প্রকাশকালঃ মার্চ ১৪, ২০২৬
আপনি আমাকে কতোটা ভালোবাসেন নিলয় ভাই?
প্রিয় মানুষটার মুখে এরকম কথাটি শুনে বরাবরের মতোই ঠোঁট চেপে হাসলো নিলয়।সে জানে কেনো মেয়েটা বার বার তাকে একই প্রশ্ন করে।মেয়েটি এই পর্যন্ত একবারও বলেনি আমি আপনাকে ভালোবাসি নিলয়,একবার ও বলেনি আপনাকে ছাড়া আমি ম রে যাবো, বা আপনি না থাকলে আমি আপনাকে মিস করব!মেয়েটি ভালোবাসা খুবই গভীর, নিখুঁত! মনের গভীরে লুকানো।যার স্বীকারোক্তি কখনো দিবে কিনা সন্দেহ।নিলয় শান্ত কন্ঠে বললো
,,যতটা ভালোবাসলে কেউ হয় দিন শেষে ক্লান্ত মুখের এক চিলতে হাসি।মন খারা'পের তিক্ততায় এক পশরা সুখ।
,,ধরুন আমার এক জটিল অ সুখ হলো!বা এক্সি*ডেন্ট করে হাত পা কোনো একটা নাই হয়ে গেলো বা সুন্দর চেহারাটা কুৎ"সিত বিভ"ৎস হয়ে গেলো তখনই কি এতোটাই ভালোবাসবেন?বাহানা করে চলে যাবেন না তো?
,,আমি তোমার বাহ্যিক রূপ, লাবণ্য কে ভালোবাসিনি বর্ষা!তুমি যেমনই হও আমি চোখ বুজে তোমাকে তেমনই গ্রহণ করতে রাজি।তবুও নেক্সট টাইম নিজেকে নিয়ে এরকম বা'জে বা'জে কল্পনা গুলো করবেনা তুমি।
,,আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না তবুও কেনো আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন আপনি?ভালোবাসা বিহীন সম্পর্ক কিভাবে টিকিয়ে রাখবেন আপনি?
,,সম্পর্কে দুজনকেই যে ভালোবাসতে হবে এমন তো ধরা বাঁধা কোনো নিয়ম নেই।সম্পর্কে যতোটা ভালোবাসার দরকার ততোটা ভালো না হয় আমি একাই বাসবো!তুমি শুধু আমার আশেপাশে ছায়া হয়ে থাকবে। তোমার দিকে তাকিয়ে আমি কাটিয়ে দিতে পারবো সারাটি জীবন।
,,আপনি কি অনেক বেশি সিনেমা দেখা শুরু করে দিয়েছেন নিলয় ভাই?এরকম ফিলমি ডায়লগ না বলে বাস্তবতায় ফোকাস করুন।আপনার কি কখনো আমাকে কাছে পেতে মন চাইবে না?নিজেকে কতোটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন আপনি?ভালোবাসা বিহীন সম্পর্কে শরীর ছুঁয়ে দিলেও কি মন ছোঁয়া যাবে আদো?
,,আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা জন্মাতে যদি এক যুগ সময় ও লাগে তবুও আমি অপেক্ষা করতে রাজি।তোমার মন ছোঁয়ার মতো ভালোবাসার জোর আছে কি না জানি না তবে আমি চেষ্টা করতে চাই।
,,আমি পুরুষ মানুষ কে সহজে বিশ্বাস করতে পারি না,আমি আমার আশেপাশের সব সম্পর্কে পুরুষ চরিত্র গুলোকে পাল্টে যেতে দেখেছি।আপনি ও যদি পরিবর্তন হয়ে যান তখন?
এই প্রশ্নে নিলয় হাসলো,কিছু বললো না যা দেখে বর্ষা ও চুপ রইলো।
,,আপনি অনেক সুন্দর নিলয় ভাই!
,,সুন্দর না হলে বুঝি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হতে না?
বর্ষার ভাবলেশহীন জবাব
,,না!
পর পর থেমে আবার বললো
,,আপনার অনেক টাকা না থাকতো আর যদি আপনি সুদর্শন না হতেন তাহলে আমি আপনাকে কখনো বিয়ে করতাম না!একটু আগে যে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম আমার কিছু হয়ে গেলে আপনি আমাকে গ্রহণ করবেন কিনা।আমি হলে বলতাম করবো না।
নিলয় মুগ্ধ কন্ঠে বললো
,,তাই!
,,হুম আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না?
,,আমি নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করি তোমায়।এটাও জানি তোমার মিথ্যা বলার স্কিল খুবই জঘ"ন্য!
,,বিশ্বাস করে ঠকে যাচ্ছেন না তো নিলয়?আমার মতো একটা বদ"রাগী মেয়েকে তো নিজের বাবা মা ই অনেক সময় সহ্য করতে পারে না আপনি কি করে এরকম ত্যাড়া ধাঁচের মেয়েকে সহ্য করবেন।
,,ভালোবেসে!
,,আপনি সত্যি মর'বেন। আপনার জন্য আফসোস হচ্ছে আমার, এরকম একটা সুন্দর, ভদ্র, ধৈর্যশীল ছেলে সত্যি একটা ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে। কিন্তু আপনার পছন্দ যে এতোটা বা জে হবে আমি কল্পনাও করিনি।তার উপর ওইদিন কি বললেন আমি আপনার চাইল্ডহুড লাভ।হতাশ আমি পুরোই হতাশ!
,,তাতেও সমস্যা নাই।জানো একটা গানের লাইন মনে পড়ছে এখন যদিও বা বাংলা গান ততোটা পারি না আমি, ভিন দেশে এসে ইংরেজি শুনতে শুনতে কেমন ওটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি!
,,আচ্ছা শুনি কি গান মনে পড়লো।
,,ডুবে ডুবে ভালোবাসি তুমি না বাসলেও আমি বাসি।
বর্ষা মৃদু হাসলো,নিলয় বলে উঠলো আর মাত্ররো পনেরো দিন ততদিন যত পারো হতাশ হয়ে নাও।যতই তুমি না করো না কেনো বিয়ে তো আমি তোমাকেই করবো!ভালোবাসায় ডুবিয়ে রেখে দিবো তোমায়।
বর্ষা কান থেকে ফোনটা নামিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো,নিলয় ছেলেটা সম্পর্কে তার মামাতো ভাই।পারিবারিক ভাবেই বিয়ে ঠিক হয়েছে দু মাস হলো,
নিলয় বিদেশি এক কোম্পানিতে কর্মরত পড়াশোনা শেষে চাকরির অফারটা মন্দ লাগেনি তার।বর্ষা অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, তার চেনা জানা নিলয় ভাই ছিলো রাগী গম্ভীর চুপচাপ। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর মানুষ টাকে সে নতুন রূপে আবিষ্কার করলো।আগের সাথে কোনো মিল নেই প্রথম প্রথম কথা বলার সময় বর্ষা এতোটাই হতবাক হয়েছিলো,ভেবেছিলো হয়তো অন্য কাউকে ভুলে কল দিয়ে ফেলেছে।ছেলেটি তার জন্য এতো ভালোবাসা মনের মাঝে লুকিয়ে রেখছিলো যা তার কল্পনার বাহিরে।তবে বর্ষা কখনো বলেনি সে নিলয় কে ভালোবাসে।বিয়েতে অমত করতেও পারেনি সে, তার মায়ের অতি পছন্দের ছেলে কিনা।
****
কেটে গেলো পনেরো দিন আজ নিলয়ের আসার কথা।এয়ারপোর্টে গিয়েছে বাড়ির অনেকেই বর্ষা নিজের বাড়িতেই আছে নিলয়দের বাড়িতেও যায়নি তার বাবা মা গিয়েছেন সেখানে।কিছুক্ষণ পর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলো তার ছোট বোন রামিসা,চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
বর্ষা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালো বোনের দিকে।রামিসা গড়গড় করে বললো
,,আপু নিলয় ভাইয়ার এক্সি*ডেন্ট হয়েছে এখন তাকে হসপিটালে নেওয়া হয়েছে।
বর্ষার মনের ভিতরটা কেমন করে উঠলো,কষ্টে কান্নারা গলায় দলা পেকে যাচ্ছে বার বার।সে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো।রামিসা আবার বললো আব্বু আম্মু সেখানেই গেছে কখন ফিরবে জানি না।
বর্ষার মুখ দিয়ে কথা বের হলো না।কেমন বিদ'ঘুটে অনুভূতি বিরাজ করে মন মস্তিষ্ক জুড়ে।
রাতে বাড়ি ফিরলেন বর্ষার বাবা মা দুজনই বেশ চিন্তিত।মা বাবা কে কিছু জিজ্ঞেস করলো না সে।সকালে রামিসার থেকে জেনে নেওয়া যাবে ভেবে, সে ফিরে আসতে চেয়েও দাড়িয়ে পড়লো বাবা মায়ের কথা শুনে।
,,নিলয়ের পায়ের কন্ডি"শন দেখেছো তুমি বর্ষার আম্মু,মনে হয় না তো কোনোদিন ভালো মতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে, এই ছেলের সাথে এখন আমি কিভাবে নিজের মেয়েকে বিয়ে দেই বলোতো জেনে শুনে!
,,এমন ভাবে বলছো কেনো নিলয়ের জায়গায় যদি আজ বর্ষা থাকতো তুমি কি একই কথা বলতে পারতে, বিয়ের প্রথম থেকেই তো তুমি রাজি ছিলে এখন সামান্য
দুর্ঘ*টনা কে কেন্দ্র করে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাচ্ছো?
,,এতো কিছু আমি বুঝি না, আমার মেয়ের ভবিষ্যতের প্রশ্ন,তার ভালো মন্দ আমি বুঝবো।তোমার ভাইয়ের ছেলের কথা ভাবতে গিয়ে নিজের মেয়ের ক্ষ"তি করতে পারবো না আমি!
বর্ষা আর কোনো কথা বললো না চুপচাপ রুমে বসে রইলো।একবার ফোন ও দিলো না মানুষ টাকে জানার জন্য সে কেমন আছে।
টানা একসপ্তাহ গেলো বর্ষা একবার ও কল করেনি নিলয় কে।নিলয়কে তিন দিন পরই বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।বর্ষা তার খুঁজ নেয়নি দেখে অভিমানে নিজেও কল করেনি।
নিলয় উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে সিলিং এর দিকে ভাবছে ওইদিন বর্ষার বলা কথা গুলো সত্যি কি তবে মেয়েটা তার থেকে দূরে চলে যাবে।সে অসুস্থ হওয়ায় তার হাত ছেড়ে দিবে মাঝপথে? সে যে স্বপ্ন দেখেছিলো অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়ার মেয়েটির হাতে হাত রেখে।তার ভালোবাসা কি মেয়েটার মনে একটুও দাগ কাটতে পারলো না।
,,,,,
ড্রয়িং রুমে বসে আছে বর্ষার বাবা মা,মেয়ে কে পরিপাটি হয়ে বের হতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো এই এক সপ্তাহে একবারও ভালো করে কথা বলেনি কারো সাথে আর না একবারও নিলয়ের কথা জিজ্ঞেস করেছে।এতে তারা ভীষণ অবাক হলেও চুপ ছিলো।
,,আব্বু আম্মু তোমরা কি আমার সাথে যাবে নাকি তোমাদের ছাড়াই বিয়ে টা করে ফেলবো?
মেয়ের এমন কথা শুনে চমকে উঠলো দুজনে।বর্ষার আম্মু সুমা বেগম তো হা হয়ে গেলো, যে মেয়ে বিয়ে করবে না বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে সে নিজ থেকে বিয়ে করতে চাচ্ছে কিন্তু কাকে?
,,কি সব বলছিস?কাকে বিয়ে করবি কেনোই বা করবি?
,,এতো কথা বলার মতো সময় নেই কাজি সাহবে মনে হয় অলরেডি চলে গেছে আমি এমনিতেই লেইট মা তুমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আসো সাথে আব্বু তুমি ও এখনই বড় মামাদের বাসায় যাবো আমরা!
,,কেনো?
,,কোনো আবার মাত্ররই তো বললাম বিয়ে করতে।
বর্ষার বাবা রেগে বললেন
,,এ কেমন ধরনের ছেলেমা'নুষী বর্ষা তুমি কি নিলয় কে বিয়ে করার কথা ভাবছো?
,,হ্যাঁ।তার সাথেই তো বিয়ে ঠিক আসার এক সপ্তাহ পরেই তো বিয়ের কথা ছিলো তো এখন কি অসুবিধা?
,,এই বিয়ে হবে না।
,,কারন কি নিলয় ভাইয়ের এক্সি*ডেন্ট? যদি বিয়ে করার পর এমন হতো তখন কি বলতে আব্বু?
ডিভো'র্সের কথা বলতে নাকি?আমার মনে হয় এখনই বিয়ে টা করা উচিত বাবা নিলয় ভাইয়ের পাশে এই সময়টাতে থাকাটা আমি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি। এখন তোমরা আসলেও বিয়ে হবে না আসলেও!জানোই আমি একটু ঘাড়*ত্যাড়া বলেছি যখন বিয়ে আজই হবে।বিয়ের পর আমার কি হবে তা নিয়ে না ভাবলেও চলবে,সব দায় ভার আমার নিজের, কখনো তোমাদের দো*ষারোপ করতে আসবো না তাই নিশ্চিন্ত থাকো।
মেয়ের কথায় কি জবাব দিবে বুঝ উঠতে পারলো না খলিল হক।স্ত্রীর দিকে তাকালেন তিনি বুঝাই যাচ্ছে মেয়ের সিদ্ধান্তে তিনি মহা খুশি যতই হোক নিজের ভাইয়ের ছেলে বলে কথা।
অগত্যা তিনি তৈরি হয়ে আসলেন যা মেয়ে পয়"দা করেছেন বলা যায় না একাই চলে যাবে আবার।
কলিং বেলের শব্দ পেয়ে ঘুমটা ছুটেছে নিলয়ের, অসুস্থ হওয়ার পর নিজেকে জোকার মনে হচ্ছে দলে দলে সবাই এসে দেখে গেলো শুধু আসলো না কাঙ্ক্ষিত মানুষটি।মনে রাগ পু'ষে চলেছে সে, অনুরাগী মন তার তবুও চাইছে বর্ষা একবার আসুক!
দরজা খুলে এতোদিন পর বর্ষা কে দেখে সবাই অবাক হয়েছে। সবাই ভেবেছিলো মেয়েটা পিছিয়ে যাবে ছেলের এই অবস্থা দেখে।বর্ষা হাসিমুখে ভিতরে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো
,,কেমন আছো শাশুড়ী আম্মু!ছেলের বউকে দেখে বুঝি খুশি হওনি?এই তোমার ভালোবাসা!
নিলয়ের মা বিষ্ময়ভাব কাটিয়ে বর্ষাকে জড়িয়ে ধরলেন।মুখে বললেন
,,তুই এসেছিস তো এখন অনেক ভালো আছি মা।
বাহির থেকে কাজি সাহেব ভিতরে ঢুকলো তাকে হয়তো কেউই আশা করেনি এখন।
বর্ষা বললো যাই তোমার ছেলেকে একটু দেখে আসি। আফটার অল কয়েক মিনিট পর সে আমার হাসবেন্ড হবে!
বর্ষা সিড়ি বেয়ে উঠে গেলো নিলয়ের রুমের দিকে ড্রয়িং রুমে রেখে গেলো কতগুলো হতবি হ্বল মানুষ। বর্ষা চলে যেতেই সুমা বেগম সব কিছু বুঝিয়ে বলতে লাগলেন সবাইকে।
,,,,
হঠাৎ দরজা আটকানোর শব্দে চোখ খুললো নিলয়।বর্ষা দেখে ভেবেছে সে স্বপ্ন দেখছে দিবা স্বপ্ন পর পর নিজের উপর বিরক্ত হলো। আবার চোখ বন্ধ করে নিতে যাবে তখনই কানে আসলো সুপরিচিত কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কন্ঠস্বর।
,,কি ভেবেছিলেন আর আসবো না?
মুখে সেই ভুবন ভুলানো হাসি, মেয়েটা কেনো সব সময় এভাবে হাসিখুশি থাকবে?নিলয় সব সময় চায় মেয়েটির মুখে হাসিটি যাতে বজায় থাকে তবে আজ তার অনুরাগী মন বাঁধ সাধলো।
বর্ষা নিলয়ের মুখোমুখি এসে বসলো।চুপ থেকে পর্যবেক্ষণ করলো নিলয়ের চুপসে যাওয়া মুখশ্রী।
,,আপনার মনে আছে নিলয়? আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম ভালোবাসি আর না বাসি কখনো ছেড়ে চলে যাবো না।আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে এসেছি নিলয়।আপনি কি নিজের কথা রাখবেন?চলবেন বাকিটা পথ আমার সাথে!
নিলয় তাকিয়ে আছে বর্ষার বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে।
সে কাঁপা হাতটা এনে রাখলো মেয়েটির হাতে।হাতটি টেনে বর্ষাকে নিয়ে গেলো নিজের খুব কাছে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো। চলো কথা রাখি!
সমাপ্ত ~