তোমার নিমন্ত্রনে

পর্ব - ২৭

🟢

শোভা দীপ্তর উত্তরের অপেক্ষায় চাতকের মতো নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে ছেলের মুখের দিকে। বিনিময়ে মিলছে তিক্ত উপেক্ষা।

“কথা বলবি না আমার সাথে?”

দীপ্ত মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “কেন এসেছেন এখানে? এটা আমার কাজের জায়গা।”

“তাহলে বাসায় যাব?”

“ভুলেও না।” ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল দীপ্ত।

“আমি তোর মা খোকা।”

“আমার মা নেই। যখন সে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সেদিন থেকেই সে আমার কাছে মৃত।”

“এভাবে বলিস না প্লিজ। আমি তো তোকে সাথে নিতে চেয়েছিলাম, তুই..”

“কেন নিতে চেয়েছিলেন? আমি তখন বাচ্চা ছিলাম, কিছুই বুঝতাম না, এখন বোকা নই। আপনি আমাকে কেন সাথে নিতে চেয়েছিলেন সেটাও জানি।”

“তুই একজন মায়ের সন্তানকে কাছে রাখতে চাওয়ার মধ্যে স্বার্থ খুঁজছিস!” বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করেন শোভা।

“স্বার্থই তো। আপনার হাজব্যান্ডের সাথে ওটা আপনার হারজিতের লড়াই ছিল তো। জিততে হতো। তাকে একেবারে নিঃস্ব করে দিতে চেয়েছিলেন। দিয়েও ছিলেন, শুধু আমার জন্য পুরোপুরি তা সম্ভব হয়নি।”

“দীপ্ত, তুই কী বলছিস তুই জানিস? তুই আমার মাতৃত্বের উপরে প্রশ্ন তুলছিস। ওটা আমার আত্মসম্মানের লড়াই ছিল। আমি মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছিলাম।”

“সেই জন্য ওই মধ্যবিত্ত স্ট্রাগলের জীবন আপনার সহ্য হয়নি। তাকে প্রতিনিয়ত অপমান করতে আপনার বাঁধেনি।”

“দীপ্ত, তুই আমার জীবনে বাঁচিসনি। তাই আমাকে উপলব্ধিও করিসনি। আমি ওকে ভালোবেসে সব জেনেশুনে ওর হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলাম। তার কী মূল্য সে দিয়েছিল? ওর ফার্স্ট প্রায়োরিটি আমি ছিলাম না। ওর ওই সারাদিন অফিস, কাজ এসবই ইম্পর্ট্যান্ট ছিল।”

“কেন তাকে ওতটা ছুটতে হতো? আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে তাকে তাল মেলাতে হতো৷ নইলে টাকা আসবে কোত্থেকে!”

“টাকা আমার কাছে কোনোদিন প্রায়োরিটি ছিল না। আমার বাবার সেটা যথেষ্ট ছিল। তুই ভুল বুঝছিস। আমি একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ওর হাত ধরেছিলাম। ভালোবাসা পাবার জন্য। আমি কোনোদিন রান্না করিনি। তখন আমাকে রান্না, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে একটা সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। সেখানে আমি ওকে পাইনি। আমি যে ওকে বিয়ে করেছি একটা আবেগের মোহে, সেটা আমি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম। এরমধ্যে তোর জন্ম হলো। আমি নিজে চাকরি করতে চাইলাম। এটা ওর পছন্দ হলো না। তোর নাকি অযত্ন হবে। ও বাবা, ওর দায়িত্ব ছিল না তোর উপরে? আমি চাকরি করলে সে আমাকে ঘরের চার দেয়ালে ধরে রাখতে পারত না। এতে ওর ইগো হার্ট হতো। আসলে ও আমাকে ডিজার্ভ করত না। আমার মতো একজনকে কোনো সাধনা ছাড়াই পেয়ে গিয়েছিল তো, তাই মূল্য বুঝতে পারেনি। হাজব্যান্ডের চাইতে ওয়াইফ সবদিকে যোগ্য হলে তো তার প্রতি ঈর্ষা থাকবেই। ওর মেল ইগো স্যাটিসফাই করতে হবে তো। তাই দাবিয়ে রাখতে চাইত৷ ওর চাওয়া আমি কেন মেনে নেব? তাই ওকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, যে সন্তানের অযত্ন করতে চাইলে সেটা চার দেয়ালেও করা যায়৷ ওর প্রতি এত বিতৃষ্ণা জমেছিল যে ওর সব কথাই আমার অসহ্য লাগত। ও যেটা বলত তার বিপরীত কাজ করে ওকে ওর প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতাম৷ তার জন্য তুই আমাকে ভুল বুঝেছিস নাকি ওই লোকটা এসবের বীজ ঢুকিয়েছে বল তো?”

দীপ্তর ক্রোধ উত্তরোত্তর বাড়ছিল।

“সন্তান শুধু উনার ছিল না৷ আপনারও। তাকে কীসের শাস্তি দিয়েছেন আপনি? তার কী দোষ ছিল?”

“তোর সাথে যে অন্যায় হয়েছে এটা আমি বুঝি। তাই তোর সাথে এমন উতলা হয়ে দেখা করতে আসি। তুই আমাকে প্রথম মা ডেকেছিস। আমার বুকটা খাঁ খাঁ করে। একবার তোকে জড়িয়ে ধরতে দিবি?”

“আপনি এই মুহূর্তে বেরিয়ে যান প্লিজ।”

“দীপ্ত, এভাবে বলিস না বাবা।”

“আপনি মাতৃত্বের কথা বলছিলেন না? মা মানেই জানেন না আপনি। আপনি ভালোবাসতেই জানেন না।”

‘’ভালোবাসা বলে আসলেই কিছু আছে? ওসব বলতে বা সিনেমা উপন্যাসে দেখতেই ভালো শোনা যায়। ফ্যান্টাসাইজ করতে ভালো লাগে৷ কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে ধাক্কা লাগলে ওসব বুকিশ ইমোশন কোথায় হারিয়ে যায়। সব বোকা বোকা টার্ম। আমি নিজে বোকা ছিলাম, সেসবে বিশ্বাস করেছিলাম।”

দীপ্তর মাথায় শেষের কথাগুলো আলোড়ন তুলল। শোভা ততক্ষণে দীপ্তর কাছে চলে এসেছেন।

ওর হাত ধরে বললেন, “একবার মা বলে ডাক, আমি চলে যাব।”

দীপ্ত কয়েক কদম পিছিয়ে গেল, “আমি আপনাকে যতটা ঘৃণা করি, পৃথিবীর আর কোনোকিছুকে তার কোটি ভাগের এক ভাগও করি না। আশা করি উত্তর পেয়েছেন। আপনার জীবনের প্রায়োরিটি লিস্টে আমি কোনোদিনও ছিলাম না। এখন এতটা উতলা কেন হয়েছেন? আর কোনোদিন আমার সামনে আসবেন না। যান প্লিজ আমি সহ্য করতে পারছি না।”

শোভা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল, ওর চোখ মুখ লাল হয়ে আছে, চোখ টলমল, যেন বহু কষ্টে আটকে রেখেছে। শোভার সামনে সেটা ঝরুক তা চাইছে না। ওর শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে এসেছে প্রবল রাগে।

শোভা দীপ্তর টেবিল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“আমি চলে যাচ্ছি খোকা। তুই শান্ত হ। পানিটা খা প্লিজ।”

দীপ্ত গ্লাসটা নিয়ে একবার তাকিয়ে দেখল, এর ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দ হলো টুকরো টুকরো হয়ে যাবার। দীপ্তর ভেতরেও কিছু একটা ওরকম করেই যেন চুরেভেঙে যাচ্ছিল।

শোভা ধীর পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে তাকালেন। ছেলেকে আরেকবার দেখে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন। তিনি কাঁদছেন, আজ তার কান্নায় সত্যিকার একজন মায়ের কষ্ট ঝরে পড়ছে।

দীপ্ত নিজেকে ধাতস্থ করার সময় পেল না, কয়েকজন ওর কেবিনে ঢুকল। দীপ্ত ওদের আশ্বস্ত করে বলল, “হাত থেকে পড়ে গেছে৷ স্যরি, আমি জায়গাটা পরিষ্কার করছি।”

মঈন এসে বলল, “দীপ্ত সাহেব, আপনি বরং আজ বাসায় চলে যান। শরীর খারাপ মনে হচ্ছে।”

“ঠিক আছে। ধন্যবাদ।”

কোনোমতে বলে সবার কাছ থেকে যেন প্রাণপণে লুকাতে চাইল দীপ্ত। এলোমেলো পায়ে বেরিয়ে এলো খোলা আকাশের নিচে। আকাশে তখন মেঘের গর্জন, পুরো আকাশ তখন গ্রাস করে নিয়েছে কালো মেঘ। দীপ্তর ভেতরকার মতো। পুরনো ক্ষত জেগে উঠেছে নতুন করে, সাথে নতুন গড়ে উঠা বিশ্বাসের ভীতও কেমন নড়বড়ে হয়ে যেতে চাচ্ছে।

ওর মাথার মধ্যে প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছে। সে গাড়িও নিল না। ফুটপাতে হেঁটে হেঁটে পার্কে ঢুকে একটা বেঞ্চে বসে মাথা এলিয়ে দিল।

***

শ্রেয়সী অফিস শেষে অপেক্ষা করছিল দীপ্তর জন্য। ওরা একসাথে ফেরে৷ কয়েকবার কল করল, কিন্তু বন্ধ। প্রায় আধাঘণ্টা অপেক্ষা করে বেরিয়ে এলো।

বাসায় ফিরল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। মোহসীন সাহেব বললেন, “ভিজে গেছিস তো। যা ফ্রেস হয়ে নে। দীপ্ত কখন আসবে?”

শ্রেয়সী বলল, “আমি তো কল দিলাম৷ তোমার ছেলের ফোন বন্ধ। হয়তো আড্ডা দিয়ে ফিরবে।”

“এই ঝড় বৃষ্টির দিনে তো ওর তোকে আনতে যাওয়া উচিত ছিল। তোর আবার জ্বর আসবে। যা, তুই ভেজা জামা কাপড় পাল্টে ফেল মা।”

রাত দশটার দিকে শ্রেয়সীর চিন্তার ভাঁজ গাঢ় হলো। শিমুলকে কল দিল, সে কিছু জানে না। আজ নাকি কথা হয়নি।

মোহসীন সাহেব অফিসের রিসিপশনে কল করে শুনলেন, দীপ্ত নাকি লাঞ্চ আওয়ারের পরে পরেই বেরিয়ে গেছে।

“ছেলেটা কোথায় গেল?”

প্রশ্নটা শ্রেয়সীর মাথায়ও ঘুরপাক খাচ্ছে।

Story Cover