তোমার নিমন্ত্রনে

পর্ব - ৩০

🟢
রাতে মোহসীন সাহেব আর শ্রেয়সী কারোরই ঘুম হলো না। মোহসীন সাহেব তাহাজ্জুদ নামাজে বসে রাত কাটিয়ে দিলেন। ছেলের আরোগ্যের জন্য দোয়া করলেন। শ্রেয়সী দীপ্তর পাশে জেগে শুয়ে বসে কাটালো। দীপ্ত কখনো ঘেমে উঠছে, আবার কিছুক্ষণ পরেই ঠান্ডায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। ঘরের পরিবেশ ওর উপযোগী করে দিচ্ছিল শ্রেয়সী। ভেজা কাপড়ে গা মুছে দিয়ে কপালের উপরে পট্টি দিয়ে দিয়েছে অনেকবার। শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে যে বেঘোরে পড়ে রইল দীপ্ত। আধো অবচেতনে শ্রেয়সীর হাত কখনো ধরে রইল খুব শক্ত করে। অনেককিছু বলেছে অস্ফুটস্বরে, যার বেশিরভাগ কথাই অবোধ্য বলে মনে হলো। কখনো মা, কখনো বাবাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছিল, কখনো শ্রেয়সীর উদ্দেশ্যে। চারটার পরে একবার শ্রেয়সীর তন্দ্রা মতো এসেছিল, তখন দীপ্তর মুখের কাছে থাকায় একটা কথা শুধু বুঝতে পারল, “আমাকে ছেড়ে চলে যাবে তুমি মায়ের মতো?” তন্দ্রাচ্ছন্ন শ্রেয়সী দীপ্তকে আগলে নিয়ে বিরবির করে বলল, “আমি তোমার সাথেই আছি দীপ্ত। তুমি সুস্থ হয়ে উঠো।” দীপ্তর জ্বর ক্লিষ্ট ক্লান্ত মুখে যেন কিঞ্চিৎ হাসি ছুঁয়ে গেল, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। শ্রেয়সী দীপ্তর মাথায় আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে তাকিয়ে রইল নির্নিমেষ। কেমন অসহায় লাগছে ছেলেটাকে। এই মুখটা ছেড়ে সে কোথায় যাবে! কেন যাবে! দূরের মসজিদে ফজরের আযান দিল, দীপ্তকে ছেড়ে উঠে নামাজ পড়ল শ্রেয়সী। এরপর রান্নাঘরে গেল। যাবার সময় দেখল মোহসীন সাহেব বসার ঘরে তসবিহ হাতে বসে আছেন। ওকে বেরুতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন কেমন আছে?” “জ্বর বেশিই দেখলাম। তবে এখন শান্ত হয়ে ঘুমিয়েছে।” মোহসীন সাহেব ঘরে গিয়ে দীপ্তর মাথার কাছে বসে ফুঁ দিলেন দোয়া পড়ে। এরমধ্যে শ্রেয়সী চা এগিয়ে দিলো, “নাও বাবা৷ চা টা শেষ করে ঘুমাও। আমার কথা তো শুনলে না।” “সন্তান অসুস্থ থাকলে আমার ঘুম হবে বুঝি? তোদের ঘরে আসুক, তখন বুঝবি।” শ্রেয়সী মৃদু হেসে বলল, “তোমার নিজের দিকে খেয়াল করো। রাতে সেই বৃষ্টির মধ্যে ডাক্তার আনতে চলে গেলে। এখন তোমার ছেলে স্বাভাবিক আছে।” “দীপ্তটা জ্বর এলে বরাবরই এমন হয়ে যায়। কাতর হয়ে পড়ে।” “ও বৃষ্টিতে ভিজতে পারে না। হঠাৎ কী হলো এভাবে অনেকক্ষণ ধরে ভিজল? জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দিল না।” “সকালে জানা যাবে। তুই বরং ঘুমা। তুইও সারারাত জেগে ছিলি। আমার অভ্যাস আছে।” “আমি আজ ছুটি নেব বাবা। রেস্ট নেবার সময় আছে।” খানিকক্ষণ ইতস্তত করে শ্রেয়সী প্রশ্ন করল, “আচ্ছা বাবা, ওর মধ্যে ওর মাকে নিয়ে, মানে রাতে ঘুমের মধ্যে…” মোহসীন সাহেবের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, “দীপ্ত আমার খুব লক্ষ্মী বাচ্চা জানিস তো। ওইটুকু বয়সে যার মাঝখান দিয়ে যেতে হয়েছিল, তাতে আমি খুব ভয়ে থাকতাম সারাক্ষণ। আমাকে ভুল প্রমাণ করে ও খুব দ্রুত পরিস্থিতির সাথে এডাপ্ট করে নিল। তবুও আমি বাবা তো, আমি জানি, কিছু ক্ষত হয়তো ব্যান্ডেজ বেঁধে লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু নিরাময় করা সম্ভব হয় না। শোভাও ওর জন্য তেমনই একটা ক্ষত হয়ে আছে।” “দীপ্ত হয়তো বিষয়টা নিয়ে ইনসিকিউরড ফিল করে। একটা স্পষ্ট ইনসিকিউরিটি আমি মাঝেমধ্যে বুঝতে পারি। ওর মধ্যে একটা প্রবল ভয় আমি গতকাল দেখতে পেয়েছি, যদি আমিও তার মা'য়ের মতো ছেড়ে চলে যাই।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাটা বলল শ্রেয়সী। ওর মাথায় হাত রেখে মোহসীন সাহেব বললেন, “তুই বুদ্ধিমতী মেয়ে মা। মা'য়ের চলে যাওয়াটা ওর ভেতর খুব গভীর একটা দ্বিধা তৈরি করে দিয়ে গেছে। ও তোকে যখন আরও ভালো করে বুঝতে শুরু করবে, সেই দ্বিধা কেটে যাবে আমি নিশ্চিত।” শ্রেয়সী একবার চকিতে দীপ্তর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে মনে মনে বলল, “এখনো তুমি আমাকে পুরোপুরি বুঝতে পারোনি দীপ্ত। তবে আমি তোমার দ্বিধা কাটিয়ে দেব, তুমি দেখো।” মোহসীন সাহেব মনে মনে দোয়া করলেন, “আল্লাহ, ছেলে-মেয়ে দুটোকে সুখে শান্তিতে রেখো।” *** দীপ্তকে সাড়ে নয়টায় ঘুম থেকে ডাকল শ্রেয়সী। তার আগে থার্মোমিটারে দেখল জ্বর এখন একশো এক। রাতে একশো তিন ছুঁয়েছিল পারদ। দীপ্ত উঠে বসল, ভেবেছিল শ্রেয়সী গতকাল দেরি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করবে। তা না করে মেয়েটা বলল, “হাত মুখ ধুয়ে আসো। খেতে হবে, এরপর ওষুধ আছে।” দীপ্ত আড়মোড়া ভাঙতে চেষ্টা করে মাথা চেপে ধরে বলল, “প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে।” “আমাকে ধরে উঠে এসো।” দীপ্ত সারা ঘরে ওর জ্বরের চিহ্ন দেখতে পেল না। এরইমধ্যে মেয়েটা মোটামুটি গোছগাছ করে ফেলেছে। তবে চোখে ঘুম না হওয়ার ক্লান্তি। সে দেখেছে মেয়েটা ওর কী পরিমাণ যত্ন করেছে। দীপ্তর মনে হলো যদি কোনো একসময় সুর কেটেই যায়, তাহলে শুধু শুধু মায়া বাড়িয়ে লাভ কী! সে মৃয়মান গলায় বলল, “আমি উঠতে পারব৷” “সেটা জানি। তবে এখন নিজের এই মেল ইগো দূরে রাখো।” “এখানে মেল ইগো কোত্থেকে এলো?” “বিছানা থেকে বউয়ের সাহায্য নিতে হচ্ছে এটা তোমার পৌরুষে আঘাত করছে না, বলতে চাইছ?” দীপ্ত কিছুটা হতচকিত হলো, এই মেয়ে যে মহা ঝগড়াটে সে ভুলে গিয়েছিল। “আচ্ছা, ধরে তোলো। এখন ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না, স্ট্যামিনাও নেই।” শ্রেয়সী জানে স্বাভাবিক কথার মানুষ এই ছেলে না। মাঝেমধ্যে এর ঘাড়ের তার ছিঁড়ে যায়। তাই বাঁকা পথে হাঁটল। যে রোগের যে ওষুধ। সুন্দর কাজ করল। মোহসীন সাহেবও উঠে পড়েছেন, খাবার টেবিলে ছেলের কুশল জিজ্ঞেস করলেন। এরপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। দীপ্ত অল্প একটু খেয়েই আর খেতে পারছিল না, মুখ তেতো হয়ে আছে। মোহসীন সাহেব নিজের হাতে জোর করে খাইয়ে দিলেন। শ্রেয়সী ছবি তুলল একটা। দীপ্ত জিজ্ঞেস করল, “ছবি তুলছ কেন?” “ধেড়ে খোকার খোকাপনা দেখার সৌভাগ্য হলো। এটা ফ্রেমবন্দী না থাকলে হয়?” “তোমাকেও তো মা খাইয়ে দেয়? তার বেলা?” “আমি তো ভাব নিয়ে বলি না, আমার সাহায্য লাগবে না। তাই দুটো এক করবে না বুঝলে?” না চাইতেও দীপ্ত হাসল, সেই হাসি দেখে শ্রেয়সী ভীষণ স্বস্তি পেল। পরিবেশটা খুব গুমোট হয়ে উঠেছিল। যা হালকা করার প্রয়োজন ছিল। সে সফল। শ্রেয়সী বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, একরাশ শীতল বাতাস এসে গায়ে লাগল। ওর নিজেরও মাথাটা ভীষণ ধরেছে। “তুমি এতকিছু আমার জন্য কেন করছ?” দীপ্তর কণ্ঠস্বর শুনে ঘাড় ফিরিয়ে ওকে দেখল শ্রেয়সী, কিন্তু উত্তর দিল না৷ “বললে না?” “আবার সেই এক গান।” বিরক্তি নিয়ে বলে শান্ত স্বরে বলল, “আমাকে কতটা বোঝে দীপ্ত?” “কম বোঝা ভালো। কষ্ট কম হবে।” “তোমার এত দ্বিধা কীসের দীপ্ত?” দীপ্ত থতমত খেয়ে গেল, “কীসের দ্বিধা?” “সেটা তুমি ভালো জানো। আমি জানতে চাইছি উত্তরটা।” শ্রেয়সীর দৃঢ়তায় দীপ্ত খেই হারিয়ে ফেলল, “আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম।” শ্রেয়সী গোলাপ গাছের সদ্য ফোঁটা ফুলে হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করল সন্তর্পণে, “আমি কিন্তু তোমাকে পড়তে পারছি দীপ্ত। তুমিও চেষ্টা করো। যখন আমাকে বুঝতে পারবে সর্বান্তকরণে, তখন আর এই প্রশ্ন মাথায় আসবে না।” কথাটা বলেই শ্রেয়সী ভেতরে এসে শুয়ে পড়ল, এবার সত্যিই একটু ঘুম দরকার। মাথা ব্যথায় ফেঁটে যাচ্ছে রীতিমতো। দীপ্ত তাকিয়ে আছে শ্রেয়সী ক্ষণকাল আগে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে, কিন্তু ওর মন ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্য কোথাও, নিজের মনেরই অলিগলি, চোরাগলিতে। আঁতিপাঁতি খুঁজে ফিরছে নিজেকেই।
Story Cover