, নাস্তা করি। পরে কথা বলব এসব নিয়ে।"

তীব্র বুঝে গেল, এই মুহূর্তে সোহা অতীত টেনে আনতে চায় না। সে তাই প্রসঙ্গ বদলে হালকা হাসিতে ভরিয়ে দিল পরিবেশ। সকালের নাস্তা হলো প্রাণখোলা আড্ডা ও হাস্যরসের মধ্যে।

নাস্তা শেষে সবাই রওনা দিল রমনা পার্কের দিকে। সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশে তারা কিছুক্ষণ বসে গল্প করল। সাবা, মিরহা আর আকাশ ক্যামেরা নিয়ে ছোটাছুটি করছিল, ছবি তুলছিল, হেসে উঠছিল। আর ঠিক তখনই তীব্র ও সোহা একটু দূরে গিয়ে বেঞ্চে বসে পড়ল।

তীব্র হঠাৎ বলল—

-"অনেক বছর পর মনে হচ্ছে আজ ঘুরতে এলেন।"

সোহা দৃষ্টিটা দূরে ফেলে উত্তর দিল—

-"হুম... প্রায় পাঁচ বছর পর। জীবনের ব্যস্ততাকে ফেলে আজ একটু নিঃশ্বাস নিলাম।"

তীব্র সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"আপনার মুখের হাসিই সেটা বলে দিচ্ছে, মিস সোহা।"

সোহা হালকা হাসল। মুহূর্তটা নিঃশব্দে ভরে উঠল। তারপর সোহা নিজেই জিজ্ঞেস করল—

-"আপনার পরিবারে কে কে আছেন, মিস্টার তীব্র?"

-"আমার বাবা-মা, ছোট এক ভাই, তূর্য আর ছোট এক বোন, রশ্মি।"

-"বাহ, ছোট এক সুখী পরিবার!"

তীব্র থেমে বলল—

-"না... আমাদের পরিবারে এখন আর সুখ নেই।"

সোহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল—

-"মানে?"

তীব্র একটুখানি দৃষ্টি নামিয়ে বলল—

-"আমার বোন রশ্মির সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর আগে একটি অঘটন ঘটে... তারপর থেকেই আমাদের পরিবার যেন থেমে গেছে।"

-"আই এম সো সরি, মিস্টার তীব্র। If you don't mind, আমি কি জানতে পারি কী হয়েছিল?"

তীব্রর চোখের কোনে একটুকরো অশ্রু এসে জমেছিল বোধহয়। সে তা সন্তর্পণে মুছে ফেলল। তারপর সোহার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"আজ নয়, অন্য কোনো একদিন বলব। আজ আমরা আনন্দ করতে এসেছি। এই মুহূর্তটা নষ্ট করতে চাই না।"

সোহা মাথা নাড়ল—

-"ঠিক আছে, চলুন। ওদিকে যাই।"

-"চলুন।"

তীব্র হাঁটছে সোহার পাশাপাশি। সোহা একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে, অথচ তীব্রের চোখ যেন পড়ে আছে কেবল তার মুখে। তীব্র নিজের মনে এক গভীর নিশ্বাস ফেলে ভাবে—

-"আপনাকে আজ অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগছে, সুশ্রী।

শ্যামলা বর্ণ, তবু কি আশ্চর্য রকমের মোহময়! রূপবতী আমি অনেক দেখেছি, কিন্তু এ যে অন্য এক রকম টান... এই টান আমাকে আমার ভেতরে কোথাও টেনে নিচ্ছে।"

সে মুহূর্তেই নিজের মনে ধাক্কা দেয় তীব্রর। নিজের মনেই গর্জে উঠলো তীব্র—

-"না, আমি এমন হতে পারি না। আমি তো প্রতিজ্ঞা করেছি, আমার লক্ষ্য আছে, বড় কিছু করার। সুশ্রী, আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি, কিন্তু এই ভালোবাসার কাছে হার মানতে পারি না। আপনার রূপে বাধা পড়লে আমি আমার লক্ষ্য পূরণ করতে পারব না।"

তার ভেতরে এক হালকা কষ্ট জেগে ওঠে। আপন মনেই কথা বলছে সে—

-"ক্ষমা করবেন আমাকে, সুশ্রী। ভালোবেসেও আপনাকে ভালোবাসতে পারব না।"

পুরো দিনটা কাটল আনন্দ-আড্ডা আর স্মৃতিমাখা আলসে দুপুরে। সন্ধ্যায় তারা একসাথে ডিনার করল, সিনেমা দেখল।

রাত বাড়লে সবাই বাড়ি ফিরে গেল। তবে মিরহাকে যেতে দেয়নি সাবা। আজ রাতটা হবে তিন মেয়ের নাইট আউট, অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের গল্প গাঁথা এক মেয়েলি রাতের নরম চাদরে মোড়ানো।

-"আহ সাবা! বাড়ি এসেই আবার মুভি নিয়ে বসেছিস কেন? পড়াশোনা নেই তোর?" সোহা কপালে ভাঁজ ফেলে বলে উঠল।

সাবা মুচকি হেসে বলল—

-"আহ আপু, এমন করছিস কেন? সারাজীবন তো পড়লাম! আজ মিরহা আপু আছে, আমরা সবাই মিলে সারারাত জেগে কাটাব!"

-"হ্যাঁ, আমাদের তো আর কাজ-কাম নেই! যা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।"

মিরহা হেসে বলল—

-"থাক না সোহা, একটা রাত না ঘুমোলেই বা কী হয়?"

সাবা মিরহার পিঠে ধাক্কা দিয়ে বলল—

-"দেখেছিস আপু, মিরহা আপু কিন্তু তোর মত নিরামিষ না! আয়, গল্প করি।"

সোহা কষ্ট করে রাগ চেপে মুখে হাসি এনে বসে পড়ল।

সাবা একসময় গা এলিয়ে দিল সোহার কোলে। তিনজনে মিলে মুভির পর্দায় ডুবে যায়। ঘরের আলো-আঁধারি, জানালার ফাঁক গলে আসা চাঁদের আলো আর সেই কাহিনি, যেন অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।

প্রায় মধ্যরাত। মুভির শেষ দৃশ্যের আবহ সংগীত ঘরের নীরবতা ছুঁয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই, মিরহা ধীরে বলে উঠল—

-"সোহা, আমি কখনো তোমার অতীত নিয়ে কিছু জানতে চাইনি। কিন্তু আজ... আজ কি বলবে আমাকে?"

ঘরের বাতাস যেন থমকে গেল। সাবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে চুপচাপ তাকিয়ে রইল বোনের দিকে।

সোহা মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকাল। তার চোখে যেন অদেখা কোনো স্মৃতির ছায়া। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলা শুরু করল—

তখন আমি অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষে। একদিন ভার্সিটিতে তানভীর নামে এক ছেলের সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যাই। ওটাই ছিল আমাদের প্রথম দেখা। এর কিছুদিন পর একদিন বাবা আমাকে ভার্সিটি পর্যন্ত নামিয়ে দিতে এসেছিলেন। বাবা ছিলেন একটু কঠোর প্রকৃতির মানুষ, নিজের নীতিতে অটল, গম্ভীর, অভিমানি।

তিনি আমাদের ভালোবাসতেন, কিন্তু তার ভালোবাসা ছিল নিয়মে বাঁধা। একজন শিক্ষক হিসেবেই হয়তো, সবাইকে লেকচার দেওয়াটাই হয়ে গিয়েছিল তার অভ্যাস।

রাস্তায় কেউ বেয়াদবি করলে, কোনো ভুল দেখলে, একদম চুপ করতে পারতেন না। আর তার সবচেয়ে বড় অপছন্দের বিষয় ছিল প্রেম। আমাদের এলাকায় তিনি এসব নিয়ে প্রকাশ্যে মতামত দিতেন। চায়ের দোকানে, রাস্তায়, প্রতিবেশীদের সামনে বলতেন—

-"আমার মেয়েরা এসব করবে না। তারা আমার গর্ব।"

আর তাতেই হয়তো অনেকে হিংসা করত, হাসত, ফিসফিস করত— "দেখা যাবে একদিন!"

সেদিন, আমি আর বাবা রিকশা থেকে নামছি ঠিক তখনই ওরহান ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল—

"উনি তোমার কে?"

আমি ভয় পেয়ে বলি— "উনি আমার বাবা।"

ওরহান, যার সম্পর্কে আগে থেকেই জানতাম, অহংকারী, দাম্ভিক, সিনিয়রদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী, যার সামনে সবাই মাথা নিচু করে কথা বলে। সেও কিছু বলল না, শুধু চোখে আগুন নিয়ে রাগে পেছন ফিরে চলে গেল।

আমি কিছুই বুঝতে পারিনি তখন। কিন্তু সেদিনই শুরু হয়েছিল এক অন্যরকম যাত্রা।

স্নিগ্ধ দুপুর। হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো নীরব গানে দুলছে। চারপাশে এক শান্ত অথচ জীবন্ত ছন্দ। পাখির কিচিরমিচির শব্দে নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে ভেঙে যাচ্ছে, যেন প্রকৃতিই কথা বলছে আজ। ভার্সিটির ক্যাম্পাসে ছেলেমেয়েরা যার যার মতো করে সময় কাটাচ্ছে। কেউ নিভৃতে বসে বই পড়ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণখোলা হাসিতে গল্প জুড়েছে, কেউবা খেলছে সবুজ ঘাসের ওপরে।

এই নরম ব্যস্ততার মাঝখানে এক কোণে নিশ্চুপ পায়ে হাঁটছে সোহা। তার পাশেই তার একমাত্র এবং সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী স্নেহা। স্নেহার মুখে যেন বিরাম নেই। সে অবিরত বলে যাচ্ছে, নানা গল্প, নানা অভিযোগ, নানা হাসির কথা। আর সোহা? সে শুনছে। শান্ত, ভাবলেশহীন মুখে। চোখে যেন এক অন্য ভাবনার ছায়া।

ঠিক তখনই... আকাশ যেন থেমে গেল কিছু মুহূর্তের জন্য। সবকিছু ছাপিয়ে একটি দৃশ্য কাঁপিয়ে দিল সোহার পৃথিবী। ওরহান, সেই দাম্ভিক, কঠিন, সকলের ভয় আর শ্রদ্ধায় জড়ানো পুরুষটি, হঠাৎই ছুটে এলো এক লাল গোলাপ হাতে নিয়ে। ছুটতে ছুটতে সোহার সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সবুজ ঘাসের ওপর।

চারদিক স্তব্ধ। পাখিরা যেন উড়ে গিয়েছে বিস্ময়ে।

স্নেহার মুখ হা হয়ে গেছে। আর সোহা... নিথর, অবাক।

ওরহানের কণ্ঠে আজ কোনো রাগ নেই, নেই সেই দাম্ভিকতা। একটা নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বর তার হৃদয় নিংড়ে বলল—

-"I love you, সোহা। আমি কি... আমি কি তোমার প্রেমিক হতে পারি?"

সবকিছু এতটা আচমকা ঘটল যে সোহা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না কী হচ্ছে। ওরহানের মতো কেউ, যাকে সবাই একধরনের ভয় আর বিস্ময়ের মিশেলে দেখে, সে আজ সবার সামনে, হাটু গেড়ে বসে, এক লাল গোলাপ হাতে, প্রেম নিবেদন করছে!

সোহা স্তব্ধ। চোখ বড় হয়ে গেছে তার, ঠোঁট কাঁপছে।

সে চট করে স্নেহার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর এক ধাপ পেছনে সরে গেল। ওরহানের কণ্ঠ ছিল উচ্চ, এতটাই, যে আশপাশের সবাই থেমে গেছে। চেনা মাঠ, চেনা মুখ, সবাই আজ অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ওরহান ও সোহার দিকে।

ওরহান— ২৫ বছরের এক তাগড়া, অভিজাত চেহারার সুদর্শন যুবক। ভার্সিটির ‘হট টপিক’। প্রতিটি মেয়ের না বলা স্বপ্ন। আর সে কিনা এমন সাদামাটা, নিরীহ চেহারার এক শ্যামলা মেয়েকে পছন্দ করেছে? এই তথ্যের চেয়েও বিস্ময়কর তার প্রকাশভঙ্গি! সবাই যেন চুপ করে হজম করার চেষ্টা করছে মুহূর্তটিকে।

সোহা সেই বিস্ময় সহ্য করতে পারল না। সবার দৃষ্টি যেন তাকে গিলে ফেলছে। সে হঠাৎই স্নেহার হাত ছেড়ে ছুটে পালিয়ে গেল। তার ছুটে যাওয়া দেখে কিছু মুহূর্ত স্তব্ধতা নেমে এলো। তারপর কিছু ফিসফাস... বিস্ময়মিশ্রিত হাসি।

ওরহান নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে সোহার পিছু হওয়া পথের দিকে। তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই, না অভিমান, না ক্ষোভ। সে যেন ঠিক এই প্রতিক্রিয়াটাই প্রত্যাশা করেছিল।

পেছনে দাঁড়ানো বন্ধুরা নীরবতা ভাঙল। তানভীর এগিয়ে এসে ঠাট্টার সুরে বলল—

-"কিরে বন্ধু, জীবনে প্রথম রিজেকশন হজম করতে কষ্ট হচ্ছে বুঝি?"

ওরহান ঠান্ডা গলায় বলল—

-"তুই রিজেকশন দেখলি কোথায়?"

রিয়া এগিয়ে এসে তানভীরের কাঁধে হাত রাখল, মুচকি হেসে বলল—

-"মেয়েটা তো সরাসরি না না করে পালিয়েছে দোস্ত! এর চাইতে বড় রিজেকশন আর কি!"

ওরহান শান্ত গলায় সোহার চলে যাওয়া পথের দিকেই তাকিয়ে বলল—

-"ওটাকে রিজেকশন বলে নাকি?"

সিয়াম এগিয়ে এসে হেসে বলল—

-"কি বলে তাহলে? মেয়েটা তো ভয়ে পেছন ফিরে দৌড়ে পালিয়ে গেল।"

ওরহানের ঠোঁটে এবার এক তীব্র আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল—

-"পালিয়ে যাবে কোথায়? এই ভার্সিটির প্রাঙ্গণেই তো আবার আসতে হবে। আর তখন আমি আবারও ওর পিছু নেবো। যতদিন না সে আমার ভালোবাসা কবুল করে।"

বন্ধুদের মুখে দীর্ঘশ্বাস, যেন জানে, এই ছেলেটার যখন কিছু মাথায় আসে, তখন আর কিছুতেই থামে না।

তানভীর, সিয়াম, রিয়া, নিশা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হাঁফ ছাড়ল।

সেই মুহূর্তে স্নেহা, যে এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে এই নাটকীয় কাণ্ড দেখছিল, হঠাৎই কিছু না বলে দৌড়ে গেল সোহার পেছনে। তানভীর অবাক হয়ে বলল—

-"এর আবার কী হলো?"

নিশা হেসে বলল—

-"কি আর হবে? বান্ধবীর কাছে যাচ্ছে বোধহয়।"

দুই বান্ধবীর দৌড়ে পালানোর দৃশ্য দেখে চারদিক হঠাৎ করেই হাসিতে ফেটে পড়ল। কারও মুখে বিস্ময়, কারও মুখে কৌতুক। কিন্তু ওরহান? সে কোনো শব্দ করল না।

তার চোখে নেই হাসি, নেই দুঃখ। শুধু এক অপলক দৃষ্টি, সেই পথে, যেখানে সোহা অদৃশ্য হয়ে গেছে।

ওরহান একটু এগিয়ে এসে থেমে দাঁড়াল। তার হাতে ধরা লাল গোলাপটি সে মুখের সামনে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘোরাতে লাগল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির সেই পথে, যেদিকে কিছুক্ষণ আগে সোহা দৌড়ে পালিয়ে গেছে।

চারপাশের কোলাহল যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে আসে তার জন্য। বন্ধুরা পেছনে, অথচ ওরহান যেন একা, এক গভীর নির্জনতায় নিমগ্ন। নিজের সাথেই যেন কথা বলে ওঠে সে, স্নিগ্ধ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে—

-"পালিয়ে যাবে কোথায়, সোহা রানী? ফিরে আসতেই হবে তোমায়। তোমার শেষ ঠিকানা... এই ওরহান খান শাহিররের বুক। এই বুকেই একদিন মুখথুবড়ে পড়তে হবে তোমাকে, জান-এ-মান... কারণ ভালোবাসা থেকে কেউ কখনও পালাতে পারে না।"

তার ঠোঁটে তখন এক প্রশান্ত, তীব্র আত্মবিশ্বাসী হাসি।

সে জানে, অপেক্ষা করতে হয়, প্রেম নিজেই পথ খুঁজে নেবে ফিরে আসার।

Story Cover