মৃত্যুর মুখে রুজভেল্ট: শেষ মুহূর্তের অসমাপ্ত প্রতিকৃতি ও ইতিহাসের এক গোপন প্রেম!

১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোকে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। শিল্পী এলিজাবেথ শুমাৎফের ক্যানভাসে অসমাপ্ত থেকে যায় তাঁর শেষ প্রতিকৃতি। তবে এই মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের এক নিষিদ্ধ ভালোবাসা এবং বিশ্বযুদ্ধ বদলে দেওয়া ইতিহাস।

গল্পের বাহার • ৩০ আগস্ট, ২০২৬ • ইতিহাস ও সভ্যতা - ০৩ • ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব
মৃত্যুর মুখে রুজভেল্ট: শেষ মুহূর্তের অসমাপ্ত প্রতিকৃতি ও ইতিহাসের এক গোপন প্রেম! - গল্পের বাহার

১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল ছিল গোটা পৃথিবীর ইতিহাসের জন্য এক অভাবনীয় মোড় পরিবর্তনের দিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় যখন ইউরোপে প্রায় শেষের পথে এবং নাৎসি জার্মানির সম্পূর্ণ পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র, ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে মারা যান যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। জর্জিয়ার ছোট্ট শহর ওয়ার্ম স্প্রিংসের এক নিরিবিলি অবকাশযাপন কেন্দ্রে বসে যখন তিনি বিখ্যাত শিল্পী এলিজাবেথ শুমাৎফের কাছে নিজের একটি চমৎকার জলরং প্রতিকৃতির জন্য পোজ দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মস্তিষ্কে মারাত্মক রক্তক্ষরণের কারণে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। ফলে শিল্পীর সেই ক্যানভাসে প্রেসিডেন্টের ছবিটি আজীবনের জন্য অসমাপ্ত থেকে যায়, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে এক ঐতিহাসিক সৃষ্টি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে এই হৃদয়বিদারক বিদায়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এমন এক ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, যা জানাজানি হলে সেসময়ের মার্কিন রাজনীতিতে প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হতে পারত। প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর ঠিক সেই মুহূর্তটিতে তাঁর একান্ত পাশে উপস্থিত ছিলেন তাঁর জীবনের দীর্ঘদিনের গোপন প্রেমিকা লুসি মার্সার রাদারফার্ড, যাঁর সঙ্গে বহু বছর আগের এক নিষিদ্ধ সম্পর্কের কথা প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ফার্স্ট লেডি এলিনর রুজভেল্টসহ পুরো দেশের মানুষের কাছে সযত্নে গোপন রাখা হয়েছিল। এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু যেমন বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের কাঁধে পরমাণু বোমার মতো মারাত্মক সিদ্ধান্তের ভার তুলে দিয়েছিল, তেমনই অসমাপ্ত প্রতিকৃতি ও গোপন প্রেমের স্মৃতি এক অদ্ভুত রহস্যে ঢেকে দিয়েছিল ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের শেষ বিদায়কে।

ওয়ার্ম স্প্রিংসের সেই শান্ত দুপুর এবং হঠাৎ নেমে আসা মৃত্যুর ছায়া

জর্জিয়ার ওয়ার্ম স্প্রিংস জায়গাটি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অত্যন্ত প্রিয় এবং পরিচিত এক আশ্রয়স্থল ছিল। বহু বছর আগে যখন তিনি পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে চলনশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তখন এখানকার উষ্ণ প্রাকৃতিক ঝর্ণার পানিতে থেরাপি নিয়ে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে দারুণ স্বস্তি পেয়েছিলেন। সেই সুবাদে তিনি সেখানে নিজের মতো করে একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করেন, যার পরিচিতি গড়ে ওঠে লিটল হোয়াইট হাউস নামে। ১৯৪৫ সালের বসন্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রচণ্ড মানসিক চাপ এবং দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও অতিরিক্ত উচ্চ রক্তচাপের কারণে প্রেসিডেন্টের শরীর ভেঙে পড়েছিল। চিকিৎসকদের কড়া পরামর্শ ছিল তিনি যেন দ্রুত সব কাজ থেকে ছুটি নিয়ে কিছুটা সময় পূর্ণ বিশ্রামে কাটান। সেই অনুযায়ী এপ্রিলের শুরুর দিকে তিনি ওয়াশিংটনের ব্যস্ততা ছেড়ে ওয়ার্ম স্প্রিংসে চলে আসেন। ১২ এপ্রিল দুপুরের পরিবেশটা ছিল বেশ শান্ত এবং মনোরম। প্রেসিডেন্ট তাঁর পড়ার ঘরে একটি বড় আরামদায়ক চেয়ারে বসেছিলেন, পরনে ছিল নীল রঙের সুট এবং লাল টাই। তাঁর ঠিক সামনে কয়েক ফুট দূরে ইজেলে ক্যানভাস বসিয়ে মন দিয়ে কাজ করছিলেন রুশ বংশোদ্ভূত খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী এলিজাবেথ শুমাৎফ। প্রেসিডেন্ট বেশ হালকা মেজাজে ছিলেন এবং ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয়ে কথা বলছিলেন। ঠিক দুপুর একটার কাছাকাছি সময়ে শুমাৎফ যখন প্রেসিডেন্টের কলার ও টাইয়ের রঙ ফুটিয়ে তুলছিলেন, তখন হঠাৎ করেই রুজভেল্ট তাঁর হাত দুটো মাথার পেছনে নিয়ে যান। তাঁর চেহারায় হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণার ছাপ ফুটে ওঠে এবং তিনি খুব নিচু গলায় অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠেন যে তাঁর ভীষণ মাথাব্যথা করছে। কথাটি শেষ করার সাথে সাথেই প্রেসিডেন্টের শরীর চেয়ারে ঢলে পড়ে এবং তিনি সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে যান। ঘরের ভেতর থাকা সবাই মুহূর্তের মধ্যে দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং সাথে সাথে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়। দ্রুত তাঁকে পাশের শোবার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন যে অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রার উচ্চ রক্তচাপের কারণে প্রেসিডেন্টের মস্তিষ্কে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গেছে। আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অচেতন অবস্থায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পর চিকিৎসকদের আর কিছুই করার রইল না। বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়। এক পলকে পুরো বিশ্বের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বযুদ্ধ জয়ের কারিগরের এই আকস্মিক পতনের শোকবার্তা।

অসমাপ্ত ক্যানভাস এবং ইতিহাসের পাতায় জীবন্ত হওয়া এক মাস্টারপিস

প্রেসিডেন্ট যখন চেয়ারে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন, ঠিক তখনই শিল্পী এলিজাবেথ শুমাৎফের হাতের তুলি থেমে গিয়েছিল। শিল্পী তখনও বুঝতে পারেননি যে তিনি আসলে এক অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে উঠছেন। প্রেসিডেন্টের হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ার দৃশ্য দেখে তিনি গভীর মানসিক ধাক্কা খান। চোখের সামনে একটি জীবন্ত মানুষের নিথর হয়ে যাওয়া এবং সেই সাথে একটি বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের নেতার শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার দৃশ্য যেকোনো মানুষের জন্যই ভয়াবহ ট্রমা তৈরি করার মতো। যখন চারদিকে ডাক্তার ও নিরাপত্তারক্ষীদের তীব্র দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়, তখন শুমাৎফ উপলব্ধি করেন যে তাঁর এই আঁকা আর কখনোই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। প্রেসিডেন্টের পরিহিত পোশাক, তাঁর গলার টাই এবং পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড তখনও আঁকা বাকি ছিল। শুধুমাত্র মুখাবয়ব এবং চোখের দৃষ্টিটুকু অসাধারণ দক্ষতায় জলরং দিয়ে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। সেই অর্ধসমাপ্ত ক্যানভাসটিকে তিনি পরম যত্নে গুটিয়ে নেন। রুজভেল্টের মৃত্যুর পর এই অসমাপ্ত ছবিটি কোনো সাধারণ বাতিল ছবি হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়নি, বরং এটি পরিণত হয় পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত ঐতিহাসিক নিদর্শনে। ছবিটির নাম দেওয়া হয় আনফিনিশড পোর্ট্রেট অফ ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। এই ছবির দিকে তাকালে মানুষের মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি জাগে। ছবিতে প্রেসিডেন্টের মুখে দেখা যায় গভীর প্রজ্ঞা, দীর্ঘদিনের ক্লান্তি এবং একই সাথে বিশ্বজয়ের আশাবাদী এক শান্ত প্রকাশ। কিন্তু গলার নিচ থেকে পুরো ছবিটি সাদা ক্যানভাসে মিলিয়ে গেছে, যা নিখুঁতভাবে তুলে ধরে যে নিয়তি কীভাবে মানুষের সবচেয়ে সাজানো পরিকল্পনাকে এক লহমায় থামিয়ে দিতে পারে। পরবর্তীতে শুমাৎফ স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ আরেকটি নতুন প্রতিকৃতি শেষ করে দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু এই অসমাপ্ত ছবিটিই মানুষের অন্তরে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। আজও জর্জিয়ার ওয়ার্ম স্প্রিংসে সেই লিটল হোয়াইট হাউসের জাদুঘরে গেলে দেখা যায় এই মূল অসমাপ্ত জলরং ছবিটি, যা রুজভেল্টের জীবনের শেষ কর্মমুখর মুহূর্তটিকে চিরদিনের জন্য জীবন্ত করে ধরে রেখেছে।

লুসি মার্সার এবং মৃত্যুর আড়ালে ঢাকা পড়া দীর্ঘ গোপন প্রেম

প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সেসময় পত্রিকায় বহু শোকবার্তা ও খবর ছাপা হয়েছিল, কিন্তু সরকার এবং প্রেসিডেন্টের কাছের মানুষেরা খুব সচেতনভাবেই একটি বড় সত্য চেপে গিয়েছিলেন। আর সেই সত্যটি হলো, রুজভেল্ট যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তখন তাঁর পাশে কেবল ডাক্তার বা চিত্রশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন তাঁর জীবনের দীর্ঘদিনের গোপন প্রেমিকা লুসি মার্সার রাদারফার্ড। তাঁদের এই প্রণয়ের গল্প শুরু হয়েছিল সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, প্রায় ১৯১৬ থেকে ১৯১৮ সালের দিকে। তখন লুসি মার্সার ছিলেন রুজভেল্টের স্ত্রী ফার্স্ট লেডি এলিনর রুজভেল্টের ব্যক্তিগত সামাজিক সহকারী। অপরূপ রূপবতী ও মিষ্টভাষী লুসির প্রেমে একসময় গভীরভাবেই হাবুডুবু খেতে শুরু করেন তরুণ রাজনীতিবিদ ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট। তবে ১৯১৮ সালে এলিনর ঘটনাক্রমে তাঁদের কিছু গোপন প্রেমপত্র দেখে ফেলেন এবং পুরো সম্পর্কের কথা জেনে যান। এলিনর তখন রুজভেল্টকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে তিনি বিবাহবিচ্ছেদ চান। কিন্তু রুজভেল্টের মা সারা রুজভেল্ট এবং তাঁর প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টারা বোঝান যে ডিভোর্স হলে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। পরিবারের সম্মান ও নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে রুজভেল্ট তখন এলিনরের কাছে লিখিতভাবে প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি লুসি মার্সারের সঙ্গে জীবনের সকল যোগাযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন করবেন। বাহ্যিকভাবে সেই দাম্পত্য টিকে যায় এবং তাঁরা শুধু রাজনৈতিক সহকর্মী ও অংশীদারের মতো সংসার চালিয়ে যান। কিন্তু মনের ভেতরের আবেগ রুজভেল্ট কখনোই ভুলতে পারেননি। বহু বছর পর, যখন রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট এবং লুসিও অন্যত্র বিয়ে করে বিধবা হয়েছেন, তখন প্রেসিডেন্টের মেয়ে আন্না গোপনে বাবার একাকীত্ব কমাতে তাঁদের মধ্যে আবার দেখা করার সুযোগ করে দেন। এলিনরের সম্পূর্ণ অগোচরে এই যোগাযোগ নিয়মিত চলতে থাকে। এমনকি শিল্পী এলিজাবেথ শুমাৎফকে দিয়ে প্রতিকৃতি আঁকানোর সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটিও ছিল লুসির নিজের উদ্যোগে সাজানো। রুজভেল্টের মৃত্যুর দিন সকালে লুসি নিজেই শিল্পীকে সাথে নিয়ে ওয়ার্ম স্প্রিংসে আসেন এবং আনন্দঘন পরিবেশে রুজভেল্টের পাশে বসে গল্প করছিলেন। কিন্তু যখনই প্রেসিডেন্ট ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যান, তখন সবাই বুঝতে পারেন যে ফার্স্ট লেডি বা সংবাদমাধ্যম আসার আগে লুসির এখানে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সম্মান বাঁচাতে এবং রুজভেল্টের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি রক্ষা করতে লুসি ও শিল্পী দ্রুত নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে গোপনে সেখান থেকে গাড়িতে করে চলে যান। ফলে কয়েক দশক ধরে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছিল রুজভেল্ট হয়তো সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় কাজ করতে করতেই মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু সত্য ছিল ভালোবাসার মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর শেষ বিদায়।

আমেরিকান ইতিহাসের বিখ্যাত নায়ক রুজভেল্ট
রূজভেল্ট এর ইতিহাস

ক্ষমতার পালাবদল এবং পরমাণু বোমার এক মারাত্মক ভবিষ্যৎ

রুজভেল্টের এই আকস্মিক মৃত্যুর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বে এমন এক অবিশ্বাস্য শূন্যতা তৈরি হয় যা সামাল দেওয়া ছিল সেসময়ের জন্য অত্যন্ত কঠিন। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন হ্যারি এস. ট্রুম্যান। তিনি খুব সাধারণ পটভূমি থেকে রাজনীতিতে উঠে এসেছিলেন এবং রুজভেল্টের মতো প্রজ্ঞাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের কাছে ট্রুম্যান ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত এক মানুষ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রুজভেল্ট ট্রুম্যানের সাথে রাষ্ট্রীয় কোনো গোপন পরিকল্পনা বা জটিল যুদ্ধকৌশল নিয়ে খুব একটা আলোচনা করার সুযোগই পাননি। এমনকি ম্যানহাটন প্রজেক্ট নামে যে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে অত্যন্ত শক্তিশালী পরমাণু বোমা তৈরি করছিল, সে সম্পর্কে ট্রুম্যানকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। রুজভেল্টের মৃত্যুর খবর পেয়ে যখন ট্রুম্যান হোয়াইট হাউসে পৌঁছান, তখন এলিনর রুজভেল্ট তাঁর কাঁধে হাত রেখে সমবেদনা জানান। ট্রুম্যান গভীর আবেগে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তিনি ফার্স্ট লেডিকে কোনো সাহায্য করতে পারেন কি না। তখন এলিনর শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলেছিলেন যে সাহায্য আসলে ট্রুম্যানের নিজের দরকার, কারণ পুরো দেশের ভার এখন সম্পূর্ণ তাঁর ওপর এসে পড়েছে। রুজভেল্ট মারা যাওয়ার ঠিক কয়েক সপ্তাহের মাথায়, অর্থাৎ ৮ মে ১৯৪৫ তারিখে নাৎসি জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে এবং ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। মানুষ যখন রুজভেল্টের অভাব গভীরভাবে অনুভব করছিল, ঠিক তখনই ট্রুম্যানের ওপর নেমে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য ট্রুম্যানের টেবিলে নিয়ে আসা হয় সম্পূর্ণ নতুন তৈরি হওয়া পরমাণু অস্ত্রের ফাইল। বিশ্বনেতা হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় ট্রুম্যানকে সেই মারাত্মক আদেশে সই করতে হয়। ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করা হয়, যার ধ্বংসযজ্ঞ মানবজাতির ইতিহাসে এক ভয়ংকর কালো দাগ ফেলে যায়। ওয়ার্ম স্প্রিংসের এক শান্ত ঘরে রুজভেল্টের অসমাপ্ত তুলির আঁচড় এবং তাঁর গোপন প্রেমের নীরব পরিসমাপ্তি যেন পুরো পৃথিবীকে আচমকা এক নতুন ও বিপজ্জনক পরমাণু যুগের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।

ধারাবাহিক গল্প পড়ুন