তোমার নিমন্ত্রনে

পর্ব - ৩১

🟢

গত দুদিনে দীপ্ত অনেকটা চুপচাপ হয়ে গেছে। ওর আচরণও যেন কিছুটা অন্যরকম। শ্রেয়সী গতকাল তেমন একটা আমলে নেয়নি, ভেবেছে শারীরিক অসুস্থতার জন্য। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ওটাই শুধু কারণ নয়। আজ মনে হচ্ছে ওকে কিছুটা এড়িয়ে চলতে যেন চাইছে। হঠাৎ কী এমন হলো শ্রেয়সী ভেবে পায় না।

এই গতকালের কথাই ধরা যাক, দীপ্ত শুয়েছিল, শ্রেয়সী আধবেলা অফিস করে এসেছে। সে ঘরে ঢুকতেই দীপ্ত বলল,

“এভাবে অফিস করলে তোমার চাকরিটা যাবে।”

শ্রেয়সী হেসে বলেছিল, “সমস্যা নেই। তোমারটা তো থাকছে।”

দীপ্ত হাসেনি, বরং বলেছে, “পরে আমার ঘাড়ে দোষ চাপবে। লোকে বলবে আমার জন্য তোমার চাকরি গেছে। এসব করো না। ভালো লাগে না আমার।”

শ্রেয়সী হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ বুঝতে চেষ্টা করল হয়েছে টা কী! কিছুটা সময় নিয়ে শ্রেয়সী বলল, “দীপ্ত, বিষয়টা তো লোকের বলার মতো নয়। এটা আমাদের দু'জনের বিষয়। লোকে কেন কথা বলবে?”

দীপ্ত উত্তর দেয়নি। কনুই দিয়ে চোখ ঢেকে গুঁজ হয়ে গেছে।

বিষয়টা শ্রেয়সীর ভালো লাগেনি। কিন্তু তখনকার মতো এড়িয়ে গেল। কারণ সেটা কিছু বলার মতো সময় নয়।

আজ দীপ্তর জ্বর পুরোপুরি নেমে গেছে, কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগিয়েছিল, এটা সারতে সময় লাগবে।

আজ দু'জনেই অফিসে এসেছে। দীপ্ত শ্রেয়সীকে নামিয়ে চলে যাচ্ছিল, শ্রেয়সী বলল, “ওষুধ দিয়েছি। দুপুরে খাবার শেষ করে ওষুধ খেতে ভুলবে না।”

“ঠিক আছে মনে থাকবে।” বলেই চলে গেছে।

অন্য সময় হলে দীপ্ত বলত, “তুমি মনে করিয়ে দিও। নিজের খেয়াল রেখো।” আজ কিছুই বলেনি। নিরস ছিল ছেলেটা৷

শ্রেয়সী অফিসে নিজের ডেস্কে বসেছিল, টুকরো টুকরো ছবিগুলো ভেসে উঠছিল ওর মানসপটে। দীপ্ত কি কোনোকিছু নিয়ে বিপর্যস্ত! অফিসে কোনো সমস্যা? ওর কোনো কলিগের সাথে শ্রেয়সীর সেভাবে আলাপ নেই৷ দীপ্তকেই সরাসরি জিজ্ঞেস করতে হবে।

মোহসীন সাহেবের সাথে তো বেশ স্বাভাবিক আচরণ করল। সমস্যাটা হয়তো শ্রেয়সী সম্পর্কিতই। পরক্ষণেই আবার মনে হলো, হয়তো বাবাকে চিন্তায় ফেলতে চায়নি বলেই সেখানে স্বাভাবিকতা বজায় রেখেছে হয়তো। শ্রেয়সী কল দিল দুইবার রিসিভ হলো না।

এরমধ্যে মোহসীন সাহেব একবার কল দিলেন,

“কী রে মা খেয়েছিস?”

“না বাবা। খাব। বাবা, দীপ্তর সাথে কথা হয়েছে তোমার?”

“হ্যাঁ, এই মাত্র কল দিয়েছিল। তোর সাথে কথা হয়নি?”

“ও, ঠিক আছে বাবা, তুমি ওষুধ মিস করো না যেন।”

উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে কল কেটে দিল শ্রেয়সী। মায়ের সাথে কিছুক্ষণ কথা হলো, তিনি বললেন,

“তোর প্রিয় চিংড়ি করেছি আজ। কাল তোর মামা ঢাকায় যাবে আমি পাঠিয়ে দেব। ছেলেটার জ্বর। ওর জন্যও অল্পকিছু ঝালঝাল রান্না করে পাঠাচ্ছি। জ্বরের সময় খেতে ভালো লাগবে। কী অবস্থা ওর?”

“এখন বেটার মা। ও খুশি হবে।”

“ছেলেটা এমনভাবে মা ডাকে, একেবারে আপন মনে হয়। মায়া লাগে, মায়ের জন্য ভেতরে ভেতরে কষ্ট পায়।”

“হুম।” অন্যমনস্ক গলায় বলল শ্রেয়সী।

“কী হুম হুম করিস?”

“না কিছু না। আসলেই ও খুব সহজে মিশতে পারে।”

“এই বৃহস্পতিবার আয় না। অনেকদিন দেখি না।”

“মা, এই উইকে না যাই, নেক্সট উইক রবিবার বন্ধ আছে একটা। তখন যাব। এখন এক্সট্রা ছুটি নেয়া যাবে না। তুমি আর বাবা এসে ঘুরে যাও না।”

“তোর বাপের সময় আছে? খালি হাতেই ব্যস্ত লোকটা। তুই বলে দেখিস নাহয়।”

শ্রেয়সী ঠিক করল অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয় না, মাঝে একটা সপ্তাহ। তারপর বাবা আর দীপ্তকে নিয়ে বাড়ি গেলে ভালোই হবে। নতুন পরিবেশে দীপ্তর মুডও কিছুটা ভালো হতে পারে।

শ্রেয়সী ওর ভ্যানিটি ব্যাগটা খুলল, পানির বোতল বের করার জন্য। সেটা বের করতেই একটা ছোট্ট চিরকুট বেরিয়ে এলো,

“স্লিপিং বিউটি,

তোমার ঘুমানোর ভঙ্গিটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না। মন শান্ত হয়ে আসে। এই দৃশ্যটা দেখার জন্য আমি রোজ রোজ তোমার আগে ঘুম থেকে উঠতে চাই। আমার আগে তোমার সকালের ঘুম যে না ভাঙে এই কামনা।”

শ্রেয়সীর মুখে একটা হাসি ফুটল, মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো, “পাগল।”

পাগলটা এটা লিখেছিল বিয়ের পরে ওর যখন শ্রেয়সীদের বাড়িতে গিয়েছিল, রেগেমেগে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস পরিবর্তন করল, তার পরেরদিন। এটা লিখে ওর একটা বইয়ের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল।

‘ফার ফ্রম দ্যা ম্যাডিং ক্রাউড’ বইটা পড়ছিল শ্রেয়সী, টেবিলে রাখা ছিল বুকমার্ক দিয়ে। সকালে বইটা উল্টাতেই এই চিরকুটটাকেই পেয়েছিল। পড়ার পরে হেসে ফেলেছি। সে নিজেই পাল্টা উত্তর লিখেছিল,

“এই যে,

সব সুযোগ তুমি একাই চাও, তা তো হবে না। আমারও তো দৃশ্যটা দেখতে ইচ্ছে করতে পারে নাকি? মাঝেমধ্যে নিয়ম ভেঙে বেশি করে ঘুমাতে পারো না?”

সে এটা রেখেছিল দীপ্তর ওয়ালেটে। পাগলটা এর উত্তর আরেকটা চিরকুটেই দিয়েছিল, সেটাও আছে শ্রেয়সীর কাছে। ব্যাগ থেকে সেটাও বের করল।

“কিছু সুযোগ ভাগাভাগি করার পক্ষে নই আমি। বুঝলেন?”

শ্রেয়সী বুঝতে পেরেছিল, এরপর সে-ও উত্তর দিলে চিরকুট চিরকুট খেলা চলতেই থাকবে। তাই আর লেখা হয়নি। ওইটুকু চিরকুটে ওমন গভীর সৌন্দর্য মিশে থাকে!

অথচ দেখো, আজ বাবাকে কল করেছে একটু আগে, তারমানে সে কল করেছিল সে সম্পর্কে দীপ্ত অবগত। কিন্তু কল তো করল না।

সে আরেকবার কল করল, এবার রিসিভ হলো, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো কথা বলল না।

“খেয়েছ?”

“হ্যাঁ।”

“ওষুধ?”

“খেয়েছি। তুমি?”

“খাইনি এখনো।”

“ও। রাখি। তুমি খাও।”

বলে কোনোকিছু না বলে কেটে দিল কলটা। শ্রেয়সীর অভিমান হলো। এমন দায়সারা আচরণ কেন করছে দীপ্ত? আজ বাসায় খোলাখুলি প্রশ্ন সে করবেই। উত্তরও জানবে। মা বলতেন, সংসারে অনেকসময় ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যায়, যদি সরাসরি কথা বলা যায়। ভেতরে অভিমান জমিয়ে রাখলে লৌহ পিণ্ড হয়ে যায় একসময় অভিমান, যখন তা সহজে গলানো সম্ভব হয় না।

***

দীপ্ত বসে আছে নিজের ডেস্কে। শরীরের জ্বর সেরেছে। কিন্তু ওর সমস্ত মন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আছে এখন। সেই জ্বরের উত্তাপে হৃৎপিণ্ড পুড়ে ছাঁই হয়ে যাচ্ছে। সেই উষ্ণতা সে ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারবে না।

মুঠোফোনে শ্রেয়সীর কলটা দেখার পর তা রিসিভ করার জন্য ভেতরটা কেমন কাতর হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মনের অন্য এক অংশ বড্ড অপারগ। কেন যে এই অপারগতার শিকল সে ভাঙতে পারছে না! এখনো সে খায়নি, খেতে রুচি হয়নি মোটেও।

মুখ এখনো তেতো৷ মনেরও অবস্থা অভিন্ন নয়।

বারবার শ্রেয়সীর নম্বরটা ডায়াল করতে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল সে জানে না। কিন্তু ভেতরের কীসের একটা দুর্ভেদ্য বাঁধার প্রাচীর সে কিছুতেই অতিক্রম করতে পারল না। ওপাশ থেকে আবারও কল এলো। এবাররও অনেক কিছু বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখল। কোনোমতে কথা শেষ করল।

ওপাশে শ্রেয়সীর ভালো লাগবে না সে জানে। কিন্তু ওইটুকু কথাতেই সে ভীষণ শান্তি পেল। দগ্ধ মনের দহনে কিছুটা যেন সহসা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল।

এই কেবিনেও ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সেদিন শোভা এখানেই এসেছিল। ওর সামনে বসেছিল। এখন নেই, কিন্তু একটা বিষবাষ্প ছড়িয়ে গেছে ঘরজুড়ে, দীপ্তর সমস্ত মন জুড়ে।

দীপ্তর মনে হলো, সে কী ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাচ্ছে! ওর মাথায় কী কোনো গণ্ডগোল দেখা দিচ্ছে! নইলে এমন খাপছাড়া অযৌক্তিক আচরণ কেন করছে! কেন সবটা উপলব্ধি করেও নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না, মেলে দিতে পারছে না!

Story Cover