দীপ্ত আর শ্রেয়সী অফিসে চলে গেলে মোহসীন সাহেব গত কিছুদিন থেকে বাইরে যাচ্ছেন। তার এক বন্ধুর কাছ থেকে গাড়ি বিষয়ক পরামর্শ নিলেন এরপর গাড়ি দেখে এলেন। দীপ্ত আর শ্রেয়সীর বিয়ের উপহার হিসেবে এটা দেবার কথা ছিল। দীপ্তকে কয়েকবার বললেও সে কানে তোলেনি কথাটা।
তাই নিজেই উদ্যোগ নিলেন, এবার জন্মদিনে এটাই উপহার দেবেন। সাথে তিনি নিজের হাতে প্রতি বছর ছেলের জন্ম কেক বানান। এবারও বানাবেন।
তবে শ্রেয়সী কেক বানানোর কথা শুনে আবদার করেছে সে-ও সাথে থাকবে। তিনি মানা করেননি। মেয়েটার এই স্বপ্রণোদিত উৎসাহ তার ভালো লেগেছে। দুজনে মিলে এবারের জন্মদিনের আরও কিছু পরিকল্পনা করেছে।
শ্রেয়সী নিজে গিয়ে আরমান ভাই আর তার স্কুলের শিশুদের দাওয়াত দিয়ে এসেছে। শিমুল আসবে শান্তাকে নিয়ে। এই আয়োজনের ঘটা নিয়ে দীপ্তকে আপাতত কিছু জানানো বারণ।
শ্রেয়সী বাবা-মাকে আসতে বলেছিল। কিন্তু মায়ের কোমড় ব্যাথাটা বেড়েছে। লম্বা জার্নি ধকল হয়ে যায় বলে আসতে পারবেন না, মা না এলে বাবা আসার প্রশ্নই আসে না। দু'জনে একসাথে যায় যেকোনো দাওয়াতে বা কোথাও। এখনো একজন আরেকজনকে ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ তারা। তবে না আসতে পারলেও উপহার পাঠিয়ে দিয়েছেন৷ শ্রেয়সী অফিসের ঠিকানায় পাঠাতে বলেছিল। দীপ্ত যাতে আভাস না পায়।
মোহসীন সাহেব হেসে বললেন, “ধেড়ে খোকার জন্মদিনের এমন আয়োজন দেখলে ওর নিজেরই পিলে চমকাবে।”
শ্রেয়সী হেসে বলল, “কথা ঠিক বলেছ। ধেড়ে খোকার জন্মদিন।”
***
রাত বারোটার পর থেকেই দীপ্তর টাইমলাইনে শুভেচ্ছা পোস্ট আসতে শুরু করে। এসব নিয়ে সে তেমন মাথা ঘামায় না। বাবা ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন বলে তিনি সকালে উইশ করেন। তবে এবার সে ভেবেছিল শ্রেয়সীর কাছ থেকে প্রথম শুভেচ্ছা আসবে। কিন্তু মেয়েটা আজ দেখো, আগে আগে ঘুমিয়ে পড়েছে।
দীপ্ত কিছুক্ষণ উশখুশ করে শুয়ে পড়ল। মনে মনে কিঞ্চিৎ আশাহত হলো। ওর মনে আছে শ্রেয়সীর জন্মদিনে সে আগে উইশ করবে বলে অসুস্থতা নিয়েও বসে ছিল। যখন আর পারছিল না, তখন সময়ের খানিক আগেই এসএমএস করেছিল। অথচ দেখো মহারানী কেমন নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। না, নাক ডাকে না, এমন মিথ্যা অপবাদ দেওয়া যাবে না। তবুও অভিমান যে হয়নি সেটাও নয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরে আসতে ভেবেছিল বাবা কেক এগিয়ে দেবেন প্রতিবারের মতো। কিন্তু তা না উল্টো বললেন,
“কী রে? রান্নাঘরের দায়িত্ব থেকে তুই অব্যহতি নিয়েছিস না-কি? সব তো আমি আর শ্রেয়সীই করছি। এসে একটু হাত লাগা আমাদের সাথে।”
দীপ্ত মনে মনে বলল, “ধূর, কেন বিয়ে করেছি আমি? বাপ তো দামই দিচ্ছে না, বউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। কোনো মানে হয়।”
গজগজ করতে করতে এসে রুটি সেঁকে দিল। শ্রেয়সী সবজি করছে। বাবা রুটি বেলে দিচ্ছেন৷ শ্রেয়সীর এখনো রুটি গোল করাটা শেখা হয়নি। তবে মোহসীন সাহেব ওকে গোলা আটা সরাসরি দিয়ে গোল করা শিখিয়েছেন।
মোহসীন সাহেবের রুটি বেলা শেষ হলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন, খাবার আগে তার দুটো ওষুধ খেতে হয়।
দীপ্ত বলল, “আজ কয় তারিখ যেন?” সরাসরি মনে করিয়ে দিতে বাঁধল বলে ইঙ্গিতে মনে করিয়ে দিতে চাইল।
“এগারো তারিখ। এখন দিন তারিখ ভুলে যাচ্ছো নাকি তুমি?”
দীপ্ত মনে মনে গজগজ করতে করতে বলল, “নিজে ভুলে বসে আছে। আবার কীভাবে বলছে দেখো!”
মুখে বলল, “আমি প্রয়োজনীয় জিনিস মনে রাখি। তোমার মতো না।”
শ্রেয়সী মনে করার চেষ্টা করে বলল, “আমি কী ভুলে গেলাম?”
“কিছু না। আমি রেডি হই। অফিসে যাব। শুধু শুধু দেরি করে লাভ নেই।”
“হ্যাঁ দেরি করো না, পরে লেইট হয়ে যাবে।” হেসে বলল শ্রেয়সী।
“ভেরি লেইম জোক।”
দীপ্ত বেরিয়ে গেলে ওর গাল ফোলানো চেহারা মনে করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল শ্রেয়সী।
পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, “আরে, তুমি একাই অফিসে যাবে নাকি! আমিও তো যাব।”
খাবার টেবিলে মোহসীন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তোর কী হয়েছে রে? ওমন ভল্লুকের মতো মুখ করে খাচ্ছিস কেন?”
“সুখে। আর কী কী বিশেষণ আছে দাও। ভাল্লুক, উল্লুক, গাধা, গরু, ছাগল যা আছে সব বলো।”
“নিজের নাম নিজেই দিচ্ছিস। ভালোই হলো পরিশ্রম কমে গেল আমার।”
শ্রেয়সী আবারও হেসে ফেলল, মোহসীন সাহেবও যোগ দিলেন সাথে। দীপ্ত শুধু রাগ মাখা করুণ চোখে দু'জনকে একবার দেখল।
***
শ্রেয়সী বারোটার পরপরই অফিস থেকে বাসায় ফিরে এলো। সে বলেছিল এসে মোহসীন সাহেবের সাথে রান্না করবে। তবে তিনি আগেই সব গুছিয়ে নিয়েছেন৷ এখন শুধু রান্না চুলায় উঠা বাকি।
“তোমার ছেলে কিন্তু সেই ক্ষ্যাপেছে।”
“বেচারা এটেনশন চাইছিল, তখন পায়নি। সমস্যা নেই আসুক। তখন খুশি হয়ে যাবে। ওকে চিনি তো আমি।”
“বাইরে যেমনই দেখাক, তোমার ছেলে কিন্তু ভেতরে ভেতরে এখনো বড্ড ছেলেমানুষ। বার্থ ডে উইশ না পেয়ে কেমন করছে। অবশ্য ওর উইশ কম পড়েছে নাকি। ফেসবুক ভর্তি ওয়েল উইশার তার।” শেষের কথাটায় খানিকটা যেন ঈর্ষার আভাস।
মোহসীন সাহেব প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন৷ এটুকু অধিকারবোধ সম্পর্কে থাকতে হয়। তাহলে দৃঢ়তা বাড়ে৷ তবে এটা যদি মাত্রা ছাড়ায় তখনই বিষাক্ত হয়ে যায়। ঠিক তার নিজের একদা এক সম্পর্কের মতো।
***
অফিসে অনেকেই দীপ্তকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। জিজ্ঞেস করছে, “বিয়ের পরে প্রথম জন্মদিন। কীভাবে সেলিব্রেট করছেন?”
আর সেলিব্রেট, বাসায় ওকে কেউ পাত্তা দেয় নাকি! ওকে আজ ঘণ্টা দেড়েক আগে ছুটি দেয়া হলো।
যাদের মনে রাখার তাদেরই মনে নেই, বাকি দুনিয়ার উইশ করায় কী আসে যায়। তার মধ্যে একটা শুভেচ্ছাবার্তা শোভার। সেটা সে ওপেন-ই করেনি। একদিনে এত বিরক্তি সে নিতে পারবে না।
বাসায় ফেরার সময় দীপ্ত ভাবল কারো যেহেতু মনে নেই, সে নিজেই মনে করিয়ে দেবে। উল্টো কাজ করবে, সে নিজেই ওদের জন্য উপহার কিনবে। এতে যদি ওদের শিক্ষা হয়। এটাও এক ধরনের প্রতিবাদ ওর পক্ষ থেকে।
সে বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি আর শ্রেয়সীর জন্য একটা শাড়ি কিনল। এরপর মিষ্টি আর রসমালাই কিনে বাড়ি ফিরল। বাবার করা পায়েশটাও এবার মিস হয়ে গেল।
বাসায় ফিরে হতভম্ব হয়ে গেল দীপ্ত। বসার ঘরে এত লোক সমাগম দেখে প্রথমে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল, পড়ে চারপাশের আয়োজন দেখে হাসল।
শ্রেয়সী আর মোহসীন সাহেবের দিকে তাকাতে ঘর ভর্তি সকলে একসাথে বলে উঠল, “শুভ জন্মদিন।”
দীপ্ত অবচেতনেই হেসে ফেলল। একরাশ খুশির বাতাস বয়ে গেল মন জুড়ে৷
মোহসীন সাহেব ওকে বসতে ইশারা করে হাতে পায়েশের বাটি তুলে দিলেন, দীপ্ত হাসিমুখে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “তোমরা আমার সাথে এটা করতে পারলে?”
শিমুল পাশ থেকে বলল, “খাবারের গন্ধে ক্ষুধা বেড়ে যাচ্ছে তো। কান্নাকাটি পড়ে কর না।”
“কান্নাকাটি মানে?”
“সব শুনেছি আমরা। এখন ঢং রাখ, আর আয়।”
এবার শ্রেয়সীর দিকে কড়া চোখে তাকায়ে গিয়েও দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। মেয়েটা ওর মন জুড়ে একরাশ স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দেয় সবসময়।
সে এগিয়ে যেতে যেতে সুযোগ পেয়ে শ্রেয়সীকে বলল, “আমার উপহার কই?”
“যথাসময়ে পাবে। এখন এসো তো। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
শাফকাত সাহেব আর আয়েশা ভিডিও কলে কথা বললেন ওদের সাথে।
সবচাইতে আনন্দিত হয়েছে শিশুরা। শ্রেয়সী ওদের সবার জন্য নতুন পোশাক কিনে দিয়েছে৷ এভাবে আনন্দ করার সুযোগ ওরা সবসময় পায় না। আজ এমন আদর পেয়ে সকলেই ভীষণ খুশি।
ওদের খুশি দেখে দীপ্তর মনে হলো, ওর পাশে বাবা সবসময় আছেন, সামর্থ্য ছিল, এখন শ্রেয়সী আছে। এই শিশুদের পাশে এসব নেই। তবুও কী সুন্দর করে হাসতে পারছে, সেই হাসিতে কোনো পঙ্কিলতা নেই৷
দীপ্তকে তো আল্লাহ ওদের চাইতে ভালা রেখেছে। তবে সে কেন এত বিষাদ জমিয়ে রাখবে অপ্রাপ্তির। বরং নিজের প্রাপ্তির আলোয় নিজের কাছের প্রিয়জনদের পাশাপাশি এদেরকেও যদি কিঞ্চিৎ আলোকিত করা যায় মন্দ কী। জীবন তো একটাই, সেটা বৃথা যন্ত্রণায় না ব্যয় করে ভালো কাজে ব্যয় হোক। তাতে সুখের সঞ্চয় জমা হবে হৃদয়ে।