যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের পোল্ক কাউন্টিতে ২০১৭ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব ঘটনা সারা পৃথিবীর মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তীব্র তাপদাহের মধ্যে স্থানীয় একটি পুরনো কবরস্থানে ঘাস কাটা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত ছিলেন ছয়জন কারাবন্দি। তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন পোল্ক কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ডেপুটি ড্যানি রেইনার। প্রচণ্ড গরম এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে হঠাৎ করেই সেই কর্মকর্তা সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তার শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সেই মুহূর্তে ওই ছয়জন বন্দির সামনে ছিল জেলখানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার এক অবিশ্বাস্য এবং নিখুঁত সুযোগ। তাদের সামনেই পড়ে ছিল অফিসারের হাতের বন্দুক, লোড করা অতিরিক্ত গুলিভর্তি বেল্ট, পকেটের ফোন এবং কাছেই পার্ক করে রাখা প্রিজন ভ্যানের চাবি। এমন পরিস্থিতিতে চাইলেই তারা খুব সহজে পালিয়ে বহুদূরে চলে যেতে পারতেন অথবা গাড়ি ও অস্ত্র নিয়ে কোনো বড় ধরনের সহিংসতা ঘটাতে পারতেন। কিন্তু বন্দি জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা এবং মুক্তির লোভ একপাশে সরিয়ে রেখে তারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা আধুনিক সমাজব্যবস্থায় মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। তারা মুহূর্তের জন্যও পালানোর কথা ভাবেননি, বরং দলবদ্ধভাবে তাদের তদারককারী কর্মকর্তার জীবন বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যান। এই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পরবর্তীতে তাদের জেল খাটার মেয়াদ পঁচিশ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয় এবং সমাজ তাদের অপরাধী হিসেবে নয়, বরং প্রকৃত মানবদরদি হিসেবে নতুন করে গ্রহণ করে।
একটি সাধারণ কাজের দিন এবং হঠাৎ নেমে আসা বিপদ
২০১৭ সালের ১২ জুনের সেই দিনটি শুরু হয়েছিল অন্যান্য সাধারণ কর্মদিবসের মতোই। জর্জিয়ার পোল্ক কাউন্টি সংশোধনাগারের নিয়মানুযায়ী যেসব বন্দি অহিংস এবং ছোটখাটো অপরাধের কারণে সাজা ভোগ করছিলেন, তাদের মধ্য থেকে ছয়জনকে বাছাই করে একটি ওয়ার্ক ক্রু বা কাজের দল গঠন করা হয়েছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল স্থানীয় একটি শান্ত কবরস্থানের বড় বড় ঘাস কেটে পরিষ্কার করা এবং কবরের চারপাশ গোছগাছ রাখা। এই দলের তদারকির দায়িত্বে পাঠানো হয়েছিল ড্যানি রেইনার নামের একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব অভিজ্ঞ ডেপুটি শেরিফকে। ড্যানি রেইনার ছিলেন সেই ধরনের কর্মকর্তা, যিনি বন্দিদের সাথে দুর্ব্যবহার করতেন না; বরং সবসময় তাদের সম্মান ও সহানুভূতির সাথে দেখতেন এবং নিজের পরিবারের সদস্যদের মতো কথা বলতেন। ফলে বন্দিদের মনেও তার জন্য আলাদা এক ধরনের শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেদিন সকাল থেকেই জর্জিয়ার আবহাওয়া ছিল চরম রুক্ষ ও চরম উত্তপ্ত। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায় এবং বাতাসে আর্দ্রতা এত বেশি ছিল যে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল। ড্যানি রেইনার নিজের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ভারি বুলেটপ্রুফ ভেস্ট, অস্ত্র এবং ভারী পোশাক পরে পুরো কবরস্থান চত্বরে হেঁটে বন্দিদের কাজের তদারকি করছিলেন। দুপুরের দিকে প্রচণ্ড রোদের তাপে এবং পানিশূন্যতায় তিনি হঠাৎ অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন তার মাথা ঘুরছে, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি ঘাসের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যান এবং পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো চত্বরে এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
মুক্তির প্রলোভন উপেক্ষা করে মানবতার চূড়ান্ত পরীক্ষা
ডেপুটি রেইনার মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সাথে সাথে পরিস্থিতি এক চরম মোড় নেয়। সাধারণত কারাগারের ইতিহাসে এমন সুযোগ বন্দিদের কাছে মুক্তির রাস্তা হিসেবে ধরা দেয়। কারণ তাদের সামনে পাহারাদার হিসেবে থাকা একমাত্র পুলিশ সদস্য তখন সম্পূর্ণ অচেতন, তার কোমরের হোলস্টারে রয়েছে সরকারি সার্ভিস রিভলভার, পাশে পড়ে আছে প্রিজন ভ্যানের চাবি, যা দিয়ে তালা খুলে অনায়াসে যে কেউ চম্পট দিতে পারত। কিন্তু ওই ছয় বন্দির অন্তরে তখন কোনো অপরাধমূলক চিন্তা বা পালানোর পরিকল্পনা কাজ করেনি। তারা কোনো ধরনের দ্বিধা বা সময় নষ্ট না করে সরাসরি কর্মকর্তার দিকে দৌড়ে যান। দলের সদস্য গ্রেগ উইলিয়ামস দ্রুত মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রেইনারের অবস্থা পরীক্ষা করতে শুরু করেন। তারা দেখতে পান অফিসারের গায়ের চামড়া বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে, শরীর নিস্তেজ এবং বুক অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। তারা সাথে সাথে বুঝতে পারেন গরমের কারণে অফিসারের রক্ত চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং শরীর জমে যাচ্ছে। তারা খুব দ্রুত এবং সতর্কতার সাথে ড্যানির শরীর থেকে ভারী বুলেটপ্রুফ ভেস্টটি খুলে আলাদা করেন, যাতে বুক হালকা হয় এবং তিনি ঠিকমতো বাতাস টেনে নিতে পারেন। এরপর তারা তার কোমরের ভারী গান বেল্ট খুলে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখেন, যেন কোনোভাবেই কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। গ্রেগ উইলিয়ামস তখনই অফিসারের পকেট থেকে তার মোবাইল ফোনটি তুলে নেন এবং লক স্ক্রিন থেকে জরুরি ৯১১ নম্বরে ফোন করে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে শান্তভাবে কবরস্থানের সঠিক অবস্থান জানান। ফোন রাখার পর তারা ডেপুটি রেইনারকে ছায়াযুক্ত জায়গায় কাত করে শুইয়ে দেন এবং তার হাত-পা মালিশ করতে থাকেন যেন রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
জরুরি দলের আগমন এবং চিকিৎসকদের বিস্ময়
জরুরি সেবার বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে স্থানীয় উদ্ধারকারী অ্যাম্বুলেন্স এবং পুলিশের অতিরিক্ত দল ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সাধারণত পুলিশের ওয়াকিটকিতে যখন বার্তা যায় যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বন্দিদের সাথে থাকা অবস্থায় অচেতন হয়ে পড়েছেন এবং বন্দিরাই ফোন করেছে, তখন প্রশাসন বড় ধরনের কোনো অমঙ্গল বা ফাঁদের আশঙ্কা করে। কিন্তু পুলিশ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের গাড়ি যখন সাইরেন বাজিয়ে দ্রুত কবরস্থানে প্রবেশ করে, তখন তারা এমন এক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন যা তাদের চোখ ভিজিয়ে দেয়। কোনো বন্দি পালানোর চেষ্টা করেননি, অস্ত্র স্পর্শ করেননি বা কাউকে জিম্মি করার সামান্যতম লক্ষণও ছিল না। বরং ছয়জন বন্দি নিবিষ্ট মনে একজন অচেতন কর্মকর্তার চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। অ্যাম্বুলেন্সের প্যারামেডিক কর্মীরা দ্রুত রেইনারকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা পরবর্তীতে নিশ্চিত করেন যে অতিরিক্ত তাপদাহের কারণে ড্যানি রেইনার হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তার শ্বাসযন্ত্র প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। চিকিৎসকরা স্পষ্টভাবে জানান, বন্দিরা যদি তাৎক্ষণিকভাবে তার শরীরের ভারী বুলেটপ্রুফ পোশাক না খুলত এবং সাথে সাথে ৯১১ নম্বরে ফোন করে জরুরি সহায়তা না ডাকত, তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অক্সিজেন স্বল্পতায় অফিসারের মৃত্যু ঘটত। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর ডেপুটি রেইনার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, এই বন্দিরা কেবল তার সহকর্মী বা সাধারণ বন্দি ছিল না, সেই চরম সংকটের মুহূর্তে তারা নিজের রক্তের পরিবারের মতো তার জীবন রক্ষা করেছে।
আইনি স্বীকৃতি, সাজার মেয়াদ হ্রাস এবং বিশ্বজুড়ে প্রশংসা
এই অসাধারণ মানবিক ঘটনাটি খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পোল্ক কাউন্টির প্রধান শেরিফ জনি মোয়েটস প্রকাশ্যে এসে বন্দিদের দায়িত্বশীলতা ও ত্যাগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন যে আইনভঙ্গের কারণে মানুষ কারাগারে যায় ঠিকই, কিন্তু তাদের ভেতরের মানবিকতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় না, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। শেরিফ কার্যালয়ের পক্ষ থেকে স্থানীয় বিচারক এবং জেলা প্রশাসকের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করা হয়, যাতে এই ছয় বন্দির নিঃস্বার্থ কাজের একটি বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া যায়। আদালতের বিশেষ বিবেচনায় ছয়জন বন্দির প্রত্যেকের সাজার মোট মেয়াদ থেকে ২৫ শতাংশ মাফ করে দেওয়ার চূড়ান্ত আদেশ জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে কয়েকজন বন্দি তাৎক্ষণিকভাবে এবং অন্যরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে জেল থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এছাড়া স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে বন্দিদের জন্য একটি বিশেষ দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হয় এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে বিশেষ সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় বন্দি গ্রেগ উইলিয়ামস এক অসাধারণ কথা বলেছিলেন; তিনি বলেছিলেন যে সেই মুহূর্তে কে পুলিশ অফিসার আর কে কয়েদি সেটা ভাবার কোনো সুযোগ ছিল না, একজন মানুষ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছিল এবং তাকে বাঁচানোই ছিল একমাত্র দায়িত্ব। এই ঘটনাটি পুরো পৃথিবীর মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে অতীত ভুল যাই হোক না কেন, মানুষের ভেতরের দয়া, দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসা সবসময় যেকোনো বাধা অতিক্রম করে সমাজকে আলোকিত করতে পারে।