তোমার নিমন্ত্রনে

পর্ব - ৩৮

🟢

বহুদিন পর দীপ্ত অকাতরে ঘুমাচ্ছে। খুব ভোরে উঠা দীপ্ত আজ বেলা সাড়ে আটটা গড়িয়ে গেলেও ওঠেনি। শ্রেয়সী ওর পাশে এসে বসল। নির্নিমেষ চেয়ে রইল দীপ্তর ঘুমন্ত মুখের দিকে। হাজার বছর ধরে পথ চলে আজ যেন দু’দন্ড শান্তি এসে ভিড়েছে দীপ্তর চোখে, মুখে, মনে, মননে। হয়তো কোনো ভালো স্বপ্ন দেখছে ছেলেটা, একচিলতে হাসি ঠোঁটের কোণে এসে ঝলমল করছে।

শ্রেয়সীর ভীষণ মায়া হলো, এই ঘুমটা ভাঙাতে ইচ্ছে করল না। এমনিতেই খুব কম ঘুমায় দীপ্ত। আজ বরং আরেকটু ঘুমিয়ে নিক। আনমনেই শ্রেয়সী হাত রাখল ওর চুলে। চুলগুলো রুক্ষ আর উসকোখুসকো হয়ে আছে৷ কয়দিন চুলে শ্যাম্পু করেনি কে জানে। গতকাল এসেছেও বিধ্বস্ত অবস্থায়। পারফেকশন মেইনটেইন করা ছেলের সমস্ত অবয়ব জুড়ে যে চাপা যন্ত্রণাটা এতকাল ছিল, তা অত্যন্ত জীর্ণ রূপে প্রকাশিত হয়েছে। তবুও অদ্ভুত এক টান, কী প্রবল উঠা পড়া হয় হৃদয়ে। সেই টান এতটাই পরাক্রমশীল যে এই মুখের দিকে এভাবেই তাকিয়ে যেন সহস্র বছর কাটিয়ে দেয়া যায়৷

শ্রেয়সী এই কয়েকদিন খুব ভেবেছে। ওদের পরিচয় থেকে পরপর ঘটে চলা সমস্ত ইনসিডেন্ট নিয়ে ভেবেছে। ভেবে একটা সিদ্ধান্তে সে আসতে পেরেছে। তা হলো, দীপ্ত ওকে ভালোবাসে। পাগলের মতো ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা কবে থেকে হলো সেটা নিয়ে ভেবে এই প্রাবল্যটুকু অস্বীকার সে কখনো করবে না। তবে ওর এটুকু বিশ্বাস বিয়ের রাতে যখন প্রথমবার দীপ্তর কাছাকাছি এসেছিল, সেইদিন সেই চোখ জোড়ায় সে ভালোবাসাই দেখেছিল। এতে ওর ভুল নেই। অবচেতনে সুপ্ত থাকা ভয় হয়তো নিজেকেই ঠিকঠাক প্রকাশ করতে দেয়নি নিজের কাছে।

“গুড মর্নিং।”

শ্রেয়সী সম্বিৎ ফিরতে দেখল, চোখ মেলেছে দীপ্ত।

“এখন উঠবে নাকি আরও ঘুমোবে?”

“তুমি এভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে আরও কিছুক্ষণ ঘুমাতে পারি।”

দীপ্তর মুখে দুষ্টু হাসি, শ্রেয়সী কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “একদম না। মা খাবার আগলে বসে আছে।”

“মায়ের মেয়ে কী করছিল?”

“বর আগলে বসে ছিল। এখন ঢং না করে উঠো।”

দীপ্ত উঠে বসল, এরপর শ্রেয়সীর গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ অনেক দিন পরে সূর্য হাসছে। দেখতে পাচ্ছ শ্রেয়সী?”

শ্রেয়সী ঠিক একইভাবে ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। মেঘের ছায়া কেটে স্নিগ্ধ ভোর নামছে আমাদের পৃথিবী জুড়ে।”

উষ্ণ আলিঙ্গনে সুন্দর রৌদ্রজ্বল দিনের সমস্ত রোদ হৃদয়ে ধারণ করে একটা সুন্দর সকাল শুরু হলো আজ।

***

আজ দীপ্ত আর শ্রেয়সী যাচ্ছে নিলুফার রায়হানের চেম্বারে। মোহসীন সাহেবও সাথে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দীপ্ত নিষেধ করে দিয়েছে।

শ্রেয়সী গাড়িতে বসে বলল, “তুমি বাবাকে ওভাবে বললে কেন? কষ্ট পেয়েছেন।”

“এলে আরও কষ্ট পেত শ্রেয়সী। ওখানে আমাকে এমনকিছু বলতে হবে যা বাবার জন্য এই বয়সে এসে শোনাটা ঠিক হবে না। আবার একই কষ্টের মধ্য দিয়ে তাকে আমি যেতে দেব না। আমি ছোট ছিলাম, আমার কষ্টগুলো বাবা সামলে নিয়েছে। কিন্তু বাবাকেও তো ভয়ংকর মানসিক চাপের মাঝখান দিয়ে যেতে হয়েছে। লড়াই করে বাঁচতে হয়েছে। পুরনো ক্ষত নতুন করে তাজা না হোক।”

শ্রেয়সী দীপ্তর দিকে আরেকবার তাকাল ভালো করে। ওর ভেতরের সংবেদনশীল মনের সন্ধান সে আগেই পেয়েছিল, আজ আরেকবার পেল। গত কিছুদিন সেই সংবেদনশীলতাটুকুই ঢাকা পড়েছিল ভয় নামক এক কালো ছায়ার আড়ালে।

শ্রেয়সী চায় সেই কালো ছায়াটুকু সে বাক্সবন্দী করে ফেলে আসবে সহস্র আলোকবর্ষ দূরের কোনো এক কাল কুঠুরিতে, যেখান থেকে তা আর দীপ্তর জীবনে ফিরে আসার পথ খুঁজে পাবে না।

চেম্বারে ঢোকার আগে যখন ওদের ডাক পড়ল, দীপ্ত শক্ত করে শ্রেয়সীর হাতটা ধরল, যেন নির্ভরতা খুঁজতে চাইল। শ্রেয়সী আলতো করে ভরসার স্পর্শ দিয়ে আগলে ভেতরে গেল।

নিলুফার রায়হান হেসে ওদের অভিবাদন জানালেন। ভদ্রমহিলার চোখেমুখে ব্যাক্তিত্বের ছাপ। স্পষ্ট স্বরে হেসে বললেন, “কেমন আছো শ্রেয়সী?”

শ্রেয়সীর মামার বন্ধুর বোন হচ্ছেন নিলুফার রায়হান। তার মাধ্যমেই উনাকে পাওয়া। বাড়িতে যাবার আগে শ্রেয়সী উনার সাথে দেখা করে গেছে। তখনই প্রথম সামনা-সামনি কথা৷ তবে তার আন্তরিকতা দেখলে মনে হয় বহুদিনের চেনা মানুষ।

“ভালো আছি আন্টি। আপনি কেমন আছেন?”

“ভালো। দীপ্ত, তোমাকে তুমি না বললে মাইন্ড করবে?”

মাথা নেড়ে না বোঝাল দীপ্ত। শ্রেয়সী ভেতরে ঢোকার আগে পরিচয়ের সূত্র ওকে দিয়েছিল।

“আগে চা নাও। আমরা চা খেতে গল্প করি।”

নিজেই ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে ওদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন তিনি। নিজেও নিলেন এক কাপ।

“তুমি কেমন আছ দীপ্ত?”

দীপ্ত কিছুটা নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, “ভালো আছি।”

নিলুফার রায়হান মৃদু হাসলেন, তার হাসি প্রতিষেধকের মতো কাজ করল খানিকটা, “আমরা খুব স্বাভাবিক আলাপ পরিচয় করব দীপ্ত। নাথিং আনইউজুয়াল৷ তোমার দুটো কথা শুনব। এই যা। বি নর্মাল, ওকে?”

মাথা নেড়ে সম্মতি দিল দীপ্ত। ওর হাতদুটো শ্রেয়সীর ডান হাত আবারও চেপে ধরল।

“শুনেছি তুমি খুব মুভি সিরিজ দেখো। তোমার কয়েকটা প্রিয় মুভির নাম বলো তো।”

দীপ্ত খানিকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল, সব মুভির নাম যেন ভুলে গেছে। তবুও যে কয়টা ইনস্ট্যান্ট মনে পড়ল, তাই বলার চেষ্টা করল, “ফরেস্ট গাম্প, টুয়েলভ এংরিম্যান, লাইফ ইজ বিউটিফুল…..”

এরকম কিছু প্রশ্ন করে দীপ্তকে সহজ করে নিলেন। এরপর বললেন, “তোমার ছেলেবেলার গল্পটা আমাকে বলবে?”

দীপ্ত একবার শ্রেয়সীর দিকে তাকাল, সোজা চোখের দিকে। সেই চোখে নতুন করে অনেক আশা বসতি গেড়েছে। মনে মনে যাই থাকুক, সে ওই চোখে তাকিয়ে এরপর নিলুফার রায়হানের দিকে তাকিয়ে সম্মতি জানাল।

বলতে শুরু করল, যতটা ওর মনে আছে। শ্রেয়সী চেয়ে রইল দীপ্তর মুখের দিকে। সেখানে ক্ষণে ক্ষণে অভিব্যাক্তি বদল হচ্ছে। কখনো সেখানে প্রগাঢ় বিষাদের ছাপ, কখনো নিদারুণ যন্ত্রণা, কখনো ভয়, কখনো স্বপ্ন ভঙ্গের ব্যথা, মা থেকেও হারিয়ে যাওয়া সমস্ত কষ্টগুলো যেন ওর চোখেমুখে লেখা আছে।

অনেক কথা শ্রেয়সীও আজই প্রথম শুনল। শুনে শিউরে উঠল কখনো কখনো। ফুটফুটে এক শিশুকে কী নিদারুণ কঠোরতা সহ্য করতে হয়েছিল, সমাজের কাছ থেকে, বন্ধুবেসী লোকের কাছে থেকে এমনকি জন্মদাত্রীর কাছ থেকে! এমন পরিস্থিতি যেন কারো শত্রুরও না হয়। মনে মনে বলল শ্রেয়সী। সমস্ত সময় সে দীপ্তকে ভরসা দিয়ে গেল বিশ্বস্ত সহধর্মিণী হয়ে।

Story Cover