ফুল চোর

লেখিকাঃ নুসরাত জাহান লিজা

প্রকাশকালঃ মার্চ ৫, ২০২৬

ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

রায়ার বাগানে একজন ভদ্রবেশী চোর ধরা পড়ল হাতে-নাতে। তার হাত ভর্তি লাল গোলাপ। সব যে ওর বাগানের সেটার সাক্ষ্য দিচ্ছে ফুলবিহীন ন্যাড়া গাছ দুটোই।

"আফা, খালি ফুল নিবার জন্যে কেউ ভিতরে ঢুকব না। এই চোরের আরও বড় কিছু চুরি করনের মতলব আছিল।"

লোকটাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে কথাটা বলল ফরিদ। সে ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে থাকে।

নুসরাত জাহান লিজা এর লেখা অনুগল্প ফুলচোর এর ইমেজ

"ফুলবানু, দড়ি নিয়ে আসো। বাইন্ধা ডলা দিলে বাপ বাপ কইরা স্বীকার করব।"

ভদ্রবেশী চোরটা করুণ চোখে রায়ার দিকে তাকিয়ে কাতর গলায় বলল, "দেখুন, আমি চুরি করিনি। আমার কথাটা শুনুন।"

"সব চুরই তাই কয়। চুর কি কয়, 'আমি চুরি করছি!' আমগোরে বুহা মনে হয়!" হাতের চাপ বাড়িয়ে বলল ফরিদ।

এরমধ্যে ফুলবানু সোৎসাহে দড়ি নিয়ে হাজির, বাড়িতে আজ রায়ারা দুই বোন ছাড়া কেউ নেই। বাবা গেছেন ঢাকায়, মা গেছেন খালামনির বাড়িতে। রায়া আশেপাশে তাকিয়ে রাহাকে কোথাও দেখতে পেল না।

ফরিদ আর ফুলবানু মিলে লোকটার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল, সতর্কতা হিসেবে প্যাঁচিয়ে বাঁধল বাগানে থাকা দুটো দেবদারু গাছের একটার সাথে।

"দেখুন, প্লিজ, আমি চোর নই। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে.."

ফরিদ নিজের গলার গামছাটা দিয়ে লোকটার মুখ বেঁধে দিয়ে চট করে ঘুষি পাকিয়ে বসাতে উদ্যত হতেই রায়া বাঁধা দিল,

"থাক, গায়ে হাত তোলার দরকার নেই ফরিদ।"

ফরিদ একটা ফাটাফাটি ফিল্মি এ্যাকশন সিনের অবতারণা করতে যাচ্ছিল, সে ভারি হতাশ হয়ে বলল,

"আফা, এইডা কী কন। চুর দেখতে সুন্দর হইলেও সে চুর, এই যে কোট পিন্দা আইসে, তাও তো হেয় চুর। এহন চুর যদি লুঙ্গি পিন্দা আইত, হেরে তো ঠিকই সাইজ করবের কইতেন।"

ফুলবানু ফরিদের সাথে তাল মিলিয়ে বলল, "ফরিদ ঠিকই কইসে আফা। ব্যাটারে কয়টা ডলা দিলে ঠিকই কইব আর কী কী চুরির তালে আইছে। বাড়িত আইজকা খালাম্মা-খালু নাই। আফনেরা দুই বইন। ব্যাটা মতলব কইরা আইজই আসবে কী জন্যে?"

রায়ার মনে হলো এবারের কথাটা যৌক্তিক, চোর না হলেও অন্য মতলব তো থাকতেই পারে। ওদের তো শত্রুর অভাব নেই।

"আমি আর ফুলবানু এখানে আছি, তুমি থানায় খবর দাও, ফরিদ।"

ওদের বাড়ির ল্যান্ডলাইন কয়েকদিন ধরে নষ্ট।

"আফনের যে দয়া আফা, মুখটা খুইলা দিয়েন না। কী না কী কইব, আফনে গইলা যাইবেন। পড়বেন বিফদে।"

"আচ্ছা, খুলব না, তুমি যাও।"

ফরিদ চলে গেলে রায়া ভালো মতো দেখল লোকটাকে। এক কথায় সুদর্শন বলা যায়। কেন যেন চোর বা মতলববাজ লোক বলে মনে হচ্ছে না ওর কাছে।

চোখ দিয়ে মুখ খুলে দেবার আকুতি জানাচ্ছে। মুখ খুলে দিলে তো রিস্ক নেই, এই চিন্তা থেকে গামছাটা খুলে দিল রায়া।

"পানি হবে? এক গ্লাস পানি... প্লিজ.." হাঁপাতে হাঁপাতে বলল লোকটা।

ফুলবানু পানি আনতে ভেতরে গেল।

"ফুল চুরি করতে আমাদের বাসায় ঢুকেছেন কেন?"

"আমি চুরি করতে ঢুকিনি। ইনফ্যাক্ট আমি..."

হঠাৎ সেখানে রাহা এসে উপস্থিত হলো, ওর দিকে তাকিয়ে থেমে গেল লোকটা। রাহার হাতে পানির গ্লাস।

সমস্যা হলো হাত খুললে যদি সত্যি সত্যি বিপদ হয়! কে কেমন তা তো চেহারায় লেখা থাকে না। অপরদিকে একজন তৃষ্ণার্ত মানুষ। দ্বিধান্বিত হলো রায়া।

"আপু, একটা ভুল বোঝাবুঝি সত্যিই হয়ে গেছে।"

রাহার কথায় ওর দিকে তাকাল রায়া।

"উনি কে?"

"উনি সায়ন আহমেদ।"

"সায়ন আহমেদ কে?"

"তোমার সাথে উনার বিয়ের কথা চলছিল। উনার এখানে আসার কথা ছিল আগামীকাল। কিন্তু বাবা-মা আজই চলে আসছে, বলে তাকে আসতে বলেছে। বাসার টেলিফোন নষ্ট বলে জানাতে পারেনি।"

"তুই এতকিছু জেনে কই পালিয়েছিলি? উনার কথায় বিশ্বাস করে এসব বলছিস?"

"উনাকে প্রথম গেটের সামনে দেখতে পাই, গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই উনি আমাকে সবটা জানান। আমি তাকে গেটের ভেতরে আনি, এরপর তোমার গাছ থেকে কিছু ফুল ছিঁড়ে উনাকে দিই। অপেক্ষা করতে বলি। আমি শিমুদের বাড়ি থেকে বাবাকে টেলিফোন করতে গেলাম, তার কথার সত্যতা জানতে। বাবা সত্যিই আজ উনাকে আসতে বলেছে।"

"যাচাই করতে যাবার আগেই ফুল দিয়ে বরণ করলি? তাও আমার গাছ থেকে?"

"নামটা আমি জানতাম। বাবা-মা আলাপ করছিল কয়েকদিন আগে। সেটা মিলে গিয়েছিল। এবার শুধু কনফার্ম হবার জন্য গিয়েছিলাম। এরমধ্যে যে এতকিছু হয়ে যাবে জানতাম না।"

রায়া ভীষণ লজ্জিত হলো, ছিঃ, ছিঃ! কী বিশ্রী একটা ব্যাপার! দ্রুত হাতে বাঁধন খুলে দিল সায়নের,

"তুই আমাকে জানিয়ে যাবি না?"

"আমি বুঝতে পারিনি আপু যে সিচুয়েশন এমন হয়ে যাবে।"

রায়া সায়নের দিকে তাকিয়ে বলল, "স্যরি.. আসলে.."

"পানি প্লিজ.."

প্রায় পনেরো বিশ মিনিটের মতো একভাবে শক্ত করে বাঁধা থাকায় হাত নাড়াতে সমস্যা হচ্ছে। রায়া নিজের হাতে গ্লাসটা সায়নের মুখের কাছে ধরল।

সেই মুহূর্তে ফরিদ এলো পুলিশ সাথে নিয়ে।

"কে ক্রিমিনাল?"

ফরিদ পুলিশকে হাত ইশারায় চোর দেখাতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে দেখল, চোরকে যত্ন করে মুখে তুলে পানি খাওয়াচ্ছে রায়া।

রায়া সায়নকে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। এরপর পুলিশকে বলল,

"একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আপনাদের হয়রানি হলো। সেজন্য দুঃখিত।"

"ভুল বোঝাবুঝি? ক্রিমিনাল অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে আপনাকে মিথ্যে বলতে বাধ্য করছে না তো?"

"অ স্ত্র? উনার কাছে কোনো অ স্ত্র আছে কিনা, চোখে পড়েনি তো।"

পুলিশ ফরিদের দিকে তাকাতেই সে চোখ সরিয়ে নিল, পালাবার তাল করছে। ওর কথা যাতে গুরুত্বের সাথে নেয়, সেজন্য একগাদা মিথ্যেও বলেছে সে। বলা তো যায় না কখন কী বিপদ ঘটে যায়!

"ওই লোকটা যে বলল, একজন ক্রিমিনাল অস্ত্রপাতি নিয়ে আপনাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। বেকায়দায় পেয়ে বেঁধে রেখে খবর দিতে গেছে।"

রায়া আন্তরিক গলায় বলল, "ও আমাদের বিশ্বস্ত লোক। একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেছে। আমাদের কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। চা খেয়ে যাবেন প্লিজ।"

পুলিশ চলে গেলে, সায়নকে রায়া জিজ্ঞেস করল,

"আপনি প্রথমেই কেন বলেননি সবটা?"

"হঠাৎ দেখি চোর সাব্যস্ত হয়ে গেছি। এমন এম্বারেসিং সিচুয়েশনে কখনো পড়িনি তো। নার্ভাস হয়ে সব গুলিয়ে যাচ্ছিল।"

বলতে বলতে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সায়ন, "আমিও চলি।"

"চলে যাবেন? বাবা কিছুক্ষণ মধ্যেই চলে আসবেন।"

"না থাক। আমি যাই।"

রায়ার ভেতরে তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছিল। কী বাজেভাবে হেনস্তা করা হলো ভদ্রলোককে। ভেতরে গিয়ে নিজের বোকামিতে কেঁদে ফেলল সে।

ছেলেটার সৌম্য মুখ, করুণ দৃষ্টি, কাতর অনুনয় ভাসছিল ওর চোখে। কিছুতেই ভুলতে পারছিল না রায়া।

সময় গড়ায়, সেই মুখ সে কিছুতেই ভুলতে পারে না।

***

সায়ন সেদিন রায়াদের বাসায় গিয়ে বাজেভাবে অপমানিত হয়ে ছয় মাসে পাত্রী দেখার নাম মুখে নেয়নি।

বড় বোন সীমা ছাড়া আর কেউ নেই ওর পরিবারে। সীমা সায়নকে একা ছাড়তে পারেনি বলে ওদের পৈতৃক বাড়িতেই তার হাজব্যান্ডসহ থেকে গেছেন।তারও তেমন কেউ নেই। স্ত্রীর ইচ্ছেকে তিনি সম্মান করেছেন।

এই ছয়মাসে সায়ন বহুবার ভুলতে চেয়েছে, তবুও ওই অপরাধবোধে সিক্ত মায়া জমে থাকা রায়ার সজল চোখ দুটো সে ভুলতে পারেনি।

সত্যিকার অনুশোচনা ছিল তাতে। সে স্পষ্ট অনুভব করেছে।

"একবার শুধু চোখ তুলে তাকিয়েই আমার ভেতর থেকে আমাকেই সরিয়ে নিয়েছ, তবুও কেন সারাজীবন সেই চোখের অতলে ডুবে থাকতে ইচ্ছে করে!"

***

ছয় মাস পরের এক সকালে সীমা এসে সায়নকে বলল,

"আমাদের সাথে আজ এক জায়গায় যেতে হবে তোকে।"

"কোথায় আপা?"

"আমি তো তোকে গলায় দড়ি দিতে নিয়ে যাব না। এই ভরসা আমার উপর?"

অগত্যা রাজি হলো সায়ন। গন্তব্য যত কাছাকাছি আসে ওর মন তত কু-ডাকে। বাস থেকে নেমে রিকশায় উঠল ওরা।

সায়নকে ওর ভাগ্নি রথির জন্য চিপস আনতে পাঠিয়ে ওরা রিকশা ঠিক করল। সে ফিরে এসে রিকশায় বসতেই রিকশা ছাড়ল।

হঠাৎ খেয়াল করল পরিচিত রাস্তায় যাচ্ছে রিকশা, "আমরা কোথায় যাচ্ছি আপা?"

বলতে বলতে দেখল রিকশা রায়াদের বাড়ির সামনে এসে থামল। এক পৃথিবী অবিশ্বাস নিয়ে সে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। একেই বোধহয় বলে ঘরের শত্রু বিভীষণ!

ধরে এনেছে খ্যাচ করে জ বা ই করার জন্য!

রায়ার বাবা-মা এসে ওদের অভ্যর্থনা জানালেন। সায়ন সেখানে দাঁড়িয়ে রইল, ঢোক গিলল কয়েকবার।

"আপু, আমি উনার সাথে একটু একা কথা বলতে পারি?"

তারা ভেতরে চলে গেলেন, রথিকে ওদের সাথে রেখে গেল।

"ভেতরে আসবেন না?"

"না। আমি চলে যাব। এখানে আনবে জানলে আসতাম না।" একবার চোখ তুলে রায়ার দিকে তাকিয়ে বলল সায়ন।

"ফরিদ আর ফুলবানু কিন্তু আমার সাথেই আছে। দড়িও রেডি আছে, দেবদারু গাছটাও আছে। শুধু এক পা বাইরে দিয়ে দেখুন, ওই গাছের সাথে বাঁধা অবস্থায় বিয়ে হোক এটা চান?"

সায়ন রাগ দেখিয়ে বলল, "জবরদস্তি নাকি!"

"আপনি চান না মনে হয়?"

সায়ন উত্তর দিল না, রায়া বলল, "তাহলে আমার ছবিটা এখনো আপনার বালিশের নিচে কেন আছে?"

"আপনার ছবি আমার বালিশের নিচে কেন থাকতে যাবে? আশ্চর্য! ছবি কি বালিশের নিচে রাখার জিনিস!"

"রথি, মা-মনি বলো তো!"

"আছে তো, মামা ছবি বের করে দেখে সবসময়। কান্নাও করে তোমার ছবি দেখে।"

একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে আট বছর বয়সী আদরের ভাগ্নির দিকে তাকাল সায়ন। রায়ার ছবিটা ওর বালিশের নিচে আছে, সে মাঝেমধ্যে বের দেখে, এই পর্যন্ত সত্যি। কিন্তু কান্নাকাটি কবে করেছে!

"তুই এত মিথ্যুক কেন বুড়ি!"

"ওকে বকছেন কেন! এসব জেনেও আপনাকে যেতে দেব?"

ফরিদ আর ফুলবাবু সমস্বরে বলল, "আমরা আছি কিন্তু আফার সৈন্য।"

সায়ন ভেতরে গেল, বাইরে বাইরে বিরক্তি দেখালেও ভেতরে ভেতরে সে হঠাৎ নির্ভার হলো। ওর পৃথিবীতে কোথাও অসীম শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। হঠাৎ করে পূর্ণ মনে হচ্ছিল।

সেদিনই কাজী ডেকে ওদের বিয়ে পড়ানো হলো। রাতে ওরা রায়াদের বাড়িতেই থাকল।

রায়ার ঘর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।

"এই যে মিস্টার ফুল চোর,.."

"আমি ফুল চোর নই।" প্রতিবাদ করল সায়ন।

"ফুল চোর না হলেও মন চোর তো। ফুল চুরি করে ধরা পড়ে মন চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিলেন।"

"আমার মনটা যে রেখে গিয়েছিলাম, তার বেলা? এটা চুরি না। বিনিময় বলা যায়।"

কথাটা বলে সায়ন একগুচ্ছ লাল গোলাপ রায়ার দিকে এগিয়ে দিল, রায়া কিছুক্ষণ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে প্রায় চেঁচিয়ে বলল,

"আমার গাছের ফুল। চোর কোথাকার।"

"ফুল চুরি না করেও চুরির অপবাদ মাথায় নিতে হয়েছে। ভাবলাম সত্যি সত্যি করে ফেলি।"

"খুব সাহসের কাজ করেছেন।"

"এবারও বেঁধে রাখুন আমায়। তবে ওই অসহ্য দড়ি দিয়ে নয়। আপনার হৃদয়ের শেকল দিয়ে। আমি সারাজীবন সেখানে বাঁধা থাকতে চাই।"

রায়া সায়নের হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে বলল, "সে তো কবেই বেঁধেছি। আপনিই দেখতে পাননি।"

রাতটা সহসা সুন্দর হয়ে গেল। রূপকথার শেষ অংশের মতো সুন্দর! ওই যে থাকে না, 'অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বাস করিতে লাগিল'! তেমন।

এমন শত-সহস্র রাত্রি ওদের জীবনে নেমে আসুক, এই কামনা করল দু'জনেই।

ইনডেক্স পাতা পরের গল্প