দীপ্ত যে বদলে যাচ্ছে তা সে নিজেও বুঝতে পারছে। যেখানে কোথাও যাবার থাকলে সে একেবারে শতভাগ পারফেকশন আনার চেষ্টা করে নিজের এ্যাটায়ারে, এপিয়ারেন্সে, সেখানে এখন সে প্রিয় বন্ধুর এত বড় এনিভার্সারি পার্টিতে সে অফিসের গেট আপেই চলে এসেছে।
খাবারের পরে শিমুলের বাসায় আড্ডার আসর জমল। সেখানেও দীপ্ত গুম হয়েই রইল প্রায়। একসময় উঠে বিদায় নিতে গেলে শান্তা বলল,
“তুমি কিছুক্ষণ পরে যাও, কথা আছে।”
আগত্যা বসে রইল সবাই চলে যাবার জন্য। কী কথা হতে পারে সে বুঝতে পেরেছে। চলে যেতে ইচ্ছে করছিল, তবুও বসে রইল। বাসায় গিয়ে শ্রেয়সীর মুখোমুখি হতে হবে বলে। আজ সে যা করেছে, তারপর আর ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো মুখ ওর নেই বলেই মনে হচ্ছে। সে তুলনায় এখানে নির্জীব হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকাও ভালো।
সবাই চলে যাবার পরে শিমুল ওর পাশে এসে বসল। শান্তা এসে বলল,
“আজ যা করলে এটা কি ঠিক করেছ?”
দীপ্ত উত্তর দিল না, শিমুল কথা বলল এবার, “উত্তর দে।”
দু'দিকে মাথা নাড়ল দীপ্ত।
“তাহলে কেন করলি?”
“আমি ভয় পাই। কীসের জন্য তুই জানিস।”
“আবার সেই একই গান। সব ঠিকঠাক ছিল৷ তোরাও একটা সুন্দর দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছিলি। তাহলে হঠাৎ এতদিনে এসে এসব যুক্তিহীন কার্যকলাপ করে তুই কী প্রমাণ করতে চাইছিস?”
“তূর্যর ডিভোর্সটা হয়েই গেল। বাবার বিষয়টা, আর সেদিন উনি আমার অফিসে এসেছিল।”
“কে?”
দীপ্তর মুখের অভিব্যক্তি দেখে শিমুল বলল, “তোর মা?”
“হুম।”
“এসবের সাথে শ্রেয়সীর সম্পর্কটা কী?” শান্তা একরাশ বিরক্তি নিয়ে কথাটা বলল।
“ওর কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আমার সাথে। আমি ভয় পাই। আমি ইদানিং শ্রেয়সীর সান্নিধ্যে অনেক বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম। ও পাশে থাকলে সব ভালো লাগত। আমার ভয় হয়, ও যদি কোনোদিন আমাকে ছেড়ে চলে যায়, আমার পৃথিবী থমকে যাবে একটা জায়গায়। তাই দূরে থাকছি।” দীপ্তর গলা মৃদু কেঁপে গেল কথাগুলো বলতে।
“ওর কোনো আচরণে তোর মনে হয়েছে যে ও চলে যাবে তোকে ছেড়ে?”
“না। কিন্তু বাস্তবতা তো এটাই, তাই না?”
“টোটালি বুলশিট। দীপ্ত, আল্লাহর ওয়াস্তে এসব ফালতু ভাবনা বাদ দে। ওভারথিঙ্কিং ইজ ভেরি হার্মফুল ফর এনি রিলেশনশিপ। ওয়েক আপ ম্যান।”
দীপ্ত জানে সেটা, কিন্তু বেরুতে পারছে কই।
শান্তা উত্তেজিত গলায় বলল, “তোমার মা যা করেছে সেই ভাবনা থেকে সব মেয়েদের জাজ করবে তুমি? এত চাইল্ডিশ তোমাকে আমার কখনো মনে হয়নি। স্যরি টু সে, এরকম আচরণ করতে থাকলে শ্রেয়সী তোমার সাথে থাকবে না। সেজন্য ওকে দোষ দিতে পারবে না। একমাত্র তুমি দায়ী থাকবে তার জন্য। তোমার মাকে তুমি দায়ী করো, অথচ তুমিও কি একই পথে হাঁটছ না? যাকে সবচাইতে ঘৃণা করো তার ফুটস্টেপ কী সুন্দর করে ফলো করছ। বাহ্! মায়ের যোগ্য ছেলে তুমি!”
দীপ্ত হাঁটুর উপরে দুটো কনুই রেখে হাতের তালুতে মুখ গুঁজে দিল। এই কথাগুলো ওর ভেতরে সুনামি তুলেছে৷ কথাগুলো ওর হৃদয়ের মর্মমূলে এমন আঘাত হেনেছে যে ভেতরটা এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে।
“শান্তা, একটু শান্ত হও প্লিজ। আমি বুঝিয়ে বলছি ওকে।”
“আমি শান্ত হতে পারছি না শিমুল। শ্রেয়সী আমাকে বড় বোনের মতো ভালোবাসে। ওর সাথে আমি লজ্জায় কথা বলতে পারছিলাম না। আমি পালিয়ে বাঁচার জন্য ফোন কেটে দিয়েছি। আজ এটা করেছে, কাল আরও বড় কিছু করবে। ও কেন অযথা কোনো কারণ ছাড়াই ভুক্তভোগী হবে? নাকি মেয়ে বলে যেমন খুশি তার সাথে তেমন করা যায়?”
শিমুল দীপ্তর পিঠে হাত রেখে বলল, “আজ খোলাখুলি কথা বল আমাদের সাথে দীপ্ত। তোর ভয়টা কীসের?”
“আমি ওকে ভালোবাসি তুই বিশ্বাস কর। কিন্তু যখন বিয়েটা হয়, তুই জানিস আমি তখন…”
ওকে থামিয়ে দিয়ে শান্তা প্রশ্ন করল, “কী হয়েছিল?”
শিমুল ইশারায় বোঝালো যে পরে খুলে বলবে। এই বিষয়টা সে স্ত্রীর সাথে শেয়ার করেনি।
“দীপ্ত, তুই তো ওকে ভালোবাসিস। শ্রেয়সীও তাই৷ অল্প সময়ের তোরা মনের কাছাকাছি চলে এসেছিস। নিজের বোকামোর জন্য এত চমৎকার আন্ডারস্ট্যান্ডিং নষ্ট করে ফেলিস না। তোদের মধ্যে খুবই ন্যাচারাল প্রসেসে একটা দারুণ বন্ডিং ক্রিয়েট হয়ে গেছে। তোদের এক্সট্রা এফোর্ট দিতে হয়নি। অনেকে কাঠখড় পুড়িয়েও এটা পায় না কিন্তু। যা গেছে তা গেছে, চাইলেও সেই সময়ে গিয়ে সেটা তুই মুছে ফেলতে পারবি না। ভবিষ্যতও আমাদের হাতে নেই৷ তাই বর্তমানে ফোকাস কর। বর্তমান সুন্দর হলে সামনের জীবন আপনাআপনি স্মুথ হয়ে যাবে।”
“তোমার ফ্রেন্ড সহজে পেয়ে গেছে বলে মর্ম বুঝতে পারছে না সম্পর্কের।” মাঝখান থেকে শান্তা ফোঁড়ন কাটল।
“শান্তা, আমি নিজে মানুষটা ভীষণ ভাঙাচোরা। ভেতর থেকে গুছিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন। তুমি এভাবে বলো না প্লিজ। আমি রিকুয়েষ্ট করছি।”
“ওকে, আমি আর কিছু বলছি না, তবে এটুকু বলছি, সম্পর্কের পরিচর্যা করতে হয়। চারাগাছকে যেমন খুব যত্ন নিলে একদিন মহীরুহ হয়ে উঠে সম্পর্কও তেমনি শেকড় গজায়। মায়ার শেকড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বেঁধে ফেলে যে নড়াচড়া করার সাধ্য থাকে না। আর বিনা পরিচর্যায় বীজ অঙ্কুরিতই হয় না। তুমি কোন প্রসেসে এগুবে সেটা সম্পূর্ণ তোমার উপর। তোমাদের দুজনের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে কথাগুলো বললাম। ভেবে দেখো।”
উঠে দাঁড়াতে দীপ্তর মনে হচ্ছিল মাথাটা প্রচণ্ড ঘোরাচ্ছে, স্বাভাবিক স্থিতিতে নেই আর। চারপাশের পৃথিবীটা অন্ধকার মনে হচ্ছিল। শিমুল ওকে ধরে বলল, “শরীর খারাপ লাগছে?”
“হুম।”
“আমি দিয়ে আসব?”
“না, আলাউদ্দিন এসেছে গাড়ি নিয়ে।”
শিমুল ওকে গাড়ি পর্যন্ত দিয়ে গেল। যাবার আগে বলল,
"সাবধানে যা। আর এবার ঠান্ডা মাথায় ভাবিস আমাদের কথাগুলো। অনেক বেশি যেহেতু ভালোবেসে ফেলেছিস, ওকে ধরে রাখ শক্ত করে তোর কাছে। যেতে দিস না।"
দীপ্ত শিমুলকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।
***
বাসায় ফিরতে রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। বাবা ঘুমের ওষুধ খান বলে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। একবার রুমে ঢুকে বাবাকে ফিরছিল, দেখল বাবার চশমার নিচে একটা সাদা কাগজ। বাবা আগে ওকে এভাবে চিরকুট লিখে ঘুমাতেন। তাই সে চিরকুটটা তুলে নিল,
“তোর সাথে সকালে কথা আছে। শুক্রবার, তোর অফিস নেই। তবুও বলে রাখলাম যাতে পালিয়ে না যাস সকাল সকাল। ইদানিং তোর পালানোর স্বভাব হয়েছে।”
দীপ্ত এই পরিস্থিতেও খানিকটা হাসল। এরপর নিজের ঘরে এলো। শ্রেয়সী ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর গালে জল শুকিয়ে গেছে কিন্তু চিহ্ন রেখে গেছে। সেজেছিল মেয়েটা। ফ্রেস হতে বাথরুমে ঢুকে দেখল শ্রেয়সীর শাড়ি ভিজে পড়ে আছে নিচে। দীপ্ত ভেতরে ভেতরে যেন মরে গেল অপরাধবোধের তীব্র দহনে। শাড়িটা ভালো করে পানি দিয়ে পরিষ্কার করে পানি ঝরাতে দিল।
একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু ধরাল না। ভেতরে এসে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে এলো। হোয়াটসঅ্যাপে শ্রেয়সীর মেসেজের নোটিফিকেশন দেখে ক্লিক করল তাড়াহুড়ো করে। দেখল একটা সেলফি আর দুটো মেসেজ।
শাড়ি পরা ভীষণ মিষ্টি একটা ছবি, ছবির দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এরপর নিচের লেখা পড়ল।
“আমাকে কেমন লাগছে? ঠিকঠাক তো?”
দীপ্ত স্বগতোক্তি করল অস্ফুটস্বরে, “তোমার পাশে আমিই বড্ড বেমানান শ্রেয়সী।”
এরপর লেখা, “আমি রেডি হয়ে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু।”
দীপ্ত প্রায় ছুটে রুমে এলো। এরপর শ্রেয়সীর পাশে শুয়ে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঘুমের মধ্যে আচমকা এমন হওয়ায় শ্রেয়সীর ঘুম ভেঙে গেল। প্রায় আর্তচিৎকার বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সামলে নিল দ্রুত। এভাবে ঘুমের মধ্যে কেউ এমন করে! ফোঁপানোর আওয়াজ আসছে, ফোঁপানের ক্ষীণ শব্দের সাথে দীপ্তর বুক-পিঠ উঠানামা করছে।
শ্রেয়সী হতভম্ব গলায় বলল, “দীপ্ত, কখন এলে? কী হয়েছে? এমন করছ কেন?”
“প্লিজ আজ কোনো প্রশ্ন করো না। গত কিছুদিন একফোঁটা ঘুম হয়নি, শ্রেয়সী। আজ একটু ঘুমায়ে চাই। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে ভীষণ। আমাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দেবে প্লিজ? আমি একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই, কিন্তু পারছি না।”
শ্রেয়সী আজকের ঘটনা কখনো ভুলতে পারবে না। তবে এটা নিয়ে কথা বলার সময় এখন নয় তা বেশ বুঝতে পারছে। রাগ, জেদ, ক্ষোভ প্রকাশের যথোপযুক্ত সময় আর ঠান্ডা এবং সুস্থ মস্তিষ্কের প্রয়োজন। দুজনের একজনও এখন সেই অবস্থায় নেই।
সকালে ধীরেসুস্থে কথা বলা যাবে। তবে এখন ওকে পীড়া দিচ্ছে দীপ্তর এভাবে ভেঙে পড়াটা। শ্রেয়সী ভেবেছিল ওকে বুঝতে পারছে, কিন্তু নাহ্! ভুল ধারণা। মানুষের মন হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে জটিল গোলকধাঁধা, তাকে কি এত সহজে ধরে ফেলা যায়! একে বুঝতে আরও খানিকটা সময় লাগবে। তার জন্য ওকে দীপ্তর সমস্তটা জানতে হবে।