শ্রেয়সী রুমে এসে শুয়ে পড়ল। এখনো ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারছে না যে দীপ্ত ওর সাথে এমন ব্যবহার করেছে। সে ভেবেছিল কিছুটা মন খারাপ করবে, অল্পবিস্তর রেগেও যেতে পারে। কিন্তু সেটা যে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাবে সে ভাবতে পারেনি।
তবে ওর সবচাইতে বেশি কষ্ট হচ্ছে দীপ্তর একটা কথায়, মাথায় ঘুরেফিরে সেই কথাটাই কানে বাজছে,
“তোমার গহনা দরকার হলে আমাকে বলতে। যার তার কাছ থেকে কেন নিতে হবে?”
অথচ ওর গহনার প্রতি তেমন ফ্যাসিনেশন একেবারে নেই। এতটা ভুল ভাবনা দীপ্ত পুষে ওকে নিয়ে! কথাটা ভীষণ পোড়াচ্ছে শ্রেয়সীকে।
আবার দীপ্তর তার মাকে নিয়ে যে অপূর্ণতা আর আক্ষেপের কথা বলল, তাতে ওর প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতি জন্মেছে।
কষ্ট, রাগ সহানুভূতি সব কেমন একসাথে বইছিল ওর মনে। তবুও ঘুরেফিরে সেই আগের ভাবনাটাই, দীপ্ত ওকে লোভী ভাবল! এটা ভীষণ অসম্মানের। কতক্ষণ যে অতিবাহিত হলো ওর কেবল এপাশ ওপাশ করতে করতে সে জানে না। আজ আর ঘুম আসবে বলে মনে হয় না। অথচ কাল অফিস আছে সক্কাল থেকে।
***
দীপ্ত বারান্দার রেলিঙের সাথে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে বহুক্ষণ ধরে। পৃথিবীতে ওই একজন মানুষকে সে তার সমস্ত অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। মুখটা যেন ওর স্বপ্নেও কখনো হানা দিতে না পারে, তাই চায়৷ তবুও ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মধ্যে সেই মুখচ্ছবি ঠিকই হাজির হয় কখনো কখনো।
ওই সময়টা যদি মেমোরি সেল থেকে মুছে ফেলা যেত চিরতরে তবে হয়তো খানিকটা স্বস্তি মিলত।
স্কুলের সামনে যেখানে অভিভাবক জোন ছিল, সেখানে সবার মায়েরা আসত। সেখানে ওর মাকে নিয়ে, বাবাকে নিয়ে, ওকে নিয়ে চর্চা চলত। তখন সব না বুঝলেও কষ্ট পেত সে। সন্তানকে পরম মমতায় জড়িয়ে রাখার সময় তাদের যতটা কোমল, মাতৃসুলভ বলে মনে হতো, ঠিক এসব চর্চায় তাদেরকেও কী ভীষণ নির্মম বলে যে মনে হতো! দীপ্তর মনে হতো পালিয়ে যায় দূরে কোথাও।
সেই স্কুল বাবা বদলে দিলেন। দুঃস্বপ্ন খানিকটা কমল। তবুও এই সমাজ, একজন ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানের বেড়ে উঠার পথ সুগম করেনি। দীপ্ত আর অফিস, সাথে ঘর সব সামলাতে হিমসিম খাওয়া বাবার স্ট্রাগল সে চোখের সামনে দেখে বেড়ে উঠেছে। বাবা রান্না করতে গিয়ে কতবার হাত পুড়িয়ে রান্না শিখেছেন।
দীপ্ত সেই ছোট্ট বয়সেই বড় হয়ে গিয়েছিল, পারিপার্শ্বিকতা ওকে বড় করে তুলেছিল। সে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে উঠতে নিজেকে অন্যভাবে গড়ে নিয়েছিল। যাতে নিজের মধ্যে হান্ড্রেড পার্সেন্ট পারফেকশন থাকে। সবার মধ্যমণি যে সে-ই হয় যেকোনো আড্ডায় কিন্তু আসরে।
তিনি ডিভোর্সের আট মাসের মাথায় বিয়েও করে নেন। তখনও দীপ্ত বোকার মতো আশা পুষে রেখেছিল মা ফিরবে। একদিন শুনল ওর মায়ের আরেকটা সন্তান হয়েছে। যাকে তিনি ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে নেন। দীপ্ত কেঁদেছিল সেদিন পাগলের মতো। ওই ভালোবাসার কিছুটা তো ওরও প্রাপ্য ছিল। সে কেন পুরোপুরি বঞ্চিত হলো! ওর দোষটা কী ছিল! সেই সন্তান জন্মানোর পর বছর তিনেক তিনি কোনো যোগাযোগ করেননি।
আজ সিমপ্যাথি কেন চাইছেন তিনি! কী চান! শ্রেয়সী…..
মনে পড়ল শ্রেয়সীর কথা। ঘণ্টা দুয়েক অতিবাহিত হয়ে গেছে ততক্ষণে। দীপ্তর উত্তপ্ত মস্তিষ্ক খানিকটা স্থির হয়েছে। শ্রেয়সীর সাথে নিজের আচরণ মনে পড়ল। ওর তো কোনো দোষ নেই। বৃথাই ওর উপরে রাগ ঝেড়ে ফেলেছে। ওকে নিশ্চয়ই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করেছে বলেই বাধ্য হয়ে নিয়েছে, তার ইমোশনকে আঘাত করতে চায়নি হয়তো।
তাছাড়া শ্রেয়সীকে সে একয়দিনে যেটুকু চিনেছে, তাতে এটুকু বুঝতে পেরেছে, তার আত্মসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রখর। নাহ্! ভুল হয়ে গেছে ওর। ক্ষমা চাইতে হবে।
রুমে এসে আলো জ্বালালো না, নিঃশব্দে এসেছে বলে শ্রেয়সীর ছটফট সে খেয়াল করেছে। ঘুমোয়নি এখনো। কীভাবে ক্ষমা চাইবে তাই সে ভাবছিল। কিন্তু ডাকার মতো সাহস আপাতত সঞ্চয় করতে পারল না। সে পাশে শুয়ে শ্রেয়সীকে জড়িয়ে ধরল।
শ্রেয়সী বলল, “কাল অফিস আছে৷ আমি ঘুমাব। গায়ে হাত দিও না। ভাল্লাগছে না।”
দীপ্ত কাতর গলায় বলল, “আমার হৃদয়ে দগদগে ক্ষত আছে। তুমি তাতে একটু প্রলেপ দিয়ে দাও প্লিজ। আমি একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই আজ।”
শ্রেয়সীর রাগ পড়েনি, তবে এমন করে বলল দীপ্ত যে এড়াতে পারল না। সে দীপ্তর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করল আলতো করে।
“বাবা আমার সবচাইতে কাছের বন্ধু। তবুও সমস্ত কথা তার সাথে শেয়ার করা যায় না। তুমি আমার তেমন বন্ধু হবে শ্রেয়সী যাকে হৃদপিণ্ড খুলে সবকটা প্রকোষ্ঠে কী জমে আছে তার সমস্তটা খুলে দেখানো যায়?”