অর্নবের বোকা প্রেমিকা

লেখিকাঃ মহুয়া আমরিন বিন্দু

প্রকাশকালঃ মার্চ ১৪, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

সুদর্শন এক শ্যাম বর্নের যুবক, সিমেন্টের তৈরি সাদামাটা বেঞ্চিটাতে বসে আকাশ দেখতে দেখতে উদাসীন কন্ঠে পাশে বসা খোলা চুলের রমনীর উদ্দেশ্য বললো

--,,নিজের বিয়ের দিন বিয়ে করার বদলে নতুন বউ এরকম এলোকেশী হয়ে আমার মতো এক অবোধ যুবক কে তলফ করার কারন কি জানতে পারি?

রমনী কপালের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চুল গুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে চমৎকার হাসলো!

মহুয়া আমরিন বিন্দু এর লেখা অনুগল্প অর্নবের বোকা প্রেমিকা এর ইমেজ

চোখ বন্ধ করেই পাশে বসা যুবক গলা খাঁকারি দিলো আবার বললো--,,এরকম লেটা মাছের মতো না হেসে জলদি বলতো কি আ'কাম করে এসেছিস এখানে!

মেয়েটা এবারও নিশ্চুপ...

ছেলেটা এবার অধৈর্য হয়ে বললো--,,কথা বলছিস না কেনো অনি?

অনি অবলীলায় হেসে বললো--,,তোর সাথে পালিয়ে যাবো বলে এসেছি,যাবি আমার সাথে?বিয়ে করবো তোকে!

---,,মজা করিস না দোস্ত, তোর যা দজ্জা'ল মার্কা বাপ! এখানে এসে আমাকে দেখলে তোর সাথে সাথে আমাকেও উপরে টপ'কে দিবে।বাঁ'শ খাওয়ানোর জন্য আর কাউকে কি তোর চোখে পড়েনি?যা তো গিয়ে চুপচাপ বিয়ে করে নে।

অনি অলস ভঙ্গিতে বললো----,,বিয়ে তো হয়ে গেছে দুইদিন আগেই!

অর্নব অনির মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো--,,তো জামাই রেখে এখানে এসেছিস কেনো?

--,,কখন বললাম আমার বিয়ে হয়েছে?

অর্নব এবার সরু দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো অনির মুখপানে, মেয়েটা সব সময় কোনো না কোনো ক্যা'চাল করবেই।

--,,তুই কি ভনিতা ছাড়া কিছু বলবি?না হয় আমি চলে গেলাম!

অনি লম্বা শ্বাস টেনে অন্য পাশ ফিরে উদাসীন ভঙ্গিতে বললো--,,সবাই এভাবে আমাকে রেখে চলে যেতে চাস কেনো?আমি এতোটাই খারা"প?এতোটাই অযোগ্য? রূপের দিক থেকে ও কি নগন্য পরিমান সুন্দরও নই?

অর্নব কিছুটা রেগেই বললো--,,কি সব বক'ছিস!

অনির হতাশ কন্ঠস্বর--,,,পরিবারের সবার মন রক্ষার্থে তাদের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলাম,সব কিছুতে হ্যাঁ বললাম, পুতুলের ন্যায় সব মেনে নিলাম।হাসি মুখে সব কিছু করলাম।

হবু বরের সাথে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও মধ্যে রাত পর্যন্ত কথা বললাম বন্ডিং ভালো করার জন্য!

তবুও কেনো এমনটা হলো বলতে পারিস?অপ'রাধ না করেও অপরা'ধীর তকমা কেনো মেয়েদের গায়েই লাগে সব সময়?সমাজ কেনো মেয়েদের নিয়েই চুল ছেড়া বিশ্লেষণে মেতে উঠে,ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হলেও একটা না একটা মন গড়া দোষ হলেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করে?

অর্নব থমথমে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো--,,কে কি বলেছে তোকে? একবার বল আমাকে!

---,,নিয়তি, সময় আর পরিস্থিতি অনেক কিছুই বলে,আবার এদের গেঁড়াকলেই চাপা পড়ে, না বলাই থেকে যায় অনেক কিছু।

---,,আমার থেকে লুকাতে চাইছিস?

অনি তপ্ত শ্বাস বাতাসে মিশিয়ে বললো--,,তাহলে এখানে আসতাম না!আর তোর থেকে লুকানোর সাহস কি আদো আমার আছে?আমি তো মুখ থেকে প্রথম শব্দটা বের করা মাত্ররোই তুই বুঝে যাস পরবর্তীতে কি বলবো!

অর্নব গম্ভীর হলো কিছুটা--,, আজকের টা তোর মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছি আমি।

অনি মাথা নিচু করে চুপ রইলো কিছুক্ষণ, তারপর ধীর কন্ঠে বললো--,, যাকে ভালোবাসলাম তাকে বলার মতো সাহস জোগাতে পারলাম না!

যাকে স্বামী হিসাবে মানতে মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিলাম সে মানুষ টাও মাঝ পথে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

কিন্তু সে মানুষটাই প্রথমে বলেছিলো তুমি আমাকে ভালো না বাসলেও সমস্যা নেই সারাজীবন আমি একাই তোমায় ভালোবাসবো,তুমি আমার প্রথম ভালোবাসা, তোমাকে পেয়ে যাবো কখনো কল্পনাও করিনি,তোমার হাত আমি কখনো ছাড়বো না একবার বিশ্বাস করতে পারো।আমি কখনো ছেড়ে যাবো না!তোমার রূপকে আমি ভালোবাসিনি, তুমি কালো, সাদা যেমনই হও আমি তোমাকে তুমি যেমন সে রকম ভাবেই গ্রহণ করবো।

ভাবছি এতো গুলো মিথ্যা মানুষ কিভাবে বলে?এতোটা নিখুঁত অভিনয় ও হয়!

অর্নব ডেকে উঠলো -"অনি তাকা আমার দিকে!

বল বিয়ে টা হচ্ছে না কেনো?

---,,ছেলেটির বর্তমান স্ত্রী খুবই সুন্দরী এক রমনী,যাকে ফেলে আমার মতো একটা ছিমছাম সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করাটা তার বোকামি হতো,ভালোবাসা নাকি আসে আর যায়,এসব নিয়ে এতোটা ভাবার কিছু নেই!

তার হাই ক্লাস স্ট্যাটাসের সাথে আমি কোনো ভাবেই মানানসই না!

সে নিতান্তই পরিবারের বাধ্য ছেলে তাই তখন বড়দের কথা ফেলতে পারেনি বিয়ে তে মত দিয়েছিলো,

তার নাকি ভালোবাসা ও ছিলো আমার প্রতি যা এখন আর নেই!

সে তার স্ত্রীর মাঝে যা যা খুঁজেছে সবই নাকি বর্তমানে তার যে লাইফ পার্টনার তার মধ্যে আছে।

আমার বাবার অহং'কার আজ চূড় চূড় হয়ে গেছে জানিস? তিনি বড় গর্ব করে বলেছিলেন আমাকে, এরকম ছেলে পাবে কোথাও?রূপ,গুন, শান, মান, দৌলত কিছুরই কমতি নেই!

আজ আমার বাবা বুঝলো ছেলেটির মাঝে আসলে বিবেক বুদ্ধি আর মনু'ষ্যত্ব নেই!দায়িত্ব জ্ঞানহীন ছেলে সে,

তবে তিনি বুঝতে সময়টা একটু বেশিই নিয়ে ফেলেছেন টানা তিন টা মাস তো কম নয়।তবে এখন আর কিছু করার নেই তাই তিনি আমাকে মুভ অন করতে বললেন!

অর্নব মৃদু হাসলো,হাসতে হাসতেই বললো----,,তুই যাকে ভালোবাসিস তাকে বলে দেখ সে হয়তো তোর অপেক্ষাতেই আছে!

---,,বাহ্!তুই দেখছি আমার থেকেও বেশি চিনিস ওই ছেলেকে, ছেলেটাকে না জেনে না চিনে তুই একদমে বলে দিলি সে হয়তো আমার অপেক্ষাতেই আছে!

---,,তোর মতো মানুষকে যে হারিয়ে ফেললো সে হারিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে অমূল্য কিছু!

তোকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কোনো সুপুরুষের নেই।

অনি কিছুটা বিদ্রুপের হাসি হাসলো---,,কি বলতে চাইছিস? আমার হবু বর সুপুরুষ ছিলো না?

অর্নব রাগলো কিছুটা কন্ঠে তা স্পষ্ট! ----,,তোর বুঝি সে মানুষটার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে?

অনি সোজাসাপটা বললো---,,না!কিছুটা মায়া আর কিছুটা অভ্যাস।

----,,কা'টিয়ে উঠতে পারবি না?

অর্নব অনিকে বলার সুযোগ না দিয়ে আবার বললো---,,ভালোবাসাকে যত্ন করে লুকিয়ে যে মেয়ে বিয়ের পীড়িতে বসতে পারে সে এই সামান্য ধা'ক্কা সামলাতে পারবে না?

অনি বলে উঠলো--,,ভালোবাসার মানুষটাকে না পাওয়ার য'ন্ত্রণা, তাকে রেখে অন্য কারো হয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাধ্য কাজ হয়তো অন্য একটাও হয় না।

একতরফা ভালোবাসাটা কেমন অদ্ভুত দেখ, পাবো না জেনেও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।

হাজারো ভীড়ের মাঝে চোখ জোড়া শুধু তাকেই খুঁজে বেড়ায়! মস্তিষ্কের এতো শতো টানাপোড়নের মধ্যেও শুধু তাকেই মনে পড়ে।

একদিনের এক ঝলক দেখা, বছরের পর বছর না দেখেও কাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে যায়।বলতে পারিস ভালোবাসাটা স'স্তা পলিথিনে মোড়া নাকি অধিক দামী কিছু?

---,,মানুষ বেধে সব কিছুর ব্যাখ্যাই ভিন্ন।

অনি চমৎকার হেসে বললো----,,প্রত্যাখান নেওয়ার মতো ক্ষমতা নেই, তাই ভালোবাসা ও প্রকাশ করিনি!

অর্নব মুচকি হাসলো---,,কখনো কখনো ঝুঁকি নিয়ে দেখতে হয় বুঝলি,অপর ব্যক্তিরও হয়তো তোরই মতো অবস্থা। আয় আমার সাথে তোকে নিজে নিয়ে যাবো তোর সেই মনের মানুষটার কাছে যাকে তুই ভালোবাসিস!

আমার সামনে তুই তাকে মনের কথা জানাবি,বাকিটা পরে দেখা যাবে কি হয়,পজি'টিভ অর নেগে'টিভ একটা না একটা তো উত্তর আসবেই চিল!

অনি পূর্ণ দৃষ্টি রাখলো অর্নবের চোখে---,,এখন প্রকাশ করাটা বেমানান,সে মানুষটির মনে হতে পারে,এখন আমি তার সুযোগ নিচ্ছি,একজন বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া সমাজের চোখে ত্রু'টিপূর্ণ এক মেয়ে নিজের দুর্বলতা কে আড়াল করতে তাঁকে হাতি'য়ার বানাচ্ছে!

যদি সে মেনেও নেয় তাহলে এমনটা হতেও পারে সে আমাকে সহানুভূতি বা দয়া দেখাচ্ছে!ভালোবাসাটাই নেই সেখানে।

অর্নব অনির মাথায় আলতো চাপড় মে'রে বললো--,,,তুই যে সব সময় দুই লাইন বেশি বুঝিস, এই সম্পর্কে তোর কি কোনো ধারনা আছে?

অনি হাসলো আবারও,অর্নব মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখলো সে হাসি!

মেয়েটার এই মনকাড়া হাসি দেখেও কি ওই ছেলেটার বুকে চিন চিনে ব্যাথা হয়নি? রাতের ঘুম হারিয়ে যায়নি,এই মায়াবী আদুরে পুতুলটাকে হারিয়ে তার বুকে কি হাহাকার জমেনি?কি করে পারলো পেয়েও ফিরিয়ে দিতে?

অর্নব নিজের বুকের বা পাশে হাত রাখলো।চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো হৃদয'ন্ত্রের কোলাহল, কাউকে হারিয়ে ফেলার তীব্র য'ন্ত্রণারা আর্তনা'দ করে বেড়াচ্ছে সেখানে। কেউ একজন চিৎকার করে বলছে, আজ বলে দে অর্নব দ্বিতীয় বসন্ত খুব কম মানুষের কাছেই ধরা দেয়।

অনি ডাকলো মৃদু সুরে

--,,অর্নব চল না কিছু খেয়ে আসি,প্রচুর খিদে পেয়েছে আমার!

অর্নব আনমনেই বলে উঠে

---,,আর আমার যে পিপাসা পেয়েছে।আমি যে বড় তৃষ্ণার্থ!

অনি তাড়া দেখিয়ে দাঁড়িয়ে বললো---,,তাহলে চল দোকান থেকে পানি কিনে নিবি!

অর্নব অনির হাত আঁকড়ে ধরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো---,,এই পিপাসা তো পানিতে মিটবে না!

এর নাম যে প্রেমপিপাসা, প্রেমিকের হৃদয়ের পিপাসা প্রেমিকা বিহীন কি করে মিটবে বলতে পারিস?আমি যে প্রেমগ'লির এক তৃষ্ণায় কাতর প্রেমিক।প্রেম বিহীন তাহা মিটবে কি করে?

"তুমি কি এসে একবার মিটাবে আমার এই প্রেম পিপাসা?

ওগো প্রেমপ্রেয়সী প্রেমনিবেদনী,

বিনীত নিবেদন তোমায়

দিবে কি আমায়,তোমার হৃদয়ের অতল সমুদ্রে ডুব দেওয়ার অনুমতি?ভালোবাসার সুযোগ টুকু কি দিবে?ভালোবাসা টুকু গ্রহন করে আমায় একটু আধটু ভালোবাসবে?আমার সাথে জীবনের বাকি পথটুকু চলবে কি!

অনি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে অর্নবের দিকে,বুঝার চেষ্টা করছে, অর্নব কি তাকে প্রোপোজ করলো নাকি সে ভুলবাল স্বপ্ন দেখছে!

অনি কাঁপা কন্ঠে বললো--,,তু....ই আমা..কে বলেছিস অর্নব!

অর্নবের মেজাজ গেলো বিগরে হাঁটু ভাজ করে রিং নিয়ে বসে আছে সে, আর এই মেয়ে কিনা প্রশ্ন করছে তাকে বলছে কি না?আনরো'মান্টিক লাউ একটা!

----,,না তোর দাদীকে বলছি আমি।

অনি মুখ বাঁকিয়ে বললো ---,,আশ্চর্য! তুই এগুলো আমাকে কেনো বলতে যাবি?নাকি প্র্যাক্টিস করছিস কিভাবে তোর মনের মানুষ কে বলতে পারবি?

অর্নব চোখ রাঙিয়ে বললো--,,তুই কি কোনো দিনই আমাকে সিরিয়াসলি নিবি না?

অর্নব এগিয়ে এসে রাগ নিয়ে দুবাহু চেপে ধরলো অনির,গমগমে কন্ঠে বললো

"ভালোবাসি কবে বুঝবি গবেট!"

আমাকে ভালোবাসার আ'গুনে জ্বা'লিয়ে পুড়ি'য়ে আর কতো মা"রবি তুই?

বিয়ে করতে পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলি একবার এসে বলতে পারলি না? যে আমাকে ভালোবাসিস!

" যে চোখে আমি ডুবেছি অনেক আগে,সে চোখে তুই কিভাবে আমার জন্য রাখা ভালোবাসা আড়াল করিস?

প্রেমিকাদের এতোটা বোকা হতে হয় না জানিস না"?

অনির চোখ চকচক করছে পানিতে,গড়িয়ে পড়ার অনুমতি পেলেই হয়তো ঝর ঝর করে নামবে এক অশ্রু বারিধারা!

,,কাঁদবি না একদম বোকা!আমি আমার প্রেয়সীর চোখে জল একদম বর'দাস্ত করবো না।

অনি এবার কেঁদে দিলো, তার সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না তার ভালোবাসার মানুষটিও তাকে ভালোবাসে!

কারা যেনো কানে কানে বার বার বলছে তুই অনেক ভাগ্যবতী অনি তোর অর্নব তোকে ভালোবাসে অনেক বেশি ভালোবাসে।

অর্নব শক্ত করে জড়িয়ে নিলো বুকের মাঝে তার আদুরে পুতুল রানীকে! অনি বিসর্জন দেয় তার সুখময় অশ্রু কণার দল তার প্রিয় মানুষের বুকে।

অর্নব অনির মাথায় হাত বুলিয়ে কানের কাছে ফিসফিস কন্ঠে বলে--''অর্নবের বোকা প্রেমিকা, অর্নবের বউ হবেন?"

অনি অর্নবের শার্ট আঁকড়ে ধরে বুকের সাথে লেপ্টে থেকেই হাসলো,পূর্ণতার হাসি!

~~~~~~সমাপ্ত~~~~~~

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প