বাইরে ভীষণ মেঘ করেছে বলে আরমান ভাই শিশিদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন রাত দশটার দিকে। এরপর শিমুল আর শান্তা আরও ঘণ্টাখানেক থেকে বেরিয়ে গেল।
“তোকে দেখে ভালো লাগছে দীপ্ত। কীভাবে উদযাপন করলে তুই খুশি হবি গত কিছুদিন থেকে শ্রেয়সী সেটাই ভেবে গেছে শুধু। তোর মুখে কাঙ্ক্ষিত হাসি দেখে দেখ আঙ্কেল আর শ্রেয়সী কত খুশি হয়েছে। এভাবেই হাসিস সবসময়।” শিমুল যাবার আগে দীপ্তকে জড়িয়ে ধরে সবার অলক্ষ্যে কথাটা বলল।
“সৌম্যকে একবার টাইট দেয়া লাগবে।” দীপ্ত বলতে শিমুল বলল,
“সৌম্যর কথাকে পাত্তা দেয়ার কিছু নেই। ব্যাটা তোর নামে উল্টাপাল্টা কথা ছড়াচ্ছে।”
“পাত্তা দিচ্ছিও না। কিন্তু খুব বিরক্ত লাগছে।”
“আজকের আয়োজনে মদ দে। আমরা পরে এটা নিয়ে কথা বলব। আসি।”
মোহসীন সাহেব দীপ্ত আর শ্রেয়সীর হাতে গাড়ির চাবিটা ধরিয়ে দিলেন।
“বাবা, তুমি এত নাছোড়বান্দা কেন?”
“তোর বাপ তাই।”
“তুমি নিজেই জীবনের সবচাইতে বড় উপহার। তুমি সবসময় আমার মাথার উপরে বটবৃক্ষের মতো থেকো। তাহলেই হবে। অন্য উপহারের আবার আলাদা করে দরকার কী!”
মোহসীন সাহেবের চোখে জল জমেছে, তিনি ছেলেকে সস্নেহে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমার যা আছে সবই তো তোর। বেঁচে থাকতে তোকে সুখী দেখার যে আকুলতা তা পূর্ণ হয়েছে। এভাবেই দেখতে চাই যতদিন বেঁচে আছি।”
দীপ্ত মনে মনে যা অনুভব করে মুখে সবসময় বলা হয় না, তাই আজ বলল, “বাবা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”
বাবা জানেন সেটা, তবুও অন্তর থেকে উৎসারিত এমন ভালোবাসা মাখা কথাটায় তিনি আরেকবার আপ্লুত হলেন৷ বলতে গিয়ে দীপ্তও আপ্লুত হলো। শ্রেয়সী পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল, ওর চোখের কোণও ভিজে উঠল।
দীপ্তর জন্মদিন সবাই ভুলে যাবার প্রতিবাদস্বরূপ যে উপহার কিনেছিল, এমন আয়োজন দেখে সেটা কোনোরকমে সরিয়ে রেখেছিল। এবার সেটা বের করল। বাবার পাঞ্জাবি আর শ্রেয়সীকে শাড়িটা দিল।
মোহসীন সাহেব হেসে বললেন, “তোর ন্যাকামির লিস্টে কিন্তু আজকের কাণ্ডটাও যোগ হবে।”
দীপ্ত বলল, “কী করেছি আমি?”
শ্রেয়সী পাশ থেকে ফোঁড়ন কেটে বলল, “ধেড়ে খোকা জন্মদিনের উইশের জন্য কেমন ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। সেটা।”
দীপ্তর মুখটা আবারও সকালের মতো হয়ে গেল, কিছু বলতে গিয়েও আবার হেসে ফেলল। আসলেই ভীষণ ছেলেমানুষি হয়ে গেছে। কিন্তু কী করবে সে! বড় হয়েছে বলে কি খানিকটা আহ্লাদ ধরে রাখা যাবে না!
“মোটেও ন্যাকামি ছিল না। আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছিলে। সেটা মেনে নিতে পারিনি।”
“তা এখন কিছু বল। আজকের রান্না সবটা কিন্তু আমি করিনি। শ্রেয়সীও করেছে।”
“সে তো তুমি ট্রেইনার হিসেবে ভালো বলে এত দ্রুত রান্না রপ্ত করেছে।”
শ্রেয়সী রেগে দীপ্তর দিকে তাকালে সে বলল, “ওই আরকি, মানে ট্রেইনিরও একাগ্রতা ভালো ছিল।”
সবাই হেসে ফেলল এবার।
সবাই একসাথে গাড়ি দেখতে পার্কিংয়ে এলো। দীপ্ত শিমুলের সাথে ড্রাইভিং শিখেছিল। এখন রাতেই কিছুক্ষণ তিনজন গাড়িতে বসে ঘুরে এলো। এরপর মোহসীন সাহেব ঘুমুতে চলে গেলেন।
দীপ্ত নিজের ঘরে আসতেই শ্রেয়সী বলল, “তোমাকে কিন্তু কিউট লাগছিল সকালে। বাচ্চা বাচ্চা লাগছিল দেখতে।”
“এখনো মজা করছো?”
“সত্যিই, মনে হচ্ছিল শিশুরা যেমন প্রত্যাশিত খেলনা না দিলে কাঁদো কাঁদো চেহারা বানায় তেমন আদুরে লাগছিল।” বলেই এগিয়ে এসে শ্রেয়সী দীপ্তর গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে সরে গেল। এরপর বলল,
“তখনকার পাওনাটা দিয়ে দিলাম।”
দীপ্ত এগিয়ে গিয়ে আদর ফেরত দিয়ে বলল, “এটা রিটার্ন গিফট। এই শাড়িটা আজ প্রথম পরলে, তোমাকে ভীষণ মানিয়েছে।”
এই শাড়িটা বিয়ের কিছুদিন পরে দীপ্ত কিনে দিয়েছিল, প্রথম উপহার ছিল এটা। তাই আজকের দিনে এটাই পরেছিল। সাথে হালকা কিছু গহনা পরেছে।
দীপ্ত ওর চুল খুলে দিয়ে বলল, “এখন আরও সুন্দর লাগছে।”
শ্রেয়সী হাসল। সে ভেবেছিল দীপ্ত শাড়িটার কথা মনে করতে পারবে না, কিন্তু পেরেছে। তার মানে সে দেখে পছন্দ করেই এই শাড়িটা ওকে দিয়েছিল। সে অনেক বান্ধবীদের কাছে শুনেছে তাদের হাজব্যান্ডরা কখন কোন শাড়ি দেয় পরে মনে করতে পারে না অনেকেই।
শ্রেয়সী বলল “এবার চোখটা একটু বন্ধ করো।”
“কেন?”
“সেটা জানতে হলে চোখ বন্ধ করতে হবে। এত প্রশ্ন করো কেন?”
দীপ্ত হেসে চোখ বন্ধ করল। শ্রেয়সী দীপ্তের হাত ধরে দেয়ালের সামনে নিয়ে এলো। এরপর বলল, “এবার চোখ খোলো দীপ্ত।”
দীপ্ত চোখ খুলল, ওর সামনে দেয়ালে বেশ বড় করে বাঁধানো ওদের বিয়ের একটা চমৎকার ছবি ঝুলছে। যে ছবি তোলার জন্য একসময় মনে মনে ফটোগ্রাফারকে গালাগালি করেছে, সেই ছবিটা আজ ওর চোখে একরাশ মধুময় স্মৃতি হয়ে ধরা দিল। শ্রেয়সী বসে আছে, ওর পেছেন দীপ্ত দাঁড়িয়ে খানিকটা ঝুঁকে মাথাটা ওর বরাবর এনে হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রেয়সীর মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত। দীপ্তর সেদিন মনে যা চলছিল ভাগ্যিস ছবিতে তা ধরা পড়েনি!
আরেকটা ছবি পাশে, দীপ্ত কাঁদছিল, মোহসীন সাহেব ওকে কোলে নিয়ে একটা খেলনা হাতে কান্না থামাবার চেষ্টা করছিলেন। এই ছবিটা দীপ্ত লুকিয়ে রাখে, কান্নাকাটি করছিল, সবাই দেখলে মজা করবে বলে।
“এই ছবি কই পেলে? বুঝেছি, বাবা দিয়েছে। ঘরের শত্রু বিভীষণ।”
“এত কিউট একটা ছবি। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।”
আজ দীপ্তরও ভালো লাগল, দীপ্তর ভালো লাগার মানুষগুলোকে শ্রেয়সী বাঁধিয়ে এনে দিয়েছে।
***
ওদের নিরপদ্রুপ, নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের আরও একমাস কেটে গেল। দুজন দুজনকে আরও অনেকভাবে আবিষ্কার করল। সময়টা কেটে গেল রঙিন ঝলমলে আবহে।
দীপ্ত এখন গাড়ি নিয়ে আগে শ্রেয়সীকে অফিসে দিয়ে নিজের অফিসে যায়। ফেরার সময় আবার নিয়ে আসে।
মোহসীন সাহেবের এই সুখ দেখে ভারি ভালো লাগে।
দীপ্ত অফিসে বসেছিল। তূর্য এলো দেখা করতে। ওর আরেকজন বন্ধু। বলল, “জরুরি কিছু কথা বলতাম। সময় হবে তোর?”
লাঞ্চ আওয়ার ছিল, ওর সাথে দীপ্ত অফিসের পাশের একটা রেস্টুরেন্টে এসে বসল।
“তোর চেনাজানা ভালো কোনো উকিল আছে?”
“কেন? কোনো সমস্যা?”
“ডিভোর্সের জন্য। আমি তরুকে আমার কাছে রাখতে চাই, কিন্তু তুলি কিছুতেই দেবে না।”
“ডিভোর্স মানে?”
“তুলির সাথে আর এডজাস্টমেন্ট হচ্ছে না রে। রোজ রোজ অশান্তির চাইতে আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো।”
“কিন্তু তরু বয়স অত অল্প, ওর জন্য…” বলতে বলতে থেমে গেল দীপ্ত। নিজের ছেলেবেলাটা তরুর মধ্যে দেখতে পেল যেন।
“তাছাড়া তোরা তো ভালোবেসে বিয়ে করেছিলি। হঠাৎ…”
তূর্য আর তুলির ভালোবাসা অনেকের কাছে ঈর্ষণীয় ছিল। তুলি হল থেকে রান্না করে নিয়ে আসত তূর্যর জন্য। তূর্যও তুলি বলতে অজ্ঞান ছিল। বিয়ে নিয়েও কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি ওদের। ওমন প্রগাঢ় প্রেমও ফিঁকে হয়ে যায়!
“ভালোবাসা ছিল, কিন্তু পাশাপাশি থাকতে থাকতে একসময় রঙ হারিয়ে যায়। তখন বড্ড রেগুলার, একঘেয়ে হয়ে যায় সব। চাওয়া পাওয়া বদলে যায়। তখন হিসেবের খেরোখাতায় কাটাকুটি চলে। ওত হিসেব করে তো আর সংসার হয় না৷ তখন ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়।”
দীপ্তর মনে ভীতিটা ফিরে এলো আচমকা। ভালোবাসা মরে যায়… কেন এমন হয়! তবে কি ওর জন্য শ্রেয়সীর মনে যে অনুভূতি আছে তাও শুকিয়ে যাবে কোনোদিন! তখন দীপ্ত কী করবে! অসহনীয় এক অস্থিরতা ওকে গ্রাস করল।