আমি এবং রুমু খালামনি

লেখিকাঃ নুসরাত জাহান লিজা

প্রকাশকালঃ মার্চ ১৪, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

"শোন না, নীরা। তুহিন মনে হয় আজ আমাকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করবে। এতদিন আকারে ইঙ্গিতে অনেকভাবে বলার চেষ্টা করেছে। আজ সাহস করে ডিনারের প্রস্তাব দিয়েছে। ভাবছি ছেলেটাকে ঘুরাব না। রাজি হয়ে যাব।"

আমি বিস্ফারিত দৃষ্টিতে খালামনির দিকে তাকালাম। এখন যদি ফ্লাইং সসার থেকে এলিয়েন নেমে এসে হাসিমুখে আমাকে জিজ্ঞেস করত, "নীরা, ভালো আছো?"

তবুও বুঝি এতটা বিস্মিত হতাম না। খালু মারা গেছেন আজ প্রায় ষোলো বছর, এরপর থেকে হাজারবার বলে কয়েও তাকে বিয়েতে রাজি করানো যায়নি, সেই খালামনি এতবছর পেরিয়ে এসে অল্পবয়সী একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাইছেন, বিষয়টা শুধু বিস্ময়কর নয়, রীতিমতো ভয়াবহ ঠেকছে আমার কাছে!

নুসরাত জাহান লিজা এর লেখা অনুগল্প আমি এবং রুমু খালামনি এর ইমেজ

আমার হতভম্ব ভাব বাড়িয়ে দিয়ে খালামনি বললেন, "তুই কিন্তু আমাকে শাড়ি সিলেক্ট করে দিবি, বুঝলি? নীল জামদানী পরব নাকি মেরুন কাতানটা পরব? আচ্ছা, থাক, মনিপুরী শাড়িটাই বোধহয় মানাবে! কী বলিস?"

"খালামনি, তুমি কি সিরিয়াস?"

"আমি তোর খালা, বেয়াই নই যে ফাজলামো করব।"

খালামনির সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুর মতো। রেগে গেলে বা অভিমান হলে এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ টেনে আনে। তাই আমি তেমন গা করলাম না। শুধু বললাম, "তোমায় এখন এসব পাগলামি করা মানায়?"

"নীরা, এখন বলতে কী বুঝাতে চাইলি? এটাই যে আমি বুড়ি? আমি মাত্র থার্টি এইট। এমন কিছু বেশি বয়স নয়। এখনো চামড়ায় ভাজ পড়েনি।"

খালামনিকে এখনো ত্রিশের আশেপাশে মনে হয়, ফিটনেস ফ্রিক বলে আসল বয়সটা বোঝা যায় না। কিন্তু আমি মানতে পারলাম না। বিরক্তি নিয়ে বললাম, "তাই বলে তোমার চাইতে আট-দশ বছরের ছোট ছেলেকে বিয়ে করবে? লোকে কী বলবে?"

"লোকের কথা কবে থেকে শোনা শুরু করলি তুই? একটা লোক অল্পবয়সী মেয়েকে বিয়ে করতে পারলে মেয়েরা কেন পারবে না? আর ভালোবাসা কি ব্যাকরণ মেনে হয়? নাকি বয়স বেধে দেয়া আছে যে এই বয়সটাই কেবল প্রেমে পড়ার?"

"তুমি বলতে চাইছো তাকে তুমি ভালোবাসো?"

"এত কথায় তোর কী কাজ? তুই যখন রাতুলের সাথে রিলেশনশিপে গেলি, আমি কিছু বলেছিলাম? ছেলে কেমন, কী করে এটুকু শুনেই সম্মতি দিয়েছিলাম।"

আমি আর কথা বাড়ালাম না, বসে বসে খালামনির পাগলামির স্বাক্ষী হতে থাকলাম। তার সবকিছুতেই বড্ড মাতামাতি। হুজুগে পরে অনেককিছু করে ফেলে, আবার হুজুগ চলে গেলে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। খালামনির মধ্যে আজ যেন কিশোরীর উচ্ছ্বলতা এসে ভর করেছে। অনেকগুলো শাড়ি বের করে এনেছে, কোন শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে কী জুয়েলারি পরবে সব নিয়ে তার বিস্তর জল্পনা কল্পনা। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি ধরে ধরে ট্রায়াল দিচ্ছে। হঠাৎ ঘুরে তাকিয়ে বলল,

"তুই এখনো ভ্যাবদা মেরে বসে আছিস কেন? যা, রেডি হ।"

"তোমার সাথে ডেট এ গিয়ে আমি কী করব?"

"তোকে ছাড়া আমি কখনো কিছু করেছি? যা না, লক্ষ্মী মা। রেডি হয়ে নে।"

আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তৈরি হলাম। হাজার হলেও খালামনির কথা আমি ফেলতে পারি না। সেই ছোট্টবেলায় মাত্র নয় বছর বয়সে আমার মা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যাবার পর খালামনি আমাকে কোলে পিঠে করে এতবড় করেছে। বাবা সবসময় ব্যবসার কাজে এই প্রান্ত নাহয় ওই প্রান্তে থাকেন। তাই তাকে খুব একটা কাছে পাওয়া হয়নি। শ্যালিকার কাঁধে আমাকে গছিয়ে দিয়ে তিনি ঝাড়া হাত-পা। খালামনি আমাকে আঁকড়ে নিজের একাকিত্ব ঘুচিয়েছে। মাসে বড়জোর তিন-চারদিন বাবাকে পাওয়া যায়। তাই খালামনিই আমার সবচাইতে কাছের মানুষ।

"দেখ তো, মেকআপ বেশি ক্যাটকেটে হয়ে গেল? আচ্ছা কানের দুল কি বেশি বড় হলো? ছোটগুলো পরব?" খালামনি গালে ব্লাশঅন লাগাতে লাগাতে বলল।

আমি বিরস মুখে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম। খালামনি আবারও রিনরিনে গলায় বলল, "পার্লারে গেলেই ভালো হতো বোধহয়। কিন্তু হুট করে এতকিছু মাথায় আসে নাকি। ধূর!"

সাজ শেষ করে উঠে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "দেখ তো নীরা, আমাকে কেমন লাগছে? সব ঠিকঠাক আছে তো?"

আমি পূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। খালামনি এমনিতেই মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো সুন্দরী। আজ সেই সৌন্দর্য যেন ঠিকরে পড়ছে! সদ্য পঁচিশ পেরোনো তরুণী মনে হচ্ছে। পৃথিবীর সব খুশি যেন তার মুখে ভিড়েছে। সাথে ব্যক্তিত্বের ছটা তো আছেই। আমি মুখ ভার করে রাখতে পারলাম না। মুগ্ধতা নিয়ে বললাম, "খালামনি, তুমি যে কী সুন্দর সেটা কি তুমি জানো?"

আমার থুতনিতে হাত রেখে বললেন, "তোকেও খুব মিষ্টি লাগছে।"

আমার গায়ের রঙ বেশ চাপা। সৌন্দর্যের যে প্যারামিটার সেটাতে আমার স্কেল নিচের দিকেই হবে। খালামনি, বাবা আর রাতুল তবুও কেন যে আমাকে সুন্দর বলে! আমাকে খুশি করতে নাকি প্রিয় মানুষের সবকিছু সুন্দর লাগে বলেই বলে সেটা জানা হয়নি কখনো!

গাড়িতে বসেও খালামনির ছেলেমানুষি উচ্ছ্বাস দেখলাম।

"নীরা রে, আমার কেমন যেন লাগছে, খুব অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে! কী হবে রে?"

আমি এতক্ষণ ভেবেছিলাম এটা বুঝি স্বভাবসুলভ হুজুগ। কিন্তু তার সলজ্জ মুখাবয়ব আর এমন আচরণে আমার বিশ্বাস বারবার টলে যাচ্ছে।

***

আমরা রেস্টুরেন্টে বসে আছি আধাঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তুহিনের আসার নামগন্ধ নেই। খালামনি দু'বার ফোন করেছিলেন। বের হওয়ার সময় একবার বলেছে আসছে। কিন্তু এখন আর ফোন ধরেনি।

"তুই বিরক্ত হচ্ছিস? এসে পড়বে, হয়তো কাছাকাছি বলে ফোন ধরছে না।" অপ্রস্তুত হেসে বললেন খালামনি। বুঝলাম তার উৎসাহে বুঝি কিছুটা দ্বিধা জমা হয়েছে। আমি নির্বিকার মুখে কফিতে চুমুক দিলাম।

সময় যত গড়াচ্ছে খালামনির উৎকণ্ঠা তরতরিয়ে বাড়ছে। আমিও এবার চিন্তায় পড়ে গেলাম। এত আনন্দ, না জানি কী হয়! কিছুক্ষণ পরে দেখলাম খালামনির মুখে আবার রঙ ফিরে আসছে, তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম একটা সাদামাটা গড়নের যুবক এদিকে আসছে। বুঝলাম এটাই তুহিন। খালামনি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার, শুনেছিলাম তুহিন তার ক্লায়েন্ট। এই ছেলের নাছোড়বান্দা আচরণে সখ্যতা বাড়ে। প্রফেশনালিজম ছাড়িয়ে গত কিছুদিনে তাদের যাতায়াত শুরু হয় কফিশপ, রেস্টুরেন্টে। আমি আগে যদিও ছবি দেখেছি, সামনাসামনি আজই প্রথম।

খালামনি লাজুক হেসে বললেন, "কোনো সমস্যা? এত দেরি যে?"

খালামনির চোখেমুখে যে উন্মত্ততা দেখেছি, যে আকুলতা তার ছিটেফোঁটাও তুহিনের চেহারায় নেই। বরং কেমন ফ্যাকাসে ভাব। কেমন অপরাধীর চাউনি।

"রুমু, আমার কিছু জরুরি কথা আছে তোমার সাথে।"

"হ্যাঁ, সেজন্যই তো এলাম। তুমি রিল্যাক্স হয়ে বসো। এরপর সুস্থির হয়ে বলা শুরু করো।" মৃদু হাসির রেখা খালামনির ঠোঁটে।

তুহিন বসল, মাথা নিচু করে রেখে ক্ষণেক পরে চোখ তুলে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না। আসলে আমি নানা সময় তোমার প্রতি নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছি। আজ তোমার পাকাপাকি সম্মতি নিয়ে বাসায় জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজকে সকালে বাসা থেকে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলল। আমি তোমার কথা জানালাম। কিন্তু..."

'কিন্তু'টা কী সেটা আমি বেশ ভালোই বুঝলাম। আমি এটারই ভয় পাচ্ছিলাম। খালামনির হাসিমুখ ততক্ষণে বিবর্ণ হয়ে গেছে।

"আসলে বাসা থেকে আগে থেকেই বিয়ে ঠিক করে রেখেছিল নাকি। আমি জানতাম না। জানলে হয়তো..."

"তুমি যাও, তুহিন। কোনো এক্সকিউজ দিতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি তোমার সমস্যা। আমার কোনো অভিযোগ নেই। স্ত্রী হিসেবে তুমি অবশ্যই তোমার বয়সের আশেপাশে একজন তরুণী মেয়েকে ডিজার্ভ করো। একজন চল্লিশের কাছাকাছি বিধবা মহিলা তোমার জন্য ঠিক নয়। আগে আগে মোহ কেটে গেছে বলে ভালো হয়েছে। পরে আফসোস হলে কী হতো বলো তো।"

একেবারে শীতল গলায় ভাবলেশহীন মুখে খালামনি কথাগুলো বলে দম নিল। একটু আগের কিশোরী মেয়ের প্রথম প্রেমে পড়ার মতো আবেগী আচরণ এখন পুরোপুরি অনুপস্থিত। এখন তিনি একজন পরিণত রমণী, যার ব্যক্তিত্বের ছটায় চারপাশ আলোকিত হয়।

তুহিন কিছু বলতে চাইলেও খালামনির কাঠিন্য দেখে আর কিছু বলল না, উঠে চলে গেল। খালামনি এখনো নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি। আমি ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলাম। নিশ্চিত একটা ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে গেলাম মনে মনে।

খালামনি আমাকে ঠান্ডা গলায় বললেন, "ডিনার করতে এসেছি, করেই যাই। অর্ডার দে।"

তার থমথমে মুখ দেখে কিছু বলার সাহস হলো না। ভাবলাম যা বলার বাসায় গিয়েই বলব। খেয়েটেয়ে বাসায় ফিরলাম। খালামনি সাথে সাথেই আমার ঘরে এসে বিছানায় আমার পাশ ঘেঁষে বসল। কিন্তু কিছু বললেন না।

আমি বললাম, "খালামনি, তুমি তুহিনকে এমনি এমনি কেন যেতে দিলে? সেই তো তোমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। শেষ মুহূর্তে এসে পাশটান দিয়েছে।"

খালামনি হুট করে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। আমি সান্ত্বনা দেবার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেলাম না। খালামনি ভীষণ ইমোশনাল, একটা ছোট্ট খুশিতে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে, পাগলামি করে, শিশুর মতো উৎফুল্ল হয়। কিন্তু কষ্ট কখনো ভাগাভাগি করে না। তুহিনের উপরে আমার ভীষণ রাগ হলো। খালু মারা যাবার পরে একবার সামলে নিয়েছিল, কিন্তু এই উটকো ছেলেটা এসে আরেকবার ভেঙে দিয়ে গেল। পরিবারের কথা আগে ভাবেনি? বিয়ে ঠিক হয়ে আছে অথচ সে জানে না, এটাও আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

"তুহিনের সাথে আমি একবার কথা বলব, তুমি ভেবো না খালামনি।"

খালামনি আমাকে ছেড়ে দিলেন, চোখ মুছে বললেন, "তুহিনের জন্য হয়তো কিছুটা অনুভূতি জন্মেছিল, কিন্তু ওর জন্য ভেঙে পড়ার মতো কিছু হয়নি।"

আমি এবার হতবাক, "তাহলে এমন করে কাঁদছো কেন?"

"তুই জানিস নীরা, তোর খালু মারা গেল আমাদের বিয়ের আটমাসের মাথায়। আমার বয়স তখন একুশ। তোর মা মারা গেল এর তিন মাস পরেই। তুই তখন সেভাবে বুঝতে শিখিশনি। নয় বছরের ছোট্ট একটা পুতুল। আমি তোকে বুকে টেনে নিলাম। আমার মনে হলো বিয়ে জিনিসটা হয়তো আমার জন্য নয়। তোকে বুকে টেনে নিজের মাতৃত্বের অপূর্ণতা ঘুচালাম। মা হতে পারব না যেহেতু, শুধু শুধু নিজের জীবন অন্যের সাথে জড়াতে চাইনি। দুলাভাই দেশে, বিদেশে ব্যস্ত। তোকে নিয়েই আমার ছোট্ট পৃথিবীটা সাজালাম।"

খালামনি মা হতে পারবে না এটা আমি জানতাম না। এই কথাগুলোর সাথে তার আজকে সারাদিনের আচরণ মেলাতে পারলাম না। তবে নিজে থেকে কিছু বললাম না। খালামনি আবার বলতে শুরু করল,

"আমার জীবনটা তোর সাথে জুড়ে গেল। সেদিন যখন হঠাৎ করে তুই বললি, রাতুল বিয়ে করে তোকে নিয়ে জার্মানিতে চলে যেতে চায়। দুলাভাইয়েরও সম্মতি আছে। তখন হুট করে মনে হলো আমি তো একা হয়ে যাব। একেবারে একা। বাকি জীবনটা আমি কী করে কাটাব? ভীষণ ভয় পেলাম। তুহিনের আমাকে ইমপ্রেস করার প্রয়াসে একটু একটু করে সাড়া দিলাম। তোর সুখ, তোর ইচ্ছেতে তো বাগড়া দিতে পারব না। কিন্তু নিজের সঙ্গী তো খুঁজে নিতে পারব। নিজের অক্ষমতা, বয়স সব যেন তীব্র ভয়ের স্রোতে আমার মাথা থেকে পালিয়ে গেল।"

আমি হতভম্ব হয়ে খালামনিকে দেখছি। এমন প্রাণবন্ত একজন মানুষ ভেতরে ভেতরে এতটা একা, এটা কখনো বুঝতেই পারিনি। যে আমার জীবনটাকে গুছিয়ে দিয়েছে, যে না থাকলে হয়তো আমার অস্তিত্বই থাকত না, তার কথা একবারো মাথায় এলো না! নিজের ঘর বাঁধার খুশিতে আমি এতটা বিভোর ছিলাম যে, আমাকে ছাড়া আদ্যোপান্ত নিঃসঙ্গতায় মোড়া মানুষটাকে একলা ফেলে যাবার ব্যাপারটা ভাবনাতেই আসেনি!

একটু আগেই তুহিনকে ভীষণ স্বার্থপর মনে হয়েছে, এখন মনে হচ্ছে আমি নিজেও তো স্বার্থপর। তুহিন আর আমার কী খুব বেশি পার্থক্য আছে? নিজের সুখের প্রশ্নে সব মানুষই কী এমন স্বার্থপর! জানি না! তবে অপরাধবোধের, ক্লেদের একটা ছাপ আমার মনকে আবৃত করল।

"আমার একাকিত্বে ভীষণ ভয় রে, নীরা, ভীষণ ভয়।"

আবারও খালামনি কেঁদে ফেললেন। আমার দু-চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। এবার আমি খালামনিকে আঁকড়ে ধরলাম। সম্পর্ক আমাদের খালা-ভাগ্নীর সম্পর্কে আটকে দিলেও আদতে খালামনি আমার মা। মা'য়ের কষ্টে আমার বুকের পাঁজর ভাঙছে। মা-মেয়ের পাজর ভাঙার শব্দ হয়তো দু'জনেই শুনতে পেলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম খালামনিকে একা ফেলে কোত্থাও যাব না।

***

বাড়িটা আজ জমকালো আয়োজনে সেজেছে। রাতুলটা কেমন নির্লজ্জের মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। কী উজবুক এই ছেলেটা! রাগী চোখে ওর দিকে তাকালেও আমার বেশ ভালো লাগছিল!

রাতুলের দুঃসম্পর্কের মামা আহাদ আঙ্কেল, বেশ প্রাণখোলা মানুষ। যদিও একটু বেশি কথা বলেন, কিন্তু চমৎকার মানুষ! ছ্যাঁকা খেয়েছিলেন একসময়। তাই কারো সাথে গাঁটছড়া বাঁধেননি। তার নাকি এই কয়েক দিনে খালামনিকে খুব ভালো লেগেছে। এখনো একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে খালামনিকে দেখছেন। খালামনি অবশ্য এসব কথা সেভাবে কানে তুলেনি। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।

আমি খালামনিকে বলেছি, "তুমি যদি এবার মত না দাও, তাহলে আমি জার্মানি যাব না।"

বেচারা রাতুল এবার আমার চাইতে জোড়ালোভাবে খালামনিকে ধরেছে, নইলে তো রাতুলকে আরও দুটো বছর একাই সেখানে থাকতে হবে। পিএইচডি শেষ না হলে দেশেও ফিরতে পারবে না।

দূর থেকে দেখলাম খালামনির সাথে বেশ ভালো জমে গেছে আহাদ আঙ্কেলের। দুজন একাকী মানুষ যদি বাকি জীবনটা হেসেখেলে কাটাতে পারে, মন্দ কী! একটুখানি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল যদি সুখের চাবি হয়, তবে তাই হোক! সুখের সংক্রমণ হোক মহামারীর মতো! বিষাদ হারিয়ে যাক চিরতরে!

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প