সাবা আজ হাসপাতালে এসেছে তার বাবাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। চিকিৎসা শেষে আজই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে, সেইসব আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করছিল সে।
তার মা, নিলুফার বেগম, সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছেন সাইফুল শেখকে নিয়ে। সাবা একবার তাদের দিকে তাকায়, তারপর সমস্ত কাগজপত্রের কাজ সেরে, বিল মিটিয়ে বেরিয়ে আসে।
বাইরে একটি ভাড়া করা গাড়ি অপেক্ষায়। বাবা-মাকে নিয়ে সে উঠে পড়ে গাড়িতে। গাড়ির জানালার কাঁচ দিয়ে তাকিয়ে থাকেন নিলুফার বেগম ও সাইফুল শেখ।
তাদের ছোট্ট সাবা, যে একদিন আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছিল, আজ কাঁধে দায়িত্বের ভার নিয়ে একাই সামলে নিচ্ছে সবকিছু।
মনে পড়ে যায় আরেকটি নাম, সোহা। আজ যদি সেও থাকতো, নিশ্চয় এমনই হতো, নিঃশব্দে, দায়িত্ববোধে ভরা। সোহার কথা মনে হতেই, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা অশ্রু। সাবা সেই দৃশ্য দেখে রিয়ারভিউ মিররে। কিছু বলেনি, শুধু চোখটা খানিক নরম হয়ে ওঠে।
বাড়িতে এসে সাবা বাবাকে ধরে নিয়ে যায় ভেতরে।
নিলুফার বেগম ব্যাগগুলো নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে একটি সোফায় বসে পড়েন। চারপাশে যেন নেমে আসে এক ধরনের শান্ত স্নিগ্ধতা। তখনই, সাবা মা–বাবাকে পাশে বসিয়ে ধীরে, মৃদু স্বরে বলল—
-"অনেক দিন হলো ভার্সিটিতে যাওয়া হয় না। আজ যেতেই হবে। আর একটা কথা, আমি আজ রাতে বাড়ি ফিরছি না।"
নিলুফার বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করলেন—
-"বাড়ি ফিরবে না মানে? কোথায় যাবে তুমি?"
সাবা চোখ নামিয়ে শান্তভাবে উত্তর দিলো—
-"আপুর কাছে। কাল রাতে একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম... আর সেই বিপদই আমাকে আপুর সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। ভাগ্যক্রমে তার সাথেই দেখা হয়ে যায়।"
নিলুফার বেগম ও সাইফুল শেখ দুজনেই চমকে উঠলেন।
-"কি বলছ তুমি, সোহা?"
চোখে বিস্ময় আর কণ্ঠে উদ্বেগ। কিন্তু সাবা স্থির কণ্ঠে বলল—
-"শান্ত হও, এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। আপু ফিরে এসেছে। কেন আমাদের সাথে যোগাযোগ করে নি, সেটা তোমরা জানো। আমি এখন থেকে কিছুদিন আপুর সাথেই থাকবো।"
নিলুফার বেগমের চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল। কণ্ঠে কান্না গোঁধরে বললেন—
-"আমাকে একবার নিয়ে চল মা। আমি একটিবার আমার সন্তানকে দেখতে চাই।"
সাবা তাকিয়ে বলল—
-"আপু যদি তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়, আমি অবশ্যই তোমাদের নিয়ে যাব।"
-"সত্যি বলছিস মা?"
-"হুম।"
আর কিছু না বলে সাবা উঠে পড়ল। তার চোখে-কান্না নেই, কিন্তু মন ভারি। বাবা-মায়ের প্রতি জমে থাকা অভিমানের ধোঁয়া এখনো তাকে ঘিরে আছে। তবুও সে জানে, ভুল সব মানুষই করে। সন্তানরা যখন ভুল করে, বাবা-মা তো নিঃশর্তে ক্ষমা করে দেয়। তাহলে একটিবার বাবা-মায়ের করা ভুল কি ক্ষমা করে আঁকড়ে ধরা যায় না?
সাবা জানে, তার সাথে অন্যায় হয়নি, হয়েছিল আপুর সাথে। তাই রাগ কিংবা ক্ষমা করা, দুটোই আপুর অধিকার।
চোখের কোণে জমে থাকা জল সাবা নিঃশব্দে মুছে ফেলল। তারপর একটিবার পেছনে না তাকিয়েই ভার্সিটির পথে রওনা হয়ে গেল।
.
.
.
-"মিস্টার তীব্র নীল চৌধুরী, আপনার নামে একটি পার্সেল এসেছে।
তীব্র মনোযোগের সঙ্গে কাজের মধ্যে মগ্ন ছিলেন। নতুন চাকরিতে যোগদান করায় কাজের চাপ বেড়ে গেছে বহুগুণে। সাথে নিজের কোম্পানির কাজগুলোও তুর্যকে বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে তীব্র ভীষণ ব্যস্ত। হঠাৎ তার পিএ আকাশের ডাকে মনোযোগ ভেঙে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন হাতে রাখা এক ঝরঝরে সাদা গোলাপের তোড়া। ভ্রু স্বতঃস্ফূর্তভাবে কুঁচকে উঠল তীব্রর; কে পাঠিয়েছে এই তোড়া? আবারো সাদা রঙের। তীব্রের জীবনে সাদা রঙের প্রতি এক অদ্ভুত টান যা অতি আপন ও কাছের কেউ ছাড়া বাহিরের কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কপালে তিন ভাঁজ আরেকটু গভীর হলো। আঙ্গুলের ইশারায় ভেতরে আসতে বললেন আকাশকে। আকাশ চুপিচুপি ভেতরে এসে গোলাপের তোড়াটি টেবিলের ওপর স্থাপন করল।
-"কে পাঠিয়েছে এই তোড়া?" তীব্র জিজ্ঞেস করলেন।
-"সেটা আমি জানি না, স্যার। রিসেপশনে এটা আপনার নামে ছিল, সেখান থেকে এনে দিয়েছি।" আকাশ উত্তর দিলো।
তীব্রর কপালে ভাঁজ আরও গাঢ় হলো। এমন কেউ তো নেই, যে তাকে গোলাপের তোড়া পাঠাবে। ভাবনার ভারে চোখ পড়ল তোড়ার মাঝে থাকা এক কার্ডে। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তীব্র কার্ডটি তুলে নিলেন।
"আমার শুভ্রতানয়,
আমি আপনাকে ভালোবাসি।
এই ভালোবাসা কোনো শোরগোল নয়, কোনো দাবি নয়, কোনো শর্ত নয়। এটা এক নিঃশব্দ দীপ্তি, যেমন করে ভোরের প্রথম আলো ছুঁয়ে যায় জানালার কাঁচ,
তেমনই আপনি ছুঁয়েছেন আমার হৃদয়।
আমি আপনাকে ভালোবাসি, যেভাবে সাদা মেঘ ভালোবাসে নীল আকাশকে, যেভাবে চাঁদের আলো নেমে আসে নির্জনতার গায়ে শুধু পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
আপনার নীরবতা আমাকে শান্তি দেয়, আপনার চোখের শুভ্রতা আমাকে সাহস দেয়। আপনার উপস্থিতি যেন এক নির্মল বিশ্বাস, যার পাশে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকেই একটু বেশি ভালোবাসতে শিখেছি।
শুভ্রতানয়,
আপনার এই সাদামাটা অথচ অসীম মমতায় আমি এক পৃথিবী খুঁজে পেয়েছি। তাই, এই শুভ্র হৃদয়ের পাতায় আমি আমার ভালোবাসার নাম লিখছি
শুধু আপনার জন্য।"
তীব্র কার্ডে লেখা প্রতিটা শব্দ পড়ে গেল। মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, নিস্তব্ধতার চাদর ঘিরে ধরল চারপাশকে। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল।
তার কাঁধে জড়ানো চাপ, হৃদয়ের ভেতর তুফান, কিন্তু বাইরের তার মুখ নিঃসঙ্গ ও নির্মম নিরবতা বজায় রেখেছিল। ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়ালো, নিঃশব্দে হাতে নেওয়া কার্ড আর সাদা গোলাপের তোড়া নিয়ে।
সাবধানে এগিয়ে গেল ডাস্টবিনের কাছে। যেন এই অপ্রয়োজনীয় ভালোবাসার নিদর্শনগুলো ফেলে দিয়ে নিজের মনকেও মুক্ত করার চেষ্টা করছিল। তীব্র হাত বাড়িয়ে তোড়া আর কার্ড দুটো ছুঁড়ে ফেলল পলিথিনের ভেতরে। ঘুরে দাঁড়িয়ে, ঠান্ডা কণ্ঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"নেক্সট টাইম, এই রকম ফালতু জিনিস আমার সামনে নিয়ে আসবে না।"
আকাশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ ছিল, তারপর সরে এসে মৃদু সুরে বলল—
-"ওকে, স্যার।"
তীব্রের চোখে স্বল্প এক ক্ষণ মনে হলো কোনো আভাস নেমে এলো। এরপর ধীরে ধীরে বলল—
-"তুমি এখন আসতে পারো।"
আকাশ মাথা নিচু করে চুপচাপ চলে গেলো। তীব্র কিছুক্ষণ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে মনের গভীরে গহীন চিন্তা করলো। তারপর নিজেই মৃদু উচ্চারণ করলো—
-"এইসব ভালোবাসা আমার জন্য নয়। এগুলো আমাকে আমার লক্ষ্য থেকে দুরে সরিয়ে নেবে। না, এই মেয়েটিকে যেভাবেই হোক আমার থেকে দূরে রাখতে হবে। বহুল প্রতীক্ষার পর আমি আজ এখানে এসেছি, আমার লক্ষ্যে পৌঁছতেই হবে।"
অন্যদিকে, শিফা অফিসের নিচে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে চলেছে। তার ভার্সিটিতে যাওয়া উচিত, কিন্তু এই পিএর বাচ্চার কোনো খবরই নেই। সে উদ্বিগ্ন হয়ে এদিক-ওদিক পায়চারি করছে। দৃষ্টি অফিসের মেইন গেটের দিকে আটকে আছে। আইডি কার্ড ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। হঠাৎ আকাশকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে, সে তার হাতেই ফুলের তোড়া ধরিয়ে দিয়েছিল। অবশেষে আকাশের মুখোমুখি হয়ে ছুটে গেলো শিফা।
আকাশের ফ্যাকাশে মুখ দেখে সে জিজ্ঞেস করল—
-"কি হয়েছে?"
আকাশ মলিন মুখে শিফার দিকে তাকিয়ে বলল—
-"আপনার দেওয়া তোড়া স্যার ডাস্টিন ফেলে দিয়েছে, মাম।"
-"কিহহহহহহহ?" শিফার কণ্ঠে অবিশ্বাস আর হতাশার মিশ্রণ।
আকাশ হালকা ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। শিফার মুখ মলিন হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে সে উল্টো পথে হাঁটতে লাগল। আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আর শিফার প্রস্থান লক্ষ্য করলো। মনের গভীরে ভাবলো,
"মেয়েটার কপালে কি আছে, যা এমন হল?
ভালোবাসায় পড়েছিল, আর ছেলে পেলো না।" চিন্তার ভারে আকাশের বুক ভারী হয়ে এল, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরে চলে গেল।
ওসমান মোহা বিপদে আছে। ওরহান আজ অফিসে উপস্থিত হয়নি। সে গেছে ভেলভেট ব্লুমে, সেটি নতুন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানে সময় দেওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজন। আবার সেখানে সোহাও আছে। খান কোম্পানির দেখাশোনা করার জন্য ওসমান ও তার বাবা-চাচা রয়েছেন, তাই বড় ধরনের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
তবে সমস্যা একটা হয়েছে। আর সেই সমস্যার সূচনা করেছে মিহিরিমা। তার সঙ্গে এঙ্গেজমেন্ট ভেঙে যাওয়ার কারণে তার এই আক্রমণ, যা বুঝতে বাকি নেই।
ওমর খান, যদি অন্য সময় হত, ছেলেকে ইচ্ছেমতো বকতেন। কিন্তু মিহিরিমাকে নিয়ে সংসার করা সম্ভব নয়, এই সত্যটি গত কয় বছর ধরে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাই ছেলের সিদ্ধান্তে কোনো আপত্তি করেননি।
কোম্পানিতে এই আচমকা বিপর্যয় পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে চমকে দিয়েছে। আজ একটি বড় ডিল সই হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে সেই ডিল চলে গেছে চৌধুরী গ্রুপের হাতে। মিহিরিমার চালাকী এবং পটপরিবর্তনের জোরেই তারা ডিলটি হাতিয়ে নিয়েছে। অফিসে এখন এক চরম হুলস্থুল পড়ে গেছে। সবাই দোষারোপ করতে ব্যস্ত।
এই সামান্য কাজটি করতে না পারলে, ওরহান একে একে সবাইকে গিলে খাবে, এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।
কাজের ভিড়ে ডুবে আছে ওসমান। এমন সময় অফিসে প্রবেশ করলেন ওমর খান। তার চেহারায় উদ্বেগ, চোখে শঙ্কা আর কণ্ঠে স্থির এক টান। ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন—
-"সমস্যাটা কি? কোথা থেকে ঝামেলা শুরু হয়েছে যার কারণে ডিলটা আমার পেলাম না। কিছু জানতে পেরেছ?"
ওসমান ধীর স্বরে উত্তর দিল—
-"আমাদের ডিলের কিছু কাগজ লিক হয়েছে, যার কারণে মিহিরিমার পক্ষে এই ডিল পেতে কোনো বাধা হয়নি।"
ওমর খান প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন—
-"কে করেছে এই কাজ?"
-ডোন্ট নো, আব্বু। এটা খুঁজে বের করতে হবে। তবে আমার সন্দেহ, এটা কোনো ঘনিষ্ঠ কারো কাজ, না হলে এ কাজ করা সম্ভব নয়। অফিসের মধ্যে যে ব্যক্তি ডিলের কাগজ হঠাৎ করে হাত দিতে পারে, তাদের মধ্যেই কেউ হবে।"
-"কে হতে পারে সেই লোক?"
-"আশ্চর্য, আব্বু! আজকেই সব ঘটনা ঘটে গেছে, এত দ্রুত আমি জানবো কি করে।"
-"তোমার ভাইয়ের কানে এইসব গেলে গিলে খাবে আমাদের।" ওমর খান ঠোঁটকাটা স্বরে বললেন।
-"জানি আমি!" ওসমান মুখে এক ধূসর ছায়া মেখে বলল, "তুমি এখন এখান থেকে চলে যাও। আমাকে কাজ করতে দাও।"
ওমর খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে অফিস থেকে প্রস্থান করলেন।
ওসমান নিজের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে করেই হোক এই সমস্যার মোকাবেলা নিজেই করতে হবে। সব কাজ ভাইয়ের ওপর নির্ভর রাখা যাবে না।
তারপর দ্রুত পিএ তুবাকে কল করল—
-"মিস তুবা, আমাকে এই অফিসের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ এনে দিন। এবং এই ডিলের সাথে জড়িত সকলের কল ডিটেইলস ও ব্যক্তিগত তথ্যও। দুই ঘণ্টার মধ্যে সব আমার সামনে চাই।"
-"ওকে, স্যার!" তুবা উত্তর দিল।
-"ইউ মে গো নাউ।"
-"ওকে স্যার।"
তুবা তাড়াতাড়ি চলে গেল, ঠিক যেভাবে এসেছিল।
ওসমান চেয়ারে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি মুখ, সাবা।
.
.
.
সোহা কার্ডটি পড়ে ফুলগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ওর চোখে যেন এক অপার অনিশ্চয়তার ছায়া। পাশ থেকে মিরহা নিঃশব্দে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল, কার্ডে কী লেখা রয়েছে।
সোহার স্থিরতা দেখে মিরহার কৌতূহল আরও বাড়ল। সে ধীরে সুযোগ বুঝে কার্ডটি তুলে নিল। কার্ডের কথাগুলো পড়ে সোহার ভ্রু কুঁচকে উঠল।
মিরহা মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে কার্ডটা পড়ে ফিসফিস করে বলল—
-"এই কুদ্দুসটাকে একটা মেডেল দেওয়া উচিত, ভণ্ডামির অলিম্পিকে গোল্ড জিতবে! একদিকে ছুরি চালায়, আরেকদিকে প্রেমপত্র ছাপায়! সালা দুই নম্বরের নাগ! বিষে ভরা বালতিও এত মিষ্টি করে কথা বলতে পারে না! তোর শরীরে বিষক্রিয়া হয় না হে কুদ্দুস?”
তারপর মুখটা এমনভাবে ভেংচি কাটল, যেন স্বয়ং কুদ্দুসকেও দংশন করতে পারত। মুখে বিদ্রুপের রেখা টেনে, বিড়বিড় করে নিজের রাগ প্রকাশ করতে লাগল মিরহা।
এমন সময় হঠাৎ সোহা দাঁড়িয়ে উঠল। আচমকা তার এভাবে উঠে দাঁড়ানো দেখে মিরহা খানিকটা চমকে পিছিয়ে গেল।
সোহার দৃষ্টি ফুলগুলোর দিকে, যা দশজন মানুষের হাতে ধরা। তার চোখে তখন এক তীব্র ব্যঙ্গ। ঠোঁটে ফুটে উঠল রহস্যময় এক বিদ্রুপের হাসি।
ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা দশজন মানুষ একটু হকচকিয়ে গেল। তারা একে অপরের দিকে তাকালো, চোখে প্রশ্নের ছায়া।
ঠিক তখনই সোহা তুরির ভঙ্গিতে উচ্চস্বরে বলল—
-"Follow me!"
লোকগুলো একে একে সোহার পেছনে চলতে শুরু করল। মিরহা প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না, তবে দেরি না করে সেও তড়িঘড়ি করে তাদের পেছনে পা বাড়াল। সবার পদচারণায় যেন একটা অদৃশ্য তীব্রতা।
সোহার পেছনে পেছনে সবাই নিচে নেমে এলো। অফিসের বাইরের খোলা জায়গাটি দেখিয়ে সোহা গম্ভীর স্বরে বলল—
-"তোড়া গুলো ওই খোলা জায়গাটায় সাজিয়ে রাখ।"
তার নির্দেশে কেউ কিছু না বলেই নীরবে ফুলগুলো সাজাতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওরহান ও ইহাব গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।
ওরহান একটু বাইরে গিয়েছিল,নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ফুলগুলো পাঠিয়ে সে আর অফিসে ফিরে আসেনি। কিন্তু হঠাৎ সোহার সাথে ডেলিভারি বয়দের বাইরে দেখতে পেয়ে থমকে গেল। কপালের রেখা কুঁচকে উঠল। তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল সে। চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সোহার দিকে গিয়ে স্থির হলো।
সোহাও দেখতে পেল ওরহান দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে নিজের শরীর ঘুরিয়ে ওরহানের দিকে ফিরে দাঁড়াল। দুই হাত বুকের ওপর গুঁজে নিল, চোখে আগুনের মতো তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টি।
ওরহান থেমে রইল। বুঝে উঠতে পারছিল না সোহার এই অদ্ভুত আচরণের মানে কী। সব ফুল এভাবে রাস্তায় সাজানোর উদ্দেশ্য কী? সে প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে, সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুখে অভিব্যক্তির ছায়া নেই, একদম নির্লিপ্ত, এক নিঃশব্দ জিজ্ঞাসা তার চোখে।
সোহা সেটা লক্ষ করল। ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক সূক্ষ্ম বিদ্রুপমাখা হাসি। তারপর সে চারদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে একটু এগিয়ে গিয়ে এক লোকের হাত থেকে সিগারেট ধরানোর লাইটারটি নিয়ে এলো। ঠিক তখনই মিরহাও হাজির হলো, হাতে একটি বোতলে তরল কিছু।
সোহা একবার ওরহানের দিকে তাকাল। ওরহান তাকিয়ে আছে তার দিকে, চোখে এক অদ্ভুত রকমের প্রশান্তি। যেন তার চারপাশে কোনো আলোড়ন নেই, কোনো শব্দ নেই।
সোহা চোখ ফিরিয়ে নিল। তারপর ফুলের স্তূপের মাঝ থেকে একটি লাল গোলাপ তুলে নিল হাতে। সেই মুহূর্তে যেন চারপাশ স্তব্ধ।
মিরহার হাত থেকে তরল পদার্থের বোতলটি নিয়ে, নিঃশব্দে তা ঢেলে দিল গোটা ফুলের ওপর, এক নিখুঁত নিষ্ঠুর শীতলতায়। নিজের হাতে থাকা লাল গোলাপে লাইটার ছুঁইয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। অগ্নিশিখা জ্বলে উঠল নিঃশব্দে। আর ঠিক তখনই সেই জ্বলন্ত গোলাপটি সে ছুঁড়ে দিল বাকি ফুলগুলোর ওপর। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা দাওদাও করে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
সোহা নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল সেই অগ্নিমণ্ডলীর সামনে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল ওরহানের দিকে। তার দৃষ্টিতে ছিল এক অন্তর্নিহিত তীব্রতা, এক প্রতিবাদের ব্যঙ্গ, এক বিষাক্ত হাসি যেন চিৎকার করে বলছে, "এই ফুলের সৌন্দর্য যতটাই বাহারি হোক, এর গন্ধে বিষ ছিল!"
ওরহান একটুও নড়ল না। ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল সোহার দিকে। যেন পৃথিবীর সব শব্দ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, চারপাশের অগ্নি, মানুষের কৌতূহল, সব ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেবল তারা দুজন। আর মাঝখানে, জ্বলতে থাকা সেই রক্ত লাল গোলাপ।
ওরহান নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। চোখে কোনো ব্যাকুলতা নেই, তবু সোহার দৃষ্টির সঙ্গে তার দৃষ্টি যেন বাঁধা পড়ে গেছে এক অদৃশ্য ডোরে। চারপাশে আগুনের দহন, কিন্তু ওরহানের দেহভাষায় কোনো আলোড়ন নেই।
সোহা তাকিয়ে আছে তার চোখে। আর ওরহান, তার ঠোঁটের কোণে এক নিঃশব্দ শব্দ ভেসে ওঠে, যেন নিজের সত্তার গভীর থেকে উঠে আসা এক স্বীকারোক্তি—
-"বিষরানীর বিষে ছেয়ে গেছে আমার সত্তার আঙিনা,
এই বিষের নিরাময় লুকিয়ে ওর অস্তিত্বে গাঁথা এক নীরব ঘ্রাণিনা। তাই তাকে কাছে টেনে নেওয়া আজ শুধু খেয়ালের খেলা নয়, এ আমার বাঁচার সংগ্রাম, প্রেমের বিষে জর্জরিত এক আত্মঘাতী আগুনে পোড়া জ্বালা!"