তোমার নিমন্ত্রনে

পর্ব - ৩২

🟢

দীপ্ত দুদিন ধরে বাসায় ফেরে রাতে করে। সেদিন শ্রেয়সী প্রশ্ন করেছিল, “আমাকে বলবে তোমার কী হয়েছে?”

দীপ্ত উত্তরে বলেছিল, “আমার আবার কী হবে! জ্বর হয়েছিল, এখন ঠিক নেই।”

“তাহলে এরকম অদ্ভুত আচরণ কেন করছ?”

“আমার কোন আচরণ তোমার কাছে অদ্ভুত লাগছে?”

“এই যে কথা বলছ না ঠিক করে, চুপচাপ হয়ে গেছ, মনে হয় কী যেন ভাব সবসময়। কী ভাব এত? আমাকে বলা যাবে?”

দীপ্ত শ্রেয়সীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে হঠাৎই যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এমনই।”

এরপর চার্জ থেকে মুঠোফোন খুলে নিয়ে বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে সেদিকে মনোনিবেশ করল।

“দীপ্ত, মানুষ যখন হুট করে বদলে যাবার চেষ্টা করে, সেটা খুবই আরোপিত মনে হয়। আমার চিন্তা হচ্ছে তোমাকে নিয়ে।”

“আমাকে নিয়ে চিন্তার কী আছে? আমার সময়ের মধ্যে ‘মি টাইম’ বলে কিছু থাকতে পারে না? বাসায় থাকলে পুরো সময় তোমার সাথে থাকতে হবে? আমি নিজেকে কিছুটা সময় দিতে চাইছি।”

“আমি কি তোমাকে বিরক্ত করছি?”

দীপ্ত সাথে সাথে উত্তর দিল, “কিছুক্ষণ একা থাকি প্লিজ? এখন কথা বলতে ভালো লাগছে না।”

বলে আবারও বুঁদ হয়ে গেল মুঠোফোনে, যেন এখন আর অন্যকিছু দীপ্তর আশেপাশে নেই, কেউ নেই। শ্রেয়সীর নিজেকে বড্ড উপেক্ষিত মনে হলো।

সে বারান্দায় গিয়ে বসল, মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল। দীপ্ত তার ‘মি টাইম’ কাটাক। সে কারো বিরক্তির কারণ হতে চায় না। সে ঠিক করল আর প্রশ্ন করবে না। ওর যখন সময় হবে নিজেই বলবে।

গত দু'দিন তাই আর ওই প্রসঙ্গ তোলেনি শ্রেয়সী। ওদের রুমে যখন দু'জন একসাথে থাকে, মনে হয় দুটো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ যেন সহসা মুখোমুখি হয়ে গেছে। এখন কী করা উচিত, চেনাশোনা কীভাবে হবে এর কিছুই তারা জানে না। গুমোট বাতাসে ভরে থাকে চার দেয়ালাবদ্ধ ওইটুকু কক্ষ। দম বন্ধ করা বাতাসে শ্বাসকষ্ট হয়।

একমাস থেকে ময়নার মা আসে সকালে। ঘর মোছা, রান্নার জোগাড় যন্ত্র, কাপড় ধোয়া এসব করে দেয়। সে শ্রেয়সীকে বলল,

“ভাবি, ময়নার বাফের চাকরি গেছে গা। একটা যদি ব্যবস্তা করন যায়!”

“ময়নার বাপ কী করত?”

“ডাইবার আছিল৷ সাহেব গাড়ি বেইচ্চা দিছে, ওর কাম নাই।”

সে মোহসীন সাহেবকে বলতেই তিনি বললেন, “আমাদেরও তো একজন ড্রাইভার প্রয়োজন। তাহলে সবারই সুবিধা হতো। ওর হাজব্যান্ডকে আসতে বলে দে মা। আমি কথা বলে দেখি।”

“ঠিক আছে বাবা। ভালোই হবে।”

শ্রেয়সী চলে যাচ্ছিল, তিনি ডেকে বললেন, “মা রে, দীপ্তর সাথে তোর কোনো ঝামেলা, মানে একটু…..” তিনি ইতস্তত করলেন, কথা পুরোটা শেষ করতে পারলেন না।

তার মনে হলো তিনি স্টেরিওটাইপ শ্বশুরের মতো আচরণ করছেন বোধহয়। তার তো দীপ্তকে প্রশ্ন করা উচিত। দীপ্তর যদি কোনো সমস্যা হয় তার জন্য মেয়েটাকে তিনি কিছু বলতে পারেন না বলে মনে হলো। আবার তাদের ভেতরের বিষয়েও এভাবে তার নাক গলানো উচিত নয়। চিন্তায় ঝোঁকের মাথায় প্রশ্ন করে আফসোস হচ্ছিল তার।

শ্রেয়সী হেসে এগিয়ে এসে তার পাশে বসে বলল, “বাবা, এত হ্যাজিটেড করার মতো কিছু বলোনি তুমি। আসলে অসুখের পর থেকে ও কেমন যেন গুটিয়ে আছে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যাচ্ছে, উত্তর দিচ্ছে না। আমি খুব টেনশনে আছি বিষয়টা নিয়ে। ওর প্রবলেমটা কী তুমি জানো?”

মোহসীন সাহেব দুইদিন থেকে বিষয়টা খেয়াল করেছেন। তিনিও টেনশনে আছেন বলেই আজ জিজ্ঞেস করে ফেললেন।

“আমিও জানি না। তবে ওর মা'কে নিয়ে ওর একটা ট্রমার মতো হয়েছিল ওইসময়। ওকে ওই ডিপ্রেশন থেকে বের করে আনতে আমার কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। সেখান থেকে বিয়ে, সংসারের প্রতি বা ভালোবাসার প্রতি একটা প্রবল বিতৃষ্ণা ওর তৈরি হয়েছিল।”

“বিয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা?” এটা শ্রেয়সীর অজানা ছিল। ওর মনে হচ্ছিল যার এতটা বিতৃষ্ণা থাকবে সে ওকে বিয়ে করতে কেন রাজি হলো!

মোহসীন সাহেব যেন ওকে পড়তে পারলেন, “বিয়ের চেষ্টা করতাম, ও নিজেই দেখা করতে যেত, এরপর বিয়ে ভেঙে দিত। তোকে দেখতে গেলে তুই ওকে রিজেক্ট করলি। এরপর আবার তোদের দেখা হলো। ওর তোকে পছন্দ হলো বুঝতে পারি। এরপর বিয়েটা হলো।”

দীপ্তকে শ্রেয়সীর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল, “আমাকে কেন তোমার পছন্দ হয়েছিল?”

কিন্তু সে এখনো বাসায় আসেনি। সে রিজেক্ট করেছিল বলেই ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল দীপ্ত! কী জানি! শোভার কথা মনে পড়ল ওর। সেদিন কেমন আচরণ করেছে ছেলেটা সেটা মনে পড়ল, এখনকার ঘটনার সাথেও সেটার যোগসূত্র আছে বলেই মনে হলো। কিন্তু শ্রেয়সীর এখানে ভুলটা কোথায়! ওর সাথে এই আচরণের মানে কী!

রুমে আসতে দেখল শান্তা কল করেছিল অনেকবার। সে কল ব্যাক করল।

“কেমন আছো আপু?”

“ভালো। তুই?”

“ভালো। তোমরা বাসায় আসো না কেন এখন?”

“আরে আসব। শিমুল হুট করে ব্যস্ত হয়ে গেছে। তাই। শোন না, পরশু অবশ্যই তুই আর দীপ্ত আমার বাসায় আসবি।”

“কোনো উপলক্ষ?”

“অবশ্যই। আমাদের ম্যারেজ এনিভার্সারি। মিস করিস না কিন্তু। আঙ্কেলকেও বলেছিলাম, কিন্তু উনি আসবেন না।”

“ঠিক আছে শান্তা আপু। অবশ্যই যাব।”

***

অফিস থেকে ফেরার সময় আলাউদ্দিন এলো গাড়ি নিয়ে। সে ময়নার বাবা৷ দীপ্ত আসেনি।

শ্রেয়সী কল দিতে দিতে গাড়িতে উঠে বসল। দীপ্ত ধরল না৷

বাসায় এসে শ্রেয়সী একটা শাড়ি বের করল, জলপাই রঙের জামদানী শাড়ি। এটা ওদের বিয়ের সময় দিয়েছিল এখান থেকে। আগে পরা হয়নি। শিমুল আর শান্তা দীপ্তর জন্য ভীষণ স্পেশাল মানুষ। তাদের বিবাহবার্ষিকী। ওর সাথেও খুব ভালো সখ্যতা তাদের।

দীপ্ত বাসায় কখন আসবে, ফোনও ধরছে না। থাক, ও রেডি হয়ে থাকুক। গতকাল রাতেও শান্তা আরেকবার কল দিয়েছিল।

সে গোসল করে সময় নিয়ে শাড়িটা পরল। জামদানি একা একা পরাটা বেশ ঝক্কির। শাড়ি পরতেই অনেকটা সময় লেগে গেল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে বসল। এরপর এই শাড়ির সাথে মাননসই সাজগোজ করল।

কী মনে করে দীপ্তর গাছ থেকে দুটো গোলাপ ছিঁড়ে খোঁপায় গুঁজল। এবার মনে হলো সাজ পরিপূর্ণ হলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, প্রায় সাতটা বেজে গেছে।

ও বেরিয়ে এলো ড্রইংরুমে। ওকে দেখে মোহসীন সাহেব বললেন, “বেরুবি এখন?”

“ও তো এলো না। কল রিসিভ করছে না।”

“বস তাহলে, ওর টাইম সেন্সের এই অবস্থা তো ছিল না।”

সাড়ে সাতটার দিকে শান্তার কল এলো, “তুই এলি না কেন দীপ্তর সাথে? দেরি করিস না, চলে আয়।”

“দীপ্তের সাথে? ও গেছে আপু?”

“হ্যাঁ, সেই ছয়টা সময়। আমি তো রান্না ঘরে ছিলাম। এখন ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে দেখি তুই আসিসনি।”

“আপু, স্যরি, দেখো, আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। প্রেসার লো হয়ে গেছে ভীষণ। তোমাদের জন্য অনেক শুভকামনা থাকল।”

“তুই তাহলে আসবি না?”

“ভীষণ ইচ্ছে ছিল আপু। কিন্তু শরীর…”

“দীপ্তর সাথে তোর… আচ্ছা, থাক। পরে কথা বলি এটা নিয়ে। তুই যত্ন নিস নিজের।”

শান্তা আপু বুঝতে পারলেন, দীপ্তর এভাবে ওকে না বলে চলে যাওয়াতে সে এটা করল।

শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে মোহসীন সাহেব কী বুঝলেন সে জানে না, ও তাকিয়ে বলল, “আমি একটু রুমে যাই বাবা। তুমি খেয়ে নিও। আমার ঘুম পাচ্ছে।”

তার চোখে সহানুভূতি ছিল, সেটা আরও পোড়াচ্ছিল ওকে। ভীষণ অপাংক্তেয় বলে মনে হলো নিজেকে। শান্তা, শিমুলের কাছে ওকে এভাবে অপমানিত করার সাহস দীপ্তকে কে দিয়েছে!

ঘরে এসে কোনোরকমে শাড়ি বদলে শুয়ে পড়ল সে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, কষ্টে, অপমানে। এমন উপেক্ষা আর অসম্মান ওকে আজ অব্দি কেউ কোনোদিন করেনি।

Story Cover