আমেরিকার নেভাদা মরুভূমির কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত নির্জন রুক্ষ প্রান্তর, যার চারপাশের নিস্তব্ধতায় লুকানো আছে বহু অজানা রহস্য। ঠিক এই মরুভূমিরই অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে ঘটে যায় আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় এক নিখোঁজ রহস্য। সাতচল্লিশ বছর বয়সী দুঃসাহসী অভিযাত্রী ও ইউটিউবার কেনি ভিচ দাবি করেছিলেন, তিনি নেভাদার সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি পাহাড়ে ইংরেজি ‘এম’ অক্ষরের মতো নিখুঁতভাবে কাটা একটি অদ্ভুত গুহার মুখ দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু সাধারণ কোনো গুহার মতো সেখানে কোনো সাধারণ ভয় ছিল না; বরং গুহার প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি যাওয়া মাত্রই তাঁর পুরো শরীর তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে, হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে যায় এবং ভেতরের এক অজানা আতঙ্কে তিনি প্রাণভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। ইন্টারনেটের দর্শকেরা যখন তাঁর এই দাবিকে বানোয়াট গল্প বলে উপহাস করতে শুরু করেন, তখন নিজের কথার সত্যতা প্রমাণ করতে কেনি আবারও সেই ভয়ংকর গুহাটি খুঁজতে একাই মরুভূমিতে পা বাড়ান। তারপর সেই নিস্তব্ধ পাহাড়ের খাঁজ থেকে তিনি চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান। এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তাঁর শরীরের কোনো চিহ্ন আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি; উদ্ধার হয়েছে কেবল একটি গভীর পরিত্যক্ত খনির মুখে নিখুঁতভাবে বসিয়ে রাখা তাঁর ব্যবহৃত ফোনটি। প্রকৃতি, বিজ্ঞান, মানুষের মনস্তত্ত্ব নাকি গোপন কোনো রহস্যের বলি হয়েছিলেন কেনি—এই প্রশ্নের জবাব আজও কেউ দিতে পারেনি।
নেভাদার রুক্ষ মরুভূমি এবং কেনি ভিচের অদ্ভুত আবিষ্কার
কেনি ভিচ কোনো সাধারণ অপেশাদার মানুষ ছিলেন না; মরুভূমির ভয়ংকর উত্তাপ ও পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে একা একা ট্রেকিং করার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। তিনি নেভাদার সেই সমস্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতেন, যেখানে সাধারণ মানুষ পা ফেলার সাহস পায় না। ইন্টারনেট দুনিয়ায় নিজের অভিযানের ছোটখাটো ভিডিও শেয়ার করতেন তিনি। ঘটনার মূল সূত্রপাত হয় যখন তিনি একটি ভিডিওর নিচে নিজের একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি জানান, নেভাদার নেলিস বিমানঘাঁটি এবং অতি সংবেদনশীল এলাকাগুলোর কাছাকাছি একটি দুর্গম পাহাড়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তিনি এক অস্বাভাবিক দৃশ্যের মুখোমুখি হন। পাথুরে পাহাড়ের গায়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি কোনো সাধারণ গুহা নয়, বরং নিখুঁত ইংরেজি বড় হাতের ‘এম’ অক্ষরের আকারে কাটা একটি অন্ধকার গুহার প্রবেশমুখ তাঁর চোখে পড়ে। পাহাড়ের গায়ে এমন জ্যামিতিক নকশার প্রবেশপথ আগে কখনো কেউ দেখেনি। কৌতুহল নিয়ে যখনই তিনি গুহাটির ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন, তখনই ঘটে এক অব্যাখ্যাত ঘটনা। কেনির ভাষায়, গুহার মুখে পৌঁছাতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি তাঁর স্নায়ুকে অবশ করে দিতে থাকে। তাঁর মনে হয়েছিল যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির তীব্র কম্পন তাঁর হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তাঁর বুকের ভেতর তীব্র চাপ সৃষ্টি হতে থাকে এবং এক গভীর, আদিম আতঙ্ক তাঁর মস্তিষ্ককে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে তিনি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। কোনো বন্য প্রাণী বা শারীরিক বিপদের কারণে নয়, বরং বাতাসেই যেন ভর করেছিল এক অদেখা ভয়। নিজের আত্মরক্ষা করতে সেদিন তিনি দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে আসেন এবং নিজের বেঁচে ফেরাকেই বড় সৌভাগ্য বলে মনে করেছিলেন।
দর্শকদের উপহাস এবং মরুভূমির বুকে দ্বিতীয় অভিযান
কেনি যখন তাঁর এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা ইন্টারনেটে প্রকাশ করেন, তখন সিংহভাগ মানুষই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নেয়নি। নেটিজেনরা দাবি করতে থাকে যে তিনি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি ও ভিউ পাওয়ার জন্য এমন ভুতুড়ে গল্প বানাচ্ছেন। কেউ কেউ তাঁকে স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলে, যদি এমন কোনো গুহা সত্যিই থেকে থাকে, তবে তিনি কেন তার কোনো ভিডিও বা প্রমাণ রাখলেন না। মানুষের এই তাচ্ছিল্য এবং কটাক্ষ কেনির মতো আত্মবিশ্বাসী হাইকারকে মানসিকভাবে ভীষণভাবে আঘাত করে। নিজের সততা ও সম্মান বাঁচাতে তিনি পণ করেন যে তিনি আবার সেই পাহাড়ে ফিরে যাবেন এবং গুহাটির ভিডিও ধারণ করে সবাইকে আসল সত্যটা দেখিয়ে দেবেন। নিজের কথা অনুযায়ী ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি একাই একটি ছোট ক্যামেরা হাতে নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মরুভূমিতে নামেন। প্রায় দশ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি সেই চড়া রোদ ও ভয়ংকর পাথুরে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গুহাটির অনুসন্ধান চালান। তিনি সেই অভিযানের পুরো ভিডিও নিজের চ্যানেলে আপলোড করেন, যেখানে দেখা যায় তিনি মরুভূমির বিপজ্জনক গিরিখাত, গভীর খাদ এবং বিষাক্ত সাপের মুখোমুখি হচ্ছেন, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজার পরও তিনি আর সেই ‘এম’ আকৃতির প্রবেশদ্বারটি খুঁজে পাননি। ভিডিওটি আপলোড করার পর ইন্টারনেটে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, কিন্তু সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটে ভিডিওর কমেন্ট বক্সে। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক আইডি থেকে অত্যন্ত সতর্কবার্তা দিয়ে একটি মন্তব্য করা হয়। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয়েছিল, কেনি যেন আর কোনোদিন ভুল করেও সেই জায়গায় ফিরে না যান। সেই বার্তায় আরও বলা হয়েছিল, যদি তিনি কখনো সেই অদ্ভুত গুহাটি আবার খুঁজেও পান, তবে যেন কোনো অবস্থাতেই ভেতরে পা না রাখেন; কারণ একবার ঢুকলে আর কোনোদিন জীবিত অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব হবে না। কিন্তু কেনির ভেতর সত্য প্রমাণের যে তীব্র জেদ চেপে বসেছিল, তার সামনে এই অজানা সতর্কতা কোনো বাধাই তৈরি করতে পারেনি।
রহস্যময় প্রস্থান এবং পরিত্যক্ত খনির মুখে পাওয়া সেলফোন
অজানা সাবধানবাণী এবং বন্ধুদের বারণ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ২০১৪ সালের ১০ই নভেম্বর কেনি ভিচ তাঁর জীবনের তৃতীয় ও শেষ অভিযানের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। মাত্র দুই দিনের খাবার ও পানি সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি সাধারণ ট্রিপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু দুই দিন পেরিয়ে যখন তিন দিন, চার দিন হয়ে গেল এবং কেনির কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না, তখন তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও বান্ধবী চরম উৎকণ্ঠায় পড়েন এবং স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নেভাদার অভিজ্ঞ অনুসন্ধানকারী দল ‘রেড রক সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ তাৎক্ষণিকভাবে এক বিশাল তল্লাশি অভিযান শুরু করে। পুলিশের বিশেষ দল, প্রশিক্ষিত স্নিফার ডগ, পাহাড়ি গাড়ি এবং ওপর থেকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য হেলিকপ্টার নামানো হয়। প্রথম দিকেই মরুভূমির শেষ প্রান্তে একটি দুর্গম ট্রেইলহেডের মুখে কেনির গাড়িটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। গাড়িতে কোনো ধরনের সংঘর্ষ, চুরি বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির চিহ্ন ছিল না। কিন্তু গাড়ির সন্ধান পাওয়ার পর উদ্ধারকর্মীদের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তাঁদের সামনে ছিল মাইলের পর মাইল বিস্তৃত রুক্ষ পাথুরে প্রান্তর। দীর্ঘ বারো দিন ধরে তন্নতন্ন করে খোঁজার পর ২২শে নভেম্বর তল্লাশি দল এক অদ্ভুত ও চমকপ্রদ ক্লু খুঁজে পায়। কেনির গাড়ি থেকে প্রায় চার ঘণ্টার হাঁটা দূরত্বের একটি পাহাড়ে, শত বছর আগের এক গভীর পরিত্যক্ত খনির প্রবেশদ্বারের কাছে একটি সেলফোন উদ্ধার হয়। ফোনটি চালু করার পর নিশ্চিত হওয়া যায় সেটি নিখোঁজ কেনি ভিচেরই ব্যক্তিগত ফোন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গভীর খনির মুখটি কেনি তাঁর আগের ভিডিওতে দর্শকদের দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় ফোনের আশেপাশের পরিবেশ দেখে। সেই ধুলাবালি ও পাথুরে জমিনে কেনির কোনো পায়ের ছাপ, জামাকাপড়ের ছেঁড়া অংশ, পানির বোতল কিংবা বন্য প্রাণীর আক্রমণের ন্যূনতম কোনো রক্ত বা আলামত ছিল না। ফোনটি মাটির ওপর সযত্নে এমন সোজাভাবে রাখা ছিল, যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সেটি সেখানে সাজিয়ে রেখে গেছে। এই একটি ফোন ছাড়া পুরো মরুভূমিতে কেনি ভিচ নামের মানুষটির আর কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া গেল না।
বিজ্ঞান, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং এক মানুষের নীরব বিষণ্ণতা
কেনি ভিচের এই অলৌকিক নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে বহু তত্ত্ব ও বিতর্ক। যে এলাকায় তিনি হাঁটছিলেন, তার সামান্য দূরেই ছিল আমেরিকার সামরিক বাহিনীর অতি গোপনীয় অঞ্চল এরিয়া ফিফটি-ওয়ান। ফলে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে কেনি হয়তো অসাবধানতাবশত এমন কোনো সামরিক সীমানা বা গোপন পরীক্ষার এলাকায় ঢুকে পড়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষের দেখা বারণ ছিল। অনেকে আবার সেই অস্বাভাবিক কম্পন ও আতঙ্কের বিষয়টিকে কোনো ভিনগ্রহের যান বা অতিপ্রাকৃতিক পোর্টালের প্রভাব বলে মনে করেন। তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও ভূ-তাত্ত্বিক গবেষকেরা এর পেছনে একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পাহাড়ি গুহা বা গভীর শিলাস্তরের বিশেষ গঠনের মধ্য দিয়ে তীব্র বাতাস প্রবাহিত হলে এক ধরণের অতি নিম্ন-কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ইনফ্রাসাউন্ড। এই কম্পাঙ্ক মানুষের কান দিয়ে শোনা যায় না, কিন্তু তা মানুষের স্নায়ুতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড এবং মস্তিষ্কে সরাসরি গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইনফ্রাসাউন্ডের সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীর কাঁপুনি দিয়ে ওঠে, মাথা ঘোরে এবং তীব্র অমূলক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়; কেনির প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা হয়তো এই প্রাকৃতিক শব্দের কারণেই ঘটেছিল। তবে অতিপ্রাকৃতিক তত্ত্ব আর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি কেনির ব্যক্তিগত জীবনের একটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী সত্য পরবর্তীতে সামনে আসে। তাঁর দীর্ঘদিনের বান্ধবী জানান, বাইরের চোখে অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও দুঃসাহসী হলেও কেনি ভেতরে ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন। আর্থিক সংকট এবং জীবনের নানা হতাশা তাঁকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তিনি একাধিকবার তাঁর কাছের মানুষদের বলেছিলেন, যদি কখনো তিনি নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে এমনভাবে নিজেকে আড়াল করবেন যাতে পৃথিবীর কোনো মানুষ তাঁর মৃতদেহ আর কোনোদিন খুঁজে না পায়। অনেকেই ধারণা করেন, কেনি হয়তো ট্র্যাকিং এড়াতে সচেতনভাবেই তাঁর ফোনটি খনির মুখে রেখে আরও গভীর কোনো গহ্বরে চলে গিয়েছিলেন, যাতে কেউ তাঁকে ট্র্যাক করতে না পারে। মরুভূমির হাজার হাজার গভীর উল্লম্ব খাদ, প্রচুন্ড উত্তাপ এবং বন্য প্রাণীর উপস্থিতি হয়তো তাঁর শেষ চিহ্নটুকুকেও নিঃশব্দে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। কেনি কি সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃতিক গুহায় হারিয়ে গেছেন, নাকি নিজের ভেতরের যন্ত্রণার বোঝা নামিয়ে রাখতে নিজেই বেছে নিয়েছিলেন মরুভূমির চিরন্তন নীরবতা—তা আজও এক গভীর অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।