ফিরে দেখা

পর্ব - ১

🟢

ঠাসস্... ঠাসস... পরপর দুই গালে পড়ল কঠোর পুরুষালি থাপ্পড়। সোহার মাথাটা ভন ভন করে ঘুরতে লাগল।

-"তোর মতো নষ্ট, খারাপ মেয়ে, যে নিজের বাবার সম্মানের কথা একবারও চিন্তা করে না, এমন মেয়ে আমার দরকার নেই। এখনই বের হয়ে যা আমার বাসা থেকে, আর কখনো যেনো তোর চেহারা দেখতে না হয়!" এই কড়া শব্দগুলো বলে সাইফুল শেখ দরজা জোরে ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দিলেন, সোহাকে কোনো যুক্তি সাফাই দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে।

দূরে দাঁড়িয়ে, নিজের বড় বোনের এই বেদনার্ত অবস্থা দেখে সোহার ছোট বোন সাবা কাঁপছে ভয়ে, বোনকে আঁকড়ে ধরে যেনো তার অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে চায়। আর মা নিলুফার বেগম নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে তার ঘৃণার অম্লান ছাপ স্পষ্ট।

প্রবল ঝড়বৃষ্টির অন্ধকার রাতে সোহাকে তার নিজের পরিবার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে, বৃষ্টির মধ্যে পা বাড়িয়ে চলেছে সে। নিজের অন্তরে ভাবছে, যে আপনজনেরা বিশ্বাস করেনি তার কথা, যারা লোক দেখানো কয়েকটি অভিযোগ দেখে তাকে দোষারোপ করেছে, তারা তাকে নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগও দেয়নি। আজ থেকে সোহা তাদের কাছে মৃত, আর কখনো ফিরবে না সেই শেখ বাড়িতে, না কখনোই।

.

.

.

.

চার বছর পর আবারও সেই চোখের মুখোমুখি, আর 'ওরহান খান শাহীর' চোখের মালিকটি ভীত হয়ে কাঁপছে। গত চার বছর ধরে সে খুঁজে বেড়িয়েছিল তাকে, আর আজ সেই চোখের মালিক হাজির হয়েছে তার নিজের কোম্পানির সাকসেস পার্টিতে।

কিছুক্ষণ আগে—

"Masquerade party"

পুরো হলরুম জুড়ে ঝলমলে আলোয় সেজে উঠেছে আজকের পার্টির আভাস। সাদা রঙের সমগ্র সাজসজ্জায় রাঙানো হয়েছে প্রতিটি কোণা। মাঝখানে বিশাল আকৃতির ঝাড়বাতি ঝুলছে, তার তলায় ফাঁকা রাখা হয়েছে নৃত্যের জন্য স্নিগ্ধ এক আয়তন। চারিপাশে গোলাকার চেয়ার-টেবিল, সোনালী ও সাদা কাপড়ে মোড়া, প্রতিটি টেবিলের কেন্দ্রে সাজানো সাদা গোলাপের গুচ্ছ। এক পাশে সাজানো রয়েছে নানা রকম ড্রিঙ্কস, আর অন্য পাশে ভোজনের আসর। হলের প্রবেশদ্বার থেকে সোজা এগিয়ে স্টেজ গড়া হয়েছে বক্তৃতা ও সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য।

আজকের পার্টির মূল আকর্ষণ ‘ওরহান খান শাহীর’। সম্পূর্ণ সাদা স্যুটে নিজেকে মোড়ানো, চোখে সোনালী রঙের মাস্ক আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার ফিয়েন্স মিহিরিমা চৌধুরী, সোনালী-সাদা রঙের সংমিশ্রণে তৈরি লং গাউনে সেজে, চোখ সোনালী মাস্কের আড়াল। এটি ছিল খান কোম্পানির সাফল্যের উদযাপন। পার্টির থিমও ছিল সাদা ও সোনালী রঙের অতিথিরা সবাই সেদিকে সামঞ্জস্য রেখে সাজ সজ্জায় মেতে উঠেছে, চোখে নানা নকশার মাস্ক পরে।

পার্টির শুরু মাত্র, সবাই একে একে হাজির হচ্ছেন এই বিশাল হলরুমে। ওয়েটাররা ট্রেতে ট্রেতে ড্রিঙ্কস পরিবেশন করছেন, অতিথিরা পছন্দমতো সেগুলো উপভোগ করছেন। ওমর খান সকলের উদ্দেশ্যে স্টেজে উঠে মাইক্রোফোনটি হাতে নিয়ে বললেন—

-"আজকের এই পার্টি আমার বড় ছেলের অর্জনের খুশিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কয়েকদিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিলের কারণে আমাদের সবাইকে অগণিত বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আমার ছেলে, ওরহান খান শাহীর, সেই ডিল মাত্র সাত দিনের মধ্যে সাফল্যের সঙ্গে সাইন করেছে। আমি সত্যিই গর্বিত, এমন সন্তানের পিতা হতে পেরে।"

ওমর খান আরও কিছু প্রশংসাসূচক কথা বলেন তার তিন সন্তান ও পরিবারের প্রতি, এরপর ছেলের হাতে মাইকের দায়িত্ব তুলে দেন।

-"আজকের এই সাফল্য শুধুমাত্র আমার একার নয়, আমার পরিবারের সমগ্র সদস্যদের অবদান, তারা যদি আমাকে সহায়তা না করতো, আমি আজ এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারতাম না। আমি ধন্য, এমন বাবা-মা ও একটি সুন্দর পরিবার পেয়েছি। তাদের অবিচল ভালোবাসা আর সমর্থনেই আজ আমি এখানে এসেছি। একজনকে না বললেই নয়, আমার প্রিয় ভাই, কলিজার টুকরো ওসমান খান শান্ত, যিনি প্রতিটি ধাপে আমার পাশে ছিলেন। তার অবদান ব্যতীত আজকের এই সাফল্য অসম্ভব ছিল। তাই, এই সাকসেস আমার নয়, আমার পুরো পরিবারের।"

ওরহানের বক্তব্য শেষ হতেই ওসমান একটি স্লো কাপল ড্যান্সের ঘোষণা দেন। এরপর সবাই একে একে ড্যান্স ফ্লোরে উঠে, ইংরেজি স্নিগ্ধ সুরে মগ্ন হয়ে স্লো ড্যান্স শুরু করে।

সিনারি-১

সেই মুহূর্তেই পার্টির গেটের সামনে এসে থামে এক লিম্ব কার। লিম্বো কার থামার পর দরজা খুলে বেরিয়ে আসে কালো হিল পরিহিতা পা। তার পেছনে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে রক্তিম রঙের শাড়িতে সেজে এক রহস্যময়ী নারী। মায়াবী শ্যামলা গায়ের রঙ, লম্বা, ঘন কালো চুল পিছনে ঝরে রাখা, চোখে কালো রঙের মাস্ক। গাড়ি থেকে নেমে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে পার্টির ভিতরের বিশাল হল রুমের দিকে, যেখানে সবাই ড্যান্সের ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।

অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক রুম, নীরবতার মাঝে নরম স্পটলাইট এসে পড়েছে প্রতিটি যুগলের উপর। আলোর স্নিগ্ধ ছায়ায় প্রতিটি মুখ আবছা, অথচ স্পষ্ট, প্রেম ও প্রত্যাশায় দীপ্ত। সেই সব মুখের ভিড়ের মধ্যেই রমণীটির খোঁজ শেষ হয় এক মুখে, কাঙ্ক্ষিত মুখ দেখে থমকে যায় মুহূর্ত। ধীরে ধীরে, এক অদ্ভুত স্থিরতা নিয়ে সে এগিয়ে আসে। সঙ্গীতের তালে তালে সে মিশে যায় বাকিদের মাঝে, নিঃশব্দে হয়ে ওঠে নৃত্যের একটি অংশ।

হাতের মৃদু স্পর্শে, পায়ের ছন্দে, শরীরের ভঙ্গিমায় সকলে বুঁদ নাচে। হঠাৎ করেই ঘোষিত হয়—

"Step change!" সেই সঙ্গে বলা হয় পার্টনার বদলের কথা।

প্রতিটি যুগল একে অপরের হাত ধরে ঘুরতে থাকে, তারপর ছেড়ে দেয় সেই হাত, যেন নিয়তির এক খেলা, যা ঘুরিয়ে দেয় সম্পর্কের চাকা। একেক রাউন্ডে বদলাতে থাকে সঙ্গী, একে একে। এই সৌন্দর্যের মাঝেই, রমণীটি এক চাতুর্যে অংশ নেয় এই খেলার। কিছু রাউন্ড শেষ হতেই, হঠাৎ করেই তার গন্তব্য হয়ে ওঠে ওরহান খান শাহিরের-এর বাহু। তাল-লয়ে দু’জন মিশে যায় এক ছন্দে। ওরহান নাচতে নাচতে মেয়েটির মুখের দিকে তাকাতেই, তার চোখে পড়ে সেই চেনা চোখজোড়া। চোখে চোখ পড়তেই ওরহান স্তম্ভিত, যেন সময় থেমে যায় সেই এক দৃষ্টিতে।

রমণীটি ওরহানকে স্তব্ধ দেখে হালকা বাঁকা হাসে। ধীরে ধীরে সে তার হাতটা নিয়ে যায় ওরহান-এর কানের পাশে, আঙুল স্লাইড করে তার চুল ছুঁয়ে যায়, রোমাঞ্চ ছড়ায় প্রতিটি কাঁপনজাগানিয়া স্নায়ুতে। তারপর সে তার ঠোঁট ওরহান-এর কানের কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বলে—

"Congratulations, Mr. Orhan Khan Shaheer…"

ঠিক সেই মুহূর্তেই, নৃত্যের ভিড়ে সে ওরহানকে ছেড়ে দেয়, আর এক চোখের পলকে যেন মিলিয়ে যায়। বাকি থেকে যায় শুধু এক অলীক অভিজ্ঞান, আর ওরহান-এর স্তব্ধ দৃষ্টি, যেন এখনো সে তাকিয়ে আছে সেই চোখের অতল গহ্বরে। ওরহান থমকে যায়,মিহিরিমার ডাকে ভাবনাচিত হয়। মুহূর্তে যেন চেতনা ফিরে পায়। তারপর, পাগলের মতো সেই রক্ত লাল শাড়ি পরা রমণীকে খুঁজতে ড্যান্স ফ্লোর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ওরহানের এই অপ্রত্যাশিত প্রস্থান দেখে তার পেছনে পেছনে মিহিরিমা ও ওসমানও বেরিয়ে আসে।

-"কি হয়েছে দাদাভাই? কাকে খুঁজছো?"

-"কি হয়েছে ওরহান? এইভাবে ড্যান্স ফ্লোর থেকে চলে গেলে! জানো না, সেটা আমার জন্য কতটা অপমানজনক মনে হয়েছে?"

-"ও শাট আপ, মিহিরিমা! সব কিছু নিজের দিকে না টানলে হয় না তোমার? প্রতিটা বিষয়ে নিজেকে জড়াতে হবে কেনো?

আমি যাচ্ছি ভাই, আমার জরুরি কিছু কাজ আছে। তোরা পার্টি শেষ কর।" বলেই ওরহান দ্রুত বেরিয়ে যায়।

ওরহান বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। ওরহান একবার আকাশের দিকে তাকালো আর সাথে সাথে বৃষ্টি নেমে পড়লো। ওরহান তোয়াক্কা করলো না গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরলো। ওদিকে ওসমান এই বৃষ্টির মধ্যে নিজের বড় ভাইকে এইভাবে উন্মাদের মতো ছুটে যেতে দেখে চিন্তিত হলো। সাথে মিহিড়িমার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হলো। ক্ষিপ্ত মেজাজে মিহিরিমাকে বললো—

-"মিহিরিমা, তুমি কি দাদাভাইকে একটু শান্তি দিতে পারো না? সব সময় কেন এমন আচরণ করো?

নিজেকে ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারো না তুমি!

যত্তসব! কোন কুক্ষণে যে বাবা তোমার সঙ্গে দাদাভাইয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন, আল্লাহ জানেন!"

ওসমান এতটুকু বলেই ভেতরে চলে যায়, আর মিহিরিমা রাগে গজগজ করতে করতে তার পেছন পেছন ভিতরে চলে আসে। ওসমান সবার মাঝে গিয়ে ঘটনাটি খুলে বললে, সকলেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

এটি ছিল একটি অফিসিয়াল পার্টি। তাই বাড়ির ছোটদের সঙ্গে আনা হয়নি, তারা বাসায়ই ছিল। বাড়ির বড়রাও রাতের খাবার শেষ করেই খুব বেশি দেরি না করে সবাই বাসায় ফিরে আসেন। সুরাইয়া বেগম বাসায় ফিরে ওরহানের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করে বেশ চিন্তায় পড়ে যান। সবাই খাওয়া-দাওয়া করে যার যার ঘরে ফিরে গেলেও, কেবল তিনি চুপচাপ বসে থাকেন ড্রয়িংরুমে, একা, অপেক্ষায়।

রাত দুটো পেরিয়ে যায়। ঠিক তখন, ওরহান বাড়িতে ফিরে আসে। এসে দেখে মা সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। চুপচাপ তার পাশে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে জাগায়—

-"তোমাকে কতবার বলেছি মা, আমার ফিরতে দেরি হলে অপেক্ষা করবে না। তুমি তো ঘুমের ওষুধ খাও, এতরাত জাগলে শরীর খারাপ করবে।"

-"কিছু হবে না আমার। তুই বাইরে থাকলে আমার মনটা শান্ত হয় না। একটু তাড়াতাড়ি বাসায় এলেই তো পারিস আমার জন্য। কোথায় ছিলি বাবা? রাতে খেয়েছিস?"

-"একটু কাজ ছিল মা, তাই এত দেরি হলো। না, খেয়ে আসিনি। আমি জানি তুমি অপেক্ষা করবে, তাই ফ্রেশ হয়ে আসি, তুমি খাবার দিও।"

ওরহান ওপরে নিজের ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এসে দেখে মা সব কিছু গুছিয়ে রেখেছেন। চেয়ার টেনে বসে পড়ে, আর মায়ের হাতের স্নেহমাখা পরিবেশন শুরু হয়।

-"কি হয়েছিল পার্টিতে বাবা? তুই হঠাৎ করে এভাবে চলে এলি কেন?"

-"তেমন কিছু না মা। মনে হলো যেন বহু বছর পর একজন চেনা মুখ দেখলাম।"

-"কার কথা বলছিস বাবা?"

ওরহান কিছুক্ষণ নীরব থাকে। খাবার হাতে নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শূন্যে। তারপর প্লেটটা নামিয়ে মায়ের দিকে তাকায়, চোখে কি হালকা জল চিকচিক করছিল? কে জানে! হয়তো পুরোনো ব্যথার সাগর আজও থেমে নেই। ছেলের সেই চাহনি দেখে সুরাইয়া বেগম বিস্ময়ে কেঁপে ওঠেন। তারপর বললেন—

-"সে? কিন্তু কিভাবে বাবা? এত বছর পর? তুই তো একসময় কত খোঁজ করেছিলি তাকে....তার পরিবারও তো আজ পর্যন্ত তার কোনো খবর দিতে পারেনি।আজও তারা মেয়ের আশায় পথ চেয়ে বসে আছে।তাহলে? হঠাৎ করে আজ, কেন সে তোর সামনে আসবে?"

-"জানি না মা...সত্যিই জানি না। শুধু এটুকুই জানি, ওই চোখ আমি কোনো দিন ভুলতে পারবো না।

সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর এখনো আমার কানে বাজে।

আজকের পার্টিতে....সেই ছিল মা, আমার নীলশ্যামা । আমি ওকে চিনতে ভুল করতেই পারি না মা। কিন্তু, কিন্তু আবারও আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি। নিজের ভুলের জন্য একটিবারও মাফ চাইতে পারলাম না তার কাছে।"

ওরহানের কণ্ঠস্বর যেন ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে আসে।

চোখের কোণে অশ্রু জমে ওঠে, কিন্তু সে চেপে ধরে, যেন কান্নাটুকুও তার প্রাপ্য নয়। সুরাইয়া বেগম নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেন। এই দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়।

গত চার বছর ধরে তিনি এই কান্না দেখে আসছেন, এই ভাঙা বুক, এই পুড়ে যাওয়া অতীত। কিন্তু কিছুই করতে পারছেন না, শুধু একজন মা হয়ে ছেলের পাশে নিঃশব্দে বসে থাকা ছাড়া।

সিনারি-২

বিদেশি এক কোম্পানি থেকে আজকে লোক আসার কথা খান কোম্পানিতে। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান ‘Velvet Bloom’, যারা বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম বিস্তার করেছে এবং যাদের নিজস্ব শাখা রয়েছে সারা বিশ্বে। Velvet Bloom এখন বাংলাদেশে নিজেদের একটি শাখা স্থাপন করতে চায়, সেই লক্ষ্যে খান কোম্পানির সাথে আজ তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং নির্ধারিত হয়েছে। খান কোম্পানি কেবল নির্মাণ, আর্কিটেকচার ও ইন্টিরিয়রের জগতে নিজেদের সুনাম প্রতিষ্ঠা করেছে। বহুমুখী এই প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা ও প্রতিভা বিবেচনায় রেখে, Velvet Bloom এর হেডকোয়ার্টার থেকেও তাদের বিষয়ে অবগত করা হয়েছে এবং পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকেও জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ শাখার যিনি সিইও হবেন, তিনি নিজেই আজকের মিটিংয়ে উপস্থিত থাকবেন। সকালের আলোয় তাড়াহুড়ো করে ওরহান ও ওসমান বেরিয়ে পড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে, কারণ আজকের দিনটি তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকাল ১০টার মধ্যেই সকলেই অফিসে পৌঁছেছে। দুপুর ১২টায় মিটিং শুরু হবে, আর এই মিটিংয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য সবাই ব্যস্ত। বিদেশি ক্লায়েন্ট, বিশাল এক চুক্তির সম্ভাবনা, সবকিছুতেই যেন কোনো ত্রুটি না থাকে, এটাই সবার প্রত্যাশা। মিটিং শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা আগে ওরহান ও ওসমান - ওরহানের কেবিনে বসে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ করেই ওসমান উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল—

-"দাদাভাই, কালকের পার্টির জন্য তো Velvet Bloom এর বাংলাদেশ শাখার সিইওকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, সে কি আসেনি পার্টিতে?"

ওসমানের কথায় ওরহানের খেয়াল করল, সত্যিই তো, কালকের সেই ঘটনাবর পর সে আর পার্টিতে ফিরে যায়নি, তাই সে কিছুই জানে না। তবে যদি সে গিয়ে থাকে আর ওরহানকে না দেখে ফিরে যায়, তাহলে তা যথেষ্ট খারাপ প্রতীয়মান হবে, এমনটাই ভাবছিল ওরহান। ঠিক তখনই ওরহানের পিএ ইহাব মাহতাব এসে জানালেন, মিটিং রুম প্রস্তুত, আর Velvet Bloom এর সিইওর সহকারী ফোন করে নিশ্চিত করেছে তারা পৌঁছে গেছেন। ওরহান ও ওসমান তাড়াতাড়ি মিটিং রুমে চলে আসে। সেখানে তারা অপেক্ষা করছিলেন বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিইও এসে উপস্থিত হলেন। তাকে দেখে, ওরহান ও ওসমান নম্রভাবে দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছা জানালেন।

একটি নারী পরনে তার সুতি নীল রঙের শাড়ি, সঙ্গে সাদা ব্লাউজ। চোখে হালকা কাজল আর চুলগুলো বেনি করা বাঁধা, ঠোঁটে সামান্য গোলাপী ও ন্যুড রঙের মিশ্রণ লিপস্টিকের আবরণ। কপালে কালো একটি ছোট্ট টিপ ঝলমল করছে। এক হাতে কালো রঙের একটি ঘড়ি, অন্য হাতে নীল-সাদা চুরি, কানে ছোট্ট সাদা ঝুমকো, গলায় চিকন স্বর্ণের চেইন পরিহিত সে। সামান্য উঁচু জুতায় শ্যামলা গায়ের রঙের রমণীটি যেন অতি সাধারণ অথচ মায়াবতী এক আলোর নক্ষত্র। তাকে দেখে কেউ কখনো অনুমান করতে পারবে না, সে কোনো কোম্পানির সিইও। বয়স হয়তো মাত্র ২৪-২৫, যা এত অল্প বয়সে এমন উচ্চ পদাধিকার অর্জন এক চিরস্মরণীয় কৃতিত্ব।

রমণীর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন তার পিএ মিস "মিহরা অবন্তী", ম্যানেজার "আরিফুল রাজ" এবং "এডভোকেট সূর্য শেখর"। এক এক করে সবাই মিটিং রুমে প্রবেশ করে নিজেদের বরাদ্দকৃত চেয়ার টেনে বসে পড়লেন।

উপর দিকে রমণীকে দেখে ওরহান যেন স্তম্ভিত, ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সে বুঝতে পারছে না, চার বছর ধরে যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওরহান নিজের চোখ বিশ্বাস করতে পারছে না। পাশে দাঁড়ানো ওসমানও একই অবাক। হঠাৎ ওরহানের পিএ ইহাবের ডাকে তাদের স্মিত ফিরে আসে।

-"স্যার, উনি হচ্ছেন মিস "নেসলিহান সোহা", ওনার পিএ মিস মিহরা অবন্তী, ম্যানেজার আরিফুল রাজ, এডভোকেট সূর্য শেখর। আর মিস নেসলিহান সোহা উনি আমাদের সিইও, ওরহান খান শাহির এবং এমডি ওসমান খান শান্ত।"

-"Nice to meet both of you, Mr. Khan!"

-"Nice to meet you guys as well miss soha!"

Story Cover