যাকে কখনও বুঝিনি

লেখকঃ আব্দুল্লাহ বিন মালিক

প্রকাশকালঃ জুলাই ২৬, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

মানুষ বড় হতে হতে অনেক কিছু শিখে। কেউ বই পড়ে শেখে, কেউ অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, আর কেউ শেখে এমন কিছু হারিয়ে ফেলার ভয় থেকে যা কখনও হারানো উচিত ছিল না।

আমি জানি না, আমি কোন দলে পড়ি। তবে একটা কথা আজ নিঃসংকোচে বলতে পারি—আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছি একজন মানুষকে ভুল বুঝে।

সেই মানুষটি আমার মা।

আব্দুল্লাহ বিন মালিক এর লেখা অনুগল্প যাকে কখনও বুঝিনি এর ইমেজ

একটা সময় আমি সত্যিই বিশ্বাস করতাম, মা আমাকে ভালোবাসেন না।

আমার মনে হতো, তিনি শুধু আমাকে বকেন, শাসন করেন, আমার কোনো কথাই বোঝেন না।

অথচ আজ, সময়ের অনেক পরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি—যে ভালোবাসা সবচেয়ে গভীর, তার শব্দ সবচেয়ে কম।

আমাদের সংসারটা খুব বড় ছিল না।

অঢেল সম্পদও ছিল না।

কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না।

শুধু আমি সেই ভালোবাসাটা দেখতে পারিনি।

আমি ছিলাম খুব দুষ্ট।

ঘরের ভেতর দৌড়ে বেড়ানো, জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলা, রাগ করে গ্লাস ভেঙে দেওয়া, দরজায় লাথি মারা—এসব যেন আমার প্রতিদিনের কাজ ছিল।

মা বারবার বলতেন,

— "আব্দুল্লাহ, এমন করিস না বাবা।"

আমি উত্তর দিতাম না।

বরং আরও জোরে দরজা বন্ধ করতাম।

কখনো চিৎকার করে বলতাম,

— "আপনি শুধু বকতেই জানেন!"

আজ ভাবলে নিজের কথাগুলো নিজের কাছেই বিষের মতো লাগে।

আমার আব্বু ছিলেন অনেক রাগী মানুষ।

আমি জানতাম, যদি তিনি আমার দুষ্টুমির কথা জানতে পারেন, তাহলে শাস্তি নিশ্চিত।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

আমি যত বড় দুষ্টুমিই করি না কেন, মা কখনো আব্বুর কাছে আমার নামে অভিযোগ করতেন না।

একদিন আমি রাগের মাথায় ডাইনিং টেবিলের কাঁচ ভেঙে ফেলেছিলাম।

শব্দ শুনে আব্বু অন্য ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

— "কী হয়েছে?"

আমি ভয়ে কাঁপছিলাম।

ভাবছিলাম, এবার আর রক্ষা নেই।

কিন্তু মা শান্ত গলায় বললেন,

— "আমার হাত ফসকে পড়ে গেছে।"

আমি অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

তিনি একবারও আমার দিকে তাকালেন না।

শুধু ভাঙা কাঁচগুলো কুড়িয়ে নিতে লাগলেন।

সেদিনও আমি বুঝিনি।

ভাবলাম, হয়তো বিষয়টা ছোট বলে তিনি কিছু বলেননি।

এমন ঘটনা একদিন নয়।

অনেকবার হয়েছে।

আমি ফুলের টব ভেঙেছি।

পাখার সুইচ নষ্ট করেছি।

মোবাইল ফেলে দিয়েছি।

বই ছিঁড়ে ফেলেছি।

তবুও মা বলতেন,

— "ছোট মানুষ, ভুল করে ফেলেছে।"

আজ বুঝি, তিনি আমাকে ভুল থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু তখন আমার মনে হতো—

"মা যদি আমাকে এত ভালোবাসেন, তাহলে সব সময় শাসন করেন কেন?"

বয়স একটু বাড়ল।

দুষ্টুমির জায়গায় এল জেদ।

মা কোনো কথা বললে আমি উল্টো তর্ক করতাম।

অনেক সময় এমনভাবে কথা বলতাম, যা কোনো সন্তানের মুখে মানায় না।

কিন্তু মা চুপ করে থাকতেন।

তার সেই নীরবতা আমি দুর্বলতা ভেবেছিলাম।

আজ বুঝি—

সেটা ছিল সীমাহীন ধৈর্য।

একদিন খুব সামান্য একটা বিষয় নিয়ে আমার প্রচণ্ড রাগ হলো।

আমি ঘরের একটি চেয়ার আছড়ে ভেঙে ফেললাম।

মা শুধু বললেন,

— "রাগ কমলে এসে খেয়ে নিস।"

আমি আরও রেগে গেলাম।

চিৎকার করে বললাম,

— "আপনার খাবার আমার লাগবে না!"

সেদিন মা কিছুই বলেননি।

রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে গেছে, তখন ঘুম ভেঙে দেখি—

আমার বিছানার পাশে একটা প্লেটে খাবার ঢেকে রাখা।

খাবার ঠান্ডা হয়ে গেছে।

কিন্তু ভালোবাসা ঠান্ডা হয়নি।

সেটাও আমি সেদিন বুঝিনি।

আজ যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়—

মা আমাকে কখনো কথায় ভালোবাসেননি।

তিনি ভালোবেসেছেন কাজ দিয়ে।

আমি সেটা পড়তে পারিনি।

আমি শুধু অভিযোগ করেছি।

ভেবেছি—

"মা আমাকে বোঝেন না।"

অথচ সত্যিটা ছিল ঠিক উল্টো।

জীবনের কিছু দিন থাকে, যেগুলো ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকে না।

সেগুলো স্মৃতির দেয়ালে স্থায়ী দাগ হয়ে যায়।

আমার জীবনেও এমন একটি দিন এসেছিল।

সেদিন সকালটা ছিল একেবারেই সাধারণ।

কিন্তু বিকেল হতে না হতেই আমার চারপাশের পৃথিবী বদলে গেল।

একটি ভুল বোঝাবুঝি...

একটি সাজানো অভিযোগ...

আর কিছু মানুষের না জেনে বিচার করে ফেলা কথাবার্তা—সব মিলিয়ে আমি এমন এক পরিস্থিতিতে পড়লাম, যেখানে আমার নিজের কথাও যেন কেউ শুনতে চাইছিল না।

আমি বারবার বলছিলাম,

— “আমি এটা করিনি... বিশ্বাস করুন, আমি করিনি।”

কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছিল না।

কারও চোখে আমি অপরাধী।

কারও চোখে আমি লজ্জার কারণ।

কারও চোখে আমি পরিবারের অসম্মান।

মানুষের বিচার কত দ্রুত হয়!

সত্য জানার আগে তারা রায় দিয়ে দেয়।

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

জীবনে প্রথমবার মনে হলো, নিজের নামটাই যেন আমার কাছে ভারী হয়ে গেছে।

আমি মানুষের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না।

চারপাশে শুধু ফিসফাস।

কেউ সরাসরি কিছু বলছে না, কিন্তু সবাই বলছে।

আমি বুঝতে পারছিলাম।

যে মানুষগুলো একসময় আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করতেন, তারাও আজ সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছেন।

সেদিন আমি একা ছিলাম।

অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছিল।

হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।

“একটু থামুন।”

কণ্ঠটি খুব জোরে ছিল না।

কিন্তু এত দৃঢ় ছিল যে সবাই থেমে গেল।

আমি তাকিয়ে দেখলাম—

আমার মা।

তার চোখ দুটো লাল।

মনে হচ্ছিল, অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছেন।

কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি।

তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

যেন সত্যের পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষ কখনো মাথা নত করেন না।

মা ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আপনারা যা শুনেছেন, তার সবটাই সত্য নয়।”

কেউ বলল,

“আপনি তো মা। ছেলেকে বাঁচাতেই বলবেন।”

মা এক মুহূর্তও রাগ করলেন না।

শান্ত গলায় বললেন,

“আমি যদি জানতাম আমার ছেলে দোষ করেছে, তাহলে সবার আগে আমিই তাকে শাস্তি দিতে বলতাম। কিন্তু সে এই কাজ করেনি। আমি সত্য জানি।”

তার কণ্ঠে কোনো নাটক ছিল না।

ছিল শুধু সত্যের শক্তি।

তিনি একে একে সেই ঘটনার আসল বিষয়গুলো বললেন।

যা কেউ জানত না।

যা আমি লজ্জায় কাউকে বলতে পারিনি।

যা বললে পুরো ঘটনাটাই বদলে যেত।

একসময় চারপাশে নীরবতা নেমে এলো।

যারা এতক্ষণ আমাকে অপরাধী ভাবছিল, তাদের চোখে দ্বিধা দেখা দিল।

কেউ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ ধীরে ধীরে সরে গেল।

আর আমি...

আমি শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

আমার বুকের ভেতরটা কাঁপছিল।

আমি ভাবছিলাম—

যে মানুষটাকে আমি সারাজীবন ভেবেছি আমার বিরুদ্ধে, সেই মানুষটাই আজ পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।

সেদিন প্রথমবার আমি মায়ের চোখের জল দেখেছিলাম।

তিনি নিজের অপমানের জন্য কাঁদেননি।

মানুষ কী বলবে, সেটার জন্যও কাঁদেননি।

তিনি কেঁদেছিলেন এই ভেবে—

তার সন্তানকে মানুষ ভুল বুঝেছে।

একজন মায়ের কান্নার শব্দ খুব জোরে শোনা যায় না।

কিন্তু সেই কান্না সন্তানের বিবেককে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়।

সেদিন আমারও তাই হয়েছিল।

আমি মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

ক্ষমা চাইতে চেয়েও পারিনি।

কারণ কিছু অপরাধের জন্য “ক্ষমা করো” শব্দটা খুব ছোট হয়ে যায়।

আমি শুধু মনে মনে বলেছিলাম—

“মা, আমি তোমাকে কোনোদিন বুঝতেই পারিনি...”

সেদিনের ঘটনার পর বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল।

মানুষ ধীরে ধীরে অন্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

যারা আমাকে নিয়ে কথা বলেছিল, তারাও একসময় চুপ হয়ে গেল।

কিন্তু আমার ভেতরে যে ঝড় উঠেছিল, তা আর থামল না।

আমি যতবার মায়ের দিকে তাকাতাম, ততবার মনে হতো—আমি এই মানুষটাকে কোনোদিন চিনতেই পারিনি।

ঘটনার দু-এক দিন পর এক রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল।

হয়তো পানি খাওয়ার জন্য উঠেছিলাম।

ঘরের আলো নিভানো ছিল।

শুধু রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট বাতিটা জ্বলছিল।

আমি ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেলাম।

দেখলাম, মা একা বসে আছেন।

হাতে তসবিহ।

চোখ দুটি ভেজা।

তিনি খুব আস্তে আস্তে দোয়া করছিলেন।

কাঁপা কণ্ঠে বলছিলেন,

— "হে আল্লাহ, আমার ছেলেটাকে মানুষের অপবাদ থেকে রক্ষা করো। ও যেন সৎ পথে থাকে। ওর জীবনে যেন আর কোনো অন্ধকার না আসে।"

আমি দরজার আড়াল থেকে সব শুনছিলাম।

আমার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম—

যার সঙ্গে আমি এত চিৎকার করেছি, যার মন আমি এতবার ভেঙেছি, সেই মানুষটাই রাতের শেষ প্রহরে আমার জন্য আল্লাহর কাছে কাঁদছে!

সেই রাতেই আমার ছোটবেলার অসংখ্য স্মৃতি একে একে ফিরে এলো।

মনে পড়ল—

আমি অসুস্থ হলে মা সারারাত জেগে থাকতেন।

আমার জ্বর কমছে কি না, বারবার কপালে হাত রাখতেন।

আমি ঘুমিয়ে পড়লেও তিনি ঘুমাতেন না।

আমি একটু নড়লেই জিজ্ঞেস করতেন,

— "কষ্ট হচ্ছে বাবা?"

আমি তখন বিরক্ত হয়ে বলতাম,

— "আহ্! বারবার ডাকবেন না তো!"

আজ ভাবি, কী নিষ্ঠুর কথাই না বলেছিলাম!

বিজ্ঞাপন

আরেকটা ঘটনা খুব স্পষ্ট মনে পড়ে।

এক ঈদের আগে আমি নতুন জামা চাইছিলাম।

মা বলেছিলেন,

— "আরেকটু অপেক্ষা কর।"

আমি রাগ করে ভেবেছিলাম, মা আমাকে ইচ্ছা করেই জামা কিনে দিচ্ছেন না।

পরে জানতে পারলাম, সেই সময় সংসারে টাকার খুব অভাব ছিল।

মা নিজের জন্য নতুন কাপড় কেনেননি।

আমার জামাটা আগে কিনেছিলেন।

নিজের পুরোনো শাড়িটাই ধুয়ে ইস্ত্রি করে ঈদের দিন পরেছিলেন।

আমি সেদিনও কিছু বুঝিনি।

ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম—

মায়েরা ভালোবাসার গল্প মুখে বলেন না।

তারা ভালোবাসা লুকিয়ে রাখেন ত্যাগের ভেতর।

নিজে না খেয়ে সন্তানের জন্য খাবার রেখে দেন।

নিজের ইচ্ছাগুলো গোপন করে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করেন।

সন্তান যেন কষ্ট না পায়, এজন্য নিজের কষ্টটাকে হাসির আড়ালে ঢেকে রাখেন।

একদিন সাহস করে মাকে জিজ্ঞেস করলাম,

— "মা, আমি তো তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। তুমি কখনো আব্বুকে কিছু বলোনি কেন?"

মা হেসে বললেন,

— "তুই যদি ভুল করিস, তোকে মানুষ করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু তোকে সবার সামনে ছোট করা আমার কাজ না।"

আমি চুপ করে গেলাম।

তিনি আবার বললেন,

— "সন্তান ভুল করলে মা তাকে ছেড়ে দেয় না। বরং আরও শক্ত করে ধরে। কারণ মা জানে, একদিন না একদিন সে বুঝবেই।"

এই কথাগুলো শুনে আমার চোখ ভিজে উঠেছিল।

কারণ আমি বুঝে গিয়েছিলাম—

মা অনেক আগেই আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

কিন্তু আমি এখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি।

সেদিন রাতে আমি অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারিনি।

জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম—

জীবনে আমি যত মানুষের ভালোবাসা খুঁজেছি, তার অর্ধেকও যদি মায়ের ভালোবাসাকে বুঝতে চেষ্টা করতাম, তাহলে হয়তো এত দেরিতে অনুতপ্ত হতে হতো না।

সেই রাত থেকেই আমি বদলানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না।

একজন মানুষ হঠাৎ করে ভালো হয়ে যায় না।

সে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের পুরোনো ভুলগুলোকে হারাতে শেখে।

আমার জীবনেও ঠিক সেটাই ঘটছিল।

সেদিনের পর থেকে আমি নিজেকে নতুন করে দেখার চেষ্টা শুরু করলাম।

আয়নায় নিজের মুখ দেখলে আগের মতো শুধু নিজের চেহারা দেখতাম না।

দেখতাম একজন ছেলেকে, যে বছরের পর বছর নিজের সবচেয়ে আপন মানুষটাকেই কষ্ট দিয়েছে।

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, মা উঠোনে ঝাড়ু দিচ্ছেন।

আগে হলে আমি পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম।

সেদিন প্রথমবার ঝাড়ুটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে বললাম,

— "মা, তুমি বসো। আমি করি।"

মা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

হয়তো ভাবছিলেন, এ কি সত্যিই তাঁর সেই দুষ্টু ছেলে?

কয়েক সেকেন্ড পর শুধু মুচকি হেসে বললেন,

— "না বাবা, তুই থাক।"

আমি জোর করেই ঝাড়ু দিতে শুরু করলাম।

মা কিছু বললেন না।

শুধু দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সেদিন তাঁর চোখে যে আনন্দ দেখেছিলাম, তার কোনো ভাষা নেই।

ধীরে ধীরে আমি বদলাতে লাগলাম।

রাগ কমাতে শিখলাম।

উচ্চস্বরে কথা বলা ছেড়ে দিলাম।

ঘরের কোনো জিনিস নষ্ট হলে আগে যেমন রাগ করতাম, এখন নিজেই ঠিক করার চেষ্টা করতাম।

মা যখন রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতেন, আমি পানি এনে দিতাম।

বাজার থেকে ব্যাগ নিয়ে ফিরতাম।

তিনি অসুস্থ থাকলে ওষুধ খেতে মনে করিয়ে দিতাম।

এগুলো খুব বড় কাজ ছিল না।

কিন্তু আমার জন্য ছিল বিশাল পরিবর্তন।

তবুও একটা কষ্ট আমাকে প্রতিদিন তাড়া করত।

আমি কোনোদিন মাকে "ধন্যবাদ" বলিনি।

কোনোদিন বলিনি—

"মা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

কেন যেন কথাগুলো মুখে আসত না।

হয়তো লজ্জা...

হয়তো অপরাধবোধ...

হয়তো এতদিনের ভুলের ভার।

এক রাতে সাহস করে মায়ের ঘরের দরজায় দাঁড়ালাম।

তিনি তখন নামাজ শেষে দোয়া করছিলেন।

আমি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলাম।

মা তাকিয়ে বললেন,

— "কিছু বলবি বাবা?"

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তারপর কাঁপা গলায় বললাম,

— "মা... আমি কি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি?"

মা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর খুব শান্তভাবে বললেন,

— "প্রত্যেক সন্তানই কোনো না কোনো সময় মাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু মা সেই কষ্ট মনে রাখে না।"

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।

আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।

আমি নিচু হয়ে মায়ের হাত দুটি ধরে বললাম,

— "আমাকে ক্ষমা করে দাও মা। আমি তোমাকে কোনোদিন বুঝতে পারিনি।"

মা আমার মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন,

— "আল্লাহ তোকে ভালো মানুষ বানাক। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।"

সেদিন আমি বুঝলাম—

মায়ের কাছে সন্তানের সবচেয়ে বড় উপহার দামি কোনো জিনিস নয়।

সন্তানের বদলে যাওয়াই একজন মায়ের সবচেয়ে বড় সুখ।

আমি সেই দিন প্রথমবার অনুভব করলাম, ক্ষমা চাওয়া মানুষকে ছোট করে না।

বরং তার হৃদয়কে হালকা করে দেয়।

কিন্তু তখনও জানতাম না—

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি এখনও বাকি।

একদিন এমন একটি ঘটনা ঘটবে, যা আমাকে বুঝিয়ে দেবে—

এই পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আরেকটি নাম শুধু "মা"।

সময় থেমে থাকে না।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যেতে লাগল।

আমি বদলে যাচ্ছিলাম।

কিন্তু যতই বদলাচ্ছিলাম, ততই বুঝতে পারছিলাম—আমি যে মানুষটাকে এত বছর অবহেলা করেছি, তাঁর ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব নয়।

মা আগের মতোই ছিলেন।

ভোরের আজানের আগেই ঘুম থেকে উঠতেন।

অজু করে নামাজ পড়তেন।

তারপর দু'হাত তুলে আমার জন্য দোয়া করতেন।

আমি অনেকবার আড়াল থেকে সেই দৃশ্য দেখেছি।

তিনি কখনো নিজের সুখ চাননি।

চাননি নিজের জন্য বড় কোনো ঘর, দামি কাপড় কিংবা আরাম-আয়েশ।

তাঁর প্রতিটি দোয়ার শেষে একটি কথাই থাকত—

"হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে ভালো রেখো। ও যেন মানুষের মতো মানুষ হয়।"

সেদিন আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছিল—

একজন মা কী দিয়ে তৈরি?

কারণ এত কষ্ট পাওয়ার পরও তিনি সন্তানের জন্যই বাঁচেন।

একদিন পুরোনো একটি আলমারি গুছাতে গিয়ে একটি ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগ পেলাম।

ব্যাগটা খুলতেই কয়েকটি পুরোনো কাগজ, আমার ছোটবেলার ছবি, স্কুলের একটি সার্টিফিকেট আর কিছু শুকিয়ে যাওয়া ফুল বেরিয়ে এল।

আমি অবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম,

— "এগুলো এখনো রেখে দিয়েছ?"

মা মৃদু হেসে বললেন,

— "এগুলো তো আমার ধন।"

আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

আমার কাছে যেগুলো ছিল পুরোনো, অপ্রয়োজনীয় কাগজ—মায়ের কাছে সেগুলো ছিল স্মৃতি।

তিনি বললেন,

— "তুই যখন প্রথম স্কুলে পুরস্কার পেয়েছিলি, সেদিন আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। বারবার কাগজটা দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে।"

আমি মাথা নিচু করে ফেললাম।

কারণ আমি সেই সার্টিফিকেটটার কথাই ভুলে গিয়েছিলাম।

কিন্তু মা ভুলে যাননি।

সেদিন বুঝলাম, সন্তানের ছোট ছোট অর্জনও একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আমরা বড় হয়ে যাই।

বন্ধু বদলাই।

স্বপ্ন বদলাই।

জীবনের ঠিকানা বদলাই।

কিন্তু একজন মা কখনো বদলান না।

তিনি আজও সন্তানের ছোটবেলার সেই হাসিটাই খুঁজে বেড়ান।

আমি জানি না ভবিষ্যতে আমি কত বড় মানুষ হতে পারব।

হয়তো সফল হব।

হয়তো ব্যর্থ হব।

হয়তো অনেক মানুষ আমাকে চিনবে।

হয়তো কেউ চিনবেও না।

কিন্তু একটি পরিচয় আমি সারাজীবন গর্ব করে বহন করব—

আমি একজন মায়ের সন্তান।

সেই মায়ের, যাকে আমি একদিন ভুল বুঝেছিলাম।

যিনি আমার রাগ সহ্য করেছেন।

আমার অবাধ্যতা সহ্য করেছেন।

আমার অন্যায়ের জন্য কেঁদেছেন।

আমার অপমান নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

আর যখন পুরো পৃথিবী আমাকে দোষী ভেবেছিল, তখন সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে আগলে রেখেছিলেন।

আজ যদি তিনি আমার সামনে বসে থাকেন, আমি আর কোনো বড় কথা বলতে চাই না।

শুধু তাঁর হাত দুটো নিজের কপালে ছুঁইয়ে বলতে চাই—

"মা, আমি জানি তোমার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না। কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকব, এমন কোনো কাজ করব না, যাতে তোমার মাথা নিচু হয়।"

আর যদি কোনোদিন তিনি এই পৃথিবীতে না থাকেন...

তাহলে আমার প্রতিটি দোয়ায় একটি নাম থাকবে।

প্রতিটি সিজদায় একটি অশ্রুবিন্দু থাকবে।

কারণ পৃথিবীর সব ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও—

মায়ের ভালোবাসার স্মৃতি কখনো হারায় না।

লেখকের কথাঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

এই গল্পটি শুধু একটি গল্প নয়।

এটি আমার হৃদয়ের একটি অংশ।

এখানে লেখা প্রতিটি অনুভূতি আমার উপলব্ধি, আমার অনুশোচনা এবং আমার মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।

একটা সময় আমি সত্যিই ভাবতাম—আমার মা আমাকে বুঝতে পারেন না, আমাকে ভালোবাসেন না। তাঁর শাসনকে আমি রাগ মনে করতাম, তাঁর নীরবতাকে অবহেলা মনে করতাম। আমি বুঝতেই পারিনি, একজন মা অনেক সময় মুখে "ভালোবাসি" বলেন না; তিনি তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করেন ত্যাগে, দোয়ায়, চোখের জলে এবং সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ সংগ্রামে।

সময় আমাকে শিখিয়েছে—যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি বকেন, অনেক সময় তিনিই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।

আজ যখন অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমার অনেক আচরণের জন্য লজ্জা হয়। মনে হয়, যদি সময়কে একটু ফিরিয়ে নেওয়া যেত! যদি আরেকবার ছোট হয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারতাম, তাহলে হয়তো রাগের বদলে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলতাম—"মা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।"

হয়তো পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ছেলের বুকেই এমন কিছু না বলা কথা লুকিয়ে থাকে। আমার বুকেও আছে—

ভাগ্যের কাছে হেরেছি আমি, মায়ের ভালো ছেলে হতে পারিনি।

কেউ ভেঙেছে আমার হৃদয়, কেউ ভেঙেছে বিশ্বাসের ঘরখানি।

আজ সবাই বলে—"তুই অনেক বদলে গেছিস!"

হ্যাঁ, বদলেছি... কারণ জীবন আমাকে বদলাতে শিখিয়েছে।

ছাইয়ের নিচে আগুন যেমন আবার জ্বলে উঠতে পারে,

ঝড়ের মাঝেও নৌকা যেমন একদিন তীরে ভিড়তে পারে;

তেমনি যদি থাকে আমার সঙ্গে শুধু আমার মায়ের দোয়া,

তবে বদলে যেতে পারে আমার ভাগ্য, বদলে যেতে পারে পুরো দুনিয়া।

এই গল্পের উদ্দেশ্য কাউকে কাঁদানো নয়।

উদ্দেশ্য শুধু একটি—যাদের মা আজও পাশে আছেন, তারা যেন তাঁকে অবহেলা না করেন। কারণ পৃথিবীতে অনেক কিছু হারিয়ে আবার ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু একজন মা হারিয়ে গেলে তাঁর শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হয় না।

আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় একজন মায়ের দোয়া।

যদি এই গল্প পড়ে একজন সন্তানও তার মায়ের কাছে গিয়ে ভালোবেসে বলে, "মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি", তাহলে একজন লেখক হিসেবে আমার শ্রম সার্থক হবে।

পরিশেষে, মহান আল্লাহ তাআলার কাছে একটি দোয়া—

হে আল্লাহ, আমাদের সকল মায়েদের সুস্থ রাখুন, দীর্ঘ হায়াত দান করুন, তাঁদের কষ্টগুলো ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে তাঁদের যথাযথ সম্মান ও সেবা করার তাওফিক দান করুন। আর যেসব মা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন। আমীন।

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প