মোহসীন সাহেব ঢাকায় ফিরেছেন গতকাল। এখন বেশ কয়েকদিন তার এমন দৌড়াদৌড়ির মধ্যে থাকতে হবে। এই বয়সে এসব ঝুটঝামেলা তার ভালো লাগে না। আগেও লাগত না যদিও। তবে নিজের বয়সের সাথে সাথে অনেককিছু মানিয়ে নিতে তিনি শিখে গেছেন বহু আগেই। আট বছরের ছেলেকে নিয়ে কত চড়াই-উতরাই তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে তা কেবল তিনিই জানেন।
তবে শোভার উপরে তার নিজের যত ক্ষোভই থাকুক, তিনি কোনোদিন দীপ্তর উপরে তার নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে চাননি। কোনোপ্রকার নেতিবাচক মন্তব্যও প্রাক্তন স্ত্রীকে নিয়ে ছেলের কান বিষিয়ে দিতে চাননি। তার সাথে সংসার টেকেনি বলে যে ছেলেকে উসকে দেবেন তেমন মানসিকতা তার কোনোকালেই ছিল না। তাতে দীপ্তর ছেলেবেলা আরও খারাপ হতো। হয়তো সে ভালো মানুষ হতে পারত না। আরও বেশি ভেঙে পড়ত। তাতে লাভ কিছুই হতো না, বরং সন্তানের মনের বিরূপ প্রভাব সন্তানের মানসিকতাকে বাজেভাবে প্রভাবিত করত। একজন বাবা হিসেবে শোভার সাথে তার ঝামেলার বিষয়টা কেবলই তাদের ব্যক্তিগত হিসেবেই রেখে এসেছেন।
তবুও দীপ্ত মা'কে পছন্দ করে না। চোখের সামনে যা সে দেখেছে, তা ওই ছোট্ট মস্তিষ্কে এখনো রয়ে গেছে। প্রথমদিকে ঘুমের ঘোরে ‘মা’ ‘মা’ বলে কেঁদে উঠত, তিনি কত রাত নির্ঘুম ছেলের মাথার কাছে বসে হাত বুলিয়ে, বুকে চেপে শান্ত করে ঘুম পাড়িয়েছেন তার স্বাক্ষী কেবল তিনি নিজে, আর রাতের চারদেয়ালে বন্দী অসহ্য আঁধারটুকু।
দীপ্ত মা'য়ের সাথে যেতে না চাইলেও ছোট্ট নিষ্পাপ শিশু হৃদয় মনে মনে আশা বেঁধে রেখেছিল। একদিন তার মা আবারও তার কাছে ফিরে আসবে, তাকে কোলে নিয়ে ঘুমপাড়ানি গান শোনাবে। সে না খেয়ে লুকিয়ে থাকলে মা খাবারের থালা হাতে ওর দুষ্টুমি সহ্য করে পিছে পিছে ঘুরে খাইয়ে দেবে! কিন্তু এসব কিছু না হওয়ায় ওর মধ্যে জন্মেছিল সীমাহীন নৈরাশ্য। নৈরাশ্য থেকে বিরাগ।
দীপ্ত একসময় মা'কে ছাড়া বাঁচতে শিখে গেল, অভিমান সরে গিয়ে জায়গা করে নিল রাগ, ঘৃণা৷ কোনো সন্তান তার মা'কে ঘৃণা করুক, তিনি এমনটা চাননি। তবুও সব তো তার চাওয়া মতো ঘটবে না। শিশু হৃদয়ের যে ক্ষত তা এমনই প্রগাঢ় যে সময়ের সাথে সাথে তা মুছে যায়নি। বরং টনটনিয়ে বুকে বেজে উঠে হাহাকারের সুর হয়ে।
“বাবা, বাবা…”
দীপ্তর ডাকে মোহসীন সাহেব নিজের চিন্তা স্রোতে লাগাম টানলেন।
“কী ব্যাপার? কী এত ভাবছো বলো তো? সেই কখন থেকে ডাকছি!”
“কিছু না। অফিস থেকে কখন ফিরলি?”
“এই তো। ফিরেই তোমার ঘরে চলে এলাম।”
দীপ্তর অভ্যাস অফিস থেকে ফিরে তার সাথে দেখা করা। আগে তো তিনিই দরজা খুলতেন। এখন দেখা যায় বেশিরভাগ সময় শ্রেয়সীই খোলে। তখন দীপ্ত নিজের ঘরে যাবার আগে তার ঘরে আসে।
“যা, ফ্রেশ হয়ে নে।”
“তা যাচ্ছি। কী হয়েছে কিছু বলবে?” চিন্তিত গলা দীপ্তর।
“কই কিছু না তো।”
“একদম মিথ্যা কথা বলবে না বাবা। আমি দেখেছি তুমি ইদানিং কিছুটা চুপচাপ হয়ে গেছ। সারাক্ষণ কী নিয়ে যেন চিন্তা করো। আমাকে বলো না!” বলতে বলতে দীপ্ত তার পাশে এসে বসে তার কাঁধে হাত রাখল।
ছেলের কাতরতায় তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। শোভার প্রসঙ্গ তুলে দীপ্তর মুড খারাপ করতে চান না তিনি। এই প্রসঙ্গ সে শুনতেই চায় না। কিন্তু ওদিকে শোভা মরিয়া।
“আরে এখন কী আমার হৈ হৈ করার বয়স আছে নাকি? আমি ঠিক আছি। অযথাই বেশি বেশি ভাবছিস।”
“তুমি সুস্থ আছো বাবা?”
“আমাকে দেখে তোর এখন অসুস্থ মনে হচ্ছে?”
“তোমার মনের সুস্থতার কথা বলছি বাবা!”
মোহসীন সাহেব কিছুটা চমকে উঠলেন। ছেলে তাকে পড়তে পারে অনেকটাই। তিনি এমন সন্তানের জন্য নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করলেন। সকলেই বাহ্যিক স্বাস্থ্যের খোঁজ নেয়, সন্তানরাও। বয়স্ক বাবার মনের খবর কয়জন সন্তান জানতে চায়! জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি এক নিমিষেই ভেসে গেল জলের তোড়ে। সহসাই নিজেকে ভীষণ সুখী বলে মনে হলো। এক জীবনে আর কী চাইবার আছে মানুষের!
“সবদিক থেকেই একদম ফিট আছি। তাছাড়া হৈ হৈ জমিয়ে রাখছি। তোর বাচ্চা কাচ্চাদের সাথে দৌড়ে খেলতে হবে না?”
দীপ্ত জানে আর জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, বাবা কিচ্ছু বলবেন না। তবে তার চিন্তার খাত কোনদিকে বইতে পারে তা সে জানে। তাদের দুজনের জীবনের সমস্ত দুর্ভোগের কারণ একমাত্র ওই মহিলা, যে ওর জন্মদাত্রী।
***
রাতে এগারোটার দিকে দীপ্ত হঠাৎ প্রস্তাব দিল, “ছাদে যাবে? বারান্দায় বসেছিলাম, চমৎকার জোছনা। যাবে?”
শ্রেয়সী বৃষ্টি ভালোবাসে, জোৎস্না ভালোবাসে, এটা দীপ্ত জানে। খোলা বারান্দায় চমৎকার আলোর বন্যা দেখে তাই স্ত্রীকে খুশি করতে চাইল। কেন যেন ওর হাসিমুখ দেখতে ভীষণ ভালো লাগে দীপ্তর।
“চলো যাই।”
ছাদে ওঠে মুগ্ধ গলায় শ্রেয়সী বলল, “কী সুন্দর!”
যদিও কৃত্রিম আলো আছে চারপাশে, তবুও তা যেন এমন পৃথিবীপ্লাবি জোৎস্নার আলোর কাছে ম্লান। দীপ্তও মোহগ্রস্ত গলায় বলল, “তোমার মতো।”
শ্রেয়সী এগিয়ে এসে দীপ্তর হাত ধরে বলল, “আমাদের মতো।”
বলেই হাসল দুজন। সেই হাসি মিশে গেল জোৎস্নায়, আর জোৎস্না তার সমস্ত আলো নিয়ে যেন মিশে গেল ওদের হৃদয়ে। সে-ই আলো জুড়ে কেবল ভালোবাসা, ভালোবাসা আর ভালোবাসা।
***
আর এক সপ্তাহ পরেই দীপ্তর জন্মদিন। শ্রেয়সী অফিস থেকে বেরিয়ে ভাবল আজ একবার শপিংমলে যাবে। ওর সাথে পরিচিত হবার পরে দীপ্তর প্রথমবার জন্মদিন। একটু স্পেশাল কিছু না হলে চলে!
নিজের জন্মদিনে দীপ্তর উপহারের কথা ওর মনে পড়ল, সেদিনটা না এলে হয়তো দীপ্তকে নিয়ে, এই সম্পর্কটা নিয়ে সে ভাবতেই পারত না।
আজ বেশ ভ্যাপসা গরম পড়েছে। রোদে একমিনিট দাঁড়ালে গায়ে যেন ফোস্কা পড়ে যায়। মানুষ যে কেন গাছপালা সব কেটে একাকার করে ফেলছে! তার ফল ভোগ করছে এখন।
শ্রেয়সী সিএনজি থেকে নেমে এলো। কী দেয়া যায় ভাবছে আর এদিক-ওদিক ঘুরছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না যে কোনটা স্পেশাল হবে। আজ কিছু পছন্দ না হলে যেন আরও ভাবার সময় পাওয়া যায়, সেজন্য সময় থাকতেই এসেছে৷ তাই অত চাপ নেই।
একবার ভাবল শিমুলকে কল করে দীপ্তর ফ্যাসিনেশন জানবে কি-না। পুরোনো এবং কাছের বন্ধু সে। শ্রেয়সী যেটুকু জেনেছে সে নিশ্চয়ই আরও বেশি করে জানবে।
পরক্ষণেই ভাবনাটা বাতিল করে দিল সে। নাহ্! নিজের জানা থেকেই উপহার কিনবে সে। সেটাই ভালো হবে। ‘'স্পেশাল” মানুষের জন্য উপহারে নিজের ওই ভাবনাটুকুরই তো বেশি বিশেষত্ব থাকে। যাকে উপহার দেয়া হয়, তারও তো এটা ভাবতে ভালো লাগবে যে উপহারদাতা তার জন্য এত ভেবে, ভালোবেসে সেই উপহারটা দিয়েছে। সেটা থেকে সে নিজেও বঞ্চিত হতে চায় না, দীপ্তকেও করতে চায় না।
শ্রেয়সী ভাবল কিছুদিন আগেই সে একা ছিল, নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন আর অল্পকিছু বন্ধু বাদে আর কারো জন্য কখনো সে ভাবেনি। এভাবে তো ভাবেইনি।
সে তার প্রেমের ‘জিরো’ এক্সপেরিয়েন্স নিয়েও বান্ধবীদের বয়ফ্রেন্ডকে কী গিফট করা যায় তার সাজেশন দিয়ে এসেছে। অথচ আজ নিজের বরকে কী দেবে তা নিয়ে ভেবে অস্থির।
একটা আউটলেট থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তখনই আচমকা একজন অভিজাত পোষাক আর চালচলনের মধ্যবয়স্ক মহিলা এসে ওর সামনে দাঁড়ালেন। ওর দিকে খানিকটা তাকিয়ে থেকে বললেন, “তোমার নাম শ্রেয়সী?”
শ্রেয়সী মৃদু হেসে বলল, “জ্বি। আপনি…”
মহিলা আরও খানিকটা এগিয়ে এসে ওর চিবুকে হাত রাখলে শ্রেয়সী অস্বস্তিবোধ করল।
“ভীষণ লক্ষ্মী দেখতে তুমি। আমাকে বোধহয় চিনতে পারোনি। তবে তোমাকে ঠিক চিনেছি। কী দূর্ভাগ্য বলো তো, নিজের ছেলেকে ফেসবুকে স্টক করে তোমার ছবি দেখতে হয়েছে। এখন চিনেছ?”
শ্রেয়সী এখনো তাকিয়ে আছে, এবার তিনি হেসে বললেন, “আমি দীপ্তর মা।”
শ্রেয়সী স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে রইল, কিছুক্ষণ বুঝতে পারল না কী করা উচিত ওর।