শ্রেয়সী প্রতিদিন নিয়ম করে খোঁজ নিল দীপ্তর শারীরিক অবস্থার। ওষুধ ঠিকঠাক মতো খাচ্ছে কি-না তাও জিজ্ঞেস করল। কেমন যেন রুটিনের মতো হয়ে গেছে। তবে দীপ্ত যে মাঝেমধ্যে ওকে ইচ্ছে করে রাগিয়ে দেয় তা সে বুঝতে পারে। খুঁনসুটিটা ওর কাছে বিরক্তিকর থেকে কখন যে উপভোগ্য হয়ে উঠল সে ভেবে পেল না।
সব মিলিয়ে নিজের মধ্যে আশ্চর্য এক পরিবর্তন টের পেল শ্রেয়সী। দীপ্তকে ওর ভালো লাগতে শুরু করেছে, পরিবারের বাইরে প্রথমবার কারো জন্য এমন টান অনুভব করছে। বাড়ি এসেও খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল মাঝেমধ্যেই। জন্মদিনের ঠিক আধাঘণ্টা আগে দীপ্তর টেক্সট মেসেজ পেল।
“ওষুধের জন্য ঘুমিয়ে পড়ব, বারোটা পর্যন্ত বাবা জাগতে দিচ্ছে না এই জন্য। পরে দেখা যাবে সকালের আগে উইশ করাই হলো না। তোমার সাথে পরিচয় না হলে কিছু অনুভূতি আমার জন্য অচেনা থেকে যেত। পৃথিবী আলোকিত হোক তোমার আলোয়। জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন, অত্যন্ত ঝগড়াটে কিন্তু ভীষণ ভালো মনের মেয়েটা।
শ্রেয়সীকে দীপ্ত।”
শ্রেয়সী কতবার যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ল! খুবই ছোট্ট সাধারণ কিছু কথা, তবুও একরাশ ভালোলাগার নির্মল বাতাস ওর হৃদয়কে যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যাচ্ছিল মিষ্টি আদুরে একটা সৌরভ, ভালোবাসার পালে জোর হাওয়া দিচ্ছিল। হঠাৎ করেই শ্রেয়সীর মনে হলো, জীবন সুন্দর।
বাবা ওর মধ্যে স্বভাববিরুদ্ধ অন্যমনস্কতা দেখে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, “কী রে মা, কী এত ভাবিস?”
শ্রেয়সী চমকে উঠে বলল, “কই, কিছু না তো বাবা।”
বাবা আর মা দু'জনেই ওর চমকে উঠা খেয়াল করলেন।
“ঠিক তো?”
শ্রেয়সী ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে, মৃদু হেসে বলল, “একদম ঠিক। আমার আবার কী হবে!”
মা বললেন, “এবার তাহলে আর বাহানা করিস না। বিয়ে নিয়ে সিরিয়াসলি ভাব।”
শ্রেয়সী সত্যিই ভাবছে এবার। দীপ্ত বর হিসেবে খুব একটা খারাপ হবে না। একটু ঘাড়ত্যাড়া গোছের, তবে শ্রেয়সী তার দাওয়াই জানে। সন্তর্পণে হাসল সে, মিষ্টি হাসি।
***
দীপ্তর ক্ষত শুকিয়ে গেছে প্রায়। মোহসীন সাহেব ওকে এই কয়দিন একটুও বাইরে যেতে দেননি। অফিসে বেশকিছু ছুটি জমেছিল, তা নিতে দীপ্তকে রীতিমতো বাধ্য করেছেন।
তিনি খেয়াল করেছেন দীপ্ত ইদানিং মোবাইলে কথোপকথন চালায়, ওই পারে যে শ্রেয়সী তা তিনি বুঝতে পারেন। তিনি খেয়াল করেছেন তার ছেলেটা সেই সময় হাসিখুশি থাকে। মেয়েটাও তো তার ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করেছে। তার সাথেও তো একদিন কথা হলো।
তিনি দীপ্তকে খেতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বাসায় অলস সময় কেমন কাটছে তোর?”
“তুমি তো জোর করে অলস বানিয়ে রেখেছ বাবা।” গোমড়া মুখে উত্তর দিল দীপ্ত।
“হ্যাঁ রে দীপ্ত, শ্রেয়সী মেয়েটা তোর শারীরিক অবস্থা নিয়ে কনসার্ন ছিল অনেক। মেয়েটা তোকে নিয়ে চিন্তা করে, তাই না?”
দীপ্ত বাবার সুরটা ধরতে পারল না, বলল, “হ্যাঁ, তা করে।”
“মেয়েটা কেমন রে?”
দীপ্ত খেতে খেতে উত্তর দিল, “ভালো। মাথায় তার একটু ছেঁড়া আছে, তবে এমনিতে মনটা ভালো।”
মোহসীন সাহেব বললেন, “তোর সাথে তো ভালোই কথা হয় দেখি।” তিনি দীপ্তকে বুঝতে না দিয়ে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বের করার চেষ্টা করছেন।
“হ্যাঁ। বন্ধুত্ব হয়েছে ওর সাথে, সেইজন্য।” বলতে বলতে দীপ্ত এবার খানিকটা সরু চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে তার মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করে বলল, “শুধুই বন্ধুত্ব, বাবা। এর বেশি কিছু ভেবো না।”
মোহসীন সাহেব অভিজ্ঞ মানুষ, তিনি বুঝলেন তার ছেলে এখনো বন্ধুত্ব পর্যন্তই আছে। এর বেশি এগোয়নি। এখন যদি দীপ্তকে বিয়ের কথা বলেন, নির্ঘাৎ একশো আশি ডিগ্রি ইউটার্ন নিয়ে নেবে। তাই এখন আর কথা তুললেন না।
তবে শ্রেয়সীর সম্পর্কে দীপ্ত ইতিবাচক এখন, এটাকে তিনি কাজে লাগাবেন বলে ঠিক করলেন। দীপ্ত অফিসে যাওয়া শুরু করতেই তিনি শ্রেয়সীর বাবাকে কল দিলেন। বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিলে তিনি জানালেন শ্রেয়সীকে জিজ্ঞেস করে তিনি উত্তর দেবেন।
***
শ্রেয়সী ঢাকায় চলে এসেছে কয়েকদিন আগে। আজ হঠাৎ বাবা এসেছেন ওর সাথে দেখা করতে।
“বাবা, তুমি এসেছো!” শ্রেয়সী বাবাকে অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে দেখে শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠল।
বাসায় এসে বসার ঘরে বসল দু'জন।
“মা আসেনি?”
“ও তোর নানু বাড়িতে গেছে।”
দুজন আরো কিছু কথা বলার পরে শ্রেয়সী রান্না ঘরে গেল। রাইস কুকারে ভাত দিয়ে গতকালের মুরগিটা গরম করে নিল, সাথে আসার সময় হোটেল থেকে কিছু ভাজি কিনে এনেছিল সেগুলো রাখল টেবিলে। সে টুকিটাকি রান্না পারে, এটা ওর কাছে পৃথিবীর সবচাইতে ধৈর্যের কাজ বলে মনে হয়। সোমাটা বাড়িতে গেছে পরশুদিন। সে একাই বাসায় এখন।
দুপুরে খেতে খেতেই বাবা বললেন, “দীপ্তির বাবা মোহসীন ভাই সেদিন কল করেছিলেন।”
শ্রেয়সী উৎকর্ণ হয়ে রইল পরের কথাটুকু শোনার জন্য, প্লেটে ওর হাত থমকে গেল ক্ষণেকের জন্য।
“উনি বিয়ের প্রস্তাব আবার দিলেন। তুই তো সেদিন বাসের ঘটনাটা বলেছিস। ও তোকে সাহায্য করেছে। তোর মাকে এখনো বিষয়টা জানাইনি৷ ভাবলাম আগে তোর মতামতটা নিই। মোহসীন ভাইও তোর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছে।”
শ্রেয়সীর পৃথিবীটা মুহূর্তের জন্য যেন অন্য এক আবেশে ভরে উঠল। দীপ্তর সাথে একটা সুখী সুখী সংসারের ছবি খেলে গেল ওর চঞ্চল দুটো চোখের তারায়। দীপ্ত নিশ্চয়ই তার বাবাকে বলেছে, নইলে তিনি তো আর বিয়ের প্রস্তাব দেবেন না৷ এটাই মনে হলো শ্রেয়সীর।
“কী হলো? বল মা? তুই কি রাজি নোস?”
শ্রেয়সী একটু সময় নিয়ে ধাতস্থ হয়ে বলল, “তুমি ভাবতে পারো বাবা, আমার আপত্তি নেই।”
বলতে গিয়ে যে কী ভীষণ লজ্জা করল, লাল নীল বেগুনি সব রঙের ছাপ যেন বাবা দেখে ফেলল এটা ভেবে।
বাবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “তুই ভীষণ সুখী হবি মা। পৃথিবীর সব সুখ আল্লাহ তোকে দিক, এই দোয়া রইল।”
শ্রেয়সী এখনো বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। নিজের এই দিকটা ওর কাছে বড্ড অচেনা লাগল। বাবাকে সে অকপটে সব কথা বলতে পারে। তবে আজ এত লজ্জা কোত্থেকে এসে ভীড়ল ওর মনে!
“আলহামদুলিল্লাহ। এবার তাহলে তোর মায়ের সাথে কথা বলে মোহসীন ভাইকে গ্রিন সিগনাল দিয়ে দেই।”