দীপ্তর পৃথিবীটা যেন থমকে আছে, সে নিজেও একজন অনুভূতিহীন পাথর। পুরো মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, শুধু তীব্র ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। দৃষ্টিতে এক পৃথিবী শূন্যতা, হৃদয় জুড়েও।
কতটা সময় পেরিয়ে গেল তারও কোনো হিসেব নেই। পুরোপুরি অস্তিত্বহীন এক জড়বস্তু বলেই বোধ হচ্ছে। হঠাৎ বৃষ্টি পড়তে শুরু করল, প্রথম ঝিরিঝিরি তারপর ঝুম বৃষ্টি। তাতেও দীপ্ত নির্বিকার। শুধু মাথাটা সোজা করে নিল চোখ আর নাকে পানি ঢুকে পড়া থেকে বাঁচাতে।
পৃথিবী জুড়ে একসময় নামল প্রগাঢ় অন্ধকার। সেই আঁধার ওকে আশ্রয় দিল, ধীরে ধীরে অসাড়তা কাটতে থাকল। আজ এই ঝুম বৃষ্টিতে পার্কে লোক সমাগম এখন নেই বললেই চলে।
ওর মানসপটে ভেসে উঠল ছোট্ট দীপ্ত, ওইটুকু বয়সে যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল এই জগতের সবচাইতে নির্মম প্রশ্নের,
“তুমি কার কাছে থাকতে চাও? বাবার কাছে নাকি মা'য়ের সাথে?”
ওর ছোট্ট পৃথিবীটা তখন কেবল ওই দুটো মানুষকে ঘিরেই আবর্তিত ছিল। সে ওই পুরো পৃথিবীর আশ্রয়েই থাকতে চেয়েছিল। সেটা নাকি সম্ভব নয়। পৃথিবীটাতে ভাঙণ অবশ্যম্ভাবী। ওর শিশুমনের চাওয়ায় কিছু আসে যায় না।
ওর প্রতি মায়ের উদাসীনতা আর বাবার স্নেহময়তায় সে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল তখন। কিন্তু ওর হৃদয়ে গড়া যে পৃথিবী তা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গিয়েছিল। কাচ ভাঙলে যেমন তা কখনো জুড়ে দেয়া যায় না, বিশ্বাসের পৃথিবীটাও ঠিক তেমন। ওর ভেতরটা তখন তেমনই চিরদিনের জন্য খণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল।
রাতে বাবার বুকে শুয়ে সে ভাবত, এই বুঝি মা আসবে। ওকে জড়িয়ে ধরে বলবে, “আমার খোকন সোনাটা ঘুমিয়ে পড়েছে? আয় বাবা, আমার বুকে আয়, তোকে ঘুম পাড়িয়ে দিই।”
মায়ের গলায় ঘুম পাড়ানি গানের সুরটাও সে শুনতে পেত ওর অবচেতনে। যা আর কখনোই সম্ভব হয়নি। অর্ধেক পৃথিবী নিয়ে সে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে। বাবা তার সমস্তটা দিয়ে সারাজীবন চেষ্টা করে গেছেন, পুরো পৃথিবী হয়ে উঠতেও পেরেছেন, তবুও ভাঙার একটা দাগ কোনোদিন মুছে যায়নি, তা রয়ে গেছে প্রবল পরাক্রমে।
নতুন করে শোভা জীবনে এগিয়ে গেছেন, তার কোলজুড়ে নতুন সদস্য এসেছে, তার পৃথিবী পূর্ণ করতে, সেদিন মা'য়ের কোথাও দীপ্ত ছিল না। বাবার সাথে সাথে বাবার দীপ্তও তার কাছে ছিল অচ্ছুৎ।
প্রতি বছর দীপ্তর জন্মদিনে তিনি একবার করে কল দিতেন। সে কথা বলেনি আর। একদিন জেনেছে তার মা চট্টগ্রাম চলে গিয়েছেন। তারপর বহুদিন তিনি কোনো রকম যোগাযোগ করেননি। দীপ্তর এসএসসি পরীক্ষার আগে দেখা করতে এসেছিল। সাথে তার দুই সন্তানকে এনেছিল, ছোটজন ছিল কোলে। দীপ্ত উঠে চলে এসেছিল। দৃশ্যটা সহ্য হয়নি। ঈর্ষায় নয়, অপ্রাপ্তির আঘাতে। ওইভাবে তো মা ওকে কখনো আগলে রাখেননি তার স্নেহছায়ায়।
তারপর থেকে পারতপক্ষে কোনোদিন মায়ের সাথে সে দেখা করেনি। তবুও কখনো সখনো দেখা হয়ে গেছে, বছর ছয়েক আগে তারা ঢাকায় এসেছেন, শোভার সন্তানরা দেশের বাইরে পড়তে গেছে৷ তখন থেকে নিজের একাকিত্ব ভুলতে দীপ্তকে বিরক্ত করছে এটাই ওর মনে হয় সবসময়।
ওর লাল হয়ে আসা ক্লান্ত চোখের পাতায় শ্রেয়সীর মুখটা ভেসে উঠল। মেয়েটাকে ওর খুব করে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে নিজের জীবনে। ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। ওর জন্য এতটা ‘কেয়ার করা’কেও ওর ভালো লাগে। কিন্তু ভালোবাসা বলে যদি সত্যিই কিছু না থাকে! যদি ওর প্রতি শ্রেয়সীর মোহভঙ্গ হয় কোনোদিন! তবে তো সে-ও মায়ের মতো ওকে ফেলে চলে যাবে! সে বড্ড হতভাগা। ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে না। যেখানে মা জন্ম দিয়েও ওকে উপেক্ষা করেছেন, সেখানে শ্রেয়সী কেন সারাজীবন ওকে আগলে রাখতে যাবে!
এটা তো ঠিক, দীপ্ত বাইরে থেকে যতই চটকদার হোক, ভেতরে ভেতরে সে তো ভাঙাচোরা একজন মানুষ। ওর ভেতরটা যদি শ্রেয়সী কখনো দেখে ফেলে, সেদিন ওর চোখে মুগ্ধতা থাকবে না, মায়া থাকবে না, কেবলই শূন্যতা থেকে যাবে। শূন্যতাই একমাত্র চিরস্থায়ী বস্তু পৃথিবীতে, বাকিসব নশ্বর, ক্ষণস্থায়ী।
পরক্ষণেই বাবার মুখটা মনে পড়ল, মানুষটা ওর মতোই অসহায়। ওদের যত দূর্ভোগ সমস্তই একজনের জন্য, ওর মা, তার স্ত্রী। ওই মানুষটাও শ্রেয়সীকে বড্ড স্নেহ করেন, তিনিও তো কতটা কষ্ট পাবেন।
চিন্তাগুলো ডালপালা মেলে দিচ্ছিল দীপ্তর মনে, সেসব চিন্তা কতটা প্রাসঙ্গিক কতটা অমূলক তা তলিয়ে দেখার মতো মানসিক স্থিতি তখন ওর মধ্যে নেই।
বৃষ্টি একসময় কমে এলো, বেশ কয়েকবার হাঁচি আসতেই খানিকটা যে তাড়া অনুভব করল। বাসায় ফিরতে হবে।
***
“মা রে, সাড়ে এগারোটা বাজে, আমি একবার বের হই। এভাবে ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছে না।”
মোহসীন সাহেবের উদ্বিগ্নতা দেখে শ্রেয়সী নিজের ভেতরের চিন্তাকে শান্ত করল। তার বয়স হয়েছে। এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে তাকে বাইরে পাঠাতে মন সায় দিচ্ছে না।
“বাবা, বৃষ্টি তো থামল, হয়তো বৃষ্টিতে কোথাও আটকা পড়েছিল। এখন এসে পড়বে। আর কিছুক্ষণ দেখি।”
এরমধ্যে শ্রেয়সী কিছুক্ষণ আগে শিমুলের সাথে কথা বলেছে, সে বলেছে, “আমি দেখছি। তুমি চিন্তা করো না। আঙ্কেলকে দেখো।”
মোহসীন সাহেব শুনলেন না। তিনি পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বেরিয়ে এলেন। দরজার কাছাকাছি আসতেই কলিংবেল বাজল।
দরজা খুলে বিধ্বস্ত দীপ্তকে দেখে দুজনেই আঁতকে উঠলেন, “দীপ্ত, কী হয়েছে?”
দীপ্ত ততক্ষণে টলছে। অস্ফুটস্বরে কী বলল বোঝা গেল না। ভেতরে ঢুকে সে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়, মোহসীন সাহেব আর শ্রেয়সী দুই পাশে ধরল।
দীপ্তর শরীর অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে আছে, পুরো গা ভেজা।
ছেলেকে ওভাবে দেখে মোহসীন সাহেব অস্থির হয়ে গেলেন। ওকে বিছানায় শুইয়ে মোহসীন সাহেব বললেন, “গরম পানি …”
“তুমি বসো বাবা আমি আনছি।”
মোহসীন সাহেব দীপ্তর ভেজা কাপড় পাল্টে দিলেন অভ্যস্ত হাতে৷ এরপর মাথা মুছে দিতে লাগলেন৷ শ্রেয়সী এসে দীপ্তর পা কুসুম গরম পানিতে ডুবিয়ে দিল।
আধা-অচেতন মানুষটাকে হালকা করে বসিয়ে দিয়ে আদা, লবঙ্গ দেয়া চা খাওয়ানোর চেষ্টা করল।
শ্রেয়সীকে নামিয়ে দেবার সময়ও তো দীপ্ত স্বাভাবিক ছিল, হঠাৎ কী হলো! এটা যে স্বাভাবিক বৃষ্টিতে ভেজা নয় তা বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট।
রান্নাঘরে এসেছিল শ্রেয়সী দেখল বসার ঘরে রাখা মোহসীন সাহেবের মুঠোফোনে কল আসছে। সে নিতে নিতে কেটে গেল, ‘শোভা’।
মোহসীন সাহেবকে মোবাইলটা এগিয়ে দিলে তিনি কলারের নামটা দেখে বিতৃষ্ণায় সরিয়ে রাখলেন। তার ছেলে অসুস্থ, এখন তার উল্টাপাল্টা কথা শুনতে একদমই ইচ্ছে করছে না তার।